মন্বন্তর-মারিতে মানুষ, গোর্কির জীবন

হাবীব ইমন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
এক. ‘মানুষ কেমন আছে?’- প্রশ্নটি এই মুহূর্তে সাধারণ। কিন্তু নির্বোধ কিসিমের প্রশ্নটিই আমাকে বেশ ভাবাচ্ছে। ভাবার কতোগুলো কারণও রয়েছে। গত কয়েক দিনের কিছু সংবাদ আমাকে ব্যাপকভাবে ভাবিয়ে তুলছে। যন্ত্রণাকাতর করে তুলছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সামলাতে সর্বাত্মক লকডাউন জনমানুষের ওপর যে প্রভাব ফেলছে—‘করোনায় কাম হারাইছি, দুই দিন না খাইয়া চুরি করছি’, ‘লকডাউনে কাজ বন্ধ, সন্তানদের খাবার দিতে না পেরে বাবার আত্মহত্যা’, ‘হাত পেতেছে তারা, খাবার দেবে কারা’—সহজেই অনুমেয়, এ অতিমারি মন্বন্তর-মারির পথে হাঁটছে। কোনো এক শ্রমজীবী কণ্ঠে শুনেছি-‘করোনায় নয়, না খেয়ে মারা যাবে’। আমরা এখনো বুঝতে পারছি না যে করোনাপরবর্তী ভবিষ্যৎ কী হাঁক দিচ্ছে, কিন্তু ওরা বুঝে গেছে ওরা গোর্কির জীবনে ঢুকে গেছে। সময়োপযুক্ত কর্মসূচি ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাবে সেখান থেকে নিস্তার পাওয়ার সক্ষমতাটুকু এখন বিলীন হচ্ছে। ইতোমধ্যেই মানুষের হাপিত্যেশ চরমে যাচ্ছে। অনাহারি মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। শিশুরাও দলবদ্ধভাবে এখন পথে নেমেছে খাবারের খোঁজে। যে দুর্দশার মধ্যে আমরা এসে পড়লাম, সেটা ঘটার সত্যিই কোনো প্রয়োজন ছিলো না। কেবল অভিজ্ঞতার অভাবকে দুষলে চলবে না, আমাদের নিজেদের যথেষ্ট খামখেয়ালিও ছিলো। বাহুল্য যে, এখনো রয়েছে। বিপর্যয়ের মধ্যেই নানা দেশে, আমাদের দেশেও একই সাথে আর্থিক বৈষম্য বাড়ছে। অথচ অতিমারির অভিজ্ঞতা বলছে, এভাবে চলতে পারে না, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন ও জীবিকার স্বার্থকে সবার আগে রেখে নীতি প্রণয়ন জরুরি ছিলো। অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ এ-মানুষগুলো আমাদের আড়ালে থেকে গেলো। তার ওপর নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণও ধরাছোঁয়ার বাহিরে। এ লেখাটি লিখতে লিখতে একটি সংবাদ চোখের সামনে আসলো, ‘পেঁয়াজের দাম কেজিতে বাড়লো ১০ টাকা’। যেখানে মানুষের আয়ের পথ রুদ্ধ, সেখানে এ মানুষগুলো কীভাবে সামাল দিবে? মাস্ক ব্যবহার, স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে অথবা সর্বাত্মক ভ্যাকসিনের সাহায্যে সংক্রমণ আটকানোর ব্যবস্থা করা গেলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, জীবন, জীবিকা, এগুলো চলতে পারতো। অথচ সেটা একেবারেই ঠিকভাবে করা হলো না। এর মধ্যে একদিকে আছে স্বাস্থ্য বিষয়ে চিন্তার অভাব, আরেক দিকে অর্থনৈতিক, সামাজিক বিচারে সব মানুষের প্রতি সমদৃষ্টির অভাব। আমাদের