নিপীড়িত মানুষের বন্ধু রিজন

জহুরুল কাইয়ুম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

২৭ এপ্রিল, ২০২১, মঙ্গলবার। সকাল সাড়ে নয়টার মধ্যে যে খবরটা পেলাম সেটার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। আমি কেন, কেউই ভাবনাতে নিতে পারিনি এমনটা। গাইবান্ধার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নিভৃতচারী অসাধারণ সংগঠক মাহমুদুল গণি রিজন আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গেছেন অজানায়। একেবারে হঠাৎ করেই তার প্রস্থানে সকলেই বাকরুদ্ধ। ওর বাসায় যেতে যেতে ফোনে খবরটা জানালাম সংগঠনের ভাইবোনদের। স্বজন প্রতিবেশীদের কান্নার মধ্যেই পৌঁছে দেখলাম সেই সারল্যভরা লাবণ্যময় মুখ নিয়ে শুয়ে আছে আমাদের প্রিয় রিজন। একে একে ছুটে আসছেন সিপিবি’র সহযোদ্ধারা, উদীচী, গাইবান্ধার বন্ধুরা আর ওর বন্ধুবান্ধব, শুভাকাক্সক্ষী সকলেই। অনেকেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন, কেউ কেউ কষ্টে কান্না চেপে বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বৈশি^ক মহামারী করোনার এই দুঃসময়ে করোনা তাকে ছুঁতে পারেনি। কিন্তু হৃদযন্ত্রটি তার হঠাৎ বিগড়ে গিয়েছিল সাত সকালেই। সময়-সুযোগ কোনোটাই দিল না চিকিৎসার। এ্যাম্বুলেন্স তাকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছার আগেই সব শেষ। অথচ ঘনিষ্ঠজনেরা কোনোদিন শুনিনি তার হৃদযন্ত্রের সমস্যার কথা। বরং স্নায়ু নিয়ে সমস্যার কারণে অনেক সময়ে হাঁটতে কষ্ট হতো, মাঝেমধ্যেই খুড়িয়ে চলতো। চিকিৎসাও নিয়েছে এই যন্ত্রণার উপশমে। তবে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তার অদম্য স্পৃহাকে কোনোটাই দমাতে পারেনি। মাহমুদুল গণি রিজনের জন্ম ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি। পৈত্রিক নিবাস গাইবান্ধা সদর উপজেলার দারিয়াপুরে হলেও রিজনের বেড়ে ওঠা গাইবান্ধা শহরের মধ্যপাড়ায়। সাত ভাইবোনের মধ্যে চতুর্থ রিজন পায়ের সমস্যা নিয়ে জন্মলাভ করে। সেকারণে চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে ছোটবেলায় শক্ত জুতা পরানো হতো। সব ভাইবোনের অনেক আদরের ছিল রিজন। বাবা কৃষি ব্যাংক কর্মকর্তা সুজা উদ-দৌলা বাদশা ছিলেন উদার প্রকৃতির মানুষ। আর মা হালিদা আদিব হানুম ছিলেন মহিয়সী নারী। অনেক বড় বাড়িতে তার দেবর-ননদের প্রায় সব সন্তানকেই তিনি আপন সন্তান স্নেহে লালন পালন করেছেন। তাদের অনেকেই তাকে মা বলেই জানতো। এমনকি দারিয়াপুর এলাকার অনেকের দুঃসময়ের আশ্রয়স্থল ছিলেন রিজনের মা এবং তাদের মধ্যপাড়ার বাসা। তার অনেক বড় একটা বদন্যতার কথা এখানে উল্লেখ করতে চাই। রিজনের বাবার অনুরোধে হালিদা আদিব হানুম নিজের নামে থাকা মূল্যবান অনেক জমি দান করেন শ্বশুরের নামে কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য। আর সেই জমিতে রিজনের বাবার অবসরকালীন প্রাপ্য অর্থে গড়ে ওঠে দারিয়াপুর হাজী ওসমান গণি কলেজ। এরকম উদারনৈতিক বাবা-মায়ের কাছেই রিজন পেয়েছিল মানুষকে ভালবাসার আর উদারতার সুমহান শিক্ষা। তাই জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মানবিক