ভাত দেবার মুরোদ নাই কিল দেবার ঘোসাই

রফিকুজ্জামান লায়েক

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
গত জুন মাসের ২১ তারিখে আমাদের দেশের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিক সম্মেলন করে সড়কে শৃংখলা জোরদারকরণ এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যায়ক্রমে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যান, অটোরিকশা, নসিমন-করিমন ও ভটভটি বন্ধের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সড়কে শৃংখলা আনতে ও দুর্ঘটনা রোধের জন্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত টাস্কফোর্স মোট ১১১টি সুপারিশ করেছেন, যা আমরা বাস্তবায়ন করবো। কিন্তু উল্লিখিত ক্ষুদ্রযানসমূহ পর্যায়ক্রমে বন্ধ করা ছাড়া অন্য ১১০টি সুপারিশের কথা বলেন নাই। যদিও বলেছেন- এর কিছু আমরা বাস্তবায়ন করছি। বা বাস্তবায়নের পথে। তার ভাষ্যমতে, ব্যাটারি চালিত রিকশা ব্রেক করলে রিকশা উল্টে যাত্রী রাস্তায় পড়ে যায়। এরকম ঘটনা উনি নিজেই দেখেছেন বলে সাংবাদিক সম্মেলনে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, এ ধরনের ব্যাটারি দেশে আমদানি করবো কে বা কারা? লক্ষ-লক্ষ রিকশা ও ভ্যানে ব্যাটারি লাগানোর পরে এখন এ কথা উঠছে কেন? রিকশা উল্টে যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়া আর কেউ দেখছেন বলেতো মনে হয় না– ব্রেক করলে ঝাকি লাগে একথা সত্য। কিন্তু ক্ষুদ্র যে কোন পরিবহনে হঠাৎ ব্রেক করলে ঝাকি লাগাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার জন্য রিকশা বন্ধ করার তো প্রশ্ন আসেনা। বরং ব্যাটারিচালিত রিকশা কীভাবে আরও উন্নত করা যায়, সে বিষয়েই মন্ত্রণালয়ের ভাবা উচিত। দুর্ঘটনার দোহাই দিয়ে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত সঠিক নয় এবং তা মানা হবে না। উল্টো প্রশ্ন হল, এক বছরে সড়কে যে পরিমাণ দুর্ঘটনা হয় তার কত ভাগ ক্ষুদ্র যানবাহনের জন্য হয়। দুর্ঘনার দায় শুধু রিকশাসহ ক্ষুদ্র যানবাহনের ওপর চাপানো অযৌক্তিক, অমানবিক এবং ষড়যন্ত্রমূলক। ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান, অটো, নসিমন-করিমন ও ভটভটি যারা চালান তরা তো শ্রমজীবী মেহনতি মানুষ। ব্যাটারিচালিত রিকশার অধিকাংশ মানুষ হলেন বেশি বয়সের। তারা তাদের শ্রম লাগবের জন্য এধরনের রিকশা চালান। বড় শহরগুলিতে মালিকদের গ্যারেজ থাকলে ও ছোট-ছোট শহর এবং সারা দেশের গ্রামঞ্চলে এক মালিকের এক রিকশা এবং তিনিই ড্রাইভার- এরাই সংখ্যায় বেশি। ধার-দেনা করে ব্যাটারির রিকশা কিনে কোন রকমে জীবিকা নির্বাহ করেন তারা। সমস্ত ধরনের ক্ষুদ্র যানের ক্ষেত্রে একই অবস্থা। দিন এনে দিন খাওয়া মানুষই বেশিরভাগ এই পেশার সাথে জড়িত। শখের বশে কেউ এ পেশায় আসেন না। এ পেশা একদিকে যেমন শ্রমসাধ্য অন্যদিকে অপমানজনকও বটে। কেননা আমাদের সামনেই আমরা দেখি- এ পেশার সাথে জড়িত মানুষদের সাথে কীভাবে তুই-তুকারি করতে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যাত্রীরা সাধারণত ড্রাইভারকে তুই বলে ডেকে থাকেন। ভাড়া নিয়ে কথা কাটাকাটি হলে প্রায়ই দেখা যায় যাত্রীর হাত ঐ ড্রাইবারের গায়ে। তারপরেও মানুষ নিরুপায় হয়ে এ পেশার সাথে জড়িত হন। সত্যি-সত্যি ক্ষুদ্র যানবাহনের ড্রাইভাররা অসহায়, নিপীড়িত এবং নির্যাতত। তা সত্ত্বেও মানুষ পেটের তাগিদে পরিবারের প্রয়োজনে এই পেশায় আসেন। অনেকে আছেন যারা সংসার ছেড়ে অন্যত্র যেতে পারবেন না, তাই নিজ এলাকায় থেকেই ক্ষুদ যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। আবার যারা গ্যারেজের গাড়ি চালান তারা অন্যস্থানে থেকে এসে থাকেন। মানুষের আয়ের বিকল্প ব্যবস্থা না করে এই ধরনের ঘোষণা চরম পাগলামি ও মেহনতি