বাম জোটের নেতৃবৃন্দের সেজান জুস কারখানা পরিদর্শন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা প্রতিবেদক : বাম গণতান্ত্রিক জোট কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের একটি প্রতিনিধি দল গত ১২ জুলাই সকাল ১১টায় রূপগঞ্জের কর্ণঘোপে হাসেম ফুড এন্ড বেভারেজ তথা সেজান জুস কারখানা সরেজমিনে পরিদর্শ করেছেন। বাম জোট কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের সমন্বয়ক ও বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বজলুর রশীদ ফিরোজের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলে ছিলেন বাম জোটের কেন্দ্রীয় নেতা বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, সিপিবি’র প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন নান্নু, বাসদ (মার্কসবাদী)’র কেন্দ্রীয় নির্বাহী ফোরামের সদস্য মানস নন্দী, গণসংহতি আন্দোলনের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য বাচ্চু ভুইয়া, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির শহীদুল ইসলাম সবুজ, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সভাপতি হামিদুল হক ও বাসদের কেন্দ্রীয় পাঠচক্রের সদস্য আহসান হাবিব বুলবুল। কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দলের সাথে আরও যুক্ত হন নারায়ণগঞ্জ জেলা বাম জোটের সমন্বয়ক ও বাসদ জেলা সমন্বয়ক নিখিল দাস, সিপিবি নেতা মন্টু ঘোষ, শিবনাথ চক্রবর্ত্তী, বিমল কান্তি দাস, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির আবু হাসান টিপু, রাশিদা বেগম, গণসংহতি আন্দোলনের তরিকুল সুজন, জেলা শ্রমিক ফ্রন্ট নেতা সেলিম মাহমুদ ও রূপগঞ্জের স্থানীয় বাসদ নেতা মো. সোহেল। পরিদর্শনকালে নেতৃবৃন্দ কারখানার বিভিন্ন তলা ঘুরে ঘুরে দেখেন। কারখানার শ্রমিক ও নিহত-আহত শ্রমিকদের স্বজনরা তাদের বলেন, ৩৪ হাজার বর্গফুটের প্রতিটি ফ্লোরের গেট অগ্নিকাণ্ডের সময় তালাবন্ধ অবস্থায় ছিল। তালা বন্ধ করে রাখা শ্রম আইনের সুস্পষ্ট লংঘন। নেতৃবৃন্দ দেখেন কারখানার নিচ তলায় অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল, কেমিক্যালসহ দাহ্য পদার্থের গোডাউন যা কারখানা আইনের পরিপন্থি। ৩৪ হাজার বর্গফুটের ৬ তলা কারখানায় বিল্ডিং কোড অনুযায়ী কমপক্ষে ৪টি সিঁড়ি এবং বাহির হওয়ার সিঁড়ি বাইরের দিকে থাকা প্রয়োজন; যা ছিল না, সেখানে ২টি সিঁড়ি ভেতর দিকে ছিল যার একটি বন্ধ ছিল অন্যটিতে কোন বৈদ্যুতিক বাতি ছিল না, সেখানে সিঁড়ি ছিল অন্ধকার ও অপ্রশস্ত, শ্রমিকদের মোবাইলে লাইট জে¦লে উঠানামা করতে হতো। নেতৃবৃন্দ যখন পরিদর্শনে যান তখনও ৪র্থ তলায় আগুনের ধোঁয়া উড়তে এবং ৫ম তলায় আগুন জ¦লতে দেখতে পান। ৪র্থ তলায় একটি কালো ভষ্মীভূত স্তুপের মধ্য থেকে কয়েকটি হাড় তুলে একজন শ্রমিকের স্বজন চিৎকার করে বলে উঠেন এটি তার মৃত মেয়ের হাড়। তার মেয়ে ওই ফ্লোরে কাজ করতো। এ ঘটনায় নেতৃবৃন্দ বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ৫ দিন পরে গিয়েও যেখানে মানুষের হাড়গোড় পাওয়া যায় তখন ২ দিন আগেই ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল কিভাবে ঘোষণা করতে পারে যে সেখানে আর কোনো মৃতদেহ নাই? পরিদর্শন শেষে কারখানা গেটে নিহত-আহত শ্রমিকদের স্বজন, স্থানীয় জনসাধারণের উপস্থিতিতে এক সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, সেজান জুস কারখানার অগ্নিকাণ্ডে শ্রমিকের মৃত্যু এবং আহত হওয়ার ঘটনা নিছক কোন দুর্ঘটনা নয়, এটি মালিক, সরকার প্রশাসনের অবহেলা, গাফিলতিজনিত ও কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। একটি কারখানা করতে হলে ২৩ ধরনের প্রতিষ্ঠানের অনুমতি লাগে অথচ সজীব গ্রুপের মালিক সম্পূর্ণ বেআইনীভাবে, শ্রম আইন-শিল্প আইন লংঘন করে দিব্যি কারখানা চালিয়ে আসছে বছরের পর বছর ধরে। ফলে এই ঘটনার দায় কোনো মতেই সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও সরকার এড়াতে পারে না। ১২/১৪ বছরের শতাধিক শিশুদের দিয়ে ওই কারখানায় কাজ করানো হতো যা শ্রম আইনে নিষিদ্ধ। অগ্নি নির্বাপনের জন্য কেন কোনো যন্ত্র এবং ফোম ছিল না, ফায়ার সার্ভিস ডিপার্টমেন্টকেই-এ তার দায় নিতে হবে। নেতৃবৃন্দ বলেন, সরাকরি তদারককারী সংস্থা দায়িত্ব পালন না করায় এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটছে। তাছাড়া

