সাংসদের অবান্তর বক্তব্য বেসামাল গণতন্ত্র...

মাহবুব রেজা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
গত ৪ সেপ্টেম্বরের জাতীয় সংসদে বগুড়া ৭ আসনের স্বতন্ত্র সাংসদ রেজাউল করিম বাবলু’র বেসামাল, অবান্তর আর অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য সংসদের ভেতর বাইরে যত না হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রশ্নবিদ্ধ আর সমালোচনার মধ্যে ফেলে দিয়েছে দেশের চলমান গণতন্ত্রহীন একদলীয় সরকার ব্যবস্থাকে। সংশ্লিষ্টরা অভিমত ব্যক্ত করে বলছেন, বিনা ভোটে রাতের আধারে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী সরকার দেশে যে একদলীয় শাসন ব্যবস্থার চালু করেছে, তার মধ্যে জাতীয় সংসদে বগুড়ার এই সাংসদের অপ্রাসঙ্গিক আবোলতাবোল বক্তব্যই প্রমাণ করছে- দেশ আসলে কোন দিকে যাচ্ছে। সাংসদের এই বেসামাল, দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্যের দায়ভার আওয়ামী লীগকেও নিতে হবে উল্লেখ করে তারা বলছেন, গণতন্ত্রের সুষ্ঠু চর্চা না থাকলে যা ঘটার দেশে এখন তা-ই হচ্ছে। জানা জায়, গত ৪ সেপ্টেম্বর স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বগুড়া- ৭ আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রেজাউল করিমকে ‘জাতীয় সংসদের নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ বিল-২০২১’-এর সংশোধনী প্রস্তাবের ওপর বক্তব্য উপস্থাপন করতে বললে সাংসদ অবান্তর, অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য উপস্থাপন করতে শুরু করলে সংসদে এক অভিনব হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। সাংসদ তার বক্তব্য দিতে উঠে দাঁড়িয়ে আইনমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে অনেকটা অভিযোগের সুরে বলেন, করোনাকালে আমাদের আইনমন্ত্রী অফিস একটু কমই করেন। এরপর তিনি দেশের চার কোটি বেকারের কথা উল্লেখ করে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। এসময় আইনমন্ত্রী সংসদ সদস্যকে গভীর মনোযোগের সঙ্গে দেখছিলেন। এরপর সাংসদ ‘জাতীয় সংসদের নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ বিল-২০২১’-এর সংশোধনী প্রস্তাবের নির্ধারিত আলোচনায় অপ্রাসঙ্গিকভাবে ‘চাকরিজীবী ছেলে-মেয়ে একে অপরকে বিয়ে করতে পারবেন না’ বেকারত্ব রোধে এমন বিধান রেখে সংসদে নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়ে বলেন, ‘করোনা ভাইরাসের কারণে চার কোটি জনগোষ্ঠী বেকার হয়েছে। দেশে প্রচলিত সামাজিক রেওয়াজ আছে। চাকরিজীবী কোনো পুরুষ চাকরিজীবী নারীকেই বিয়ে করতে চান। আবার চাকরিজীবী নারীও একজন চাকরিজীবী পুরুষকে বিয়ে করতে চান। এতে কিন্তু বেকার সমস্যার সমাধান হয় না।’ এসময় সাংসদ তার প্রস্তাবনাটির পক্ষে সমর্থন আদায়ে আইনমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘এখানে আইনমন্ত্রী আছেন, উনাকে নিবেদন করবো- এমন একটি আইন উনি সুবিধাজজনকভাবে করবেন যে, কোনো চাকরিজীবী নারী কোনো চাকরিজীবী পুরুষকে বিয়ে করতে পারবেন না। আর কোনো চাকরিজীবী পুরুষও কোনো চাকরিজীবী নারীকে বিয়ে করতে পারবেন না। তাহলে আমাদের বেকার সমস্যাটা অনেকাংশে লাঘব হবে। এ প্রস্তাবটি আমলে নিয়ে চার কোটি বেকারের সমস্যা কিছুটা হলেও লাঘব হবে।’ প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে সাংসদ রেজাউল করিম বাবলু বলেন, ‘আমার প্রস্তাবের পেছনে আরও একটি কারণ আছে। যখন চাকরিজীবী দম্পত্তি অফিসে যান, তাদের শিশু সন্তানরা গৃহকর্মীদের দ্বারা নির্যাতিত হয়।’ সাংসদ রেজাউল করিমের প্রস্তাবনার বিপরীতে জবাব দিতে গিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘সংসদ সদস্য বললেন ছেলে চাকরি করলে তাকে চাকরিজীবী মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেয়া যাবে না। এমন প্রস্তাব নিয়ে আমি এখান থেকে দু’কদমও হাঁটতে পারবো না। এটা অসাংবিধানিক প্রস্তাব।’ মন্ত্রী আরও বলেন, ‘কীভাবে এ প্রস্তাব এখানে (জাতীয় সংসদে) এলো বুঝতে পারলাম না। আমাদের বাক স্বাধীনতা রয়েছে। উনি যা খুশি তাই বলতে পারেন। কিন্তু আমি যা খুশি তাই গ্রহণ করতে পারবো না। কারণ আমি জনগণের প্রতিনিধি।’ জানা যায়, সরাসরি সম্প্রচারিত সংসদ সদস্যের এরকম অবান্তর আর অপ্রাসঙ্গিক আলোচনায় সংসদের সিনিয়র সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট সবাই উল্লিখিত সাংসদের পরিমিতি বোধ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, তারা রীতিমত হতবাক হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সাংসদের এ বক্তব্যটি নানাভাবে হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে। সংসদে কিভাবে একজন সাংসদ এরকম অবান্তর, অপ্রাসঙ্গিক আর বেসামাল কথা বলতে পারেন জানতে চাইলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম জানান, এখানে সাংসদের দোষ দিয়ে লাভ কি! কারণ একটি দেশ যখন নির্বাচিত লুটেরাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় তখন এসেব হাস্যরস দেখা ছাড়া আমাদের উপায় কি? আর সাংসদ রেজাউল করিমকে তো এই সরকারই রাতের আঁধারের নির্বাচনে জিতিয়ে এনেছেন সুতরাং এসব অবান্তর, ফালতু কথার দায়ভার আওয়ামী সরকারকেই নিতে হবে। তিনি আরও জানান, শক্তিশালী বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে সরকার দিন দিন বিতর্কিত হয়ে উঠেছে, ফলে তাদের কোন কাজ নেই। তো নেই কাজ তো খই ভাঁজ- নীতি অবলম্বন করে চল্লিশ বছরের পুরনো ইস্যু জিয়ার কবরের ভেতর জিয়ার লাশ আছে না নেই সেই বিতর্কসহ নানা অবান্তর, অপ্রাসঙ্গিক ইস্যুতে নেমেছে; অনেকটা বগুড়ার সাংসদ রেজাউল করিম বাবলুর মতো। মানবাধিকার নেত্রী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল এ প্রসঙ্গে জানান, একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে কথা বলার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের দায়িত্বজ্ঞান থাকা উচিত। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনু এমপি এ প্রসঙ্গে বলেন, জাতীয় সংসদের মতন জায়গায় দাঁড়িয়ে একজন সাংসদকে কথা বলার ক্ষেত্রে তার জন্য বরাদ্দকৃত সময়ের সুষ্ঠু ব্যবহার কিভাবে করতে হবে তা জানতে হবে। নির্ধারিত বিষয়ে ফ্লোর পেয়ে একজন সাংসদকে কথা বলার আগে সেই বিষয়ে পড়াশোনা, চিন্তাভাবনা আর হিসেব করতে হবে- মুখে যা এলো তা বলে সংসদে হাস্যরসের সৃষ্টি করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এক্ষেত্রে সংসদীয় রীতিনীতি, আদবকায়দা শেখানোর ব্যাপারটিকেও গুরুত্ব দেয়া দরকার বলে তিনি মনে করেন। সাংসদ রেজাউল করিমের অনভিপ্রেত বক্তব্য নিয়ে সরকার দলের অভিজ্ঞ ও প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ানরাও বিব্রতকর ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন বলে জানা যায়। অভিজ্ঞজনেরা বলছেন, সংসদের রক্ষণাবেক্ষণে যেখানে কয়েক লাখ টাকা খরচ হয় সেখানে একজন সাংসদের কথা বলার ক্ষেত্রে আরও সচেতন ও দায়িত্ববান হওয়া দরকার। অবশ্য বিনা ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের এসব দায়ভার থাকবেই বা কীভাবে!

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..