আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য সমাপ্ত যুদ্ধটির স্বরূপ

অনুবাদ : বিপ্লব রঞ্জন সাহা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
“আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য সমাপ্ত যুদ্ধটি শুরু হয়েছিলো চল্লিশ বছর আগে : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘ইসলামী জঙ্গি’দের সংগঠিত করতে শুরু করে ১৯৭৯ সালে। ” - বাইনিউ ব্রেজেজিনস্কি প্রেসিডেন্ট কার্টারের ন্যাশানাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজর বাইনিউ ব্রেজেজিনস্কি নিশ্চিত করেন যে, তথাকথিত ‘সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ’ সোভিয়েত ইউনিয়ন নয় বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সূচিত ও তাক করা। আমেরিকা আফগানিস্তানের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে আছে বিগত চল্লিশ বছর ধরে। শুরু হয়েছিলো ১৯৭৯ সালের জুলাই মাসে আর এটা এখনো জারি আছে। আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু হয়েছিলো ১৯৭৯ সালের ৩ জুলাই, যেদিন প্রেসিডেন্ট কার্টারের ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার বাইনিউ ব্রেজেজিনস্কির পরামর্শক্রমে ‘কাবুলে সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুগামী শাসকদের বিরোধিতা করছিল, তাদেরকে সহযোগিতা করার প্রথম নির্দেশনাপত্রে স্বাক্ষর করেছিল।’ বাইনিউ ব্রেজেজিনস্কির সাথে ১৯৯৮ সালে গৃহিত এক সাক্ষাৎকারের সত্যতা নিশ্চিত করে যে, আফগানিস্তানে সিআইএ’র হস্তক্ষেপ শুরু হয় কাবুল সরকারের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের এক সামরিক সহযোগিতা চুক্তির ভিত্তিতে সোভিয়েত বাহিনীর আফগানিস্তানে প্রবেশের পরপরই। একই ধরনের একটি চুক্তি সিরিয়ায় চলমান যুদ্ধের কারণে দামেস্কাস ও মস্কোর মধ্যেও হয়েছিল। মস্কোর সাথে কাবুলের চুক্তিটি হয়েছিল ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৯ সালে। একই সাক্ষাৎকারে বাইনিউ ব্রেজেনজিনস্কি এ ব্যাপারেও নিশ্চিত করেছেন যে, সোভিয়েত বাহিনী (আফগানিস্তানের ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের সাথে চুক্তির ভিত্তিতে) সিআইএ’র দ্বারা সংগঠিত আল-কয়েদার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলো। এ ব্যাপারে যথেষ্ট স্বাক্ষী সাবুদ রয়েছে যে, মুজাহিদিনদের সংগঠিতকরণ, প্রশিক্ষণ প্রদান ও অর্থ সংস্থানের কাজটি করতো মাদক ব?্যবসায়ীরা, যাদের সিআইএ প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন করতো। ১৯৭৯ সালের জুলাই মাস থেকে সংগঠিত সন্ত্রাসীরা আফগানিস্তানের ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক গঠনকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতো এবং সুযোগ পেলেই তছনছ করে দেওয়ার চেষ্টা করতো। আফগানিস্তানের ধর্মনিরপেক্ষ সরকারকে অস্থিতিশীল ও বাধাগ্রস্ত করার ব্যাপারে কার্টার প্রশাসনের সিদ্ধান্ত জাতি রাষ্ট্র হিসেবে আফগানিস্তানের ধ্বংসের মূল কারণ। এগুলোই হলো ইতিহাসের বাস্তবতা আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ন্যাটোর যুদ্ধ যেটি ৭ অক্টোবর ২০০১ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয়েছিল তার দাপ্তরিক যৌক্তিকতা হলো একটি নামহীন বিদেশি শক্তি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে আক্রমণ করেছিল এবং যেটি পরিণতিতে ‘যুদ্ধের আইনসমূহ’ প্রয়োগ করে দেখানো হয়েছিল যে দেশ আক্রান্ত আর তাই আত্মরক্ষার নামে পাল্টা আক্রমণ যৌক্তিক। ন্যাটোর উত্তর আটলান্টিক কাউন্সিলের যে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাতে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তসমূহ গৃহিত হয়েছিলো : এটা যদি পূর্বনির্ধারিত হয় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ (১১ সেপ্টেম্বর ২০০১) করা হয়েছিলো বিদেশী শক্তির (আফগানিস্তান) দ্বারা নর্থ আটলান্টিক অঞ্চলের উপর এক আক্রমণ, তাহলে এটাকে বিবেচনা করতে হবে ‘ওয়াশিংটন চুক্তির আর্টিকেল ৫-এর আওতাধীন।’ ৭ অক্টোবর ২০০১ সালে সংঘটিত আফগানিস্তানের ওপর বোমা নিক্ষেপ ও আগ্রাসনকে বর্ণনা করতে হবে ‘ইসলামী জঙ্গি’দের বিরুদ্ধে এক অভিযান হিসেবে। এবং সেই একই ইসলামী জঙ্গি অন্তর্ভুক্ত আল কায়েদা বাহিনী ১৯৭৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সংগঠিত। তাদের সমর্থন ও অর্থায়নও করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৭৯ সালে যা শুরু হয়েছিল তাকে সবচেয়ে ভালোভাবে বর্ণনা করা যায় ‘সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধ’ হিসেবে যদিও আল কায়েদা নারকীয় ও গুপ্ত আক্রমণের মাধ?্যমে একটি অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন রাষ্ট্রকে ধ্বংসের তৎপরতায় লিপ্ত ছিল যেটা তার তৃষ্ণাকে সম্প্রসারিত করে মধ্য প্রাচ?্য হয়ে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া এবং আফ্রিকার সাহারা অঞ্চলসহ আরো দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। আফগানিস্তান হলো একটি মুসলমান অধ্যুষিত দেশ যেটাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধ্বংস করেছে। ন্যাশানাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজারের একটি সাক্ষাৎকার (ফরাসি ভাষা থেকে উইলিয়াম ব্লাম কর্তৃক ইংরেজি অনুবাদ থেকে নেওয়া হয়েছে): প্রশ্ন : সিআইএ-এর প্রাক্তন ডিরেক্টর রবার্ট গেটস তার স্মৃতিচারণে বলেছেন (ফ্রম দি শ্যাডো) যে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা আফগানিস্তানের মুজাহেদিনদের সোভিয়েত হস্তক্ষেপের ছয় মাস আগে থেকেই সহযোগিতা করতে শুরু করে। সেই সময় আপনি ছিলেন প্রসিডেন্ট কার্টারের ন্যাশানাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার। তাই আপনি এ ব?্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সেটা কি সঠিক ছিলো? ব্রেজেজিনস্কি : হ্যাঁ। ইতিহাসের অফিসিয়াল সংস্করণ অনুসারে সিআইএ ১৯৮০’র দশকে মুজাহেদিনদের সহযোগিতা করতে শুরু করে অর্থাৎ বলতে গেলে সোভিয়েত বাহিনীর আফগানিস্তানে আগ্রাসনের পরেই ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৯ সালে। কিন্তু বাস্তবতাকে এখনও গোপনে আবৃত করে রাখা হয়েছে একেবারেই ভিন্নভাবে। আসলে ১৯৭৯ সালের ৩ জুলাই ছিলো সেই সুনির্দিষ্ট দিন যেদিন প্রেসিডেন্ট কার্টার কাবুলে সোভিয়েত শাসনামলে তাদের বিরোধিতাকারীদের গোপনে সংগঠিত ও সহায়তা প্রদানের ব্যাপারে নির্দেশনায় স্বাক্ষর করেন। এবং ঠিক সেদিনই আমি প্রেসিডেন্ট বরাবর একটি নোট লিখেছিলাম যেটাতে আমি তার কাছে ব্যাখ্যা করেছিলাম যে, আমার মতে এই সহায়তা সোভিয়েত সামরিক হস্তক্ষেপের দিকে ধাবিত হবে। প্রশ্ন : এই ঝুঁকি সত্ত্বেও, আপনি এই গুপ্ত কাজের একজন সমর্থক। কিন্তু সম্ভবত আপনি নিজে সোভিয়েত বাহিনীর আগ্রাসনের প্রত?