রাজপথে বামপন্থি

বাজেট ‘প্রয়োজনের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ’

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রতিবেদক : ঘোষিত বাজেট সাধারণ মানুষের জীবনের ও জীবিকার প্রয়োজনের সাথে সংগতিপূর্ণ নয় বলে অভিহিত করেছেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান। গত বাজেটের চেয়ে ৩৫ হাজার কোটি টাকা এবং সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৬৫ হাজার কোটি টাকার বেশি, ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার এই বাজেট করোনাকালীন সময়ে সাধারণ মানুষের জীবনমান রক্ষা ও জীবিকার নিশ্চয়তার চাইতে বৈষম্য বাড়িয়ে তুলবে বলে তিনি আশংকা প্রকাশ করেন। খাদ্য সরবরাহ, খাদ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, শ্রমিক কৃষক, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীদের জীবন বাঁচাতে রেশন ব্যবস্থা চালু, শ্রমজীবীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল ও চিকিৎসায় বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল। যে কৃষি ও কৃষক ধান, ভুট্টা, মাছ, মাংস, সবজি, ফল উৎপাদন করে করোনাকালে দেশকে বাঁচিয়ে রেখেছে, ৪২ শতাংশ শ্রমজীবীর কর্ম সংস্থান করেছে সেখানে বরাদ্দ ও ভর্তুকি বাড়ানো দরকার ছিল কিন্তু বাজেটে গত তিন বছর ধরে কৃষিখাতে ভর্তুকি একই পরিমাণ রাখা হয়েছে। ফলে মুদ্রাস্ফিতির বিবেচনায় কৃষিতে ভর্তুকি কমে গিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম উল্লেখ করে তিনি বলেন, করোনায় আগের তুলনায় আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে, দরিদ্র্য মানুষের সংখ্যা ৪২ শতাংশের বেশি হয়েছে অথচ তাদের জীবন রক্ষায় প্রয়োজনীয় বরাদ্দ করা হয় নি। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে উপকারভোগীর সংখ্যা বেড়েছে ১৪ লাখ আর বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে ৮ হাজার কোটি টাকা। যার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বৃদ্ধির জন্য ১৫০০ কোটি টাকা এবং পেনশনভোগীদের জন্য টাকার বাড়তি বরাদ্দ বাদ দিলে বাস্তবে তেমন কোন বরাদ্দই বাড়েনি বলে তিনি উল্লেখ করেন। রাজস্ব আয় বাড়াতে গিয়ে জনগণের উপর বাড়তি ভ্যাটের বোঝা চাপালেও কর্পোরেট ট্যাক্স ২.৫ শতাংশ কমিয়ে দিয়ে সরকার তার ধনিক তোষণের নীতিকে অব্যাহত রেখেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প দেশের কর্ম সংস্থান ও অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। কিন্তু বাজেট ঐ খাতে বরাদ্দে প্রান্তিক পর্যায়ে। গত বাজেটে করোনাকালে প্রণোদনায় কৃষি ঋণের সুদ ৪.৫ শতাংশ অথচ গার্মেন্টস সহ শিল্পে তা ২ শতাংশ করা হয়েছিল, কৃষি ঋণের সুদ কমানোর প্রস্তাব এবারের বাজেটেও নেই। করোনায় কাজ হারিয়েছে শ্রমিক, ৬ লাখের বেশি প্রবাসী শ্রমিক দেশে ফিরেছে, প্রতি বছর শ্রমের বাজারে আসে ২২ লাখ তরুণ যুবক তাদের কর্মসংস্থানের কোন পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা এবারের বাজেট প্রস্তাবে নেই। সাড়ে চার কোটি শিক্ষার্থী এবং ২০ লাখের বেশি শিক্ষক করোনাকালে বিপর্যস্ত। ছাত্রদের জন্য শিক্ষা সহায়তা এবং শিক্ষকদের জন্য দুর্যোগ ভাতা প্রয়োজন থাকলেও বাজেটে তার নির্দেশনা নেই। নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং পাহাড় সমতলের আদিবাসী মানুষেরা করোনায় অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিপদাপন্ন হয়েছেন। তাদেরকে রক্ষায় কোন বরাদ্দ ও নির্দেশনা বাজেট প্রস্তাবে নেই। এক্ষেত্রে গতানুগতিকভাবে দায়সারা গোছের প্রস্তাব করা হয়েছে। কালো টাকা বৈধ করার ধারাবাহিক ভুমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয় যে কালো টাকা উৎপাদনের ব্যবস্থা বহাল আছে। এবং সরকার কালো টাকার উৎপাদন বহাল রাখতে চায়। একদিকে বাজেটে জনগণের উপর কর ভ্যাট বাড়ানো, অন্যদিকে ট্যাক্স ফাঁকি দেয়া লুটপাটের টাকার আইনি ও রাজনৈতিক বৈধতা দেয়ার নিন্দা করে কালো টাকা বাজেয়াপ্ত এবং তা উদ্ধার করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, শিল্পখাতে বরাদ্দের দাবি জানান। বিশাল বাজেটের বড় বোঝা জনগণের উপর চাপিয়ে বড় ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, আমলা সহায়ক এই বাজেট কৃষককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, শ্রমিককে দুর্দশায় ফেলবে, বেকারদেরকে হতাশায় নিমজ্জিত করবে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে টিকে থাকার চ্যালেঞ্জে ফেলবে বলে তিনি এই বাজেটকে ধনি-শিল্পপতি-বড়লোক বান্ধব উল্লেখ করে শ্রমিক, কৃষক, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত জনগণের স্বার্থে বাজেট সংশোধনের দাবি জানান। দারিদ্রসীমার নীচে পড়ে থাকা মানুষের জন্য কিছু নেই বিস্ময়কর করোনা মহামারীর মধ্যেও অনুৎপাদনশীল খাতসহ সরকার পরিচালনায় ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক প্রস্তাবিত নতুন অর্থবছরের জাতীয় বাজেট সম্পর্কে গণমাধ্যমে প্রদত্ত প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, গতানুগতিক ধারায় ঘোষিত বাজেট দিয়ে করোনার বহুমাত্রিক নেতিবাচক অভিঘাত মোকাবেলা করা যাবে না। বিপুল অংকের ঘাটতি বাজেট দিয়ে করোনা দুর্যোগজনিত পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাবে না। বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতার অভাবে বিপুল অংকের বাজেট কোন আশা জাগাতে পারছে না। তিনি বলেন, ছয় লক্ষ তিন হাজার ছয়শত একাশি কোটি টাকার বাজেটে ২,১৪,৬৮১ কোটি টাকার যে ঘাটতি তা পূরণে যেমন মারাত্মক অনিশ্চয়তা রয়েছে, তেমিন শেষ পর্যন্ত তার দায় মেটাতে হবে স্বল্প আয়ের সাধারণ মানুষকে। তিনি বলেন, ঘোষিত বাজেটের আকার দিয়ে কোনভাবেই সরকারের সাফল্য নিরূপণ করা যাবে না। সরকার বাজেট করতে গিয়ে দরিদ্রসীমার নীচে নেমে আসা ৬ কোটি মানুষের জন্য বড় কিছু নেই। তিনি ক্ষোভের সাথে উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রীয় প্রণোদনার বিপুল অর্থের বড় অংশ এবারও যথেচ্ছ উপর তলার শিল্পপতিদের কাছে। মাঝারি, ছোট ও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য এখনও প্রণোদনা অপ্রতুল। কৃষি ও গ্রামীণ খাতের বরাদ্দ এখনও অত্যন্ত কম। আর বিদ্যমান ব্যবস্থায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কৃষি ভর্তুকীতে প্রকৃত কৃষক লাভবান হয় না। দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য ‘গণস্বাস্থ্য ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার উদ্যোগ ও বরাদ্দ এবারও বাজেটে অনুপস্থিত। অথচ উন্নয়ন বাজেটে মেগা প্রকল্পসমূহে জবাবদিহিহীন বরাদ্দ বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত দেশের দক্ষিণাঞ্চল এবারও বাজেটে অবহেলিত। বন্ধ রাষ্টীয় পাটকল, চিনিকলসহ জাতীয় শিল্প পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ বাজেটে অনুপস্থিত। সরকারের কোনো মাথাব্যাথা নেই গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ও ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল ২০২১-২০২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ধারাবাহিকতা রক্ষার বাজেট দিয়ে প্রমাণ করা হয়েছে যে, করোনা বিপর্যয় থেকে নাগরিকদের রক্ষা কিংবা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিয়ে সরকারের কোনো মাথাব্যাথা নেই। এ বাজেটে তাদের চরম দায়িত্বহীনতাই প্রকাশ পেয়েছে। সকল খাতে বরাদ্দের বন্টনের ক্ষেত্রে কোনো রদবদল নেই বললেও চলে। স্বাস্থ্যে সেই গতানুগতিক ধারায় মোট বরাদ্দের ৫ শতাংশের মতো গেছে। তারা বলেছেন, কর প্রস্তাবে নতুনত্ব নেই। করযোগ্য আয়ের ন্যূনতম সীমায় পরিবর্তন আনা হয়নি। ফলে করোনাকালে বিপাকে পড়া মধ্যবিত্তের জন্য জীবন যাপন আরও কঠিন হবে। সামাজিক সুরক্ষার বরাদ্দেও বড় কোন ধরনের পরিবর্তন নেই বললেই চলে। শিক্ষায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়ার গর্ব করা হবে আগের মতোই, কিন্তু গুণগত পরিবর্তন বিশেষত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখায় শিক্ষায় যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে তা কাটিয়ে ওঠার কোন নির্দেশনা বা পথনকশা উপস্থিত করা হয় নি। বিবৃতিতে বলা হয়, বাজেটে ঘাটতি বেড়েছে। ঋণও বাড়ছে অপরিকল্পিতভাবে। সুদুরপ্রসারী পরিকল্পনা অনুপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..