সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন

লুৎফর রহমান

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
ইতিহাস লিখিত হওয়ার আগে, পাথর যুগে মানুষ সংস্কৃতিবান ছিলো। আদি মানবের যে চিহ্ন পাওয়া গেছে তাতে বোঝা যায়- মানুষ শুধু প্রকৃতির রূপে আত্মহারা ছিলো না, নিজেও রূপচর্চা করেছে। প্রকৃতির তাল লয়ে সুরে বিভোর থাকেনি, সে সুরকার হয়েছে। তখনকার অর্থনৈতিক পরিবেশ, ভৌগলিক অবস্থা অনুযায়ী আদি মানুষ তার কর্মে একটা রুচির পরিচয় দিয়েছে। এই বিষয়টা তার সংস্কৃতির অংশ। মানুষ তার কণ্ঠে উচ্চারিত করেছে ভাষা। মানুষের জৈবিক, সামাজিক, বৈষয়িক, আত্মিক, রাজনৈতিক ও পারিবারিক অস্তিত্বে গৃহীত হয়েছে যে জীবনধারা, তাতে সংস্কৃতি এসেছে সহজাত প্রবৃত্তি (ওহংঃরহপঃ) হিসেবে। সে যে অবস্থানেই থাকুক না কেনো তার জীবন-প্রণালিতে প্রকাশ পেয়েছে একটা বিশেষ কৌশল বা ভঙ্গি আর্মা সেটাকেই সংস্কৃতি বলি। রূপ রস ভাষা দীপ্তি ধ্বনি বর্ণ সুর তালের এই বিশেষ বিশেষ কৌশল ও অস্তিত্ব ইতিহাসের অগ্রগতির পথে দেশ এবং কালভেদে রূপান্তরিত হয়েছে। পরস্পর আদান-প্রদানের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে; মজে গেছে পরস্পরের মধ্যে বা অন্যের মাঝে মিশে রয়েছে। মানুষের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হাজার হাজার বছর ধরে বংশানুক্রমে চলে এসেছে ইতিহাসের পর্যায়ে পর্যায়ে। সেটা হয়েছে নাচে গানে আঁকায় বাজনায় সাজপোশাকে প্রসাধনে কথায় আচার-আচরণে। ঘটেছে নিরন্তর ঘাত প্রতিঘাত। পরিবর্তিত হয়েছে প্রাকৃতজনের প্রচলিত বিশ্বাস-সংস্কার-ধারণার ও আচারের। সেরকমটা হয়েছে অভিজাতদের মাঝেও। মানুষের উত্তরাধিকার লাঞ্চিত হয়েছে শ্রেণিশোষণে। কোথায়ও ঘটেছে নতুন কিছু বা বিপ্লব আবার কোথায়ও হয়েছে ক্ষয়। মানুষের সংস্কৃতির এই ইতিহাস, চলমানতা, ক্রমবিকাশ প্রমাণ করে যে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে মানুষ আমূল পরিবর্তনের অর্থাৎ রূপান্তরের পক্ষে। সংস্কৃতি হচ্ছে উন্নততর জীবন সম্পর্কে চেতনার মাধ্যমে সৌন্দর্য, আনন্দ ও প্রেম বিষয়ে জানা। সংস্কৃতি বাইরের কোনো শক্তি নয় যা মানুষকে পরিচালনা করে, সেটা মানুষের ভেতরের সূক্ষ্মচেতনা-শক্তি যা তাকে চালায়। শিল্প, সঙ্গীত, সাহিত্যের মাধ্যমে মানুষ নিজের ভেতরে গতিশীল এই চেতনার জন্ম দেয় বিধায় এগুলোও সংস্কৃতির অংশ, উপায়। সংস্কৃতি মানে অন্যায় ও নিরতাকে ঘৃণা করা। সংস্কৃতি ব্যক্তিগত জীবন-দর্শনের স্রষ্টা যা মানুষকে অসুন্দরের বিরুদ্ধে লড়তে উদ্বুদ্ধ করে জীবনের বিকাশের জন্য। সংস্কৃতি মানে আত্মনিয়ন্ত্রণ। নিজের আইনে নিজেকে বাঁধা। সংস্কৃতি মানে বৈরাগ্য নয়, সৃষ্টিতে মেতে ওঠা। তাই বলা হয়েছে শ্রমই সংস্কৃতির উৎস কারণ শ্রম ছাড়া সৃষ্টি সম্ভব না। পৃথিবীর সব বৈষয়িক ও আত্মিক মূল্যের স্রষ্টা মানুষের শ্রম। সংযম সংস্কৃতির শিক্ষা। সংযম হচ্ছে কোনো বড় জিনিসের জন্য প্রতীক্ষা। আর সেই বড় জিনিসটা হচ্ছে প্রেম। প্রেম হচ্ছে জৈবিকতা আর সংস্কৃতির মিশ্রণ। প্রের্মে সুতোয় বাঁধা নারী-পুরুষ সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কর্ষণ করবে পৃথিবী, সুন্দর করবে জীবন, এটাই সংস্কৃতির উদ্দেশ্য। এখানে নৈতিকতার একটা প্রশ্ন থেকে যায়। নীতি হচ্ছে জীবনের বিকাশের জন্য, সৌন্দর্যের জন্য নিয়ম। বর্তমান সমাজে যৌনব্যভিচার অনৈতিক কিন্তু শোষণ অনৈতিক নয়, এটা পুঁজিবাদী সমাজের সংস্কৃতি। কিন্তু শোষণ মনুষ্যত্ব প্রতিষ্ঠাক্ষেত্রে অন্তরায়। এজন্য সংস্কৃতির রূপান্তরের প্রশ্নটি এসে পড়ে। কারণ দয়া-মায়া, স্নেহ-প্রীতি ও মনুষ্যত্বই শ্রেষ্ঠ মানবজীবনে। মনুষ্যত্ব সম্বন্ধে তাই সংস্কৃতি মানুষকে সচেতন করে। সংস্কৃতিই মানবধর্ম। সংস্কৃতি মূল্যবোধের স্রষ্টা। সমাজ পরিবর্তনের সাথে মূল্যবোধের পরিবর্তন জড়িত। আমাদের সমাজে মূল্যবোধের যে অবক্ষয় সেটা সংস্কৃতির বিপর্যয়ের জন্য। সুতরাং সংস্কৃতির রূপান্তরের দাবিটির যৌক্তিকতা এখানেই। সংস্কৃতির রূপান্তরের বিষয়টি একটা লড়াই, সংগঠিত লড়াই। এটা এমনি এমনি হয়ে যাবে না। অগ্রসর সচেতন মানুষকে সেজন্য প্রস্তুত হতে হবে। মেহনতি মানুষ সাংস্কৃতিক রূপান্তরের মূলে : পৃথিবীতে যুগে যুগে নানা বিপ্লব ঘটে গেছে। বিপ্লব মানে আমূল পরিবর্তন। পরিবর্তন দুভাবে ঘটে। প্রথমে একটু একটু করে পরিবর্তন হতে থাকে যাকে বলে ক্রমপরিবর্তন; তারপর হঠাৎ ঘটে যায় আমূল পরিবর্তন। ক্রমিক পরিবর্তনে বস্তুর মৌলিক ধর্ম বজায় থাকে, কিন্তু আমূল পরিবর্তনে বস্তুটির মৌলিক ধর্ম বদলে হয়ে যায় একটি নতুন বস্তু। এই সম্পূর্ণ বদলে যাওয়াকেই বলে বিপ্লব বা রূপান্তর। যেমন আদি সমাজ ছিলো শ্রেণিহীন। সে সমাজ একটু একটু করে বদলে হঠাৎ এক সময় হয়ে গেলো শ্রেণিসমাজ, দাস-মালিক সমাজ। এটা আমূল পরিবর্তন কারণ পূর্বে মালিকানা ছিলো সমাজের এখন হলো ব্যক্তির। এভাবেই এলো সামন্তসমাজ ও ধনতান্ত্রিকসমাজ। এই তিনটা সমাজই শ্রেণি সমাজ। ইতিহাসের পর্যায়ে পর্যায়ে পর্যায়ে শ্রেণি সমাজ মানুষের কর্মের ধারা, সম্পর্ক, রীতিনীতি, স্বভাব, জীবনপ্রণালি, অর্থনীতি, ধ্যান-ধারণায় আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে