নারী সমাজের একটি অংশও এখন দুর্বৃত্তায়নের চোরাগলিতে

মমতা চক্রবর্তী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
চলমান সময়টায় বাংলাদেশ করোনা মহামারির পাশাপাশি এক ভয়াভহ দুর্র্বৃত্তায়ন মহামারির দেশে পরিণত হয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে দীর্ঘদিন থেকেই শাসকগোষ্ঠী দেশ পরিচালনার যে ধারার সূচনা করে চলছিল তার ফলশ্রুতিতে এ জাতি-রাষ্ট্র যেনতেন প্রকারের সরকারি ছত্রছায়ায় ধন-সম্পদ আহরণ করে খুব দ্রুত ধনী হওয়ার এক ব্যাপক অবৈধ প্রতিযোগিতা জন্ম নেয়। এবং একটি বিশেষ গোষ্ঠী বা চক্র সৃষ্টি দ্বারা দুর্র্বৃত্তায়নের যে বিষর্বৃক্ষটির রোপিত হয় তা আস্তে আস্তে এক বিশাল মহীরূহে পরিণতি লাভ করেছে আজ। সমাজ দেহে মাঝেমধ্যেই এ ক্ষতিকর র্বৃক্ষের দু’একটি ডালপালা ভেঙে পড়ে জনসমক্ষে সাময়িক কিছু কাণ্ড কারখানা- হৈচৈ ঘটলেও দুর্র্বৃত্তায়নের মূল র্বৃক্ষটি তার দৃঢ় অবস্থান নিয়েই থেকে যাচ্ছে বিশেষভাবে। বর্তমান বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় এমন কোনো সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন নেই যেখানে দুর্র্বৃত্তায়নের জমজমাট মহোৎসব চলছে না বা কোনো দুর্র্বৃত্তজন নেই। এদের দাপটে সমাজ-রাষ্ট্র আজ দিশেহারা। পরিণতিতে দেশের সমস্ত আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি, বিধি-ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। প্রতি পদে পদে জনজীবন অতিষ্ঠ। রাষ্ট্র কাঠামো দুর্বল স্থানে। পৃথিবীর সমস্ত দেশ যেখানে করোনাকালীন সু-চিকিৎসা জনসেবা ও করোনা পরবর্তী রাষ্ট্রীয় সার্বিক দুরব্যবস্থা মোকাবিলা দ্বারা সমাধান খুজতে ব্যস্ত তখন আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে করোনা চিকিৎসায় উদাসীনতা, ব্যক্ততা, নানা ঘাটতি, সমন্বয়হীনতা, অবস্থা দুর্র্বৃত্তায়নের নানা চিত্র ও কাণ্ড-কারখানা সংবাদ পত্র, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশবাসীর সামনে উঠে এসেছে এবং প্রতিনিয়ত আসছে। এর সাথে যোগ হয়েছে মন্ত্রীসহ আমলাতন্ত্রের নানা অপ্রাসঙ্গিক অসংলগ্ন বাক্য প্রয়োগের ঠাট্টা-তামাশা। যা জনগণকে করোনা মহামারি নিয়ে নানা বিভ্রান্তিতে ও ভুল পদক্ষেপ ঠেলে দিয়েছে। খুবই হতাশাজনক এই ঘটনাগুলো জাতির জীবনে। অবাক-বিস্ময়ে ভাবতে গিয়ে কষ্ট হয় যে জাতি ৫২-এর ভাষা আন্দোলনসহ ৭১’-এর মুক্তিযুদ্ধোর দু’টো সূর্য-বিদ্যায় গৌরব মুকুট শিরে ধারণ করে চলেছে, সেই জাতি রাষ্ট্র সমাজ কেন এই লাগামহীন কুৎসিত এক ব্যভিচারী দুর্র্বৃত্তায়নের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হলো এমনভাবে, এর জবাব কে দেবে। মুষ্টিমেয় জীবনকে চরম দুর্ভোগজনিত যন্ত্রণার সাগরে নিক্ষেপ করেছে। যে দুরবস্থা মোকাবিলায় সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ। কারণ শাসকদের ক্ষমতার মূল উৎস জনগণ নয়, এ দুর্র্বৃত্তজন। এরই এখন সরকারের মধ্যে ছায়া সরকার ও মূল চালিকাশক্তি। কিছুদিন