মানুষের স্বার্থবিরোধী। বর্তমানে আমাদের দেশে কয়েক কোটি মানুষ বেকার ও অর্ধ বেকার। পর পর দুই বছর করোনা মহামারির কারণে নতুন করে কয়েক লক্ষ মানুষ বেকার হয়েছেন। এ অবস্থায় ব্যাটারিচালিত রিকশাসহ মোট ছয় ধরনের ক্ষুদ্রযান বন্ধের সিদ্ধান্ত চরম হঠকারিতা। বর্তমানে দেশে এমন কোন গ্রাম নেই, যে গ্রামে উক্ত যান বাহনের চালক নাই। ফলে দেশে বর্তমানে ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান, অটো রিকশা, নসিমন-করিমন ও ভটভটির চালক নাই এ ধরনের যান বাহনের যন্ত্রাংশ বিক্রেতা মিলিয়ে ২৫ লক্ষের মত মানুষ জড়িত রয়েছেন। আর একটি পরিবার গড়ে চারজন ধরলে এক কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা চলে এর উপরে। ফলে এই শিল্পকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। আজ আমরা লক্ষ্য করছি যে, রাস্তায় ফুটপাত দখল করেছে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির সাথে যারা জড়িত তারা। রাস্তার ওপর যত্রতত্র বিভিন্ন ধরনের নির্মাণসামগ্রী রেখে রাস্তা সংকুচিত করা হয়েছে। ফলে যানজট তৈরি হচ্ছে। দোষ দেয়া হচ্ছে রিকশা চালককে। সড়কে দুর্ঘটনার দায় দেয়া হয় উল্লিখিত ছয় ধরনের ক্ষুদ্রযানের ড্রাইভারদের। দেশে আমরা ক্ষুদ্রযান ছাড়া যত গাড়ি রাস্তায় দেখি, তার বেশিরভাগেরই ফিটনেস নাই, এবং লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভাররা গাড়ি চালাচ্ছে। ফলে ফিটনেসবিহীন গাড়ি আর লাইসেন্স ছাড়া অদক্ষ ড্রাইভারের কারণে সড়কে অতিরিক্ত দুর্ঘটনা ঘটছে। কিন্তু অহেতুক দায় চাপানো হয় বিশেষ করে রিকশা ড্রাইভারের ওপর। রাস্তার দুপাশ দখল করে যারা রাস্তাকে সংকুচিত করল তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে অভাবি শ্রমজীবী মানুষের ঘাড়ে দোষ চাপানো হয়। এ ধরনের পরিবহনের আধুনিকায়ন না করে সরাসরি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত ২৫ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থবিরোধী এবং শাসক শ্রেণি তাদের শ্রেণিস্বার্থে এরকম পদক্ষেপ নিচ্ছেন। ২০১৯ সালে ফরিদপুর, গোলালগঞ্জে ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বেশ কয়েকটি জেলায় ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ করার ঘোষণা স্থানীয় প্রশাসন দিয়ে তা বাস্তবায়নের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করে। যদিও শ্রমজীবী মানুষ প্রশাসনের এধরনের পদক্ষেপ ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দিয়েছিল। ফরিদপুরের অভিজ্ঞতা হল শহরের ২৭টি ওয়ার্ডসহ সদরে ছয় হাজারের মত রিকশা রয়েছে। এই রিকশা বন্ধ করে মোটা টায়ারের রিকশা রাস্তায় নামাতে চেয়েছিল। শাসক শ্রেণির ঐ ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের পিছনে ছিল প্রায় পাঁচ কোটি টাকার বাণিজ্য। একটা বন্ধ করে নতুন একটা রাস্তায় নামানোর অর্থ হল নতুন আমদানি ও নতুনভাবে বিক্রি করা। ফলে আমদানি ও বিক্রি দুদিক থেকেই শাসক শ্রেণির কিছু লোক লাভবান হয়। শাসক শ্রেণির বুর্জোয়া দলগুলি তাদের স্বার্থের জন্যই গতরখাটা এ শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়াতে চায় না। তারা তাদের স্বার্থের জন্য সময়ে সময়ে এদের ব্যবহার করবে এবং করেছে, ফলে এই গতরখাটা শ্রমজীবী মানুষের পাশে কমিউনিস্ট পার্টিসহ বামপন্থিদের দাঁড়াতে হবে। অন্য শ্রেণিপেশার গণআন্দোলন গণসংগঠনের পাশাপাশি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশাসহ অন্যান্য ক্ষুদ্রযানের সাথে জড়িত শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম-সংগঠন গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে। লেখক : সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..