উৎপাদন সমাজের বুনিয়াদ

লুৎফর রহমান

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
অর্থনীতি সামাজিক বিজ্ঞানের অন্তর্গত একটি বিজ্ঞান। সামাজিক বিজ্ঞান মানবসমাজের নানাদিক বিশ্লেষণ করে। ‘দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ’ কার্ল মার্কসের যুগান্তকারী আবিষ্কার। মানুষের সমাজের ওপর এই দর্শনের প্রয়োগকেই ‘ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’ বলে। ঐতিহাসিক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে অর্থনীতি হচ্ছে মানবজাতির বিকাশের প্রতিটি স্তরে উৎপাদনের সামাজিক ব্যবস্থা, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং বৈষয়িক মূল্যসমূহ উৎপাদন, বণ্টন ও বিনিময় সংক্রান্ত নিয়মগুলো সম্পর্কিত বিজ্ঞান। অর্থনীতির ভাষ্য অনুসারে, উৎপাদনই সমাজের বুনিয়াদ। ইতিহাসের ঝোঁক: মানবজাতির ঐতিহাসিক অগ্রগতি কখনো সরল ছিলো না, বৈপরীত্যে পূর্ণ ছিলো। ছিলো শান্তি ও যুদ্ধ, শোষিতের কঠোর মেহনত আর শোষকের অলস বিলাস এবং শহর ও গ্রামের বিশাল ব্যবধান। মানুষের এ-যাবৎকালের সংগ্রাম হচ্ছে এই বিপরীত অবস্থা থেকে উত্তরণের সংগ্রাম। মানুষ এ-জন্য নানা পথের সন্ধান করেছে। অত্যাচারিতরা অত্যাচারীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। জ্ঞানীরা এমন সমাজের কল্পনা করেছেন যেখানে ব্যক্তিত্বের বিকাশ হবে, প্রকৃতির সাথে মিল রেখে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের নীতির ভিত্তিতে বাস করবে। এ-সবই বৈপরীত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সমাজের কিছু সংখ্যক সুবিধাভোগীর বিরুদ্ধে বিশাল সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সংগ্রাম। পৃথিবীর সব বৈষয়িক ও আত্মিক মূল্যের স্রষ্টা মানুষের শ্রম। এই শ্রম দিয়ে মানুষ প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগায়, মহাশূন্যে সন্ধান চালায়, সূক্ষ্ম যন্ত্র তৈরি করে, বিদ্যুৎ ও পরমাণুশক্তিকে কাজে লাগায় যা আসলেই বিরাট ব্যাপার। কিন্তু প্রকৃতিকে আয়ত্তে আনতে শেখা এবং তার নিয়মগুলো বোঝার পরও মানুষ তাদের নিজেদের ইতিহাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম ছিলো। বহু প্রাকৃতিক ব্যাপারের পুনরাবৃত্তি ঘটে, যেমন দিনের পর আসে রাত আবার রাতের পরে দিন, অথচ সমাজজীবন এমন নয়। এর চালিকাশক্তি নির্ণয় কঠিন। কেউ কেউ মনে করে ইতিহাসের প্রক্রিয়াগুলো শাসিত হয় ব্যক্তিদের দ্বারা, শাসকদের দ্বারা তাদের ক্রিয়াকলাপের গতি-প্রকৃতির দ্বারা। ভাব-ধারণাই পৃথিবীকে শাসন করে, এর থেকেই এ সরল সিদ্ধান্তটি করা হয়, বাস্তবে সেটি ঠিক নয়। মানুষের আচরণ, অভিমত ও ক্রিয়ার