পরাধীনতাই গণমাধ্যমের জন্মক্ষত

হাবীব ইমন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
এক. একটি সংবাদের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বাস্তবতা বিচার করা যেতে পারে। কয়েক বছর আগের কথা, মধ্যপ্রাচ্যে শিশুপাচার নিয়ে একটি সংবাদ ছিলো। মধ্যপ্রাচ্যে উটের জকি হিসেবে ব্যবহৃত শিশুদের নিয়ে তৈরি প্রতিবেদনটি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখতে পায়নি। অংকের হিসাব খুব সহজ। প্রতিবেদনটি প্রচার করা হলে মধ্যপ্রাচ্যের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটবে। উটের দৌড়ের মস্তি উপভোগে অভ্যস্ত আরব শেখরা ক্ষুব্ধ হবেন। তাতে অন্তত কয়েক হাজার প্রবাসী বাংলাদেশির জীবন-জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এখানে যুক্তি থমকে দাঁড়ায় এবং বিবেক বন্দি হয়ে পড়ে। তাই হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকার কথা বিবেচনা করে দু’শ শিশুর অধিকার বঞ্চনার খবরটিকে হত্যা করে। এইরকম অজস্র সংবাদের মৃত্যু আমাদের চারপাশে ঘটে। আমার কোনো কোনো কলাম লেখারও মৃত্যু হয় এখন। একটি সংবাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়েই সাংবাদিকতার শেষকৃত্য হয়ে গেলো, এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না। কিন্তু এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যে টাল খায় তা নিসন্দেহে বলা যায়। আইন, নীতিমালা বা অধ্যাদেশ জারি করে এ পরিস্থিতির উত্তরণ সম্ভব নয়। ১৬৪৪ সালে জন মিল্টন প্রথমবারের মতো এ উপলব্ধির জের টেনেছিলেন তাঁর লেখায়- ‘অবাধ মত প্রকাশের স্বাধীনতার ঊর্ধ্বে আমাকে স্বাধীনতা দাও নিজের বিবেক অনুযায়ী জানবার বলবার এবং অপ্রতিহতভাবে মতপ্রকাশের’। এ আকুতি আজও মুক্তির দিন দিশা খুঁজে পায় নি। নানা কায়দায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এ যাবতকাল শাসকচক্রের হাতেই নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। গণমাধ্যমের নীতি-নৈতিকতার সীমানা-পরিধিও তারাই নির্ধারণ করে দিয়েছেন। গণমাধ্যমে তা অনুসরণে ব্যর্থ হয়েছে। এক্ষেত্রে শাসকচক্রের বর্ম হয়েছে কখনো আইনি বেষ্টনি অথবা নৈতিকতার দোহাই, আবার পরিস্থিতিগত চাপেও গণমাধ্যম বাধ্য হয়েছে তাদের স্বাভাবিক প্রকাশের মৃত্যু ঘটাতে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যে কেবলই কেতাবি বুলি মাত্র, তা স্পষ্ট হয়েছে, মার্কিন-ব্রিটিশ গণমাধ্যমগুলোর ভূমিকায়। তারাই প্রমাণ করেছে সাংবাদিকতায় ‘বস্তুনিষ্ঠতা’ একটি একবগ্গা প্রচারণা মাত্র। আজকাল আর এসব গালভরা কথামালার অসারতা অনুধাবনে বিভ্রমের কোনো অবকাশ নেই। দুই. একসময় পানি বিশুদ্ধকরণের একটা পদ্ধতি ছিলো। ছাঁকন-পাতন পদ্ধতি। বিনে খরচায় পানি বিশুদ্ধ হতো। কর্পোরেটাইজেশনের কালে পদ্ধতিটি নানান নামে বাজার দখল করেছে। পদ্ধতি একই। কেবল যুক্ত হয়েছে চটকদার মোড়কাদি। তা হোক। লোকজ পদ্ধতি না হয় বিনে পয়সার ছিলো। এখন সেটা কিনতে হবে। মাঝে-সাঝে তার পাথর-কয়লা-বালি বদলানোর জন্য বাড়তি পয়সা দিতে হবে। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও ওই রকম একটা ছাঁকন-পাতন পদ্ধতি স্বীকৃত। তাতে সংবাদ বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হতো। কর্পোরেট সাংবাদিকতা এখন সেই ছাঁকন-পাতন পদ্ধতির নতুন সংস্করণের মতো নতুন কৌশল বের করেছে। ব্যাপারটা ‘কর্পোরেট ইম্প্রোভাইজেশন’। কৌশলে খুব কোনো মাজেজা নেই। সেখানে কেবল ‘বায়বীয়’ কিছু জিনিস (এই যেমন নীতি-নৈতিকতা-আদর্শ-দর্শন ইত্যাদি) একসাথ করে ঘুঁটা দিতে হয়। তাতে করে সাংবাদিকতা ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ হারায় কতোখানি, জানি না। তবে ঘুঁটার বদৌলত কর্পোরেট পুঁজির জানালা ঘুলঘুলি হাট করে খুলে যায়। এদেশে মিডিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা কোন তলানিতে ঠেকেছে, তা বিচারের দায় পাঠক-দর্শক-শ্রোতাদেরই। কর্পোরেট মিডিয়ার ঘুঁটা তারা কতোটা হজম করবেন সে বিবেচনার ভারও তাদের। নীতি-নৈতিকতা-আদর্শ-দর্শন এসব বায়বীয় বিষয় নিয়ে কর্পোরেট পুঁজির কোনো আগ্রহ নেই। সুতরাং কর্পোরেট মিডিয়া এখানে মুক্তই বলা যায়। তিন. কর্পোরেটোক্রেসির যুগে গণমাধ্যম আদতে একটা ব্যবসায়িক মডেল। আর দশটা ভোগ্যপণ্যের মতই। বাজারে বিকোয়। যদিও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নানান গাল-গল্পের রেশ এখনো কাটেনি। ডেমোক্রেসির একরকমভাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা ছিলো। রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে দাঁড় করবার জন্য একটা আখ্যান তৈরি করা হতো। গণতন্ত্রের প্রেক্ষাপট পাল্টেছে। জনগণের অনুশাসন চলে গেছে কর্পোরেট শ্রেণির হাতে। নামকাওয়াস্তে ডেমোক্রেসির খোলসের আড়ালে চলছে কর্পোরেট শাসন। গণমাধ্যমের ওপর কর্পোরেট গোষ্ঠীর এ আধিপত্যের মূলে রয়েছে প্রযুক্তির বাড়-বাড়ন্ত। উনিশ শতকের আগে পর্যন্ত গণমাধ্যম স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বিশাল সংখ্যায় এবং পরিসরে জনগণের কাছে পৌঁছুতে পারেনি। প্রাক-শিল্প বিপ্লব যুগে গণমাধ্যমে প্রকাশ প্রচার ও বিতরণ প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা ছিলো ব্যাপক। মূলত ব্যক্তিগত সংযোগের মাধ্যমেই বিতরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতো। তা সত্ত্বেও গণমাধ্যমের প্রভাব বৃহৎ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে বিস্তার লাভ করেছিলো। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার পুরোপুরি প্রতিফলন হয়ে উঠতে না পারলেও, ডেমোক্রেসির টিকে থাকার অন্যতম শর্ত হয়ে উঠতে পেরেছিলো। কর্পোরেটোক্রেসির যুগে গণমাধ্যমের টিকে থাকার পুরোনো শর্তগুলো এখন মৃতপ্রায়। চতুর্থ শিল্প-বিপ্লব পরবর্তী সময়কালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কবলে গণমাধ্যম মোকাবেলা করছে নূতন আরেক বাস্তবতা। ফিরে যাচ্ছে প্রাক শিল্প-বিপ্লব যুগে। একে প্রযুক্তির এক চমৎকার এক ‘রসিকতা’ বলা যায়। কিংবা আমরা বলতে পারি, গণমাধ্যম তার আবর্তন প্রক্রিয়া শেষ করে ফিরে যাচ্ছে সামাজিক মাধ্যমের যুগে। অর্থাৎ গণমাধ্যমের মৃত্যু ঘটেছে, তার জায়গা দখল করে নিচ্ছে সামাজিকমাধ্যম কিংবা নতুন মোড়ক ‘প্রচারমাধ্যম’। এক সময় মানুষ যেমন মুখে মুখে খবর ছাড়াতো, হাট-বাজারে নিজেদের মতপ্রকাশ করতো, নিজস্ব সামাজিক একটা বলয় তৈরি করে নিতো। বর্তমান সময়কালে প্রযুক্তির সহায়তায় জনগণ একই কাজ করছেন। তফাৎ অবশ্য আছে। তা হলো, প্রাক-শিল্প বিপ্লব যুগে সামাজিকমাধ্যম ছিলো মানুষে মানুষে সংযোগ স্থাপনের বিনে পয়সার উপায়। এখন প্রযুক্তির কল্যাণে সামাজিক মাধ্যম তথা ‘প্রচারমাধ্যম’ গণমাধ্যমের প্রতি একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে তেমনি ভাগ বসাচ্ছে গণমাধ্যমের মুনাফায়। প্রযুক্তিনির্ভর নতুন সামাজিক মাধ্যম আমাদের সামনে হাজির করেছে ভিন্ন বাস্তবতা। অকল্পনীয় দ্রুততা এবং দক্ষতার সাথে সংযোগ স্থাপন সম্ভবপর হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর সামাজিক মাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সংরক্ষিত হলেও সংযোগ দক্ষতা অপরিসীম। মানবিক সংযোগের ক্ষেত্রে প্রথমবারের গণমাধ্যমের বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরিবেশিত একরৈখিক তথ্য প্রবাহের বাইরে জনগণের নিজস্ব তথ্যের জগতকে প্রসারিত করেছে। ব্লগ, ফেসবুক এবং টুইটার ক্যামেরা-ফোন সামাজিক মাধ্যম হিসেবে নতুন মনে হতে পারে। তবে অতীতে যেভাবে তথ্য সংগ্রহ এবং বিনিময় করা হতো এগুলো তারই প্রচ্ছায়া মাত্র। ক্রেগ নিউমার্ক বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়া নতুন কিছু নয়, জন লক, থমাস পেইন এবং বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনকে আধুনিক ব্লগারদের সাথে তুলনা করেছেন। তিনি বলছেন, ‘...মিডিয়া এবং রাজনীতিক হবে ভিন্নতর, কারণ ক্ষমতায় অভ্যস্ত লোকেরা বিভিন্ন ধরনের সামাজিক নেটওয়ার্ক দ্বারা পরিচালিত হবে।’ জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ বলেছেন যে, উইকিলিক্স ইংলিশ গৃহযুদ্ধের র্যা ডিক্যাল পুস্তিকা প্রচারকারীদের ঐতিহ্য অনুসরণ করে কাজ করেছেন। অ্যাসাঞ্জ জনগণের সামনে ‘শোসকগোষ্ঠীর সমস্ত রহস্য এবং গোপনীয়তা’ তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন। বিগত কয়েক দশকে হাফিংটন পোস্ট, উইকিলিকসের বিস্ময়কর উত্থানের মাধ্যমে তথ্যপ্রবাহ আরও বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠছে। উত্থান ঘটেছে লক্ষ লক্ষ ব্লগের। কিন্তু একই সাথে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের তথ্য প্রবাহ আরও বেশি বিতর্কিত, এবং পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে উঠছে। অবাক হওয়ার কিছু নেই, বিগত পৌনে দু’শ বছরে বেড়ে ওঠা গণমাধ্যমের যুগ দ্রুতই ফুরিয়ে আসছে। কর্পোরেটোক্রেসি তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় শরণ নিচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার। চার. প্রশ্ন হচ্ছে, কর্পোরেটোক্রেসির যুগে গণমাধ্যমের শক্তি বা সক্ষমতার সত্যি কি কোনো বাস্তবতা আছে? ক্ষমতা কাঠামোকে প্রভাবিত করার কোনোরকম সমর্থ্য কি গণমাধ্যমের রয়েছে? নাকি গণমাধ্যমের শক্তি-সক্ষমতা-সামর্থ্য নিয়ে আপ্তবাক্য অতিরঞ্জন মাত্র। প্রশ্নগুলির উত্তর সহজ নয়। গণমাধ্যমের বিষয়বস্তু বিচিত্র ও বহুমুখীন। ক্ষমতা কাঠমোর ভরকেন্দ্র যেমন রাজনীতি। তেমনি রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে কর্পোরেট ব্যবসায়িক মডেল। গণমাধ্যম রাজনীতির উপরাপর বিষেয়াবলীর মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে, কদাচিৎ হয়তো গলিঘুঁজির সন্ধান খুঁজছে। কিন্তু কর্পোরেটোক্রেসির দাপটের সামনে তার শক্তি-সক্ষমতা-সমর্থ্য কেবল সীমিতই নয়, ক্ষেত্রবিশেষে শূন্য। ফলে গণমাধ্যমকে সত্য প্রকাশের এক শূন্য গহ্বর হয়েই থাকতে হচ্ছে। পরিস্থিতিভেদে রাজনৈতিক কার্যক্রমের নানান মাত্রা থাকে। সমাজে তার প্রভাবও সুদূর প্রসারী। গণমাধ্যমের পক্ষে রাজনৈতিক কার্যক্রমের এই ব্যাপক প্রভাব ধারণ করা