কমরেড আফজালুর রহমান মেহনতি মানুষের নেতা

কাফি সরকার

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড আফজালুর রহমান ছিলেন একজন বিনয়ী ও নিরহংকার বিপ্লবী নেতা। বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার চোপড়া থানার লক্ষ্মীপুর গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে ৩১ ডিসেম্বর ১৯৪৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন জমিদার মিয়া হাবিবুর রহমান ও অফলা খাতুনের চতুর্থ সন্তান। যদিও তাঁর বাবা ব্রিটিশদের দেওয়া ‘মিয়া উপাধি’ বহু আগেই ত্যাগ করেন। জানা যায়, তাঁর বাবা ব্রিটিশ ভারতের ইলেকটোরাল ভোটার ছিলেন। মা আফলা খাতুনের পৈত্রিক নিবাস ছিল পঞ্চগড় জেলার মীরগড়ে। বড় ভাই আমিনুর রহমান ছিলেন বাম প্রগতিশীল রাজনীতির মানুষ। বড় ভাইয়ের হাত ধরেই খুব ছোটবেলায় কমরেড আফজালুর রহমানের বাম-প্রগতিশীল রাজনীতির হাতেখড়ি হয়। দুই বোনের মধ্যে বড় বোন এখনও জীবিত। দেশভাগের সময় তাঁর জন্মস্থানটি ভারতের বিহার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। যেহেতু দেশ ভাগে শুধু বাংলা ভাগ হয় তাই লক্ষ্মীপুর গ্রামটি মুসলমান অধ্যুষিত ও বর্তমান বাংলাদেশের পঞ্চগড় শহর ঘেঁষা (৯ কি.মি) হলেও তা তৎকালীন পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তবে তাঁর পরিবার মাতৃভূমির মায়া ত্যাগ না করে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত মাটি কামড়ে সেখানেই থেকে যায়। তাই দেশভাগের পরবর্তী সেই উত্তাল সময়ে পশ্চিমবাংলা, আসাম ও বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে তাঁর শৈশব ও কৈশোরকাল অতিবাহিত হয়। পরিবারে রাজনৈতিক সচেতনতা থাকায় সে সময়ের পরিবর্তনের ঘটনাচক্র তিনি ছোটবেলায় খুব কাছ থেকেই প্রত্যক্ষ করেছেন। প্রাইমারি শিক্ষা শেষ করার পর তিনি পড়তে চলে যান বর্তমান ভারতের বিহার রাজ্যের কিশানগঞ্জ জেলার কিশানগঞ্জ হাইস্কুলে। ১৯৬০ সালে স্কুল শেষ করে তিনি প্রি ইউনিভার্সিটি (বর্তমান উচ্চ মাধ্যমিক) পড়ার জন্য ভর্তি হন বিহারের পূর্ণিয়া জেলার পূর্ণিয়া কলেজে। ১৯৬২ সালে প্রি ইউনির্ভাসিটি পাস করে পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন পূর্ণিয়া কলেজেই পুনরায় বিএসসিতে পড়াশুনা করেন। কিন্তু সেখানে প্রথমবর্ষ পাস করার পরে রংপুরের কারমাইকেল কলেজে বিএসসিতে নতুন করে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় এবং সেখান থেকে তিনি ১৯৬৫ সালে বিএসসি উত্তীর্ণ হন। তখনো তাঁর পরিবার ভারতেই ছিল। কিন্তু ১৯৬৫ সালে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময় প্রিয় মাতৃভূমির মায়া ত্যাগ করে তাঁর বাবা ও বড় চাচার পরিবারের সকলেই রংপুর সদর সংলগ্ন চন্দনপাঠ ইউনিয়নে এক হিন্দু পরিবারের সাথে জমি-জায়গা বিনিময়ের মাধ্যমে রংপুর জেলা প্রশাসকের কাছ হতে পাকিস্তানের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু তিনি ও তাঁর পরিবার ধর্মের কারণে মাতৃভূমি ছেড়ে আসার কষ্ট উপলব্ধি করে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে থাকেন। বিএসসি পাস করার পরে কমরেড আফজালুর রহমান ১৯৬৬ সালের শেষের দিকে পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া থানার ভোজনপুর গ্রামের ভোজনপুর স্কুলে গণিতের শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। এ বছর তিনি গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ পান এবং তখন থেকে তিনি পার্টির রাজনীতিতে আরো বেশি সক্রিয় হন। কমরেড ফরহাদের সান্নিধ্যে তেঁতুলিয়া পঞ্চগড়ে সংগঠন গড়ে তুলতে থাকেন। প্রকাশ্যে তিনি ন্যাপ (মোজাফ্ফর) এর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এরপরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে একজন সংগঠক হিসেবে এবং বেশ কয়েটি সম্মুখযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের শুরুর দিক হতে তিনি রংপুরে অবস্থান করছিলেন। ২৫ মার্চ কালরাত্রির পরে সকালে তাঁর স্নেহভাজন মুক্তিযোদ্ধা মাহাবুবুল আলমের সাথে রংপুরের বিভিন্ন গণহত্যার স্থানসমূহে প্রিয়জনদের খুঁজতে বের হন। এই গণহত্যাই তাঁকে যুদ্ধে যেতে মূল শক্তি যোগান দেয়। যুদ্ধের পরে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। পরে