১৯৮০ সালের ১ আগস্ট প্রকাশিত

একতার এক দশক

মোজাম্মেল হোসেন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
১৯৬৯-এর দেশ কাঁপানো উত্তাল গণসংগ্রামের পরে চাপানো সামরিক শাসনের জগদ্দল পাথরের নিচে দেশ যখন স্বল্পকালের জন্য স্তম্ভিত, অথচ অগ্নিগর্ভ, একাত্তরের ঐতিহাসিক যজ্ঞানুষ্ঠানের জন্য অপেক্ষমান, সেই সময় ১৯৭০ সালের ৩১ জুলাই আত্মপ্রকাশ করে একটি নতুন সাপ্তাহিক পত্রিকা। ‘একতা’। আবির্ভাবের কোনো জৌলুসপূর্ণ ঘটা ছিল না, ছিল না চোখ ধাঁধানো বিজ্ঞাপনে ও রঙচঙে প্রকাশনায়। পুরনো ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের গলি, ২৪নং শ্রীশদাস লেনে নোংরা নর্দমার ওপর সিঁড়িতে পা রেখে উঠলে আয়তাকার মাঝারি একটি ঘরের মধ্যে বড় একটি টেবিল ঘিরে বসতে হত সম্পদাকসহ জন দুই কর্মীকে। প্রুফ দেখাও ঐ টেবিলেই। ঘরটি ছিল ছাপাখানারই এক ক্ষুদ্রাংশ। মালিকের সাথে বন্দোবস্ত করে নেওয়া। ঐ দীন সম্পদ নিয়ে একটি নতুন সাপ্তাহিক কেন আত্মপ্রকাশ করেছিল? আত্মপ্রকাশের দিনে সাপ্তাহিক ‘একতা’র সম্পাদকীয় স্তম্ভে লেখা হয়েছিল : “সমাজকে যাহারা খাদ্য জোগায়, কলকারখানা ও সমাজের যাবতীয় উৎপাদন যাহারা চালু রাখে, যাহাদের শ্রমের উপর গোটা সমাজটা দাঁড়াইয়া আছে, তাহারাই আজ শোষিত, নিপীড়িত ও শিক্ষা-দীক্ষায় সমস্ত আলোক হইতে বঞ্চিত। এই শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের মুক্তির জন্য যাহারা কাজ করেন তাঁহাদের ওপরই নামিয়া আসে দমননীতির আঘাত। অন্যদিকে মুষ্টিমেয় দেশি ও বিদেশি শোষক ঐ মেহনতি মানুষগুলিকে শোষণ করিয়া ভোগবিলাসে জীবন যাপন করে।” “এই অবিচারমূলক ও শ্রেণি শোষণযুক্ত সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, দেশের জনগণের মুক্তি ও অর্থনীতির অবাধ উন্নয়নের জন্য মৌল প্রয়োজন হইল শোষক শ্রেণিগুলিকে ক্ষমতার আসন হইতে অপসারণ, শ্রমিক-কৃষকদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা, জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্তব্যগুলো সম্পাদন, সামাজিক বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা।” এই উপলব্ধিই ছিল একতার আত্মপ্রকাশের তাগিদ। ঐ লক্ষ্য অর্জনের জন্য একতা সেদিন সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও একচেটিয়া পুঁজি-দেশি-বিদেশি শোষকদের বিরুদ্ধে সমগ্র শোষিত জনগণের একতা গড়ার ডাক দিয়েছিল। পাকিস্তান আমলে শ্রেণি শোষণের বিরুদ্ধে শোষিত মানুষের সংগ্রাম ও সমাজ বিপ্লবের পক্ষে কথা বলার কোনো প্রকাশ্য পত্রিকা ছিল না, তখনই শত বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও আইনানুগ সুযোগ সদ্বব্যবহারের কৌশল নিয়ে অনেক বিপদের ঝুঁকি নিয়েই শোষিত মানুষের পক্ষে কথা বলার জন্য একতা প্রকাশ করা হয়। তাই একতার আত্মপ্রকাশ ভবিষ্যতে এদেশের শোষিত মানুষের মুক্তি বিপ্লবের ইতিহাসে একটি বিশেষ ঘটনা রূপে চিহ্নিত হবে–এ বিশ্বাস নিঃসন্দেহে পোষণ করা চলে। প্রথম থেকে একতার অঙ্গীকার হল দেশের শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত ও মেহনতি বুদ্ধিজীবী প্রভৃতি শ্রেণির শোষিত মানুষের এবং সকল নিপীড়িত শোষিত জাতিসমূহের স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে সত্যনিষ্ঠ, নির্ভিক ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা। পাকিস্তানী শাসনামলে প্রকাশনার ৭ মাসে একতা দেশবাসীর গণতান্ত্রিক অধিকার ও জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের আপসহীন সংগ্রামের পতাকা প্রথম সংখ্যা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে, সাম্রাজ্যবাদ ও পাক শাসকগোষ্ঠীর চরিত্র, কৌশল ও চক্রান্তের বিভিন্ন দিক যথাসাধ্য পাঠকদের কাছে উম্মোচিত করেছে, জাতীয় সংগ্রামে মেহনতী মানুষের শ্রেণিস্বার্থের প্রেক্ষিত তুলে ধরেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে একতা স্বাধীনতাকে সংহত করা, ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়া এবং স্বাধীনতাকে দুর্বল করার দেশি-বিদেশি চক্রান্ত সম্পর্কে দেশবাসীকে সজাগ করাকে দায়িত্ব বিবেচনা করেছে। সেই সঙ্গে দেশপ্রেমিক শিবিরের দুর্বলতা ও দোষত্রুটিও একতা তুলে ধরেছে খোলাখুলি। এক দশকে দুবার একতার প্রকাশনা ব্যাহত হয়েছে। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর গণহত্যা ও বাঙালির সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে একতার প্রকাশনা বন্ধ হয়। ১০ মাস পরে ১৯৭২- এর ফেব্রুয়ারিতে স্বাধীন দেশের মাটিতে একতার পুনরাবির্ভাব ঘটে। পুনরায় ১৯৭৫ এর জুন মাসে উদ্ভুত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আইন বলে অন্য অনেক কাগজের সাথে ডিক্লারেশন বাতিল হওয়ায় একতাও বন্ধ হয়। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে একতা তৃতীয় পর্যায়ে যাত্রা শুরু করে। দশ বছরে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু শোষণ দূর হয়নি, বরং শোষণ ও শোষক-শোষিতের দ্বন্দ্ব তীব্রতর হয়েছে। সময়ের অনিবার্য প্রভাবে একতার মুদ্রণ ও ভাষা-ভঙ্গিতে হয়তো কিছু পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু একতা তার মৌলিক অঙ্গিকার ও ভূমিকায় অটল রয়েছে। আজ রাজনীতিতেও সমাজে জাতি-বিরোধী শক্তির তাণ্ডব। স্বাধীনতার আদর্শ ও সুফল, বাঙালি জাতির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মেহনতি মানুষের স্বার্থ পদদলিত করে দেশি-বিদেশি শোষকদের স্বার্থে দেশকে সাম্রাজ্যবাদের উপর নির্ভরশীল ধনতান্ত্রিক দেশ রূপে গড়া হচ্ছে। এসময় একতা তার স্বীয় ভূমিকাকে আরও তীক্ষ্ম করে তুলতে চায়, মেহনতি মানুষের স্বার্থে প্রচার বাড়াতে চায়। ধনিক সমাজে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বহুল প্রচলিত একটি ভড়ং একতা পরিহার করে চলে। অর্থাৎ তথাকথিত ‘নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা’র নামে প্রচলিত ব্যবস্থার পক্ষালবম্বন বা সত্য ও মিথ্যা, ন্যায় ও অন্যায়, শোষক ও শোষিতের সংগ্রামের মাঝে কোনো সুবিধাবাদী অবস্থান গ্রহণ করে না। একতা শোষিতের পক্ষে, শোষকের বিরুদ্ধে। অপরদিকে, আজ একথা বললে অত্যুক্তি হয় না যে, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে দেশে চলছে সততা ও নীতির দুর্ভিক্ষ। বিরল ব্যতিক্রম বাদে নির্লজ্জ স্বাতবকতা ও আত্মসমর্পণ এবং দায়িত্ব-জ্ঞানহীন আচরণ দুই-ই চলছে পাশাপাশি। বিশেষভাবে সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রকাশনার ক্ষেত্রে বানানো খবর, সস্তা চমক ও উত্তেজনা পরিবেশনের মাধ্যমে পাঠকদের সুড়সুড়ি দিয়ে ভোলানোর ও বিভ্রান্ত করার এক আপাত বাণিজ্যিক কিন্তু আত্মঘাতি খেলা চলছে। এ পরিবেশে একতা তার স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে সচেষ্ট। ধনিক সমাজে শোষকের হাতে যতগুলো অস্ত্র আছে গণ-প্রচার মাধ্যম তার অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র, বিশেষভাবে কারিগরি প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতির এই যুগে। স্বাভাকিকভাবেই শোষিতের পক্ষে প্রচার শতগুণ দুর্বল। কিন্তু প্রচার উপক্ষেণীয় কিছুতেই নয়। আমাদের অর্থবল, সম্পদবল কম, কিন্তু বিপ্লবী স্পৃহা, শোষিতের মুক্তিসংগ্রামের ঐতিহাসিক দায়িত্ববোধ ও শ্রম দিয়ে আমরা ঐ অভাব পূরণের চেষ্টা করি। রাজনৈতিক সংগ্রামে মেহনতি মানুষের শক্তিবৃদ্ধি ও মেহনতি মানুষের সংবাদপত্রের প্রচারবৃদ্ধি দুটো দুটোকে সহায়তা করে। মেহনতি মানুষের মুক্তিবিপ্লবে এ-ধরনের সংবাদপত্রের ভূমিকা একাধারে প্রচারক, শিক্ষক ও সংগঠকের। একতার দশম বর্ষপূর্তির দিনে একতার সম্পাদকমণ্ডলী, কর্মী, পাঠক, সকল সুহৃদ ও শুভার্থীর অঙ্গিকার হোক একতার প্রচার বৃদ্ধি। শোষিতের বিজয় অবশ্যম্ভাবী।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..