্যাশা করেছিলেন এবং তাদের প্ররোচিত করতেন বলে মনে হতো? ব্রেজেজিনস্কি: এটা আসলে ঠিক তেমনটা নয়। রাশিয়ানরা আগ্রাসন চালাক সেদিকে আমরা তাদেরকে ঠেলে দিইনি কিন্তু যাতে তারা আগ্রাসনের দিকে ঝুঁকে পড়ে তার সম্ভাবনা আমরা বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। প্রশ্ন : যখন সোভিয়েতরা তাদের হস্তক্ষেপের যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টা করতো এ কথা বলে যে আফগানিস্তানে তারা আমেরিকার সম্পৃক্ততা আছে এমন একটি গোপন তৎপরতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, তখন লোকজন সে কথা বিশ্বাস করতো না। কিন্তু এর তো একটা সত?্যতা ছিলই। আপনার কি এখন এ ব?্যাপারে কোন অনুশোচনা হয় না? ব্রেজেজিনস্কি: কীসের অনুশোচনা? সেই গুপ্ত কর্মকাণ্ড ছিল দারুণ একটা ভাবনা। এর পরিণতিতে রাশিয়ানরা আফগানিস্তানের ফাঁদে পা দিয়েছিল আর আপনি আমাকে বলছেন আমি এর জন্য অনুশোচনা করবো? ঠিক যেদিন রাশিয়া সীমানা অতিক্রম করলো সেদিন আমি প্রেসিডেন্ট কার্টারকে লিখেছিলাম, এখন আমরা ভিয়েতনামে আমাদের যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল সেই অভিজ্ঞতাটা রাশিয়াকে ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগটা পেয়েছি। আসলে প্রায় দশ বছর ধরে মস্কোকে একটা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়েছে যা সরকারের সমর্থন পায়নি, সেটা ছিলো এমন এক সংঘাত যা তাদেরকে নৈতিকভাবে পরাজিত করেছে এবং বলতে গেলে পুরো সোভিয়েত সাম্রাজ্যকে ভেঙে দিয়েছে। প্রশ্ন: আর তাহলে আপনি ইসলামী মৌলবাদকে সমর্থন করা তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ জঙ্গিদের উপদেশ দেওয়ার মতো কাজ করেও অনুশোচনা করছেন না? ব্রেজেজিনস্কি: পৃথিবীর ইতিহাসের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা কী? তালিবান নাকি সোভিয়েত সাম্রাজ্যের পতন? কেউ কেউ মুসলিমদের আন্দোলিত করেছিল আর কেউ কেউ মধ্য ইউরোপে বিপ্লব সংগঠন করেছিল এবং ¯œায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছিলো? প্রশ্ন : কেউ কেউ মুসলিমদেরকে আন্দোলিত করেছিল? কিন্তু এটা বলা হয়ে থাকে এবং পৌনঃপুনিক ইসলামী মৌলবাদ আজ এক বৈশ্বিক বিপর্যয়ের কারণ। ব্রেজেজিনস্কি: আজেবাজে কথা! এটা বলা হয় যে, পশ্চিমা দেশগুলোর ইসলামের ব?্যাপারে একটি কৌশল রয়েছে। সেটা নির্বোধের মতো কথা। কোন বৈশ্বিক ইসলাম নেই। ইসলামকে মানবিক দিক থেকে দেখুন ডেমাগোগুরি বা আবেগ দিয়ে নয়। এটা ১.৫ বিলিয়ন মানুষকে প্রতিনিধিত্বকারী পৃথিবীর প্রধান ধর্ম। তার ভেতরে কোন জিনিসটা সাধারণ। সৌদি আরবের, উদারনৈতিক মরক্কো, পাকিস্তানি সামরিকতন্ত্রী, মিশরীয়, পশ্চিমা-মুখী বা মধ্য এশীয় ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী, কোথায় মিল আছে? যা খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে তার বাইরে কিছুই না। [উপক্রমণিকা লিখেছেন : প্রফেসর মিশেল চসুডভস্কি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন : লা নৌভেল অবজারভেচার সূত্র : এই প্রতিবেদনটি মূলত গ্লোবাল রিসার্সের প্রথমদিকের অন্যতম একটি প্রবন্ধ। এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো ১৫ অক্টোবর ২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ন্যাটো পরিচালিত ৭ অক্টোবর ২০০১ খ্রিস্টাব্দের আগ্রাসনের ঠিক পরেই।] অনুবাদক : সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজ।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..