শাসকের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের সুবর্ণ রেখা দৃশ্যমান হচ্ছে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
জলি তালুকদার : দেশ গণআন্দোলনের এক নতুন পর্বে প্রবেশ করছে। একদিকে গণবিরোধী শাসক গোষ্ঠীর শোষণ জুলুমের মাত্রা বেড়েই চলেছে। অন্যদিকে শ্রমিক-ছাত্র-জনতার প্রতিরোধ সংগ্রামের সুবর্ণ রেখা ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। আর ক্ষমতাসীনদের রক্ষায় রাষ্ট্রযন্ত্র গণআন্দোলনগুলো অঙ্কুরেই ধ্বংস করতে সমস্ত শক্তি নিয়োজিত করেছে। সর্বশেষ সরকারের চরম গণবিরোধী জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পদক্ষেপ দেশের মানুষের জীবনযাপন দুর্বিষহ করে দিয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ জীবন ব্যয়ের চরম ঊর্ধগতির কারণে এমনিতেই সাধারণের জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির মধ্যদিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই গত একসপ্তাহে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন, সড়ক অবরোধ এবং ছাত্রদের হাফ ভাড়ার দাবিতে রাজপথে বিক্ষোভ-অবরোধ চলছে। আন্দোলন যাতে বিস্তৃত হতে না পারে, সেজন্য শাসকদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই। গত ২২ নভেম্বর মিরপুরের অদূরে কচুক্ষেত ও ভাসানটেক এলাকায় মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে এলে মালিকগোষ্ঠী, দালাল চক্র ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাসমূহ তথাকথিত ‘উস্কানিদাতা’ হিসেবে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রকে চিহ্নিত করেছে। যুক্তি হিসেবে তারা বলতে চান, মিরপুরের ১০ নম্বর গোল চত্ত্বর সংলগ্ন আইডিয়াস গার্মেন্ট কারখানায় গত ১১ নভেম্বর থেকে চলে আসা নয় দফা দাবির শ্রমিক আন্দোলন থেকেই অদূর কচুক্ষেত ও ভাসানটেকে শ্রমিক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে মালিক সমিতি বিজিএমইএ এবং মালিকদের সেবক কিছু দালাল সংগঠন সুযোগ মতো উঠে পড়ে লেগেছে তাদের ‘জাতশত্রু’ গার্মেন্ট টিইউসিকে শায়েস্তা করার জন্য। শোনা যায়, বিজিএমইএ’র একজন পরিচালক, গোয়েন্দা ও পোশাকধারী সংস্থার লোকজন এবং কয়েকটি দালাল শ্রমিক সংগঠনের নেতারা ২২ নভেম্বর গাড়িতে ঘুরে ঘুরে সভা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, যেকোনো মূল্যে গার্মেন্ট শ্রমিক টিইউসিকে থামাতে হবে। যার প্রেক্ষিতে তারা আমাদের ওপর সর্বাত্মক চাপ সৃষ্টি ও আক্রমণ শুরু করেছে। গার্মেন্ট শ্রমিক টিইউসিকে চাপে ফেলতেই গত ২২ নভেম্বর রাতে সিপিবি’র কেন্দ্রীয় নেতা ডা. সাজেদুল হক রুবেলকে ফিল্মি কায়দার অভিযান চালিয়ে বাসা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে পরের দিন বিকেল পর্যন্ত কাফরুল থানায় আটকে রাখা হয়। তিনি আগের দিন ২১ নভেম্বর আইডিয়াস কারখানার আন্দোলনরত শ্রমিকদের বিক্ষোভ সমাবেশে সংহতি বক্তব্য দিয়েছিলেন, এ কারণেই আইন-শৃঙ্খলার কর্তাদের সাথে ‘একটু কথা বলার জন্য’ তাকে নিয়ে গিয়ে সে রাত এবং পরের গোটা দিন হাজতে আটকে রাখা হয়। তাকে নানান হয়রানীমূলক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ ঘটনা গার্মেন্ট শ্রমিক টিইউসি’র ওপর কতটা চাপ তৈরি করতে পেরেছে সেটা নিরূপণ করা সম্ভব না হলেও, এই অপকর্মটি শ্রমিকদের যথেষ্টই বিক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত করেছে। ২২ নভেম্বরের ধারাবাহিকতায় পরের দিন মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে গোটা বৃহত্তর মিরপুর এলাকার শ্রমিকরা রাস্তায় নামলে মাস্তান ও সন্ত্রাসী বাহিনী ভাড়া করে শ্রমিকদের দমন করা হয়। বিভিন্ন জায়গায় শ্রমিকদের ধরে ধরে পিটিয়ে আহত করা হয়। যার প্রতিবাদে পরের দিন ২৩ নভেম্বর ঐ এলাকায় সর্বাত্মকভাবে শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে পড়েন। আগের দিনের ভাড়াটে মাস্তান ও সন্ত্রাসী বাহিনীর ডেরা হিসেবে পরিচিত ফুটপাথের কিছু দখলি ঝুপড়ি ঘর ভাংচুর করে। আন্দোলন সেদিন কুড়িল, চন্দ্রা, কুমিল্লা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। উত্তেজিত শ্রমিকরা কিছু যানবাহনে ঢিল ছুড়েছে মর্মেও সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ২৫ ও ২৬ নভেম্বর ঐ এলাকার সকল কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ২৪ ও ২৫ নভেম্বর মিরপুর এলাকার এমবিএম কারখানাসহ কয়েকটি কারখানায় ভাংচুর ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। খোদ মালিকরাই বলছেন, এ সকল ধ্বংসযজ্ঞের সাথে শ্রমিকরা জড়িত নয়। বহিরাগত লোকেরা এর সাথে জড়িত। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো শ্রমিকদের বা ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীদের ধরতে যতটা পারদর্শী, এই সকল স্বার্থান্বেষী চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে ততটা পারদর্শী বলে দেখা যাচ্ছে না। গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র সরকারের প্রতি ২২ নভেম্বর মিরপুরে শ্রমিকদের ওপর হামলাকারী সকল ভাড়াটে মাস্তান-সন্ত্রাসী ও তাদের নির্দেশদাতা-অর্থদাতাদের গ্রেফতার ও বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে। একই সাথে অবিলম্বে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ, মজুরি বৃদ্ধি না হওয়া পর্যন্ত মহার্ঘ্য ভাতা চালু এবং জাতীয় নিম্নতম মজুরি ২০ হাজার টাকা ঘোষণার জোর দাবি করেছে। গার্মেন্ট শ্রমিক টিইউসি শিল্পের সকল শ্রমিক-কর্মচারীর কাছে দাবি আদায়ে বিপ্লবী ধারার ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছে। মজুরি বৃদ্ধি এই মুহূর্তে শ্রমিকদের জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট। কারো ভালো লাগুক আর না লাগুক, কেউ নেতৃত্ব দিক কিংবা না দিক- শ্রমিকরাদের এই সংকটের আশু সুরাহা না হলে বার বার জ্বলে উঠবে। শ্রমিকদের জীবনের এই মহাসংকট দূর না করে ‘উস্কানি’, ‘ষড়যন্ত্র’ এই সকল তত্ত্ব দিয়ে পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটানো যাবে না। গাজীপুরের স্টাইল ক্রাফট কারখানার শ্রমিকরা ঢাকার শ্রম ভবনে টানা দশ দিন লাগাতার অবস্থান আন্দোলন করে গত ৬ নভেম্বর আংশিক পাওনা আদায় করেছিলো। আগামী ২ ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের অবশিষ্ট পাওনা পরিশোধ করার জন্য শ্রম প্রতিমন্ত্রী অঙ্গীকারবদ্ধ। এই বিষয়ে গত ২১ নভেম্বর শ্রম মন্ত্রণালয়ে ত্রিপক্ষীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মালিকপক্ষ অবশিষ্ট পাওনা কম দেয়ার চেষ্টায় লিপ্ত। তারা আন্দোলনের শ্রমিক নেতৃত্বকে ঠেকাতে তথাকথিত রেজিস্টার্ড ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্ব সাথে করে সভায় এসেছে। পরে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই সভা শেষ হয়। স্টাইল ক্রাফট শ্রমিকরা আবারো যদি প্রতারণার মুখে পড়ে তাহলে কঠোর আন্দোলনের কোনো বিকল্প থাকবে না। শ্রমিক সংখ্যার বিচারে দেশের সবচেয়ে বড় গার্মেন্ট কারখানা সিনহা গ্রুপ বন্ধ ঘোষিত হয়েছে। শ্রমিকদের পাওনার জন্য আমরা দীর্ঘ দিন ধরে আন্দোলন করে আসছি। মালিক আইন অনুযায়ি পাওনা পরিশোধ করলে শ্রমিককে কোনো আন্দোলন করতে হয় না। আর শ্রমিক যদি আন্দোলনের চাপে মালিকপক্ষকে আলোচনায় বসাতে পারে তাতেও শতভাগ পাওনা আদায় হয় না। আইনের চেয়ে বেশি দাবি করে দরকষাকষিতে আইন মত পাওনা আদায় করা; আন্দোলনে এমন হওয়ার সুযোগ থাকে না। আইনে যা বলা আছে তার জন্য আন্দোলন করে শেষমেষ শ্রমিক পক্ষকেই পাওনা টাকা কিছুটা মাফ করে দিয়ে সমঝোতা করতে হয়। অন্যথায় আদালতের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া শ্রমিক পক্ষের আর কোনো পথ খোলা থাকে না। শ্রমিক আদালতে গেলে সেটা মালিকের জন্য হয় পোয়াবারো। দীর্ঘ আন্দোলনের ফল হিসেবে গত ২১ নভেম্বর বিকেএমইএ-এর প্রধান কার্যালয়ে সিনহা গ্রুপ শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের বিষয়ে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়েছে। মিরপুরের আইডিয়াস কারখানার শ্রমিকদের একটি বাদে সব দাবি মালিকপক্ষ মেনে নিয়েছে। মানুষের জীবন আজ যে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে তা থেকে মুক্তি পেতেই শ্রমিকদের বিদ্রোহ, ছাত্রদের আন্দোলন মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। এই বিদ্রোহ ও আন্দোলনগুলোই সুবর্ণ রেখা হিসেবে আমাদের পথ দেখাবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..