সত্যিকার চালিকাশক্তির ব্যাখ্যা করতে হলে, সমাজজীবনের মূলে যেতে হবে। পৃথিবীতে তা সর্বপ্রথম করেছেন কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস। এটিই হচ্ছে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ, ইতিহাসের বস্তুবাদী উপলব্ধি। ইতিহাসের বস্তুবাদী উপলব্ধির প্রধান প্রধান বিষয় হলো - (ক) ইতিহাস এক প্রাকৃতিক বিষয়গত প্রক্রিয়া যা মানুষ নিজেরা তৈরি করে। এখানে কোনো অতিপ্রাকৃতিক শক্তির হস্তক্ষেপ নেই। (খ) মানুষের ইচ্ছায় ইতিহাস তৈরি হয় না, হয় সমাজের প্রতিটা স্তরে সৃষ্ট বৈষয়িক অবস্থার দ্বারা। (গ) এইসব বৈষয়িক অবস্থাই সমাজের পুরা কাঠামোর প্রাণকেন্দ্র, যা মানুষের আত্মিক ও রাজনৈতিক জীবন নিয়ন্ত্রণ করে। এ-ব্যাপারে মার্কসের সূত্রটি হচ্ছে, ‘‘মানুষের চেতনা তাদের অস্থিত্বকে নির্ধারণ করে না, বরং তাদের সামাজিক অস্তিত্বই চেতনাকে নির্ধারিত করে। ” বৈষয়িক উৎপাদন : ইতিহাস সম্পর্কে মার্কসের বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি অর্থনীতি বিষয়েও মৌলিক পরিবর্তন আনে। তিনি দেখান বৈষয়িক উৎপাদন মানবসমাজের বিকাশে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। বেঁচে থাকার জন্য মানুষের প্রয়োজন অনড়ব-বস্ত্র-শিক্ষা-বাসস্থান ও অন্যান্য বৈষয়িক মূল্য। কিন্তু এগুলো প্রকৃতির মাঝে তৈরি অবস্থায় পাওয়া যায় না, মানুষের নিজেদের শ্রমের দ্বারা উৎপন্ন করতে হয়। সমাজ বিকাশের সূচনালগ্নের মানুষ বিভিন্ন বস্তু উৎপন্ন করার কাজে লিপ্ত ছিলো। তারা বন্য পশুর মাংস শিকার করে ঝলসাতো, মাছ ধরতো, আদিম হাতিয়ার বানাতো, বাসস্থান বানাতো এসব করতো। চাহিদা মানুষের শ্রমমূলক কার্যকলাপের সম্প্রসারণ করেছিলো। তাদের যন্ত্রপাতি ও উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ত্রুটিমুক্ত করেছিলো। তারা শিকার করা থেকে পশুপালনের দিকে গিয়েছিলো, তারপর ফসল ফলানোর দিকে। পরবর্তীতে হস্তশিল্প, বয়ন, মৃৎশিল্প ও ধাতুকর্মে হাত দিয়েছিলো। বিকাশের এক নির্দিষ্ট পর্যায়ে হস্তশিল্পের টেকনোলজি ও কায়িক শ্রমের ভিত্তিতে ম্যানুফ্যাকচারগুলোর, অর্থাৎ বহুল পরিমাণের উৎপাদন আত্মপ্রকাশ করেছিলো। এটিরই বিকশিত রূপ বৃহৎ আকারের যান্ত্রিক উৎপাদন। মানুষের অনড়ব-বস্ত্র-বাসস্থান ইত্যাদি ভোগের সামগ্রী উৎপাদন করার প্রয়োজন হয়। আরো প্রয়োজন পড়ে এ-সব উৎপনড়ব করার জন্য আবশ্যক যন্ত্রপাতি-উৎপাদন। উৎপাদন হচ্ছে মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে চলমান এক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষ প্রাকৃতিক পদার্থগুলোকে মানব জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তুতে