দার্শনিক পদ্ধতি, আওতা ও শ্রেণিচরিত্র

লুৎফর রহমান

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
দ্বন্দ্ববাদ ও অধিবিদ্যা : দর্শনের বুনিয়াদী প্রশ্নের মতো আরো একটি প্রশ্ন আছে। সেটি হচ্ছে, পৃথিবী কি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, না বিকশিত হচ্ছে ? দর্শনের এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয়েছে পরস্পর বিপরীত দুই পদ্ধতিতে। এর একটি হচ্ছে দ্বন্দ্ববাদ (উরধষবপঃরপং), আর অন্যটি হচ্ছে অধিবিদ্যা (গবঃধঢ়যুংরপং)। পদ্ধতি হলো লক্ষ্য অর্জনের উপায় যার সাথে যুক্ত থাকে নির্দিষ্ট নীতিসমূহ, তত্ত্বগত গবেষণা ও ব্যবহারিক কাজের ধরন, এসব মিলিয়েই হয় একটি পদ্ধতি। কোনো বৈজ্ঞানিক বা ব্যবহারিক সমস্যা সমাধানে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতির প্রয়োজন পড়ে। কোনো একটি বিশেষ সমস্যার ক্ষেত্রে একটি পদ্ধতির প্রয়োগ হয় না কেবল, পদ্ধতিটির প্রয়োগ হয় প্রকৃতি, সমাজ ও চিন্তার সকল ক্ষেত্রে। প্রয়োগ হয় বিশ্বজনীন সমস্যাগুলোর ক্ষেত্রে। দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি : (ক) দ্বান্দ্বিকতার প্রবক্তারা মনে করেন, সমস্ত পদার্থ, প্রক্রিয়া ও ব্যাপারসমূহ পরস্পর সম্পর্কিত। সেগুলোর মধ্যে একটা মিথষ্ক্রিয়া বা রহঃবৎধপঃরড়হ ঘটে। এবং সেগুলো একটি অপরটিকে শর্তে আবদ্ধ করে। (খ) তাঁরা আরো বলেন, সবকিছু প্রতিনিয়ত গতি ও বিকাশের অবস্থায় আছে। এ ছাড়া কোনো কিছুই নেই। বিকাশ সম্বন্ধে তাঁরা প্রথমতঃ বলেন, বিকাশের উৎস হচ্ছে সবকিছুর মধ্যে বিরাজিত তার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। প্রত্যেক পদার্থের মাঝে সহজাতভাবে আছে দুই বিপরীতের সংগ্রাম। এই দ্বন্দ্ব বাইরে থেকে ঢোকানো হয় না, এটা প্রকৃতি ও সমাজের ভেতরেই রয়েছে। দ্বিতীয়তঃ ডায়লেকটিকস বিকাশকে দেখে, পরিমাণগত পরিবর্তন থেকে গুণগত পরিবর্তন রূপে। গুণগত পরিবর্তন মানে নতুন পদার্থ বা ঘটনার উদ্ভব, আরো শক্তি বৃদ্ধি। তৃতীয়তঃ পুরনো সব সময় নতুনকে স্থান ছেড়ে দেয় অর্থাৎ বিকাশের একটি পর্যায় আরেকটি পর্যায়কে স্থান ছেড়ে দেয় সার্বিকভাবে। (গ) ডায়লেকটিকস পৃথিবীকে দেখে যেমন আছে তেমনভাবে। পৃথিবীর পরিবর্তনের কথা বলে, নতুনের জয়ের কথা বলে দ্বন্দ্ববাদ প্রগতিশীল বৈপ্লবিক শক্তিগুলোকে সাহায্য করে পুরনোকে ভেঙে নতুনকে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। (ঘ) আজকে বিশ্বময়, এক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসেবে ডায়লেকটিস-এর প্রয়োজন জ্ঞানার্জন ও কর্মপ্রয়োগের মাধ্যমে বিকাশের জন্য। এছাড়া আত্মিক জীবনের বিকাশেও এ পদ্ধতি অপরিহার্য। অধিবিদ্যাগত পদ্ধতি: (ক) অন্যদিকে অধিবিদ্যার পক্ষ অবলম্বনকারীরা ধরে নেন যে, পৃথিবী অপরিবর্তনীয়। প্রকৃতি ও সমাজ কখনো বদল হয় না। (খ) তারপর বস্তু ও ব্যাপারগুলোর একটি অপরটির সাথে কোনো সংযোগ নেই। সবকিছুর অস্তিত্ব থাকে বিচ্ছিন্নভাবে। (গ) বিকাশের প্রক্রিয়াকে তারা দেখেন বর্তমানে যা আছে, তার হ্রাস-বৃদ্ধি হিসেবে। তাঁদের মতে বিকাশ হয় বিভিন্ন পদার্থের বাহ্যিক সংঘর্ষের মাধ্যমে। অথবা এক দৈব শক্তির দ্বারা। (ঘ) অধিবিদ্যা বিকাশের প্রগতিশীল চরিত্রকে স্বীকার করে না। স্বীকার করে না নতুনের অবশ্যম্ভাবী বিজয়কে। এই পদ্ধতি প্রগতির বিপক্ষে সংগ্রামে রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর স্বার্থে ব্যবহৃত হয়। এটি সংশোধনবাদ ও মতান্ধতার ক্ষেত্রে তত্ত্বগত সমর্থন দেয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে অধিবিদ্যা হচ্ছে দ্বন্দ্ববাদের সম্পূর্ণ বিপরীত এক দার্শনিক পদ্ধতি। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের আওতা : একটি বিজ্ঞান হিসেবে দর্শনের বিষয়বস্তু যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়ে আসছিলো। প্রথমে পৃথিবীর সব জ্ঞান দর্শনের আওতায় ছিলো। প্রাচীন দার্শনিকরা প্রকৃতি-বিজ্ঞানীও ছিলেন। নতুন নতুন বিশেষ বিজ্ঞানেও বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তখন অনেক বিশেষ বিজ্ঞানের উদ্ভব হয়েছিলো। যেমন- জ্যোতির্বিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, বলবিদ্যা, জীববিদ্যা, রসায়ন ও অন্যান্য আরো বিজ্ঞানের শাখা। সেই সাথে বিজ্ঞানগুলো থেকে দর্শন পৃথক হয়ে গিয়েছিলো। সকল বিজ্ঞানের ওপর দর্শন এক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলো, অর্থাৎ তার প্রতিজ্ঞাগুলো চাপিয়ে দিয়েছিলো। সে সময় দর্শনকে বলা হতো বিজ্ঞানগুলোর বিজ্ঞান। ফলে জন্ম নিয়েছিলো এক বিতর্কের। তখন দর্শনের বিষয়বস্তু কি হবে, অন্যান্য বিজ্ঞানের মধ্যে তার স্থান কি হবে, সমাজে দর্শনের ভূমিকা কি হবে, এসব প্রশ্নের এক বিজ্ঞানসম্মত মীমাংসা করেছিলেন মার্কস ও এঙ্গেলস। তারা এটা করেছিলেন দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদের দর্শন দিয়ে। (ক) মার্কস-এঙ্গেলস আবিষ্কার করেছিলেন যে, দর্শন ও অন্যান্য নির্দিষ্ট বিজ্ঞানের একই উদ্দেশ্য। মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে পারিপার্শ্বিক জগৎ বিষয়ে জ্ঞান অর্জন যাকে বলা হয় অবধারণা। তবে তারা দেখিয়েছিলেন যে এ দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে গবেষণার ক্ষেত্রে। (খ) তারা এ-ও বলেছিলেন পৃথিবীতে নিয়ম হিসেবে ‘বিশ্বজনীন’ ও ‘সুনির্দিষ্ট’ দুটুই আছে। এই উভয় নিয়মই একসাথে একই ব্যাপার ও ক্রিয়াসমূহের অভ্যন্তরে কাজ করে। প্রকৃতির পৃথক ক্ষেত্র ও সমাজ বিষয়ক সুনির্দিষ্ট নিয়মগুলো, বিশেষ বিশেষ বিজ্ঞান অধ্যয়ন করে। আর বিশ্বজনীন নিয়মগুলো অধ্যয়ন করে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ। এগুলো এর আওতা। (গ) দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ হচ্ছে বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির তত্ত্বগত ভিত্তি। এই দর্শন মানুষকে প্রকৃতি, সমাজ ও চিন্তার নিয়মগুলো শেখায়। এই জ্ঞান পৃথিবীর বৈপ্লবিক রূপান্তরে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে প্রয়োজন পড়ে। (ঘ) দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী দর্শন নির্দিষ্ট বিজ্ঞানগুলো ও সামাজিক কর্মপ্রয়োগের সাথে আন্তঃসম্পর্ক স্থাপন করে। এই দর্শন একদিকে পারিপার্শ্বিক জগতের অস্তিত্বের মূলনীতি বিষয়ে এবং বিকাশের নিয়মগুলো বিষয়ে জ্ঞান দেয় বিশেষ বিজ্ঞানগুলোকে। জ্ঞান দেয় সামাজিক কর্মপ্রয়োগকে। অর্থাৎ দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং মানুষের ব্যবহারিক কাজকামকে একমাত্র সঠিক পথে পরিচালিত করে। অন্যদিকে বিশেষ বিজ্ঞানগুলোর উপাত্ত বা ফধঃধ দ্বারা দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ সমৃদ্ধ হয় এবং বাস্তব রূপ পায়। সুতরাং জগৎ সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করতে এবং পৃথিবী ও মানুষের সমাজকে বদলাতে গিয়ে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে আজ দ্বন্দ্বমূলক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ অধ্যয়ন অপরিহার্য। কারণ এ দর্শন