ভাঙনে-দখলে বিলীন শত শত ঝাউগাছ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রকৃতি ডেস্ক : বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের অন্যতম আকর্ষণ এর সবুজ বেষ্টনী হিসেবে পরিচিত ঝাউবাগান। কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত প্রায় ১শ ২০ কিলোমিটার সৈকতের পাশে সবুজ বেষ্টনীর মতো দাঁড়িয়ে আছে ঝাউগাছ। সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি পর্যটকদের অসাধারণ সৌন্দর্যের হাতছানি দিচ্ছে ঝাউবাগান। সৌন্দর্য বর্ধনের পাশাপাশি এ ঝাউবাগানের পরিবেশগত গুরুত্বও অনেক। কিন্তু সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ এবং ‘পূর্ণিমার’ জোয়ারের কারণে সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে সৈকতের কবিতা চত্বর, ডায়বেটিক পয়েন্টসহ বিভিন্ন এলাকায় বিলীন হয়ে গেছে শত শত ঝাউগাছ। এতে সৈকতের সৌন্দর্য্যহানির পাশাপাশি পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরেজমিনে দেখা গেছে, সাগরের করাল গ্রাসে শহরের নাজিরারটেক, চরপাড়া, সমিতিপাড়া, ডায়বেটিক হাসপাতাল, শৈবাল পয়েন্ট থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত ঝাউবাগানে নেমে এসেছে মহাবিপর্যয়। গত দুই বছরে শুধুমাত্র এসব এলাকায় বিলীন হয়েছে অন্তত ৬ হাজার গাছ। এছাড়াও পর্যটন স্পট হিমছড়ি, প্যাঁচারদ্বীপ, ইনানী, মনখালীসহ টেকনাফ পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন, নিধন এবং দখলের কবলে পড়েছে ঝাউবাগান। সমিতিপাড়ার বাসিন্দা পরিবেশ সাংবাদিক হুমায়ুন সিকদার আক্ষেপ করে বলেন, ৮০ দশক থেকে সৈকতের বিভিন্ন অংশে ভাঙনের সৃষ্টি হয়। এতে প্রতিবছর বর্ষায় ভাঙন আরও বেড়ে যায়। তিনি বলেন, নাজিরারটেক থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত অব্যাহত ভাঙনে গত দুই বছরে স্থানভেদে এক কিলোমিটারেরও বেশি বালিয়াড়ি বিলীন হয়ে গেছে। বিশেষ করে ডায়বেটিক পয়েন্ট থেকে শৈবাল পয়েন্ট পর্যন্ত ঝাউগাছ নিধনে অনেক ক্ষতি হয়েছে। এর ফলে শ্রীহীন হয়ে পড়েছে সমুদ্রসৈকত এলাকা। এভাবে হলে ভাঙন বেড়ে পাড়ায় চলে আসবে। ১শ ২০ কিলোমিটার লম্বা সাগর তীরের অপরূপ ও নয়নাভিরাম দৃশ্যের রানি সৈকত গত চার দশকে ভাঙনে সাড়ে ৫ লাখেরও বেশি গাছ বিলীন হয়ে গেছে। অন্যদিকে এসব ঝাউবাগান দখল করে সেখানে অবৈধ বসতি গড়ে তোলায় দিন দিন সৌন্দর্য হারাচ্ছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত। শুধু দখল নয়, এসব অবৈধ দখলদারদের শিকারে পরিণত হয়ে প্রতিদিন নিধন হচ্ছে শত শত ঝাউগাছ। বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৪ সালের পর থেকে কক্সবাজার সৈকতজুড়ে প্রায় সাত লাখ চারা রোপণ করা হয়। কিন্তু ভাঙন এবং অসাধু ব্যক্তিদের দ্বারা গাছ নিধনের কারণে এখন গাছের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ হাজারে। এতে উদ্বিগ্ন বন বিভাগও। কক্সবাজার বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. হুমায়ন কবির বলেন, ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’র প্রভাবে সৈকতে বিভিন্ন এলাকায় তিন শতাধিক পরিণত গাছ বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১৩ হেক্টর বাগান। যেখানে চারা গাছ রয়েছে। কক্সবাজার দক্ষিণ এবং উপকূলীয় বনাঞ্চল মিলে ২৩ হেক্টর বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান তিনি। ডিএফও হুমায়ুন কবির আরও বলেন, বর্ষা মৌসুমে কক্সবাজার কস্তুরাঘাট, হিমছড়ি, এবং উখিয়ার ইনানী মনখালী এলাকায় নতুন করে ৩৫ হেক্টর বনায়ন করা হবে। এছাড়াও যেখানে-যেখানে গাছ মরে গেছে, কেটে ফেলেছে বা গাছ নেই সেসব শূন্যস্থানে ৬০ হাজার চারা রোপণ করা হবে। এরমধ্যে কস্তুরাঘাট থেকে হিমছড়ি পর্যন্ত ৩৫ হাজার, ইনানী রেজুখাল থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত ২৫ হাজার চারা রোপণ করা হবে। তবে, যেসব এলাকাগুলোতে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে অবস্থানগত কারণে সেখানে আপাতত আর চারা লাগানো যাবে না বলে যোগ করেন তিনি। পরিবেশবাদীরা বলছেন, ঝাউবাগনের ভেতরে এক ধরনের বেসিনের মত গর্ত তৈরি হয়, যেখানে পানি জমে থাকে। জমে থাকা এসব পানি ভাঙনকে তরান্বিত করে। তাই ভাঙনরোধে ঝাউবনের পাশাপাশি নারিকেলসহ অধিক শেকড়যুক্ত গাছ যেগুলো উপকূলীয় এলাকায় হয়, এ ধরনের গাছ লাগাতে হবে। কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক শেখ মোহাম্মদ নাজমুল হুদা বলেন, বিভিন্ন সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় পানি ওভার-ফ্লু হচ্ছে। সৈকতে পর্যটকদের অবাধ বিচরণ এবং কিছু অসাধু লোকজন সৈকতের বালিয়াড়ি থেকে লতাপাতা কেটে নিয়ে যাওয়ায় কারণে সৈকতের বালিয়াড়ি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রসৈকতে বালিয়াড়িগুলোকে অনেকে আঁকড়ে ধরে রাখে সৈকত লতা, নিশিন্দাসহ গুল্ম জাতীয় লতা বা ঝোঁপগুলো। কিন্তু দিন দিন এসব লতাপাতা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় সমুদ্রে সৈকতে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে বলে যোগ করেন নাজমুল। পরিবেশ অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ভাঙনের কারণে একদিকে সৈকতের সৌন্দর্য যেমন নষ্ট হচ্ছে অন্যদিকে সাগর লোকালয়ের দিকে চলে যাওয়ায় কমে আসছে মূল ভূ-খণ্ড। এছাড়াও স্বাভাবিক সৈকত না থাকলে সামুদ্রিক কচ্ছপ, লাল কাঁকড়াসহ এ ধরনের প্রাণীগুলো আবাসস্থল হারাচ্ছে। ফলে মুখে পড়ছে জীববৈচিত্র্য।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..