উদীচির মিন্টু চৌধুরী স্মরণে

রফিকুজ্জামান লায়েক

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
কর্মের মাধ্যমে মানুষ তার পরিচয় ফুটিয়ে তোলে। মানুষ মরে যায় প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে। রেখে যান কাজ ও নানান জনের সাথে নানা স্মৃতি। কেউ কেউ যেন মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আরো বড় হয়ে ওঠেন। এমনই একজন উদীচী ফরিদপুর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কমরেড মিন্টু চৌধুরী। পুরো নাম হাফিজুর রহমান চৌধুরী। ফরিদপুরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এবং পার্টি কমরেডদের কাছে মিন্টু চৌধুরী নামে তিনি পরিচিত ছিলেন। ছোটবেলায় মা-বাবা আদর করে ডাকতেন "পোখরাজ" নামে। সেজন্যই পার্টির সদস্য পদ পাওয়ার পর যেহেতু সরকারি চাকুরি করতেন, সেজন্য নাম পাল্টাতে বললে পার্টি তথ্য এবং নবায়ন করার সময় নাম লিখতেন পোখরাজ চৌধুরী। অবসরে যাবার পর আর এই নাম ব্যবহার করেননি। ফরিদপুর শহরে গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শুরু থেকে কয়েকটি পরিবার ছিল যারা প্রবীণ বিপ্লবীদের নানাভাবে সহায়তা করতেন। কমলাপুরে মান্নান ভাইয়ের বাসা, চরকমলাপুর মুজিবুর রহমান বাদল ভাইয়ের বাড়ি, ঝিলটুলিতে চিত্ত রঞ্জন ঘোষের বাসা, আলিপুরে মোল্লা জাকির হোসেন (ননী মোল্লার বাড়ি), লক্ষ্মীপুরে ছিল তিন চারটি বাসা। আশির দশকের শেষ পর্যন্ত এইসব বাসাবাড়িতে প্রবীণ কমরেডরা আসতেন এবং থাকতেন। শহরের লক্ষ্মীপুর এলাকার এইরকম এক পরিবারের সন্তান আমাদের মিন্টু ভাই। আমরা ছাত্রজীবনে গোপনে খবর পেয়ে এই বাড়িতে সন্তোষ দাকে দেখতে যেতাম। বৃহত্তর ফরিদপুরের প্রবীণ বিপ্লবী কমরেড সন্তোষ ব্যানার্জি জীবনের বেশ কিছু সময় মিন্টু ভাইদের বাড়িতে কাটিয়েছেন। তার বড় ভাই ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের নেতা। ছোট ভাই ছাত্র ইউনিয়ন থেকে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ ছাত্র সংসদে এজিএস নির্বাচিত হন। ৯০এর দশকে পার্টি বিপর্যয়ের পরে ফরিদপুর উদীচীর কার্যক্রম একরকম স্থবির হয়ে পড়ে। এই সময়ে অল্প কয়েকজন সংগঠনের দায়িত্ব নিয়ে আবার উদীচীকে সচল করার চেষ্টা করেন। মিন্টু ভাই ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি উদীচী জেলা কমিটির অর্থ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সংগঠনের অন্যান্য সব কাজ গুছিয়ে করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। কয়েকবার জেলা সম্মেলনে অন্যদের সামনে আনার চেষ্টা করেন। একসময় আমাদের সকলের অনুরোধে জেলা উদীচীর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। অন্যদের সহযোগিতায় উদীচি গানের স্কুল এবং আবৃত্তি ক্লাস শুরু করেছিলেন। কয়েকটি নাটকে অভিনয় করেছেন। কাজের মধ্যে আনন্দ পেতেন। যে কোনো জাতীয় দিবসে সংগঠনের পক্ষ থেকে কর্মসূচি অন্যদের সহযোগিতা নিয়ে দক্ষতার সাথে বাস্তবায়ন করতেন। পহেলা বৈশাখ পালনে তার ছিল বিশেষ আগ্রহ। সকালের মিছিলে, তারপর ফলাহার এবং বিকালের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যমণি থাকতেন সবার প্রিয় মিন্টু ভাই। সংগঠনের কাজের জন্য প্রচুর পরিমাণে নিজের টাকা খরচ করতেন। জনতা ব্যাংক লিমিটেডের কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও সংগঠনের কাজে ছিলেন সাধারণ কর্মীর মত। সাধারণের মতো কাজ করতে করতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অসাধারণ। কাজের গাফিলতিও তিনি জানতেন না। পার্টি এবং গণসংগঠনের কোনো ভাল জমায়েত দেখলে খুবই খুশি হতেন। ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি পার্টির পল্টন মহাসমাবেশে তিনি আমাদের সাথে গিয়েছিলেন। সমাবেশ দেখে আবেগে কেঁদেছিলেন। কমরেড মিন্টু ভাই একতা পত্রিকার পাঠক ছিলেন। সাপ্তাহিক একতা ঠিক সময় না পেলে ফোন করতেন। একতা পত্রিকা নিজের প্রতিষ্ঠানে রাখতেন যাতে অন্যরা পড়তে পারে। বই পড়ার প্রতি ঝোঁক ছিল। যে কোনো কর্মসূচিতে চাইতেন বইয়ের স্টল থাকুক। পার্টি ও গণসংগঠনসমূহের কর্মীদের প্রতি সদয় ছিলেন। দেখা হলেই অন্যদের খবর নিতেন। চাকরির পাশাপাশি প্রেসের ব্যবসা করতেন। তার প্রেসে কর্মী-সমর্থকরা অফিস হিসেবে যাতায়াত করতেন। এতে তিনি খুবই খুশি হতেন। ২০০৬ সালের ৩০ মার্চ পার্টির সমাবেশ ফরিদপুর এসেছিলেন জননেতা কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। আমরা পরিকল্পনা করেছিলাম সমাবেশ শেষে সেলিম ভাইকে নিয়ে সন্ধ্যায় কিছু সময়ের জন্য শহরের চাকরিজীবীদের নিয়ে একটা সংক্ষিপ্ত সভা করব। মিন্টু ভাই শুনে বললেন যে, আমাদের বাসায় করা যায় না? আমরা রাজি হলাম। কিছুদিন আগেই তার বাবা মৃত্যুবরণ করেছেন। তার বাবার প্রতি সেলিমভাই সহ আমরা শ্রদ্ধা জানাই। এতে মিন্টু ভাই খুবই আনন্দিত হয়েছিলেন। বলেছিলেন, সন্তোষদার পর পার্টির কোনো বড় কমরেড বাড়িতে এলেন। কমরেড মিন্টু চৌধুরীর বাবা চৌধুরী মোঃ খবিরুর রহমান ছিলেন চাকরিজীবী। মা বেগম শামসুন্নাহার চৌধুরী গৃহিনী। পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন মা-বাবার তৃতীয় সন্তান। করোনার কারণে উদীচীর কার্যক্রম বন্ধ থাকায় প্রায়ই মন খারাপ করতেন। এই সময়ে ডায়াবেটিসসহ আরো কিছু শারীরিক সমস্যা দেখা দিয়েছিল। চিকিৎসা চলছিল। নিয়মিত থেরাপি নিতেন। তাদের বাসার সামনেই ফরিদপুর রেল স্টেশন। ১৯৯৮ সালে রেল বন্ধ হয়ে গেলে কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে রেল পুনরায় চালু হওয়া পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে নানা ধরনের আন্দোলন আমরা করেছি। রেল চালুর জন্য মিছিল দেখলে খুবই খুশি হতেন। ২০১৪ সালে একটি ট্রেন ও ২০০৮ সালে দ্বিতীয় ট্রেন চালু হলে অনেক মানুষকে তিনি মিষ্টি খাইয়েছেন। মিন্টু ভাই নিজে কাজ করতেন এবং অন্যের কাজের প্রতি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। মানুষের প্রতি, মানুষের সংগ্রামের প্রতি, নিজে থেকেই দ্বায়বোধ অনুভব করতেন। আমাদের মিন্টু ভাই মানুষের বিপদের সময়, চিকিৎসার জন্য, কারো লেখাপড়ার জন্য নিজে থেকে এবং পার্টির মাধ্যমে সহায়তা করার চেষ্টা করতেন। জুন মাসের ২০/২১ তারিখ থেকেই তার জ্বর ও কাশি সমস্যা দেখা দেয়। নিজে থেকেই চিকিৎসা নিতে শুরু করেন। কিন্তু একপর্যায়ে সমস্যা বেশি হলে ২৬ তারিখে ডাক্তার দেখানো হলে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে অক্সিজেন নেওয়ার পরামর্শ দেন। সেই মোতাবেক ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সন্ধ্যায় ভর্তি করেন তার পরিবারের লোকজন। রাত্রে খবর পেয়ে আমরা তাকে দেখতে চাই। আমাকে দেখে জোরে বলছিলেন, ‘কমরেড লাল সালাম সালাম। এটিই শেষ সালাম।’ আমি সান্তনা দিতে গেলে বললেন, ‘যা বলেছি বুঝেই বলেছি, আর পারছি না’। এর ঘণ্টা দুই পরে কমরেড মিন্টু চৌধুরী শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে, মা, অন্যান্য ভাই-বোন, স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। মেয়ে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, চাকরীজীবি। ছেলে ভারতের পাঞ্জাবে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত। মিন্টু ভাই, আপনার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। লাল সালাম।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..