আনাতোলি লুনাচার্সকি : সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতি নির্মাণের পথিকৃৎ

আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবর (নতুন পঞ্জিকা ৭ নভেম্বর) মধ্যরাতে রাশিয়ার বিজয়ী শ্রমিক-কৃষক-সৈনিকরা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনকে চেয়ারম্যান করে সংবিধান সভা না বসা পর্যন্ত শাসন পরিচালনার জন্য “জনকমিশনার পরিষদ” নামে শ্রমিক-কৃষক-সৈনিকদের যে সাময়িক সরকার গঠন করেছিল তার জনশিক্ষা কমিশনার হন আনাতোলি ভাসিলিয়েভিচ লুনাচার্সকি। আলেকজেন্ডার আন্তনোভ ও আলেকজেন্দ্রা রুসতোস্টেভেয়ার পুত্র আনাতোলি লুনাচার্সকি ১৮৭৫ সালের ১১ নভেম্বর (মতান্তরে ২৪ নভেম্বর) উইক্রেনের পলটাভায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মায়ের প্রথম স্বামী ভাসিলি লুনাচার্সকির নাম গ্রহণ করেন। লুনাচার্সকি মাত্র ১৫ বছর বয়সে মার্কসবাদের দীক্ষা লাভ করেন। তিনি ১৮৯৪ সালে জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে খ্যাতিমান দার্শনিক আভেনারিয়স্্ এর অধীনে কোন ডিগ্রি গ্রহণ না করেই দুই বছর দর্শন শাস্ত্রে দীক্ষা গ্রহণ করেন। পশ্চিম ইউরোপে থাকাকালীন সময়ে তিনি রোজা লুক্সেমবার্গসহ তৎকালীন গুরুত্বপূর্ণ মার্কসবাদীদের সাথে যোগাযোগ করেন। ১৮৯৬ সালে তিনি রাশিয়ায় ফিরে আসেন। রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টি গঠন প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে তিনি জারশাহী কর্তৃক গ্রেফতার হন এবং কালুগাতে নির্বাসিত হন। ১৯০২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি কিয়েভে ফিরে আসেন এবং ভোলোগদায় রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টির নেতা এবং বিশিষ্ট চিন্তক আলেকজেন্ডার বগদানভের সান্নিধ্যে আসেন। একই বছরে তিনি বগদানভের কনিষ্ঠ বোন আন্না আলেকজেন্দ্রভনা মালিনভকায়াকে বিয়ে করেন। ১৯০৩ সালে বেলজিয়ামের ব্রাসেলস ও লন্ডন দুই জায়গা মিলিয়ে অনুষ্ঠিত রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টি (আরএসডিএলপি)’র দ্বিতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। কংগ্রেসে পার্টির গঠন প্রক্রিয়া ও পার্টি সদস্য হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে বিতর্কে পার্টি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়। লেনিনের নেতৃত্বাধীন অংশ বলশেভিক এবং মার্তভ ও প্লেখানভের নেতৃত্বাধীন অংশ মেনশেভিক নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯১২ সালে দুটি ভিন্ন পার্টি গঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত একই পার্টির মধ্যে দুটি আলাদা পার্টির মতই কাজ করে বলশেভিক ও মেনশেভিকরা। দ্বিতীয় কংগ্রেসের সময় আনাতোলি লুনাচার্সকি তাঁর সম্বন্ধী আলেকজেন্ডার বগদানভের সাথে লেনিনের নেতৃত্বাধীন বলশেভিক অংশে যোগ দেন। লুনাচার্সকি ১৯০৭ সালে জার্মানির স্টুটগার্ডে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্রী কংগ্রেসে যোগ দেন। স্তিলিপিন প্রতিক্রিয়ার যুগে রাশিয়ার বামপন্থিদের মধ্যে নানা রকম বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কমিউনিস্টদের