রূপান্তরিত করে। উৎপাদন ছাড়া মানবসমাজ টিকে থাকতে পারে না, বিকশিত হতে পারে না। ইতিহাসের ধারায় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। একটা সমাজব্যবস্থা আরেকটা সমাজব্যবস্থাকে স্থান ছেড়ে দিতে পারে, কিন্তু উৎপাদন সবসময়ই থাকবে সমাজজীবনের ভিত্তি রূপে। মানুষ সবসময় বৈষয়িক মূল্য উৎপাদন করে সামাজিকভাবে। উৎপাদন-ব্যবস্থা যাই হোক, উৎপাদন আসলে সামাজিক-ব্যক্তি-মানুষের ক্রিয়া। বৈষয়িক মূল্য উৎপাদন তিনটি মূল উপাদানকে যুক্ত করে, যথা (১) মানুষের শ্রম (২) শ্রমের বস্তু (৩) শ্রমের উপকরণ। মানুষের শ্রম: শ্রম হচ্ছে মানুষের সচেতন ও উদ্দেশ্যপূর্ণ মানবিক কাজের এক প্রক্রিয়া। শ্রমের সাহায্যে মানুষ প্রাকৃতিক বস্তুগুলোকে পরিবর্তন করে। এই পরিবর্তন মানবজাতিকে বাঁচিয়ে রাখে। বুর্জোয়া পণ্ডিতরা মৌমাছি, মাকড়সার শ্রম বর্ণনা করে সেগুলোর প্রতি সামাজিক উৎপাদনের ‘শ্রমবিভাগ’ ‘শ্রম সংযোগ’ ও আরো ব্যাপার আরোপ করার যে চেষ্টা করেন তা অর্থহীন। পশু প্রায়ই কিছু জটিল ক্রিয়া করলেও বাস্তবে তা তার সহজাত প্রবৃত্তি। বাবুই পাখি সুন্দর বাসা তৈরি করে, কিন্তু সারা জীবন একইভাবে বানায়। মানুষ গুহা থেকে শতাধিক তালার দালান বানিয়েছে বুদ্ধি খাটিয়ে । মানুষ শ্রম করার আগে সামনে একটা লক্ষ্য রাখে। সে শ্রম থেকে নির্দিষ্ট ফল পেতে চায়। মার্কস লিখেছেন, ‘‘শ্রেষ্ঠ মৌমাছি থেকে নিকৃষ্টতম স্থপতির পার্থক্য এই যে, স্থপতি তার কাঠামোটি বাস্তবে নির্মাণ করার আগে তা কল্পনায় খাড়া করে। এমনটা মৌমাছি পারে না, সে সারা জীবন একইভাবে বানিয়ে যায়, তার উদ্ভাবনী শক্তি নেই। মানুষ প্রকৃতির শক্তিগুলোর উপরে কর্তৃত্ব অর্জন করে। সে প্রাকৃতিক সম্পদকে ব্যবহার করে নিজেদের প্রয়োজনে এবং স্বার্থে। তারা যন্ত্র তৈরি করে, জমি চাষ করে, খনি থেকে আকরিক ধাতু ও কয়লা তুলে এবং তা প্রক্রিয়াজাত করে, তেল নিষ্কাশন ও শোধন করে। তাদের কাপড়ের প্রয়োজন মেটানোর জন্য তুলা উৎপাদন করে, পোশাক বানায়। ঘর বানাতে কাঠ কাটে, ইট ও আরো উপাদান নির্মাণ করে। সুতরাং শ্রম হলো মানবজীবনের ভিত্তি। এখানে একটি কথা মনে রাখতে হবে, সব ধরনের কাজ সরাসরি বৈষয়িক উৎপাদন করে না, যেমন, ডাক্তার, শিক্ষক, শিল্পীর কাজ সরাসরি কোনো বৈষয়িক মূল্য উৎপন্ন করে না। শ্রম-প্রক্রিয়ায় মানুষ তাদের মানসিক, ¯ড়বায়বিক, ও পেশীগত শক্তি ব্যয় করে। শ্রমশক্তি হলো ব্যক্তিমানুষের কাজ করার কায়িক, মানসিক ও অন্যান্য সামর্থের সমগ্রতা। তাই শ্রম হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে শ্রমশক্তি ব্যয়িত হয়। মানবজীবনের প্রতি-ক্ষেত্রে শ্রমের ভূমিকা অপরিসীম। মানুষ যে মানুষ হয়েছে সে