কালের আলোকবর্তিকা কমরেড মজিরুনন্নেছা

স্বপন পাল

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

মজিরুনন্নেছা। আহামরি তেমন কোনো নাম নয়। সেই সময় আমাদের দেশের আর পাঁচটা সাধারণ মেয়েদের যেমনটা হতো, তেমনি একটা নাম। বর্তমান প্রজন্মের কাছেও তেমনভাবে পরিচিত নয়। অবশ্য এরজন্য যারা তাঁর পরের প্রজন্মের তাদেরকেই দায় নিতে হবে! জন্ম ব্রিটিশ শাসিত-শোষিত ভারতবর্ষে ১৯২৩ সালে (ডিসেম্বর ৯), ময়মনসিংহ শহরের সেহড়া এলাকায়। একদিকে ব্রিটিশ শাসন-শোষণের নিপীড়ন অন্যদিকে নারী হিসেবে জন্ম নেয়ায় বঞ্চনার বিষয়টি তো ছিলই। ফুফাতো ভাই কমরেড আলতাব আলী ছিলেন এ অঞ্চলের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম পর্যায়ের প্রখ্যাত নেতা। সেই সূত্রেই ছোট বেলা থেকেই কমিউনিস্ট পার্টির পলাতক কমরেডদের মধ্যে কুরিয়ারের (খবরাখবর আদান-প্রদান) কাজ করতেন মজিরুনন্নেছা। এইভাবে যুক্ত হয়ে যান কমিউনিস্ট পার্টির সাথে এবং পরবর্তী সময়ে আলতাব আলীর সাথে বিয়ে হয়। উল্লেখ্য ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা কমরেড আলতাব আলী ছিলেন সাতচল্লিশের দেশভাগের পর এই অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে প্রথম কমিউনিস্ট এবং যাদেরকে নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি যাত্রা শুরু করেছিল, আলতাব আলী ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। মজিরুন্নেছা বিয়ের পর এসে যুক্ত হন এক বড় পরিবারের সাথে। আমাদের সমাজে বা রাষ্ট্রে পুরুষতন্ত্রের যে আগ্রাসী থাবা দেখি, এর অবাধ চর্চার ক্ষেত্র পরিবার, আর সেটার শক্তিশালী ও সুবিন্যস্ত রূপ দেখা যায় সমাজে-রাষ্ট্রে। পিতৃতন্ত্রের চর্চা পরিবারেই হয়ে থাকে একেবারে শিকড় ছুঁয়ে। তো সেই বৃটিশ আমলে এর চর্চা তো স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি ছিল এবং মজিরুন্নেছাও এর শিকার হয়েছিলেন। শ্বশুরবাড়ির একান্নবর্তী পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় এক’শ । নানান বিষয়ে পরিবারের নারীরা বৈষম্যের শিকার হতেন। বিষয়টি মজিরুনন্নেসা নজরে পড়ে। উদ্যোগও নিয়েছিলেন তিনি, তাঁর প্রয়াসেই অনেকটা কমে এসেছিল পরিবারের ভেতরের নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য। তখন থেকেই চিন্তা করতেন নারীদের সম-অধিকারের জন্য কিছু করা উচিত। একান্ত পরিচিত নারীদের নিয়েই ময়মনসিংহে গড়ে তুললেন 'মহিলা সমিতি' নামের সংগঠন। তিনি হলেন এর সভানেত্রী। স্বামীর অনুপ্রেরণায় কমিউনিস্ট রাজনীতিতে এসে দীক্ষিত হয়েছিলেন সমাজ পরিবর্তনের চেতনায়। বুঝেছিলেন এ সমাজ পাল্টাতে না পারলে নারীর এই অবস্থা ও অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হবে না। নারীর এগিয়ে যাওয়ার গতি তরান্বিত করার জন্যে নারীদের আরো বেশি করে সংগঠিত করতে প্রতিষ্ঠাকালেই যুক্ত হয়েছিলেন 'মহিলা পরিষদ'এর সাথে। এর আগে কমরেড জ্যোৎস্না নিয়োগী (কমরেড রবি নিয়োগী'র সহধর্মিণী), কমরেড নির্মলা সান্যাল (কমরেড মনি সিং এর দিদি), কমরেড যুইফুল রায় (কমরেড খোকা রায়ের সহধর্মিণী) কমরেড হেনা রায়(কমরেড পবিত্র শংকরের বোন) প্রমুখ নারী কমরেডদের সাথে মিলে ময়মনসিংহে গড়ে তুলেছিলেন 'মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি'। রাজনৈতিক কারণে অনেকবার জেল খেটেছেন এবং আত্মগোপনে (আন্ডারগ্রাউন্ডে) থেকেছেন বহুদিন। ১৯৪৩ সালে আত্মগোপনে থাকার কারণে জীবনের সবচয়ে বড় শোকটি জীবনে গেঁথে গিয়েছিল তাঁর। বড় সন্তান খোকার (রফিক) অকাল মৃত্যুর সময় কাছে তো থাকতে পারেনইনি, এমনকি পুলিশি তাণ্ডব ও নিষ্ঠুরতার কারণে প্রিয়তম সন্তানের মুখও শেষবারের মতো দেখতে পারেন নি। পুলিশ এক মাসেরও অধিক সময় কবরটি পাহারা দিয়ে রেখেছিল। সেই সময় জীবনসঙ্গী রাজনৈতিক সহকর্মী কমরেড আলতাব আলীও অনেক দূরে বর্তমান ভারতের আলীপুর জেলে বন্দী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে ময়মনসিংহে গঠিত সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ছিলেন তিনি৷ স্বামী কমরেড আলতাব আলীও উক্ত কমিটির সদস্য ছিলেন। ময়মনসিংহ চক্ষু হাসপাতালের জন্যে জমি দান করে গিয়েছেন কমরেড মজিরুনন্নেসা। ২০০২ সালের ৭ জুলাই প্রয়াত হন কালের আলোকবর্তিকা কমরেড মজিরুন্নেছা। একটা কালে জন্মেছিলেন, কালকে পরিবর্তন করতে- এগিয়ে নিতে যুক্ত হয়েছিলেন সমাজ পরিবর্তনের লড়াই-সংগ্রামে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, নারী আন্দোলনসহ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের প্রতিটি প্রগতির সংগ্রামে রেখে গেছেন স্বাক্ষর। আমাদের দায়িত্ব এইসব মানুষদের স্মরণ করা, তাদের কর্ম বর্তমান প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা এবং যে জন্যে তাঁরা লড়াই সংগ্রাম করেছেন, সেই ন্যায্যতার ও সমতার সমাজ বিনির্মাণে আরও বেশি করে কাজ করে তাঁদেরকে শ্রদ্ধা জানানো। প্রয়াণবার্ষিকীতে অপার শ্রদ্ধা, কমরেড মজিরুন্নেছা।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..