মধ্যে পার্টি পরিত্যাগ করে ভিন্ন গ্রুপ গঠনের প্রবণতা দেখা যায়। ১৯০৮ সালে আরএসডিএলপি’র বলশেভিক অংশের মধ্যেও বিভ্রান্তি দেখা দেয়। বলশেভিকরা লেনিনের অনুসারী এবং আলেকজেন্ডার বগদানভের সমর্থক গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যায়। আনাতোলি লুনাচর্সকি বগদানভের পক্ষাবলম্বন করেন। বগদানভ গ্রুপ ‘ভেপরোয়েদ’ নামের পত্রিকাকে সামনে রেখে সমবেত হয়। আভেনারিয়স্ এর ছাত্র আনাতোলি লুনাচর্সকি আলেকজেনদার বগদানভের ন্যায় তৎকালীন খ্যাতিমান দার্শনিক আর্নেস্ট মাখ, আভেনারিয়স্ এর মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। আর্নেস্ট মাখের ‘পজিটিভিজম’ দ¦ারা তারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। ১৯০৮ সালে সেন্টপিটার্সবুর্গ থেকে প্রকাশিত ‘মার্কসবাদের দর্শন বিষয়ে আলোচনা’ নামে একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। যাতে বাজারভ, বগদানভ, বের্মান, হেলফন্ড, য়ুশকেভিচ, সভরভের সাথে লুনাচার্সকিরও একটি প্রবন্ধ ছিল। সে সময় বলশেভিকদের বিভ্রান্ত অংশ, মেনশেভিক দার্শনিকরা এবং সস্বীকৃত মার্কসবাদীরা মার্কসের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদের মর্মবস্তুকে আক্রমণ করে বহু প্রবন্ধ রচনা করেন। তার জবাবে ভ. ই. লেনিন ১৯০৯ সালে রচনা করেন ‘মেটিরিয়ালিজম অ্যান্ড এম্পিরিয়ো ক্রিটিসিজম’ নামক দার্শনিক গ্রন্থ। এ গ্রন্থে তিনি মার্কসবাদের নীতিগত ভিত্তি দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। ১৯০৯ সালে লুনাচার্সকি, বগদানভ, ম্যাক্সিম গোর্কি মিলে ক্যাপ্রি দ্বীপে রুশ সমাজতন্ত্রীদের জন্য স্কুল খুলেন। ১৯১০ সালে তা বোলোগনাতে স্থানান্তরিত হয় এবং ১৯১১ সাল পর্যন্ত তা টিকে থাকে। ১৯১৩ সালে লুনাচর্সকি প্যারিসে চলে যান। সেখানে ‘প্রলেতারিয়ান কালচার সার্কেল’ নামে নিজস্ব একটি চক্র চালু করেন। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেন যা তাকে লেনিন ও ট্রটস্কি উভয়ের মতাদর্শের নিকটবর্তী করে। ১৯১৫ সালে লুনাচার্সকি পাভেল লেবদেভ পলিয়ানাস্কিকে সাথে নিয়ে পুনরায় ‘ভেপরোয়েদ’ পত্রিকা চালু করেন। নতুন ভেপরোয়েদ এ সর্বহারার সংস্কৃতি আলোচনা প্রধান্য পায়। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে রুশ বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে জারতন্ত্রের উচ্ছেদ ঘটলে লুনাচার্সকি রাশিয়ায় প্রত্যাবর্তন করেন। অন্যান্য আন্তর্জাতিকতাবাদী সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের মত বলশেভিক ও মেনশেভিকদের চিন্তাধারার মধ্যবর্তী ট্রটস্কির দল ‘মেঝ্্রাইয়ন্ত্সি’তে যোগ দেন। ১৯১৭ সালের ২৬ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট (৮-১৬ আগস্ট) অনুষ্ঠিত রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টি (বলশেভিক)’র ষষ্ঠ কংগ্রেসে ‘মেঝ্্রাইয়ন্ত্সি’ দল ঘোষণা করে “তারা সর্ববিষয়ে বলশেভিকদের সাথে একমত”। তাদের পার্টিতে অন্তর্ভুক্তির আবেদনের প্রেক্ষিতে কংগ্রেস মেঝ্্রাইয়ন্ত্সি’র সকল সদস্যকে বলশেভিক পার্টিতে যোগ দেয়ার অনুমতি দেয়। লুনাচার্সকি তখন ট্রটস্কির সাথে জুলাই অভ্যুত্থানের