থেকে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আরো একটি লজ্জা ও পরিতাপের উপসর্গ যুক্ত হয়ে গেছে। তা হলো দেশের জনগোষ্ঠীর অর্ধেক নারী সমাজের একটি অংশও আজ মহা-দুর্র্বৃত্তায়নের চোরাগলিতে হৈচৈ চলেছে। ইতোমধ্যে কতিপয় নারী, দুর্বৃত্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে নূরজাহান আখতার ডা. সাবরিনা, সহকারী রেজিস্টার শারমিন জাহান ইত্যাদি ইত্যাদি। সমাজের আনাচে কানাজে এদের আরো কতোজন যে আড়ালে আছে তার খোঁজই বা কে রাখে। হয়ত নূতন কলংকিত কোন ঘটনা নিয়ে সামনে চলে আসবে কেউ। এটাই তো এখন ম্যাজিক হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো- এটাই এই নারীদের মধ্যে আবার দুজন উচ্চ শিক্ষিত হয়ে উচ্চ চাকুরিতে থেকে সমাজের উঁচু স্থানে বিরাজ করেছে। এরাই করোনা মহামারিতে দুর্বৃত্তায়নে সরাসরি জড়িত। একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রলীগ নেত্রী এবং ঢাবির সহকারী রেজিস্টার শারমিন জাহান। সে নকল মাস্ক সরবরাহ করেছে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে, যার ফল হতে পারে- ডাক্তার নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবীরা আক্রান্ত হয়েছে। ওইসময় তারা অন্যান্য করোনা রোগীদের স্বাস্থ্য সেবা দিতে পারেনি। তারা অন্যকে আক্রান্ত করে থাকতে পারেন। করোনা সেবা দিতে গিয়ে দেশে অনেক ডাক্তার মৃত্যুবরণ করেছেন। তাদের মধ্যে কেউ এই নকল মাস্কের কারণে মৃত্যুর শিকার হয়েছেন হয়ত। ডা. সাবরিনা তার স্বামীকে নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট বিক্রি করে মানুষের কাছে থেকে লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বিত্তবান হওয়ার জন্য। কোনো একটি বেসরকারি চিকিৎসা ক্লিনিকেও এই দুর্নীতি হয়েছে। করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট পাওয়া লোকগুলো ইটালিতে গিয়ে করোনা পটেটিভ ধরা পড়ে কাজে যুক্ত হওয়ার পরিবর্তে ধোকাবাজ রূপে দেশে ফেরত আসতে বাধ্য হয়েছে। ডাক্তারদের এই কাজ দেশের ভাবমূর্তিকে ভূ-লুণ্ঠিত করেছে। একদিকে, অন্যদিকে এদের দ্বারা ব্যাপক করোনা সংক্রমণ ঘটেছে মানুষের মধ্যে। এদের অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য। দেশের সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে উচ্চশিক্ষিত এই দুই নারী বিভিন্ন অপরাধে অপরাধী। প্রথমত : সাধারণ জনগণের টাকায় সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে বিসিএস ক্যাডার ভুক্ত হয়ে উচ্চ পদে সরকারি চাকুরি করেও এরা তৃপ্ত হলো না। কেবলমাত্র লোভ-লালসার কাছেই কিনা এদের সর্বস্ব ভালো বিসর্জন দিলো। এদেশে কজন নারীর ভাগ্যে এতবড় সুযোগ জোটে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ধিক। এদের উচ্চ শিক্ষাকে। শিক্ষাকে বলা হয় পরশ পাথর এই পরশ পাথরের ছোঁয়ায় লোহাও নাকি সেনা হয়ে যায়। আর এরা হয়ে গেল কি না কয়লা। যথার্থ শিক্ষা এরা পায়নি বলে ধরে নিতে হবে। দ্বিতীয়ত : ডাক্তারি পেশাটিতো হলো সেবাধর্মী একটি মহৎ পেশা, ডা. সাবরিনা এক্ষেত্রে কিনা উল্টো। পেশাটিকে কিনা অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে করলো। তাও কিনা করোনা মহামারি নিয়ে। তৃতীয়ত : শিক্ষা বিশেষত উচ্চ শিক্ষা মানুষের বিবেক, মনুষ্যত্ব, মানবিক সমস্ত গুণাবলি জাগ্রত করে। মানুষের মার্জিত-দায়িত্বশীল, কর্তব্যপরায়ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করে তার ব্যক্তিগত ও সামাজিক বা ভামূর্তি এনে দেয়। এমনকি অনেককে সের্বা ধর্মেও দীক্ষিত করে। সাথে স্বভাবিক আর্থিক স্বচ্ছলতাটুকুও এনে দেয়। এতে তারা খুশি থাকলো না। অর্থের অতি লোভই কিনা তাদের জীবনে অনর্থ বয়ে আনলো। এ প্রবণতা নিন্দিত। চতুর্থত : অবের্ধ অথ সাময়িকভাবে জৌলুস, আরাম-আয়েস, বিলাস বিত্ত-বৈভব এনে দেয় ঠিকই। কিন্তু দিতে পারে না সম্মান ও চারিত্রিক মর্যাদা। বরং কলংকের কালিমা লেপন করে চারিত্রক দৈন্যতায় ভরে দেয় জীবনকে। প্রতিটি মানুষের মনে রাখা উচিৎ-জীবন অতীব ক্ষণস্থায়ী। সে জীবন শিক্ষিত বা অশিক্ষিত, সাধারণ বা অসাধারণ যাই হোকনা কেন মৃত্যুতেই তার পরিসমাপ্তি। মানুষ কেবল রেখে যায় তার চারিত্রিক পরিচয়টুকুই। সাধারণ হলেও একজন সৎ ও ভাল মানুষকেই কিছুদিন হলেও মানুষ মনে রাখে। দুর্বৃত্তজনকে ঘৃণাই করে সবাই। দুঃখের বিষয় এ সত্যটুকুও তার মনে রাখল না কেবলমাত্র লোভের বলি হয়ে। পঞ্চমত : সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয হলো নারীরা মায়ের জাত, তারা সন্তানের জন্ম এবং ছোট থেকে তাকে ধাপে ধাপে বড় করে তুলতে একজন মায়ের ভূমিকা সন্তানের জীবনে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। একজন সচেতন শিক্ষিত ও নীতিবান মা তার সন্তানের একটি সুস্থ্য সুন্দর ও সত্যিকার শিক্ষায় গ্রহণ করার জীবনে ও জীবন গঠনে এক বিশাল ভূমিকা রাখতে পারেন। ফরাসি বিপ্লবের একজন বিশিষ্ট জেনারেল নেপোলিয়ান বোনপার্টি এর উক্তি- “তোমরা আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেবো”। সন্তানের জীবনে একজন সুশিক্ষিত মায়ের যে কতবড় গুরুত্ব, এ উক্তি তারই প্রতিফলন। শিক্ষা রেখে গেল, সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্যও তাদের কি অবদান রইল। একজন নারী হিসেবে এই প্রশ্নই রাখছি তাদের কাছে। ষষ্ঠত : নারী শিক্ষার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় অষ। টাদশ ঊন বিংশ শতাদ্বী পর্যন্ত সারা পৃথিবীসহ ভারত উপমহাদেশের নারীর অশিক্ষা-কুশিক্ষায় নিমজ্জিত অন্ধকার জীবন কাটাতে বাধ্য হতো। পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় সমাজপতিদের নির্মম অত্যাচারী বিধি-ব্যবস্থায় তারা কঠোর বন্দি জীবন যাপনে বাধ্য হতো। কঠোর পর্দা ব্যবস্থায় গৃহকোণে ঘরকন্যা, সন্তান জন্ম ও পালনই ছিল তাদের জীবন। নানা কুসংস্কারের অন্যায়-অত্যাচার ঘেরা জীবনই সব জাতি-ধর্ম-বর্ণ সমপ্রদায়ের নারীদের ভাগ্য লিখন বলেই নির্ধারিত ছিল। সম্ভবত ঊনবিংশ শতাব্দির শেষ ভাগে কলকাতায় কিছু