চাকুরি ছেড়ে কয়েক বছর পেশা হিসেবে ঠিকাদারি ব্যবসাকে বেছে নেন এবং পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলায় পার্টির সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩ সালে তিনি নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার মকসুদার রহমান চৌধুরীর কন্যা শাহানা বেগমকে বিয়ে করেন। ১৯৮৩ সাল হতে তিনি মুলাটোলে তাঁর নিজ বাসায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। এ সময়েই তিনি কৃষক সমিতিতে যুক্ত হয়ে পড়েন। পেশা হিসাবে চন্দনপাটের পৈত্রিক জমির কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত হন ও রংপুর পার্টির কাজে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। তিনি পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেস হতে সর্বশেষ কংগ্রেস পর্যন্ত সকল কংগ্রেসে অংশগ্রহণ করেছেন। উল্লেখ্য যে, তাঁদের বাসায় যাতায়াত করতেন কমরেড ছয়ের উদ্দিন। কমরেড ছয়ের উদ্দিন ছিলেন নিরহংকার প্রকৃতির মানুষ। তিনি সব সময় চিন্তা করতেন মানুষের মুক্তির কথা। সুতরাং কমরেড আফজালুর রহমান কমরেড ছয়ের উদ্দিনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং তাঁর নেতৃত্বেই তিনি রংপুর অঞ্চলে শক্তিশালী কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলেন। কমরেড আফজালুর রহমান ঐ সময়েই কৃষক সমিতির জেলা কমিটির সহ-সহাপতি নির্বাচিত হন এবং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। রংপুরে আসার পর হতেই তিনি কৃষক আন্দোলনের পাশাপাশি কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং নিরলস ভাবে গ্রামে-গঞ্জে পার্টি গড়ে তোলার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন সমাজতান্ত্রিক-সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থায়। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত পার্টির লড়াই-সংগ্রামের সাথে যুক্ত থেকেছেন। কমরেড আফজালুর রহমান বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন পার্টির একাদশ জেলা সম্মেলনে এবং মৃত্যু পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব আন্তরিকতার সাথে পালন করেছেন। তিনি যখন ঢাকায় অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ছিলেন তখন তাঁর বড় ছেলেকে বলেছিলেন যে, “আমি জেলা পার্টির সভাপতি হয়ে ছুটি না নিয়ে এতদিন পার্টির কাজে অনুপস্থিত থাকতে পারি না। সুতরাং আমাকে পার্টির কাছে ছুটি নিতে হবে, তুমি ছুটির ব্যবস্থা করো। ” তাঁর এ কথাতেই বোঝা যায় তিনি পার্টির প্রতি কতটা আন্তরিক ও দায়িত্ববান ছিলেন। কমরেড আফজালুর রহমান এতটাই বিনয়ী ছিলেন যে, পার্টির ও বিভিন্ন গণসংগঠনের নেতা-কর্মীদের সাথে তিনি কখনো উচ্চস্বরে কথা বলেননি। সমমনা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের সাথেও তাঁর আন্তরিকতাপূর্ণ বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। তিনি পার্টির দৈনন্দিন কাজ-কর্ম ও নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও ছিলেন নীতিতে দৃঢ় কিন্তু কৌশলে নমনীয়। তিনি কখনোই নিজের মত বা সিদ্ধান্তকে চাপিয়ে দিতেন না পার্টির তাত্ত্বিক ও দৈনন্দিন কাজের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে। তাঁর চিন্তা ও কর্মের মধ্যে কোনো ফাঁক ছিল না। ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের পর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিতেও বিপর্যয় নেমে আসে। সেই সময় তিনি অবিচল দৃঢ়তায় কমিউনিস্ট নীতি আদর্শকে আঁকড়ে ধরে পার্টি রক্ষার সংগ্রামে অবদান রাখেন। বিলোপবাদীদের কারণে ঢাকাসহ দেশের অনেক জেলার পার্টি কার্যালয়গুলি ভাগ হয়ে যায়। সে সময় রংপুরের পার্টি কার্যালয়কে “উৎসর্গ ট্রাস্ট” এ পরিণত করা হয়। কমরেড আফজালুর রহমান উৎসর্গ ট্রাস্টের সাথে প্রায় শুরু থেকেই জড়িত ছিলেন। ২০১৬ সালে তিনি উৎসর্গ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং মৃত্যু পর্যন্ত তিনি সততার সাথে এ দায়িত্ব পালন করেন। ২০২১ সালের ২৬ আগস্ট ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় কমরেড আফজালুর রহমানের জীবনাবসান ঘটে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..