সংস্কৃতি-ক্ষেত্রে রূপান্তর ঘটালো। এই রূপান্তরের কর্মটিতে মূল অবদান হলো মেহনতি মানুষের। পৃথিবী পুঁজিবাদ পর্যন্ত পৌঁছতে ইউরোপে নতুন কিছু ঘটনা ঘটে গেলো। এর একটির নাম রেনেসাঁ। রেনেসাঁ অর্থ পুনর্জাগরণ। এটা চিন্তার ক্ষেত্রে বিপ্লব, ভাববিপ্লব। ইতিপূর্বে শাসকগোষ্ঠী মানুষের চিন্তাকে ধমের বেড়াজালে বা নির্দিষ্ট স্থানে আটকে রাখতে সচেষ্ট ছিলো। সে সময়কার কতিপয় চিন্তক মানুষের ভাবজগৎকে মানবতার আলোকে মুক্ত করে। এটাকেই রেনেসাঁ বলে। তারপর অষ্টাদশ শতাব্দীতে ঘটেছিলো যন্ত্রশিল্প-বিপ্লব এবং উনিশ শতকের শেষদিকে বিজ্ঞানবিপ্লব। এইসব আমূল পরিবর্তন সমাজকে ধনতন্ত্রে পৌঁছে দিলো। এই পরিবর্তনসমূহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলো সমাজের সকল মেহনতি মানুষ যার মধ্য দিয়ে মানব-সংস্কৃতির প্রভুত উন্নতি হয়। কিন্তু পুঁজিবাদের মুনাফাখোররা মেহনতি জনতার সকল অর্জনকে আত্মসাৎ করলো। বর্তমানে আমাদের সমাজে একই ফল দেখতে পাই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে শ্রেষ্ঠ অবদান ছিলো মেহনতি মানুষের, আর তারাই আজ সহস্র রকর্মে নিপীড়ন, অনাচার ও অমানবিকতার স্বীকার। এটা মূল্যবোধের অবক্ষয়, সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের ফল। তাই আজ আমাদের দেশে ও পৃথিবীময় মানুষের সাংস্কৃতিক অর্জনকে মেহনতি মানুষের খাতে প্রবাহিত করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। কারণ মেহনতি মানুষরাই দুনিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। আর্মা জানি বিংশ শতাব্দির প্রথমদিকে পৃথিবীতে একটি অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছিলো। রাশিয়ার শ্রমিকশ্রেণি কৃষক সমাজের সাথে জোট বেঁধে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে পুঁজিবাদের পরিবর্তে সমাজতন্ত্র বিনির্মাণের ঘোষণা দেয়। সমাজতন্ত্রের সারকথা হচ্ছে, উৎপাদন সামাজিক সুতরাং এর ভোগও হবে সামাজিক, ব্যক্তিগত নয়। সমাজের সব সক্ষম মানুষ কাজ করবে, কেউ বসে খাবে না, আর যতটুকু কাজ করবে তার ফল ভোগ করবে। শোষণ থাকবে না, কোনো মুনাফাখোর থাকবে না। এটা হলে মানুষের এতোকালের সাংস্কৃতিক অর্জন সকলে মিলেমিশে ব্যবহার করতে পারবে। এই শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার মাঝেই মেহনতি মানুষের মুক্তি। কিন্তু শোষক শ্রেণি এতোকাল চেতনা, সমাজ ও সংস্কৃতিতে আবর্জনা জমিয়েছে সেটি সাফ করার জন্য প্রয়োজন আরেকটি বিপ্লবের সেটি হচ্ছে সাংস্কৃতিক বিপ্লব। তাই মেহনতি মানুষদেরকে সমাজবদলের লড়াইয়ের সাথে সংস্কৃতির রূপান্তরের সংগ্রামকে যুগপথ চালিয়ে যেতে হবে। রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে সংস্কৃতি-রূপান্তরের যে প্রক্রিয়াটি অগ্রসর হচ্ছিলো, সত্তর বছর পরে এসে দুর্ভাগ্যক্রমে সেটি ভেঙে পড়লো। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সাংস্কৃতিক রূপান্তরের প্রয়োজনটি ফুরিয়ে গেছে। না, সেটা আজ বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই আজ আর্মা দেশে দেশে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এই বিপ্লবের লক্ষণগুলোকে কোথায়ও পূর্ণতার দিকে, আবার কোথায়ও শুরুর পর্যায়ে দেখতে পাচ্ছি। দেশে দেশে মেহনতি মানুষদেরই হতে হবে সাংস্কৃতিক জীবনের নিয়ামক, রক্ষক এবং উত্তম জীবনধারক। মেহনতি মানুষের স্বার্থ এবং সর্বাঙ্গীন বিকাশের প্রয়োজনে সকল সাংস্কৃতিক কাজের আয়োজন করতে হবে। সব বাধাকে অতিক্রম করেই তা করতে হবে। মনে রাখতে হবে মানব সমাজের আদিতে মেহনতি মানুষই ছিলো সংস্কৃতির মূল আধার। কিন্তু সভ্যতার বিকাশের সাথে শ্রেণিসমাজের কারণে সংস্কৃতি-ক্ষেত্রে মেহনতি মানুষের কেন্দ্রবিন্দুর পরিবর্তে শোষক শ্রেণির কেন্দ্রবিন্দু হয় নিয়ন্ত্রক শক্তি। আর ইতিহাসের গতিপথে নিপীড়িত মেহনতি মানুষ বারবার শোষক-কেন্দ্রবিন্দুটি ভেঙ্গে নিজেদের কেন্দ্রবিন্দুটি প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বিদ্রোহ করে আসছে, শ্রেণি সমাজের সব প্রতিরোধ অতিক্রম করেই তা করছে। শোষণহীন সমাজব্যবস্থাই মেহনতি মানুষের কেন্দ্রবিন্দুটিকে কেবল স্থায়ী রূপ দিতে পারে এবং নিশ্চিত করতে পারে সাংস্কৃতিক বিকাশকে; অতীতের সব সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে পারে নতুন প্রাণে সাজাতে। এমন সাংস্কৃতিক উদ্যোগ পৃথিবীর সব মেহনতি মানুষকে এক হওয়ার আহ্বান রাখায় তা বিশ্বজনীন, আবার জাতীয় সংস্কৃতির মুক্ত বিকাশেরও সহায়ক। সমাজ শ্রেণিহীন হলে সকল মানুষ একই কেন্দ্রে মিলিত হবে। আমাদের আলোচনায় একটা জিনিস বোধ করি পরিষ্কার হলো যে সংস্কৃতি-রূপান্তরের আন্দোলন শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সাথে জড়িত। কারণ আর্মা দেখেছি, রেনেসাঁর ফসল, যন্ত্রশিল্প বিপ্লব ও বিজ্ঞানবিপ্লবের ফল মুনাফাখোররা শোষণের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। তাই মেহনতি মানুষদের শোষণের প্রাচীরটা ভেঙেই লক্ষ্যে পৌঁছতে হবে। লেখক : কলামিস্ট

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..