সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক

বিপ্লব রঞ্জন সাহা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই প্রায় প্রতিটি বামপন্থি নেতাকর্মী- হোক তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পাটি (সিপিবি), ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, বাসদ, সাম্যবাদী দলের, আর দলটা হোক মস্কোপন্থি বা পিকিংপন্থি বা মাওবাদী (আসলে এভাবেই আমাদের বামদলগুলো পক্ষভুক্ত) একটি বিষয়ে সবার সাহস দেখেছি মাত্রাছাড়া, আর সেটি হলো কিউবা এবং ফিদেল কাস্ত্রো। সবাইকে বুক চিতিয়ে বলতে শুনেছি, সমাজতন্ত্রের শক্তি পরিমাপ করতে হলে এক কিউবাই যথেষ্ট। আমেরিকার তুলনায় একটি এক চিলতে দেশ হয়েও এবং আমেরিকার নাকের ডগায় দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সত্তর বছর ধরে যে দেশটি আমেরিকার বিরুদ্ধে মাথা তুলে অবিচল দাঁড়িয়ে আছে তার নাম কিউবা এবং এর যে নেতা তার নাম কমরেড ফিদেল কাস্ত্রো। আজ বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ জনিত মহামারি অবস্থায় সেখানে সুকৌশলে এক অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে একদল বিপ্লবী মানুষের প্রতি যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী ও তাদের প্রধান হোতা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার দিকে সারা পৃথিবী কিউবার প্রতি সংহতি ও সহানুভূতিশীল দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। গত ১৩ জুলাই ২০২১ তারিখে কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল ডায়াজ ক্যানেল দ্বীপরাষ্ট্রটির কয়েকটি শহরে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে দেশটিতে সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছে। গত রবিবার কিউবার কমিউনিস্ট পার্টি (পিসিসি)-র পলিটব্যুরো, ও কেবিনেট সদস্যদের সাথে নিয়ে রাষ্ট্রীয় রেডিও টেলিভিশনে হাজির হয়ে পার্টি সমর্থকদেরকে রাস্তায় নেমে বিপ্লবকে সংহত করতে আহ্বান জানান। ডায়াজ ক্যানেল বলেন যে, ‘সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে এবং মাত্র কয়েক ঘন্টায় ঘটমান উত্তেজনা যে স্বার্থবাদী মুষ্টিমেয় কিছু লোকের পক্ষ থেকে সরকার ও বিপ্লবের সকল কাজকর্মকে কলঙ্কিত করার উদ্দেশ্যে করা হচ্ছ- তা স্পষ্ট করতে বেতার তরঙ্গের মাধ্যম ব্যবহার করেছেন তিনি। পিসিসি সেন্ট্রাল কমিটির ফার্স্ট সেক্রেটারি বলেন, বিগত কিছুদিন ধরে এ ধরণের উত্তেজনা তৈরি করার জন্য পরিকল্পনা করা হচ্ছিলো জনগণের কাছে এমন একটি পরিস্থিতি সম্পর্কে বার্তা পৌঁছে দিতে যখন দেশটিতে কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট ‘খাদ্য, ঔষধ ও জ্বালানি সংকট’ রয়েছে। ডায়াজ ক্যানেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কিউবায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য দায়ী করেন। যখন দেশটি কোভিড-১৯ সংক্রমণের সবচেয়ে খারাপ অবস্থার শিকার এবং দেশটির স্বাস্থ্যকর্মীরা ভাইরাসটির বিরুদ্ধে শুধুমাত্র নিজ দেশেই নয় অনেকগুলো দরিদ্র দেশেও সেবার লক্ষ্য নিয়ে কর্মরত। তিনি মহামারি পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের পক্ষ থেকে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর কথা তুলে ধরেন। বিশেষত দেশটির পশ্চিমে অবস্থিত মাটানজাস প্রদেশের কথা যেটি কিউবার অস্থিতিশীলতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। চলমান অস্থিরতার জবাবে এবং প্রসিডেন্ট ডায়াজ ক্যানেলের রবিবারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার মানুষ সরকারের প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করতে রাস্তায় নেমে এসেছে। দ্বীপ দেশটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দশকের পর দশক ধরে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা ভোগ করছে। ১৯৬২ সালে আরোপিত এই নিষেধাজ্ঞা প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় সবচেয়ে জোরালো হয়। যার ভিত্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোন বিমানের হাভানা ছাড়া কিউবার অন্য কোন শহরে অবতরণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা আছে। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে ঘুরতে আসা কোন জাহাজ এবং ইয়টকে কিউবায় নোঙর করতে দেয়া হয় না। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত কিউবানরা যৎসামান্য অর্থ প্রেরণ করতে পারে। কিউবার জনগণ খুব ভালোভাবেই জানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবার সরকারকে হেয় প্রতিপন্ন করতে কি কি প্রচেষ্টা গ্রহণ করে থাকে। ওয়াশিংটন ব্যাপকভাবে দাবি করেছে যে, কিউবার মেডিকেল মিশনে ‘জবরদস্তিমূলক শ্রম’ ব্যবহার করা হয়, যা বন্ধ করার জন্য তারা দাবি উত্থাপন করে। কিন্তু ডেমোক্র্যাটদের এই দ্বিধাগ্রস্ত দাবি মানবতা লঙ্ঘন বিষয়ে যতটা না তার চেয়ে বেশি ফ্লোরিডার কিউবান-আমেরিকানদের ভোটপ্রাপ্তির উদ্দেশ্যে করা। ২০২০ সালের প্রচারণায় বাইডেন ট্রাম্পের গৃহিত ব্যর্থ কিউবা নীতি উল্টে দেয়ার অঙ্গীকার করেছিলো। শপথ গ্রহণ করার অব্যবহিত পরেই ট্রাম্পের গৃহীত বহু নীতি বাইডেন দৃশ্যত উল্টে দিয়েছিলেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তার গৃহীত সব নীতিই কিউবার উপর ন্যস্ত আছে। একটানা ২৯ বছর ধরে কার্যকর থাকার পরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গত মাসে একচেটিয়াভাবে সিংহভাগ সদস্যদের ভোটে আমেরিকার প্রদত্ত বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পক্ষে রায় এসেছে। জুন মাসের ২৩ তারিখে অনেক কূটনীতিক এতো দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে রাজি করাতে চেষ্টা করে। ২০১৬ সালে ওবামা প্রশাসন স্থগিত করলেও ট্রাম্প প্রশাসন পূর্বতনদের মতো বছর বছর ওবামা প্রশাসনের সিদ্ধান্তটির বিরোধিতা করতো। বাইডেন প্রশাসনের প্রথম সভায় সিদ্ধান্তটি বহাল রাখা হয়। ট্রাম্পের গৃহিত সিদ্ধান্তটিই পুনর্বহাল হয় ১৮৪/২ ভোটে। কিউবার মেডিকেল মিশনগুলো-যার অধীনে প্রায় ৫০, ০০০ কিউবান ডাক্তার ৬০টির বেশি দেশে কাজ করে-বুশ-ট্রাম্পদের জন্য ভীতির কারণ। যারা দুজনেই ফ্লোরিডার কিউবান-আমেরিকান ভোটারদেরকে কাস্ত্রোবিরোধী হিসেবে নিজেদের প্রমাণিত করার সর্বাত্মক প্রয়াস নিয়েছে। আর এখন বাইডেনের স্টেট ডিপার্টমেন্ট লক্ষ্যস্থির করে কিউবার মেডিকেল মিশনগুলোর বিরুদ্ধে বাধ্যতামূলক শ্রমের অভিযোগ আনছে। কিউবার প্রেসিডেন্ট ওয়াশিংটনকে এসব বিক্ষোভের জন্য দায়ী করে এ কথা বলেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। কারণ তাদের নিষেধাজ্ঞার জন্যই বহুবিধ সংকট ও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। কিউবান-আমেরিকান সিএনএন-এর মুখপাত্র আন্দ্রেস ওপেনহেইমার বাইডেনের কর্মকাণ্ডের শুধুমাত্র প্রশংসাই করেননি বরং স্পষ্ট নির্বাচনী হিসাব-নিকাশ বলেও তুলে ধরেছেন। তার ভাষ্যমতে, বাইডেন প্রশাসন হয়তো ২০২০ সালের প্রচারণায় কিউবান-আমেরিকান ভোটারদের দীর্ঘ ছয় দশকের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে মনোভাব বুঝার ব্যর্থতাজনিত কারণে তাদের ক্ষমতাকে ছোট করে দেখেছিলো। আর এই ভুলের জের ধরেই ডেমোক্র্যাটরা ফ্লোরিডা ও মিয়ামির আসনগুলো হারিয়েছিলো। ইন্ডিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির পলিটিক্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক মিখাইল এরিকম্যান ব্যাখ্যা করে বলেন যে, কিউবান মেডিকেল ব্রিগেডগুলো দরিদ্র দেশসমূহের সেইসব রোগীদেরকেই প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করে যাদের তা পাওয়ার যোগ্যতা ছিলো না।...