সমাজ গড়বার প্রত্যয়ে লড়াই করেছে রিজন। সেটা কখনও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে, কখনও গণমাধ্যমে আবার কখনও সরাসরি রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মকাণ্ডে। কলেজ জীবনের শুরুতেই ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নে যুক্ত হয়ে প্রগতিশীল রাজনীতির দীক্ষা নেয় রিজন। ১৯৯১ সালে সাংগঠনিক সংকটে ছাত্র ইউনিয়ন, গাইবান্ধা জেলা সংসদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রায় দুই বছর নেতৃত্ব দেয়। নব্বই এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও সাহসী ভূমিকা পালন করে। ছাত্রাবস্থাতেই বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করে বিভিন্ন সময়ে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত পার্টির জেলা কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ছিল। রিজন রাজনীতির বাইরেও নানা কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিল। এক সময় গাইবান্ধা থিয়েটার-এর সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে। ২০০৮ সালে যুক্ত হয় বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী গাইবান্ধা জেলা সংসদের সাথে। ওই বছর অনুষ্ঠিত ৮ম জেলা সম্মেলনে সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, ২০১০ সালে ৯ম জেলা সম্মেলনে সহ-সাধারণ সম্পাদক এবং ২০১২ সালে ১০ম জেলা সম্মেলনে জেলা সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে পরবর্তী তিনটি সম্মেলনে একই পদে পুনঃনির্বাচিত হয়ে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করে। সপ্তদশ (২০১০) থেকে বিংশতিতম জাতীয় সম্মেলন (২০১৯) পর্যন্ত সংগঠনের জাতীয় পরিষদের সদস্য ছিল রিজন। গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্র নেতাদের সমন্বয়ে সম্প্রতি গাইবান্ধায় গঠিত ‘আমরা ৯০ এর যোদ্ধা’ সংগঠনের আহ্বায়ক নির্বাচিত হয় রিজন। দেশ ও সাধারণ মানুষের প্রকৃত চালচিত্র তুলে ধরবার জন্যই রিজন দীর্ঘদিন দৈনিক সংবাদ, সাপ্তাহিক একতা, মাসিক দলিত কণ্ঠ এবং রেডিও টুডে-র গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। আয়ের উৎস হিসেবে সে কখনই সাংবাদিকতাকে ব্যবহার করেনি। মানবমুক্তির লড়াইয়ের নিরলস অভিযাত্রী রিজন যেখানেই কাজ করেছে, সেখানেই আদর্শিক অবস্থানের দৃঢ়তা, অসাধারণ সততা ও নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছে। সাম্প্রদায়িকতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তার আপোষহীন অবস্থান ছিল অনুসরণযোগ্য। ১৯৯৫ সাল থেকে পাঁচ বছরের অধিকাল মধ্যপ্রাচ্যে কাটিয়ে এসেও তার আদর্শগত সামান্য পরিবর্তন হয়নি। দেশে ফিরেই আবার যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির সাথে। কিছুটা আড়ালে থেকেই কাজ করেছে। পার্টির জেলা সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক পদে তার নাম আসলেও সে গ্রহণ করেনি। বলেছে ‘আমার পায়ের সমস্যায় আমি অনেক সময় হাঁটতে পারি না, মিছিলে থাকতে পারি না। জেলা পার্টির মূল দায়িত্বে থেকে সেটা হতে পারে না।’ বর্তমান সময়ে নেতৃত্ব নিয়ে সর্বত্র যখন কাড়াকাড়ি, তখন তার মত স্পষ্টবাদিতা ও সততা কতজন দেখাতে পারে। উদীচীর কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবার পর থেকে ও নিজেকে সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে গড়ে তুলেছে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষার চেষ্টা করেছে। করোনাকালেও আমরা উদীচীর কর্মকাণ্ড সীমিত আকারে করেছি। অস্বচ্ছল শিল্পী কর্মীদের, বন্যাদুর্গত এবং আদিবাসী-দলিতদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের মত কাজে ওর অগ্রণী ভূমিকা ছিল। উদীচী গাইবান্ধা পরিচালিত সত্যেন সেন সঙ্গীত বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থীদের সাথে ছিল গভীর ভালবাসার সম্পর্ক। ৪ এপ্রিল উদীচীর জেলা কার্যালয় ঝড়ে বিধ্বস্ত হলে আমরা দু’জন কত জায়গায় ছুটেছি সহায়তার জন্য। ২৬ এপ্রিল সংস্কারের প্রায় সবকিছু গুছিয়ে রেখে ও চলে গেল। উদীচীর সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে ওর শূণ্যতা পূরণ হবার নয়। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও রিজন আদর্শের কথা ভুলে যায়নি। দেশ এবং দেশের মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা থেকে সংবাদ তৈরি করেছে। মানুষের মধ্যে বিভাজনের বিরুদ্ধে, বৈষম্যহীনতার পক্ষে, নিপীড়ন ও নির্যাতনের বিপক্ষে সাংবাদিকতাকেও নিয়েছিল সংগ্রামের হাতিয়ার হিসাবে। সাপ্তাহিক একতা এবং দলিত কণ্ঠের অনেক প্রতিবেদন আমাকে দেখিয়ে নিয়েছে বারবার, যাতে ভুল না থাকে। সাম্প্রতিক ছাত্র রাজনীতি বিশেষত ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সংকট নিয়ে আমার সাথে কথা বলে হতাশা প্রকাশ করত। আর এসবই রিজনের ভাবনায় ছিল আদর্শিক রাজনীতির প্রতি গভীর মমত্ববোধ থেকে। আমার ব্যক্তিগত ক্ষতির পরিমাণও সামান্য নয়। সাম্প্রতিককালে আমার লেখালেখির একটা বড় অংশই কম্পোজ করে দিয়েছে রিজন। আমার প্রকাশিত তিনটি গ্রন্থের প্রায় সবকিছুই ওর হাতে করা। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে আমার সম্পাদনায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক সংকলন ‘হৃদয়ে একাত্তর’ প্রকাশিত হয়। শুরু থেকে আমৃত্যু রিজন ছিল এর সম্পাদনা পরিষদের সদস্য। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি গভীর আস্থার কারণে রিজন আমার সাথে এই কাজগুলো করেছে অপার ধৈর্য্য ও নিষ্ঠার সাথে। কতবার সংশোধনী দেখেছি, অনেক সময় রাগ করেছি, কিন্তু রিজনের মুখের অম্লান হাসিটি মিলিয়ে যায়নি। ওর প্রতিষ্ঠানে কিংবা বাসায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটেছে। ওর কম্পিউটারে আমার লেখার অসংখ্য ফাইল আছে। তাই শুধুমাত্র সাংগঠনিক ক্ষেত্রেই নয়, ব্যক্তি জীবনেও রিজনের জন্য অসীম শূন্যতা বোধ করছি প্রতিনিয়ত। ২৭ এপ্রিলের সকাল বেলাটা হঠাৎ করেই আমাদের কাছে বিষাদে ভরে উঠেছিল। উদীচীর বোনেরা ছাড়াও অনেকেই হাউমাউ করে কাঁদছিল। তাদের কান্না থামানোর চেষ্টা করে তাদেরকে পাঠাচ্ছিলাম শাপলার কাছে। ২০০৭ সালের ২০ এপ্রিল রিজন আর আলহামরা লায়লা শাপলা যৌথজীবন শুরু করেছিল গভীর ভালবাসায়। ১৪ বছর এক সপ্তাহের এই জীবন বন্ধনের হঠাৎ ছিন্ন হওয়া শাপলা সামলে উঠবে কী করে? আমরা ভিতরের রক্তক্ষরণ আর কান্না সামলে নিয়ে শেষযাত্রার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। তার আদর্শিক কর্মস্থল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি এবং উদীচীর জেলা কার্যালয়ের সামনে নেয়া হলো রিজনের মরদেহ। সদা তৎপর মানুষটির নিথর দেহ ফুলেল ভালবাসায় ভরিয়ে দিল সহযোদ্ধা, সাথী বন্ধুরা। ফিরিয়ে আনা হলো নিজ আবাসে। সেখান থেকেই বিকেলে সবাই সামিল হলাম ওর অন্তযাত্রায়। এরপর আর ওর সাথে হাঁটা হবে না কখনও! পোশাকী নামে মাহমুদুল গণি আর আমাদের প্রিয় রিজন তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কত মানুষের মনে গভীর দাগ কাটতে পেরেছিল তার কিছুটা আভাস পেয়ে যাই ৩ মে অনুষ্ঠিত নাগরিক শোকসভায়, ৮ মে অনুষ্ঠিত সিপিবি’র স্মরণ অনুষ্ঠানে এবং ১ জুন অনুষ্ঠিত উদীচী-র স্মরণ সভায় নানা বয়সী বক্তাদের আলোচনায় আর উপস্থিত স্বজন, সহযোদ্ধাদের মুখাবয়বে। কথা বলতে গিয়ে প্রায় সবাই বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেছেন, অনেকেই কেঁদে ফেলেছেন। রিজনের অম্লান স্মৃতির পাশাপাশি কত অজানা কাজ আর ভালবাসার কথা উঠে এসেছে কথায় কথায়। আর দলিত শ্রেণির মানুষদের সাথে তার আন্তরিক সম্পর্কের গভীরতা বুঝতে পারি ৩০ এপ্রিলের একটি ভিন্নমাত্রার শোকসভায়। গাইবান্ধা শহরের পূর্ব প্রান্তে দলিত শ্রেণির মানুষদের একটি সাংগঠনিক কার্যালয় উদ্বোধনের কথা ছিল সেদিন। সেটিকে রিজনের প্রথম শোকসভায় রূপান্তরিত করে তার ভালবাসার দলিত শ্রেণির মানুষেরা। কী অসাধারণ মমত্ববোধ। এভাবেই রিজন তার কাজের মাধ্যমেই সকল মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিল। অমোঘ সত্য হলেও সব মৃত্যু সহজভাবে মেনে নেয়া যায় না। রিজনের মৃত্যুটাও আমাদের জন্য মানা কঠিন। আমরা অনেকেই বিষণ্ন ঘোরের মধ্যেই ছিলাম। এই বুঝি রিজন ডেকে বলবে আমাদের এখন এটা করা দরকার, ওটা করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম। রিজনকে নিয়ে লেখাটা যে কত কঠিন তা বলে বুঝানো যাবে না। মানসিক যন্ত্রণাবিদ্ধ আমি লিখতে গিয়েও পারি নি। এক মাস পরেও কতটুকু বলতে পারলাম জানি না। তবে মৃত্যু জীবনের শেষ কথা নয়। মানুষের দৈহিক মৃত্যু হলেও তার জীবনের স্বপ্ন সাধনা কখনও পুরোপুরি ব্যর্থ হয় না, মরে না। রিজনের মনুষ্যত্ববোধ, মানুষের প্রতি অপার ভালবাসা, সংগঠনের কাজের প্রতি মমত্ববোধ ও নিষ্ঠা আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত হোক আরও গভীরভাবে। প্রগতি সরণির নিরন্তর সংগ্রামী মাহমুদুল গণি রিজনের স্বপ্নের বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক, সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে একাত্ম থাকার মাধ্যমেই আমরা নিয়ত স্মরণে রাখতে পারি তাকে। লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, গাইবান্ধা জেলা সংসদ

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..