প্রগতিকামী মেহনতি মানুষের দর্শন। দর্শনের শ্রেণিচরিত্র : আমাদের কালে সমাজের মূল দুটো শ্রেণি হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণি ও বুর্জোয়া বা ধনিক শ্রেণি। পৃথিবীতে এযাবৎকালে যে সব দার্শনিক তত্ত্বের উদ্ভব হয়েছে এবং এসময়ে বর্তমান আছে তা হয় বস্তুবাদী নয় ভাববাদী। বস্তুবাদ আর ভাববাদের মাঝামাঝি কোনো দর্শন নেই। বস্তুবাদী দর্শন শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের পক্ষে কাজ করে আর ভাববাদ ধনিক শ্রেণি ও শোষকগোষ্ঠীর পক্ষে কাজ করে। এখানেই দর্শনের পক্ষপাতিত্ব, শ্রেণি-চরিত্র ফোটে ওঠে। (ক) দর্শন দুই হাজার বছর আগে যেমন পক্ষপাতমূলক ছিলো এখনো সেরকমই আছে। বস্তুবাদ সবসময়ই ছিলো প্রগতিশীল শক্তিগুলোর বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি। অন্যদিকে ভাববাদ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি। এই দুই শ্রেণির সংগ্রামে দর্শন সব সময় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বর্তমানেও ডায়লেকটিস ও অধিবিদ্যার মধ্যে সংগ্রাম বিদ্ধমান আছে। (খ) দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদী দর্শন ঘোষণা করে যে এটি শ্রমিক শ্রেণি ও প্রগতিশীল মেহনতি মানুষের দর্শন। এই দর্শন ভাববাদের যুক্তিহীন ও প্রতিক্রিয়াশীল সারমর্ম তুলে ধরে; দেখায় যে ভাববাদ সবসময়, ঐতিহাসিকভাবে বিদায় নেবে এমন শ্রেণি-গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করতে চায়। (গ) অন্যপক্ষে ভাববাদের ঘোষণা হচ্ছে, ভাববাদ কোনো পক্ষ অবলম্বন করে না কারণ পক্ষ নেয়া বৈজ্ঞানিক বিষয়মুখিতার বিপক্ষে চলে যায়। আসলে এটা তারা মিথ্যা বলে। এমনটা বলে তারা ঢেকে রাখতে চায়, ভাববাদের শোষক শ্রেণির পক্ষে কাজ করার বিষয়টি। তারা জনগণকে প্রতারিত করে। শোষণ সুদৃঢ় ও চিরস্থায়ী করাই এর লক্ষ্য। সম্রাজ্যবাদ, নয়া-উপনিবেশবাদ, ও বর্ণবাদ-সন্ত্রাসবাদের সেবায় ধনিক শ্রেণি তাদের ভাববাদী দর্শনের পক্ষপাতিত্বকে বাধ্য হয়ে ঢেকে রাখে। কারণ এতে শোষকদের স্বার্থ রক্ষিত হয় এবং শোষণের ব্যবস্থা টিকে থাকে। মূলত এরাই বৈজ্ঞানিক বিষয়মুখিতা বাতিল করে। তারাও বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালায় তবে তা তাদের যতোটুকু শোষণের প্রয়োজনে লাগে। তারা যে শোষণের পক্ষে এটা সরাসরি বলতে পারে না। তাই তাদের দর্শনের উদ্দেশ্য গোপন করে। তারা বলতে পারে না যে তাদের ভাববাদী দর্শনের তত্ত্বগুলো ভুল, অবৈজ্ঞানিক। তা হলেতো জনগণ তাদের ছেড়ে যাবে। তাই শঠতাই তাদের একমাত্র পথ। (ঘ) অন্যদিকে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ তার পক্ষপাতকে গোপন করে না। কারণ শ্রমিক শ্রেণির লক্ষ্য হচ্ছে সকল প্রকার শোষণ-নিপীড়ন দূর করে শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। শ্রমিক শ্রেণি, মেহনতি কৃষকসমাজ ও বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী সমাজের সমস্যাগুলো দূর করতে হলে প্রয়োজন বাস্তব সত্য জ্ঞান যা সরবরাহ করে বৈজ্ঞানিক দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী দর্শন। এখানেই এই দর্শনের সাথে বৈজ্ঞানিক বিষয়মুখিতার নীতি মিলে যায়। ফলে এই দর্শনের পক্ষপাতনীতি ঘোষণায় কোনো সমস্যা হয় না। বরঞ্চ সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মেহনতি মানুষের জমায়েত বাড়ে, যা সমাজের রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করে। লেখক : কলামিস্ট

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..