তাজরীন, রানা প্লাজা, টাম্পাকো কারখানায় অগ্নি সংযোগ ও ভবন ধসের ঘটনায় মালিক-সরকার প্রশাসনের কারো বিচার ও শাস্তি না হওয়াও একের পর এক এ ধরনের ঘটনার জন্য দায়ী। স্থানীয় জনগণ নেতৃবৃন্দকে জানান, ব্যাংক ঋণের প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের উদ্দেশ্যে মালিক পক্ষ থেকেই আগুন লাগানো হতে পারে বলে তারা ধারণা করছেন। পরিদর্শন শেষে বাম জোট নেতৃবৃন্দ সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত শ্রমিকদের পরিবার প্রতি আইএলও কনভেনশন ১২১ অনুযায়ী আজীবন আয়ের সমান অর্থাৎ ৫০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদান, আহতদের উন্নত চিকিৎসা-পুনর্বাসন-ক্ষতিপূরণ এবং নিহত-আহত-নিখোঁজ শ্রমিকের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের দাবি জানান। তারা নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির মাধ্যমে তদন্ত করে অগ্নিকাণ্ডের কারণ, অনিয়মসহ প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন, মালিক হাসেমসহ ঘটনার জন্য দায়ী কল কারখানা পরিদর্শক, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, শিল্প মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনা, বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে বলেন। পরে ১৪ জুলাই দুপুর ১২টায় বাম জোটের পরিদর্শন পরবর্তী সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। মুক্তিভবনের মৈত্রী মিলনায়তনে এ সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বাম জোটের সমন্বয়ক ও বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বজলুর রশীদ ফিরোজ। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহ আলম, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, ইউসিএলবি’র সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন নান্নু, বাসদ (মার্কসবাদী)’র কেন্দ্রীয় নেতা মানস নন্দী, গণসংহতি আন্দোলনের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য বাচ্চু ভুইয়া, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির শহীদুল ইসলাম সবুজ, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের হামিদুল হক, সিপিবির আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, বাসদের রাজেকুজ্জামান রতন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির আকবর খান, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের আব্দুল আলী। নেতৃবৃন্দ বলেন, গত ৫ বছরে ফায়ার সার্ভিসের হিসাব মতে গার্মেন্টস ও শিল্প কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ৫৮৩৪টি। এ যাবৎ যতগুলো কারখানায় অগ্নিকাণ্ড, ভবন ধস, বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে সবগুলোর মালিক সরকার এবং সরকারি দল সংশ্লিষ্ট হওয়ায় কোনটিরই বিচার বা শাস্তি হয়নি। সেজানের মালিকও আওয়ামী লীগের টিকিটে লক্ষ্মীপুর থেকে সংসদ নির্বাচন করেছিলেন। নেতৃবৃন্দ বলেন, সরকারের তদারককারী সংস্থার অবহেলা, দুর্নীতি, অনিয়মের কারণে আইন না মেনে কারখানা চালু রাখার দুঃসাহস দেখাতে পারে মালিকেরা। ফলে সরকারিভাবে ৩/৪টি তদন্ত কমিটি গঠন হলেও তার প্রতি জনগণের কোন আস্থা নাই কারণ যারা অভিযুক্ত তাদের তদন্তে সঠিক ঘটনা বেরিয়ে আসবে না। নেতৃবৃন্দ বলেন, আজ পর্যন্ত কোনো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, বিচার ও শাস্তি না হওয়ায় একের পর এক শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে চলছে। এর অবসান হওয়া দরকার। নেতৃবৃন্দ অগ্নিকাণ্ডের জন্য দায়ী মালিক ও কারখানা পরিদর্শকসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের শাস্তি; নিহত শ্রমিকদের পরিবার প্রতি ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং আহত শ্রমিকদের উন্নত চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ প্রদান; নিখোঁজ শ্রমিকদের খুঁজে বের করা এবং নিহত-আহত-নিখোঁজ শ্রমিকদের প্রকৃত তালিকা প্রকাশ করার দাবি জানান। একই সাথে নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন ও দায়ী সকলকে বিচারের আওতায় আনা; ঈদের পূর্বেই সকল শ্রমিকের বকেয়া বেতন-বোনাস-ওভারটাইম পরিশোধ করার দাবি জানান। সংবাদ সম্মেলন থেকে ঈদের আগেই কারখানা গেটে শ্রমিক জনসভা এবং ঈদের পর শ্রম মন্ত্রণালয় ঘেরাও করার ঘোষণা দেয়া হয়।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..