যখন কিউবা দুই ডজনেরও বেশি দেশে বিনা পারিশ্রমিকে এ ধরণের মেডিকেল সেবা প্রদান করে, তার বিনিময় মূল্য ৭ বিলিয়ন ডলার হবে বলে অনুমান করা যায়। এক রিপোর্টে কিউবাকে মেডিকেল মিশনের সংখ্যা ও আকার বৃদ্ধি করার মাধ্যমে মহামারির বাণিজ্যিকীকরণের জন্য দায়ী করা হয়েছে। তবে এন্টিগুয়া ও বারবুডার কূটনীতিক রোনাল্ড স্যান্ডারস দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন কিউবার মেডিকেল মিশনগুলো বিপুল ও ব্যাপক মুনাফাজনক সেবা প্রদান করেছে। আর তা না হলে সে দেশে কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ রোধ করা সম্ভব হতো না। শুধু তাই নয়, অনেকগুলো ক্যারিবিয়ান দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়তো। এ প্রসঙ্গে বাইডেন প্রশাসন অভিযোগ উত্থাপন করে যে, কিউবা সরকার মেডিকেল কর্মীদের সেসব দেশ থেকে প্রাপ্ত পারিশ্রমিকের এক কিয়দাংশ প্রদান করে তাদেরকে ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করেছে। অথচ কিউবা সেসব দেশকে একটি মহামূল্যবান চিকিৎসা শিক্ষা বিনামূল্যে দিয়ে এসেছে। এই বিনিয়োগের ক্ষতিপূরণের অংশটা খুঁজতে যাওয়া অযৌক্তিক নয়। আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিদেশে কর্মরত কিউবার মেডিকেল কর্মীদের বিশেষ করে ডাক্তারদের বিপথগামী করার চেষ্টা করছে। যাতে তারা যে কোন অজুহাতে আমেরিকায় পাড়ি জমায়। যাকে এরিকম্যান বলছেন, ‘ব্রেইন ড্রেইন পলিটিক্স’। সেই রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে যে, কিউবা সেসব ডাক্তারদের পাসপোর্ট জব্দ করে রেখেছে। কিন্তু কিউবা বলছে তারা এমনটা করছে কারণ তাদের পেছনে রয়েছে ব্যাপক অর্থনৈতিক বিনিয়োগ। কারণ যেখানে একজন ছাত্রকে আমেরিকায় মেডিকেল সায়েন্স পড়তে ব্যয় করতে হয় ২, ৫০, ০০০ মার্কিন ডলার, কিউবায় তারা তা বিনা খরচে করতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে হেল্থ প্রফেশনাল স্কলারশিপ মেডিকেল ছাত্রদের যাবতীয় খরচ বহন করে আর তার বিনিময়ে তাদেরকে চার বছর পারিশ্রমিক ছাড়া পূর্ণকালীন সেবা দিতে হয়। এটা কি তাহলে জবরদস্তিমূলক শ্রম? আমেরিকার করদাতারা যেমন এটাকে সহজভাবে নিতো না, কিউবার ক্ষেত্রেও তাই। ‘ফ্রিডম, ফুড ভ্যাক্সিন!’ এই গণ প্রতিবাদের পেছনে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদত। হাভানা কেন্দ্রিক এক ব্রিটিশ জার্নালিস্ট এড অগাস্টিন বলেন, ‘আমার সাত বছরের আলাপচারিতায় আমি কিউবায় কখনো কোন ডাক্তার বা নার্সকে বলতে শুনিনি যে, তাদের জবরদস্তি করে বিদেশে কাজ করানো হচ্ছে।’ ১৯৯৮ সাল থেকে ল্যাটিন আমেরিকান স্টাডিজের প্রফেসর জন কার্ক- যিনি ডালহৌসি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত- তিনি বলেন যে, ২৭০ জন ডাক্তার, নার্স ও প্রযুক্তিবিদ যাদের সাথে তিনি দীর্ঘ সময় বিভিন্ন মিশনে কাটিয়েছেন ও তাদের সাথে আলাপ আলোচনার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এ ধরণের অভিযোগ যা জনসমক্ষে আনা হচ্ছে তা অতিরঞ্জিত ও অবিশ্বাস্য। তিনি এ কথাও বলেন, ‘ডাক্তাররা একটা কথাই আমাকে বলেছে যে বিদেশে কাজ করে তারা কিউবায় কাজের তুলনায় কত বেশি আয় করতে পারছে। এবং আরেকটি কথা তারা আমাকে বলতো যে বাইরে কাজের অভিজ্ঞতা তাদের জন্য একটি জীবন্ত মেডিকেল টেক্সট বই। যেমন যখন ব্রাজিলে যায় আমাজনের জঙ্গলে আদিবাসীদের কোনদিন ডাক্তার দেখেনি। কী বিচিত্র সেই অভিজ্ঞতা।’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এহেন ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠুক। সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক। লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজ
বিশেষ রচনা
একতার এক দশক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..