কারণে কেরনেস্কির নির্দেশে কারাবন্দি ছিলেন। লুনচারিস্কি ১৯০৮ সালের পর পুনরায় লেনিনের নেতৃত্বাধীন বলশেভিক পার্টিতে ফিরে এলেন। রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকারে তিনি জনশিক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিশনার বা মন্ত্রী ছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর ডেপুটি হিসেবে দায়িত্ব পান আরেকজন আদি বলশেভিক নাদেজদা ক্রুপস্কায়া। ১৯৩২ সালের মধ্যে সমগ্র সোভিয়েত ইউনিয়ন নিরক্ষরতামুক্ত হয়। এর ভিত্তি তৈরি করে লুনাচার্সকির নেতৃত্বে জনশিক্ষা পরিষদ। ১৯১৯ সালে বলশয় থিয়েটার প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন লুনাচার্সকি। তিনি সোভিয়েত সেন্সর বোর্ডের সভাপতি ছিলেন। তিনি আলেকজেন্ডার বগদানভের সর্বহারা সংস্কৃতি কেন্দ্রিক ’প্রলেটকাল্ট’ আন্দোলনকে পৃষ্ঠপোষকতা দেন। ১৯২৯ সাল পর্যন্ত তিনি জনশিক্ষা কমিশনার পদে দায়িত্ব পালন করেন। সোভিয়েত সমাজে সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতি ধারণা নির্মাণ ও বিস্তারে অসামন্য ভূমিকা রেখেছেন লুনাচার্সকি। সোভিয়েত সরকার ১৯৩০ সালে আনাতোলি লুনাচার্সকিকে লীগ অব নেশনস্্ বা জাতিপুঞ্জে তাদের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্তি দেয়। ১৯৩৩ সালে সোভিয়েত সরকার লুনাচর্সকিকে স্পেনে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত করে। ১৯৩৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর (২৬ ডিস্মেবর) মাত্র ৫৮ বছর বয়সে স্পেনে রাষ্ট্রদূতের পদে যোগদানের পথে ফ্রান্সের মেনটন শহরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। লুনাচার্সকিকে ক্রেমলিন প্রাচীরের নেক্রপলিসে সমাহিত করা হয়। লুনাচর্সকি একজন সৃষ্টিশীল লেখক ছিলেন। আলেকজেন্ডার পুশকিন, জর্জ বার্নার্ড শ’সহ অনেক সৃজনশীল সাহিত্যিকের সাহিত্যকর্মের উপর সমালোচনা প্রবন্ধ রচনা করেন তিনি। তাঁর অন্যতম সাহিত্যকর্ম হচ্ছে আত্মজীবনী ‘জবাড়ষঁঃরড়হধৎু ঝরষযড়ঁবঃঃবং’, এ বইয়ে লেনিন, ট্রটস্কি ও অন্য আটজন বিপ্লবী সম্পর্কে তাঁর অভিমত সন্নিবেশিত আছে। তিনি সাহিত্য ও চিত্রকলার উপর লিখেন ‘ঙহ খরঃবৎধঃঁৎব ধহফ অৎঃ’. দর্শনের ছাত্র হিসেবে লুনাচর্সকির মার্কসবাদী দর্শনের বাইরে ফিস্তে, নিৎসে, মাখ ও আভেনারিয়স্্ এর দর্শনের উপর দখল ছিল। তিনি ছয়টি আধুনিক ও দুটি মৃত ভাষা পাঠ করতে পারতেন। তাঁর সাথে এইজ জি ওয়েলস, জর্জ বার্নার্ড শ ও রোঁমা রোলার পত্র যোগাযোগ ছিল। আনাতোলি লুনাচার্সকি সম্পর্কে আইজাক ডয়েশ্চার লিখেছেন, “প্রত্যক্ষদর্শীরা সাক্ষ্য দিয়েছেন ১৯১৭ সালের ঘটনায় তাঁর অবদান ছিল অনন্য। ‘নরম’, ‘ঈশ্বর সন্ধানী’, ‘আধাভোলা অধ্যাপক’ টাইপের মানুষটি বিপ্লবের গরম পরিস্থিতিতে সকলকে বিস্মিত করে দিয়েছিলেন তাঁর অদম্য কর্মক্ষমতা দিয়ে। লাল পেত্রগ্রাদে ট্রটস্কির পর তিনি ছিলেন অনলবর্ষী বক্তা। প্রতিদিন অথবা দিনে অনেকবার তিনি পেত্রগ্রাদের অজস্র ক্ষুধার্ত, উত্তেজিত শ্রমিক জনতার সামনে অগ্নি উগ্রে দিতেন নিজের বক্তৃতায়।” লেখক : প্রেসিডিয়াম সদস্য, সিপিবি, কেন্দ্রীয় কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..