জীবনযাত্রায় স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার যে খুব বড় ভূমিকা রয়েছে, সেটা তো উপেক্ষা করা হয়েছে। এমন নয় যে, এ বিষয়ে কিছু ভাবা হয়নি। কিন্তু বাস্তব সহায়ক লক্ষণেও দেখা মেলেনি। বরং দুর্নীতির চাদরে সব ঢাকা পড়েছে, একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য, মানুষ শিউরে উঠেছে। দুই. কার্ল মার্ক্স তাঁর শেষ লেখা, ‘ক্রিটিক অব দ্য গোথা প্রোগ্রাম’-এ বলছেন, সকলের জন্য সমতার ব্যবস্থা এখনই করা যাবে না, সেটা করতে হবে ভবিষ্যতে। কিন্তু গোথা প্রোগ্রামে যে বলা হয়েছিল, মানুষকে উৎপাদনশীলতা অনুযায়ী টাকা দিলে আর কিছু ভাবার দরকার নেই—মার্ক্স বললেন যে সেটা ভুল। তাঁর মত ছিলো, ‘প্রত্যেকের কাছ থেকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী নেওয়া আর প্রত্যেককে তার প্রয়োজন অনুযায়ী দেওয়া’—এই নীতি এখনই কার্যকর করে ফেলা সম্ভব না হলেও সেই লক্ষ্যে এগোনোর জন্য কী করা যায় তা নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। এই চিন্তাগুলো ইউরোপের মানুষের মাথায় ছিলো। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তারা কথাটা তুললেন যে, এখন রাষ্ট্রের সাহায্যে, সামাজিক সুব্যবস্থার সাহায্যে, সমতার দিকে দৃষ্টি রেখে অগ্রসরের একটা চেষ্টা করা যায়। ইংল্যান্ডে এবং ইউরোপের অন্য বিভিন্ন দেশে যুদ্ধের পরে সামাজিক ব্যবস্থাগুলোয় বড় রকম পরিবর্তন আসলো। সমস্যাগুলো সমাধানের যে প্রচেষ্টা হয়েছিল—অসমতাকে বাড়তে না দিয়ে বরং কমানোর প্রচেষ্টা এবং সমাজের সাহায্য নিয়ে ব্যক্তিগত অর্থনীতির ঘাটতি পূরণ করার প্রচেষ্টা—এই পরিবর্তনে সেগুলোর বড় ভূমিকা ছিল। ইউরোপে অসমতা অনেকটা কম, তার একটা বড় কারণ, সেখানে এ জন্য অনেক দিন ধরে নানা রাজনৈতিক আন্দোলন তৈরি হয়েছিলো, বামপন্থী ও মার্ক্সীয় চিন্তাধারারও একটা প্রভাব ছিলো। তাই আমাদের শুধু এই আশায় বসে থাকলে চলবে না যে—সমস্যার কল্যাণে, তার থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে গিয়ে আমাদের অনেক উপকার হবেই হবে। হবে না, যদি সমাধান করতে গিয়ে আমরা সমতার দিকে দৃষ্টি না দেই এবং সমাজের কর্তব্য কতো দূর যেতে পারে সে বিষয়ে চিন্তা না করি। আমরা যদি এর থেকে কোনো উপকার এখনো পর্যন্ত না পেয়ে থাকি, এবং পাচ্ছি না বলেই আমার ধারণা, তার কারণ—আমরা এইসবে চিন্তা করছি না। এর মধ্যে রাজনীতির প্রশ্নটা খুবই বড়। সেটা শুধু রাজনীতিবিদদের ঘাটতি না, সব মানুষেরই ঘাটতি। তিন. বিভূতিভূষণের ‘অশনি-সংকেত’ উপন্যাসে গঙ্গাচরণ ‘গাঁ বন্ধ’ করতে যাবে। মানে, গ্রামে যাতে কলেরা না ঢোকে, সে জন্য মন্ত্র পড়ে গ্রামের চার দিকে গণ্ডি টানতে হবে। গাঁ বন্ধ করতে কী কী লাগবে, ব্রাহ্মণ গঙ্গাচরণ যজমানদের ফর্দ দেয়। দশ সের আলোচাল, আড়াই সের গাওয়া ঘি, আড়াই সের সন্দেশ, তিনটে শাড়ি ইত্যাদি। ১৯৪৩ সাল, ক’দিন পরেই এ সব গ্রামে শোনা যাবে মন্বন্তরের পদধ্বনি। চালের দাম হুহু বাড়বে, কেউ খিদের জ্বালায় বুনো শাক আর কচু খেয়ে মরে পড়ে থাকবে। তখনও দুর্যোগের মেঘ দেখা দেয়নি। গঙ্গাচরণের স্ত্রী স্বামীকে বলে, “গাঁ বন্ধ করতে পারবে তো? এতগুলো লোকের প্রাণ নিয়ে খেলা...।” গঙ্গাচরণ হাসে, “আমি পাঠশালার ছেলেদের ‘স্বাস্থ্য প্রবেশিকা’ বই পড়াই। তাতে লেখা আছে মহামারির সময় কি কি করা উচিত অনুচিত। তাতেই গাঁ বন্ধ হবে। মন্ত্র পড়ে গাঁ বন্ধ করতে হবে না।” সে যুগে গ্রামের মানুষ লোকাচার মেনে ‘গাঁ বন্ধ’করতে গেলেও বৈজ্ঞানিক স্বাস্থ্যবিধির ওপর ভরসা রাখতো। এখনো তা কম-বেশি রয়েছে। কিন্তু তাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে আমাদের উদ্যোগের অভাব রয়েছে, আবার উদাসীনতাও রয়েছে। চার. তেঁতাল্লিশের মন্বন্তর। সেই সময়টার দিকে একটু দৃষ্টি ফেরা যেতে পারে। হয়তো ঘোরতরভাবে বলা, কিন্তু এটা অপরিহার্যভাবে স্বীকার করতে হবে, সেই চিত্রটি আবার ফিরতে শুরু করছে, বৈশ্বিকভাবেই। সিরীয় বাস্তুচ্যুতদের জনাকীর্ণ ক্যাম্পে কাটিয়েছে ছয় বছর বয়সী নাহলা আল-ওথম্যান। ক্যাম্পের চারপাশে ঘুরে বেড়ানো ঠেকাতে তার বাবা প্রায়ই তাকে শিকলে বেঁধে কিংবা খাঁচায় আটকে রাখতেন। চরম বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে মে মাসে নাহলার জীবন শেষ হয়। চরম ক্ষুধার্ত অবস্থায় দ্রুত খাওয়ার সময় মারা যায় ছয় বছরের শিশুটি। এই ঘটনা সিরিয়ার হলেও, এ ক্ষুধামন্দা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। যতোটা আমরা করোনা আক্রান্ত নিয়ে শঙ্কিত, তার চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত, আগামী বিশ্বে কী ঘটে যাচ্ছে। যখনই প্রথম থেকে করোনাপরবর্তী বিশ্বের কথা বলছি, এগুলোকে গুরুত্ব দিতে চায়নি অনেকে। এখন বিশ্বব্যাপী এ আলোচনা কিন্তু শুরু হয়ে গেছে। ইতিহাসে ফিরি— দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। সেই যুদ্ধের থাবা থেকে বাংলাদেশও রেহাই পেলো না। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের নিষ্ঠুর নীতির কারণে বাংলায় খাদ্যসংকট দেখা দিলো। তিনি বাংলার মানুষের মুখের গ্রাসের আকাল বানিয়ে ব্রিটিশ সৈন্যদের খাবারসহ অন্যান্য রসদ জোগালেন। যার ফলে বাংলা ১৩৫০ সালে বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিলো। গ্রামে-শহরে অগণিত মানুষ। ক্ষুধার তাড়নায় ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। কাক ও কুকুরের সঙ্গে বুভুক্ষু মানুষ অখাদ্য-কুখাদ্য খুঁজে ফিরছে ডাস্টবিনে, নর্দমায়। পাঁচ. ছোটবেলায় দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের মর্মস্পর্শী