একমাত্র তার শ্রমের জন্যই। শ্রমই মানুষকে সৃষ্টি করেছে। শ্রম-প্রক্রিয়ার চলমানতার জন্য বিকশিত মানবিক শ্রমশক্তি প্রয়োজন। শ্রম-দক্ষতা নিরন্তর উৎপাদন বাড়িয়ে মানবজীবনকে সমৃদ্ধ করে। শ্রমের বস্তু : শ্রম-প্রক্রিয়ায় মানুষ যে প্রাকৃতিক পদার্থসমূহের ওপর কাজ করে সেগুলোকে শ্রমের বস্তু বলা হয়। এগুলোর মধ্যে থাকতে পারে প্রকৃতিতে পাওয়া উপকরণ যেমন, খনির আকরিক ধাতু বা বনের গাছ, যে সবের উপর মানুষের শ্রম প্রয়োগ হয়। এ ছাড়া ইতোমধ্যে মানুষের জীবন্ত-শ্রম প্রয়োগ হয়েছে এমন বস্তু- যেমন, খনি থেকে তোলা আকরিক ধাতু কারখানায় ব্যবহার হলে একেও শ্রমের বস্তু বলা হয়। এখানে আকরিক ধাতু কাঁচামাল হিসেবে পরিচিত। সুতরাং যে-কোনো কাঁচামাল শ্রম প্রয়োগের বস্তু বা শ্রমের বস্তু। যদিও প্রত্যেক শ্রম প্রয়োগের বস্তু কাঁচামাল নয়। যেমন- খনি থেকে তোলা আকরিক ধাতু খনি-শ্রমিকের শ্রমের বস্তু। কিন্তু ধাতু-কারখানায় সেই একই আকরিক ধাতুকে দেখা হয় কাঁচামাল হিসেবে। আর সেই কারখানায় উৎপাদিত ইস্পাত একটি ইঞ্ছিনিয়ারিং কারখানায় কাজ করবে কাঁচামাল হিসেবে। প্রাকৃতিক পদার্থসমূহ শ্রমের বস্তু হয়ে উঠে তখনই যখন তার উপরে মানুষের শ্রম প্রয়োগ হয়। খনিজ সম্পদ, জল, অরণ্য ও জমি এ-সব হলো বিশ্বজনীন শ্রমের বস্তু। মানুষের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের ধরন ও মাত্রা নির্ভর করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার স্তরের ওপর; আরো নির্ভর করে মানবসমাজের ধরনের ওপর। বৈজ্ঞানিক ও কৃৎকৌশলগত অগ্রগতি শ্রমের বস্তুর পরিধিকে বৃদ্ধি করে। শ্রমের উপকরণ : শ্রম-প্রক্রিয়ায় মানুষ শ্রমের বস্তুর উপর শ্রম প্রয়োগের জন্য যে সব উপকরণ ব্যবহার করে তাকে শ্রমের উপকরণ বলে। শ্রমের উপকরণের মধ্যে পড়ে, (১) শ্রমের কারিগরি যন্ত্র বা হাতিয়ার, (২) শিল্পের জন্য ব্যবহার্য সরঞ্ছাম সহ গৃহ, (৩) পরিবহন ও যোগাযোগের সরঞ্জাম, (৪) শ্রম প্রয়োগের বস্তুগুলো গুদামজাত করার জন্য পাত্র ও ট্যাংক - যেমন, সিলিন্ডার, গ্যাস-হোল্ডার ইত্যাদি। অর্থাৎ অর্থনীতির গোটা উৎপাদনকারী যন্ত্র হচ্ছে শ্রমের উপকরণ। শ্রমের উপকরণের মধ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো শ্রমের কারিগরি যন্ত্রগুলোর। এগুলোর যান্ত্রিক, পদার্থগত, রাসায়নিক, জীববিদ্যাগত ও অন্য গুণাবলী ব্যবহার করে মানুষ বৈষয়িক মূল্য উৎপাদন করে। খনি, জমি, পানি, অরণ্য ও অন্যান্য সম্পদ হলো বিশ্বজনীন শ্রমের উপকরণ। এগুলো ছাড়া উৎপাদন কল্পনা করা যায় না। ইংরেজ অর্থনীতিবিদ পেটি যথার্থই বলেছেন, ‘‘শ্রম হলো বৈষয়িক সম্পদের জনক আর ধরিত্রী হচ্ছে জননী।’’ চারপাশের প্রকৃতির উপর ক্রিয়া করার জন্য শ্রমের উপকরণগুলো ব্যবহার করতে করতে মানুষ নিজেরাই পরিবর্তিত হতে থাকে। অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান সঞ্চয় করে শ্রমের উপকরণগুলোর উনড়বতি সাধনের মাধ্যমে মানুষ শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে। মানুষ তার শ্রমের উকরণসমূহের বিকাশে আদিম লাঠি ও পাথরের কুঠার থেকে আধুনিক রোবটে পৌঁছেছে। শ্রমের উপকরণ তৈরিতে মানুষ তার ধীশক্তি ব্যবহার করে অন্য কোনো প্রাণী যা পারে না। পশুর মধ্যে বানর লাঠি নিক্ষেপ করতে পারলেও আদিম পর্যায়ের কুঠার বানাতে পারে না কারণ তার ধীশক্তি বা বুদ্ধি নেই, যা আছে তা তার সহজাত প্রবৃত্তি। মানুষের শ্রম শুরু হয়েছিলো সেই আদিম হাতিয়ারগুলো তৈরি করা থেকেই। সেই প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত ছিলো মানবদেহের ত্রুটিমুক্তকরণ, বিশেষ করে হাতের। এই হাতই মানুষকে মুক্তি দিয়েছিলো পশুস্তর থেকে। সুতরাং শ্রমের ক্ষেত্রে এই উপকরণটিই শ্রেষ্ঠ। উৎপাদনের উপকরণ : শ্রমের বস্তু ও শ্রমের উপকরণ একত্রে মিলে হয় উৎপাদনের উপকরণ। এখানে উপলব্ধির বিষয় হচ্ছে একই জিনিস শ্রমের বস্তু হিসেবে, কাঁচামাল বা শ্রমের উপকরণ হিসেবে কাজ করতে পারে। সেটা নির্ভর করে শ্রম-প্রক্রিয়ায় বস্তুটির স্থান ও ভূমিকার উপরে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ইঞ্ছিনিয়ারিং শ্রমিকের কাছে তৈরি হচ্ছে যে সেলাইকলটি সেটি হচ্ছে শ্রমের বস্তু। অন্যদিকে পোশাক শ্রমিকের কাছে সেটি শ্রমের উপকরণ বা যন্ত্র। শ্রমের বস্তু ও শ্রমের উপকরণগুলো হচ্ছে অতীত শ্রমের মূর্তরূপ। যতোক্ষণ পর্যন্ত সেগুলো জীবন্ত শ্রমের প্রক্রিয়ায় জড়িত না-হয় ততোক্ষণ সেগুলো থাকে জড় বস্তুপিণ্ড। যে যন্ত্র শ্রম-প্রক্রিয়ায় কাজ করে না সেটি নিতান্তই অকেজো। মানুষের শ্রমমূলক ক্রিয়াকলাপের কথা বলতে গেলে, উৎপাদনের উপায় ছাড়া তা চলতে পারে না। তাই বৈষয়িক উৎপাদন একমাত্র সম্ভব শ্রমের বস্তু ও শ্রমের উপকরণে মিশে-থাকা অতীত শ্রম এবং বর্তমান জীবন্ত শ্রমের এক মিলনের ফলে। মানুষের শ্রম, তার উৎপাদনী ক্রিয়াকলাপ ও প্রকৃতির উপরে তার অভিঘাত ঘটে নির্দিষ্ট সামাজিক কাঠামোর মধ্যে। শ্রমমূলক ক্রিয়াকলাপের প্রক্রিয়ায়, মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয় নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীগুলোতে। বস্তুজগৎ সতত পরিবর্তনশীল, মানুষের সমাজও। সমাজের যতই রূপান্তর ঘটুক বেঁচে থাকার প্রয়োজনে মানুষের নানা চাহিদা থেকেই যায়। সে জন্য সব সময় উৎপাদন অপরিহার্য। এজন্য বলা হয়েছে, উৎপাদন সমাজের ভিত্তি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..