শিক্ষিত মহান ব্যক্তিবর্গ সমাজ প্রগতির স্বার্থে নারী শিক্ষার গুরুত্ব উপলদ্ধি করে সমাজ পতিদের সাথে প্রচণ্ড লড়াই সংগ্রাম করে কলকতায় প্রথম “হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়” প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন হিন্দু মেয়েদের জন্য যেটা পরবর্তীতে বঙ্গীয় মহিলা বিদ্যালয়ে হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। কতিপয় হিন্দু মেয়ে অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও তাদের মেধার স্বাক্ষর রেখে শিক্ষাজীবন চালিয়ে যান। আর অবিভক্ত বাংলার প্রথম বাঙালি নারী “কাদম্বিনী” মহিলা ডাক্তার হন ১৮৮২ সালে। এভাবে মুসলিম নারী শিক্ষার অগ্রদূত বেগম রোকেয়াও তার অনেক দৃঢ়তা ও সংগ্রামী উদ্যোগ নিয়ে মুসলিম মেয়েদের শিক্ষার জন্য ১৯১১ সাল কলকাতায় “সাখাওয়াতত মেমোরিয়াল গালর্স স্কুল প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হন। এবং নারী শিক্ষায় ব্রর্তী হন। তাই বলতে হয় আজকের এই অবাধ নারী শিক্ষার অধিকার অনেক লড়াই সংগ্রামের ফসল। এমনি এমনি এ অধিকার দরজায় এসে দাঁড়ায়নি। তাই এই তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত দুর্বৃত্ত নারীদের কোনো অধিকার নেই আমাদের পূর্বসূরী মহান শিক্ষব্রতীদের এবং তাঁদের শিক্ষার জন্য আপ্রাণ আন্দোলন সংগ্রামকে কলঙ্কিত করার। এই ইতিহাসও কোন গুরুত্ব পেলনা তাদের লালসার কাছে। এ নন্দিত নারীদের শুধু জেল-জরিমানাই যথেষ্ট নয়, এদর উচ্চ শিক্ষার সার্টিফিকেট বাতিলের মধ্য দিয়ে এদে পূর্ণ শাস্তি সম্পন্ন সম্ভব। এছাড়া বাঙালী নারীদের একটি আলাদা ভাবমূর্তি আছে সমাজে। বাঙালী নারীরা সাধারণত মার্জিত অপেক্ষাকৃত কম লোভ-মোহাচ্ছন্ন, ধর্মভীরু শালীনতা বোর্ধ ও লজ্জা-শরম ভূষিত। আর এই বাঙালি নারী চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলোকেও নাসাৎ করে ধুলোয় মিলিয়ে দিতে দ্বিধা করলনা এ লোভী দুর্বৃত্ত নারীরা। ধিক! এ সব লোভী কলঙ্কিত নারী চরিত্রকে। ধিক! এদের তথাকথিত শিক্ষা, আধুনিকতা ও চাতুর্যকে। এরাই মনুষ্যত্বের গলা টিপে সমাজকে-দেশকে অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে দিচ্ছে। দেশ ও সমাজ থেকে এই দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন উচ্ছেদ খুবই জরুরি। প্রতিকারহীন এ দুর্বৃত্তায়ন ও সর্বগ্রাসী দুর্নীতি করোনা মহামারির প্রথম দিকে অনেক মানুষের মৃত্যুর কারণ ঘটিয়েছে। দেশের ব্যাপক মানুষের স্বার্থেই এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া জরুরি। কেবল মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী বিভিন্ন মত ও পথের সর্বশ্রেণির মানুষের রংধনু ঐক্যের আন্দোলন-সংগ্রামই পারে এই দুর্বৃত্তায়ন, ব্যবিচার-দুর্নীতি অনেকটা কমাতে। তবে কেবল সমাজ বিপ্লবের মাধ্যমেই এই ন্যায় নীতিহীন ব্যবস্থার চির অবসান সম্ভব। লেখক : নারীনেত্রী

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..