ছবি অনেকবার দেখতাম, জয়নুলের কথা বিশেষ করে মন্বন্তর নিয়ে দুর্ভিক্ষ সিরিজের কাজগুলোর কথা আমার বার বার মনে দাগ কাটে। জয়নুল আবেদীন আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন প্রায় পাঁচ দশক হয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে সংকট, দুর্দশা আর বিপর্যয়ে জয়নুলের কাজের প্রসঙ্গ বারবার ফিরে এসেছে। আজো তাই—এই করোনার এই মহামারিকালে জয়নুলের দেখানো পথে তার ছাত্ররা কতটা হাঁটলেন? সময় ও জীবনকে ধরে আঁকা সেরকম কাজগুলো আজকের শিল্পীদের তুলিতে কোথায়? এর মধ্যে অতিসুখে, সুখ রাখার জায়গা না পেয়ে; একদল স্বঘোষিত ‘ফেসবুকীয় বুদ্ধিজীবী’; ‘বুদ্ধিজীবী’র তালিকা বানাচ্ছে, সেখানে যাদের স্থান হয় নাই তারা আবার গোস্বাও করছে। তালিকা সংস্কৃতির প্রচার এবং প্রসার কবে শুরু হয়েছিলো এদেশে? তা উদ্ধার করতে হলে এক নুনুসন্ধানী গবেষণা করতে হবে। তবে এটা সত্য যে, বাঙালি তালিকাভূক্ত হতে কিংবা করতে পছন্দ করে। তা কারো পশ্চাৎদেশে দণ্ড দেয়ার বা নিজের পশ্চাৎদেশে দণ্ড নেয়ার জন্য হলেও। আসল অবস্থা হলো, মানুষ খুবই খারাপ সময় পার করছে। ভীষণ অসহায় দিনযাপন করছে, রাত্রি পোহাচ্ছে। কোনো নিশ্চয়তা নেই, কোনো আশা নেই; দুরাশা কাটার কোনো লক্ষণও নেই! এরকম একটা পরিস্থিতি যখন বিরাজ করছে তখন ‘লকডাউনে’র মেয়াদ বাড়ানোর সাথে সাথে জনগণের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা প্রকাশ না করাটা সম্ভব হয়, যখন যেখানে আলোচিতভাবে আমলানির্ভর রাষ্ট্র কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। আর যে শিল্প-সাহিত্য জনগণের সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়ায় না, মানুষের পক্ষে যায় না; সেই শিল্প-সাহিত্যকে পদপিষ্ঠ করে মেরে ফেলতে হয় বলেই শিখছি। ছয়. কৃষিখাতে যদি কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়, তাহলে কৃষি উৎপাদন কমে যেতে পারে- কমে যেতে পারে খাদ্যসামগ্রী। এর ফলে খাদ্য সংকটের সেসব প্রতিক্রিয়া তার কিছু কিছু এখনই দেখা যাচ্ছে। গৃহাভ্যন্তরে অবরুদ্ধ হওয়ার কারণে বহু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখন বন্ধ। দোকান খোলা নেই, কারখানায় কাজ হচ্ছে না, লোকজন বাইরে বেরুচ্ছে না। ফলে যাঁরা ‘দিন এনে দিন খান’, তাঁদের আয়ের পথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ। এর মধ্যে রয়েছেন দিন-মজুর, রিক্সাচালক, বাজারের ক্ষুদ্র বিক্রেতাগণ, যাঁরা রাস্তার পাশে বেসাতি সাজিয়ে বসতেন এবং এমন অজস্র মানুষেরা। বহু বাড়িতে সাহায্যকারী গোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে দেয়া হয়েছে। তাঁদের আয়ও বন্ধ হয়ে গেছে। অবরুদ্ধ জীবনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ফলাফল এটি। ছোট ছোট ব্যবসায়ী ও উৎপাদনকারীরা দেউলিয়া হয়ে যাবেন। দিনের পর দিন সে সব প্রতিষ্ঠান নিষ্ক্রিয় থাকার কারণে সেগুলো সচল থাকতে পারবে না। তাদের এমন কেন সঞ্চয় নেই যে তারা ক্রমাগত ক্ষতি দিয়েও টিঁকে থাকতে পারবেন। বাংলাদেশে সংকটের আর্থ-সামাজিক প্রভাবের কথা বলতে গিয়ে নানা কথা উঠে আসছে, তবে যে সমস্যা সবচেয়ে প্রকট বলে আবির্ভূত হয়েছে, তা হচ্ছে খাদ্য অনিরাপত্তা—বিশেষত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্যে। ইতোমধ্যেই বলা হচ্ছে যে, দেশের ৩০ শতাংশ মানুষ বা ৫ কেটি মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে। আগামীতে প্রায় ১ কোটি পরিবার খাদ্য সংকটের শিকার হবে। সাত. খিলগাঁও রেলগেইটের পাশে তিনটে বাচ্চা কাড়াকাড়ি করছে একটি বাটি নিয়ে। কী খাচ্ছো? বাসন উঁচিয়ে উত্তর দেয়, মুড়ি। এরা কারা? জিজ্ঞাসা করতেই কেঁদে ফেলেন একজন নারী। বলেন, ‘সব কটাই আমার ছাও (বাচ্চা)। ঘরে খাওনের কিচ্ছু নাই। পোলাপাইনগুলা কান্দে। যেই বাসায় কাম করতাম হেরাও ঘরে ঢুকবার দেয় না। এই পোলাপানগুলার ল্যাইগা খাওন ক্যামনে জোগাড় করুম চিন্তায় আমার পরানে পানি না নাই’। মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকা শিল্পীর মুখে কথা নেই। ফ্যালফ্যাল করে সন্তানদের দিকে তাকিয়ে আছেন। কোথা থেকে কোনো সাহায্য পাওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করতেই হুঁশ ফিরলো তার। চোখে তখনো পানি শুকায়নি। কণ্ঠে রাজ্যের আক্ষেপ নিয়ে বললেন-সাহায্য কে দিবো! কাউন্সিলরের কাছে গিয়া কতবার ঘুইরা আইছি, কিছুই দেন নাই। এই অভাবের দিনে সরকার আমাগো কি কিছু দিতে পারে না? রাজধানীজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে শিল্পীর মতো এমন হাজারো নিরন্ন মানুষের হাহাকার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুসারে, এদের সংখ্যা ২০ লাখেরও বেশি। করোনার বিস্তার রোধে ঘরে থাকা, স্বাস্থ্যবিধি সামাজিক দূরত্ব মানা, ঘন ঘন হাত ধোয়া, মাস্ক পরার মতো নির্দেশনাগুলো এদের কাছে ‘উপহাস’ ছাড়া আর কিছুই নয়। কেননা, লকডাউন এদের কাছে ‘সুরক্ষা’ নয়, ‘যন্ত্রণা’। শিল্পীর মতো পেটে ক্ষুধা বয়ে বেড়ানো ভাগ্যাহত মানুষগুলোর কাছে লকডাউন মানেই বিষফোঁড়া। খাবারের খোঁজে দিন-রাত আক্ষেপ করতে থাকা মানুষ যেন সমাজের বিদ্যমান অসঙ্গতি আর বৈষম্যকেই দেখিয়ে দিচ্ছে চোখে আঙুল দিয়ে। হাইকোর্ট এলাকা, রমনা, কমলাপুর, কারওয়ানবাজার রেলস্টেশন, কুড়িল, এজিবি কলোনিসহ রাজধানীজুড়েই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বস্তা, পলিথিন দিয়ে ঘর তুলে বাস করা ছিন্নমূল মানুষরা। যেখানে রান্না, খাওয়া সেখানেই দিনের শুরু আর রাত শেষ হয় এদের। স্বাস্থ্যবিধি তো দূরের কথা কারো মুখে মাস্কও নেই। এখন কাজ নেই। তাই খাওয়াও জোটে না। ঘরে খাদ্যের জন্য সন্তানের করুণ চাহনি আর বাইরে পুলিশের লাঠিপেটা। মানুষের কাছে পেটের ক্ষুধাই সবচেয়ে বড় মহামারি। গত বছর করোনা সংকটে সরকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন, সংস্থা থেকে ত্রাণ দেয়া হলেও এবার আর কেউ খোঁজ নিচ্ছে না এই অন্নহীন মানুষগুলোর। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার (ডব্লিউএফপি) সহায়তায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘নগর আর্থসামাজিক অবস্থা জরিপ-২০১৯’-এর ফলাফলে উঠে এসেছে রাজধানীসহ মহানগরগুলোতে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের ক্ষুধার হাহাকারের এক চিত্র। দেশের মহানগরগুলোতে করোনাকালের আগেই ৮ দশমিক ২২ শতাংশ পরিবারের কোনো না কোনো সদস্যকে খাবার না থাকায় ক্ষুধার্ত অবস্থাতেই রাত কাটাতে হয়েছে। আর করোনা পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতার কারণে স্বল্প আয় ও অনানুষ্ঠানিক খাতে সম্পৃক্তরা চাকরি ও উর্পাজনের সুযোগ হারিয়েছেন। ৭৭ শতাংশ পরিবারের গড় মাসিক আয় কমেছে, এবং ৩৪ শতাংশ পরিবারের কেউ না কেউ চাকরি অথবা আয়ের সক্ষমতা হারিয়েছেন। পরিবারগুলোর মাসিক সঞ্চয় ৬২ শতাংশ কমে গেছে, ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৩১ শতাংশ। ব্র্যাক, ইউএন উইমেন বাংলাদেশ এবং নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির যৌথভাবে পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। পত্রিকার খবরে দেখি, হাইকোর্টের মাজার গেটে হালিমা বেগম নামে ষাটোর্ধ্ব আরেক নারী, তিনি বলেন, ‘সবাই নাকি সাহায্য পায়, আমি তো কিছু পাই নাই। আবার কেউ কেউ বিরানির প্যাকেট দিয়া ছবি তুইলা নিয়া যায়, পরে আর কিছু দেয় না।’ এক-সময় যে সন্তানকে পায়ের উপরে বালিশ পেতে শোনাতেন অনাহারি রাক্ষুসের কেচ্ছা। সেই ক্ষুধা তাড়না তাকেও পেয়ে বসেছে। ভুলতে বসেছেন সন্তানদের নাম। সেই মা আজ ভিক্ষা করেন। মানুষ বের হয় না। তাই ভিক্ষা মেলে না। তবুও রাস্তার ধারে দু’চোখে অপেক্ষা নিয়ে বসে থাকেন। কেউ যদি মায়া করে কিছু দিয়ে যায়। লকডাউনের দিনে কেমন আছেন? জিজ্ঞাসা করতেই মাথা নিচু তার, কিছুক্ষণ পরে মাথা তুলে ছলছলে চোখে জানালেন, ‘ভিক্ষা নাই, পয়সা নাই, খাওনও নাই। তয় বাতাসের এই অসুখটা চইলা গেলে আবারো প্যাট ভইরা খামু’। সেইসব প্রান্তিক মানুষ, যাদের চোখে-মুখে অনাহারের দুঃস্বপ্ন-বিপন্নতার ছাপ, ভবিষ্যৎ দুর্ভিক্ষের আতঙ্ক। সেটা কাটিয়ে উঠাটা এখন অনেক বেশি জরুরি। লেখক: সহকারী সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় কমিটি
বিশেষ রচনা
একতার এক দশক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..