অসম্ভবপ্রায়। গণমাধ্যম কেবল রাজনৈতিক কার্যক্রমের চলমানতাকে তুলে ধরতে পারে। ক্ষেত্র-বিশেষে খুব সামান্যমাত্রায় ব্যক্তিগত মতামত বা রাজনীতি পরিচালনার উপায়কে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু কর্পোরেটোক্রেসির মোকাবিলায় গণমাধ্যমের অসহায়ত্ব-অসারতা এখন আর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার দরকার পড়ে না। এটা এখন দিনের আলোর মতো বিদিত। খ্যাতিমান মার্কিন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ওয়াল্টার লিপম্যান বলেছেন—‘গণমাধ্যম আয়নার বদলে টর্চলাইট দেখায়।’ ফলে জনগণ রাজনৈতিক দৃশ্যপটের এটা ঝলকানি পায় মাত্র। পরিপূর্ণ দৃশ্যের দেখা তারা কখোনই পায় না। উপরন্তু কর্পোরেটোক্রেসির আবর্তে গণমাধ্যম ডেমোক্রেসি সম্পর্কে জনসাধারণকে যৎসামান্যই ধারণা দিতে পারে, কখোনই আদ্যপান্ত বিবরণ হজির করতে পারে না। গণমাধ্যমের পরিস্থিতি, বাস্তবতা এবং চরিত্র দেশভেদে আলাদা। কর্পোরেটোক্রেসির প্রভাবে গণমাধ্যম তার নিজস্ব বয়ান তৈরি করে। কর্পোরেটোক্রেসির উদ্দেশ্য এবং প্রয়োজন মাফিক জনমত তৈরি করে। মজার ব্যাপার হলো, তারপরও অনেকেই গণমাধ্যমের শক্তিশালী ভূমিকার প্রতি আস্থা রাখতে চান। ডেমোক্রেসির কার্যকারিতা মাপেন গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নিক্তিতে। গণমাধ্যম তথ্যের সরবরাহকারী হিসেবে জনমতকে প্রভাবিত করে নিঃসন্দেহে। কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অথবা ক্ষমতা কাঠামোর নাট-বল্টু কতোটা নাড়াতে পারে তা নিয়ে তর্কের অবকাশ রয়েছে। ম্যাক্সওয়েল ই. ম্যাককমস এবং ডোনাল্ড এল শ’র মতো পণ্ডিতদের মতে, গণমাধ্যম যদি জনগণের মনোযোগ নির্দিষ্ট বিষয়ের দিকে চালিত করতে পারে, তাদের চিন্তা-ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে, তাহলে ক্ষমতা কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করার জোরটাও তার রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কর্পোরেটোক্রেসি সেই জোরটার ওপরই আঘাত হানে। পাঁচ. বিশ শতকে এসে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি কথাবার্তা হয়েছে পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের ভরকেন্দ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এ শতকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংরক্ষণে সেদেশে বেশ কিছু পদক্ষেপও গৃহিত হয়েছে। ফলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে মার্কিনীদের নিয়ে আহাজারিও খানিকটা বৈধতার সুযোগ পেয়েছে। স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে ১৯১৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সংবাদপত্রের জন্য ডাকমাশুল রেয়াত করা হয় এবং কয়েকটি কাগজ নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনা শাসকচক্রের দ্বিচারিতা প্রকাশিত হয়েছিলো। শাসকচক্র চেয়েছিলো ডাক মাশুল রেয়াতের মাধ্যমে গণমাধ্যমের নিরঙ্কুশ বশ্যতা। আবার যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রতিস্পর্ধী ধারার গণমাধ্যমের বিকাশ শাসকচক্রের কাছে অসহনীয়। তারা চান বংশবদ গণমাধ্যম, যেখানে তাদের কীর্তিকলাপের বিবরণ থাকবে। সেখানে অবশ্য সমালোচনাও থাকবে। কিন্তু তা হতে হবে ‘গঠনমূলক’। গঠনমূলক সমালোচনা বলতে তারা যা বোঝাতে চান, সোজাসাপ্টা কথায় তা হলো–বিদ্যমান ব্যবস্থার তোষণ। এর ব্যত্যয় হলেই গণমাধ্যমের অপরাধ শাস্তিযোগ্য বলে ধরে নেয়া হয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর স্বাভাবিকভাবেই নেমেই আসে খড়গ। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে ভাবতে হলে অন্য পথে এগুতে হবে। বর্তমান বিশ্বে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে যে বাজার, মুনাফা আর পুঁজির স্বাধীনতা, এ নিয়ে খুব বেশি দ্বিধা-দ্বৈরথের অবকাশ নেই। ছয়. হাইব্রিড মিডিয়ার প্রচার-প্রসার বেশি দূরে নয়। কেমন করে যেনো শাকসবজি ফল ফসলের মতো চলে গেলো কর্পোরেটের দখলে।? আমরা সার-বীজ-কীটনাশকের দৌরাত্ম্যে, গায়ে গতরে নাদুস-নুদুস ফল-ফসল পেতে থাকলাম। প্রাকৃতিক স্বাদ-গন্ধ-গুণ-মান ভুলে হাইব্রিড ভক্ত হয়ে উঠলাম। নব্বইয়ের শুরুর দিকে মিডিয়াকে হাইব্রিড করে তুলতে কর্পোরেটগুলো কতোখানি পুঁজি ঢাললো। আমরা একটার পর একটা তরতাজা মিডিয়া পেতে থাকলাম। আর সাংবাদিকতার নামে চললো কর্পোরেট দুর্নীতি আড়াল করার চেষ্টা। হাইব্রিড মিডিয়ার ঝলমলে উপস্থাপনায় ভূমি দখল, কর ফাঁকি, অবাধ দুর্নীতির উপর সহজেই পর্দা টানা যায়। দেরিতে হলেও কর্পোরেটরা তা বুঝেছে। কর্মসংস্থানের বেলায় তারা কি করেছে না করেছে তা অন্য আলোচনার বিষয়। তবে সাংবাদিকতার বারোটা তো এরমধ্যেই বেজে গেছে। লিফলেট আর খবরের কাগজে তফাৎ ঘুচিয়ে দিতে তারা সফল। হাইব্রিড করে তুলতে সার-বীজকীটনাশক এর বদলে তারা খুব সযতেœ ব্যবহার করেছে: ১. হাইব্রিড আলু-মুলা-কলায় ছিটানো কীটনাশকের মতো মধ্যম সারির সাংবাদিকরা ব্যবহৃত হচ্ছেন, ২. সাংবাদিকরা পড়ছেন ত্রিশঙ্কু অবস্থায়, তারা না নিজেদের শ্রমিকের কাতারে ফেলতে পারে, না পারে কর্পোরেট কর্মকর্তা দাবি করতে? এখন উচ্চফলনশীল বীজ হওয়া ছাড়া সামনের কাতারের সাংবাদিক কর্মীরা উপায়হীন। সাত. বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে আমরা কথা চালাচালি করি। এ ধরনের আলোচনায় আমরা নিশ্চয় বাজার, মুনাফা আর পুঁজির বৃত্ত অতিক্রম করতে পারবো না। সে বাস্তবতা আমাদের সামনে অনুপস্থিত। শাসকচক্র গণমাধ্যমের বিকাশের সূচনাকাল থেকেই দ্বিচারিতায় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। শাসকচক্রের দ্বিচারিতার মাঝে গণমাধ্যমগুলোর সামনে হাজির হয় দুটো বিকল্প। হয় তাদের সামনে ছুঁড়ে দেয়া পঁচা মাংসের টুকরো তুলে নিয়ে ল্যাজ দোলানো, নয় প্রতিস্পর্ধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে শাসকের গ্যাঁড়াকলে জড়িয়ে পড়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। এছাড়া শাসকচক্রের সাথে গণমাধ্যমের বোঝাপড়ার তৃতীয় কোনো পথ খোলা থাকে না। গণমাধ্যমের সাথে শাসকচক্রের এ খেলা বহু পুরানো। কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যমগুলো উদ্দেশ্য বাজার সম্প্রসারণ এবং মুনাফা অর্জনের মধ্যেই সীমিত বলে, জনমামাধ্যমের স্বার্থ সেখানে উপেক্ষিত। সংবাদ বা তথ্যকে কেবল বিক্রয়যোগ্য তোলাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। তাতে জনমানুষের কতোটা ক্ষতি-বৃদ্ধি হলো, তা দেখার অবসর তাদের হাতে নেই। কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যমগুলোও তা ঢের জানে। মুুনাফা যেহেতু তাদের একমাত্র লক্ষ্য, সংবাদ বা তথ্যের যাচাই-বাছাইও হয় মুনাফার নিক্তিতে। সেখানে অবশ্য প্রতিযোগিতা আছে। মুনাফা বৃদ্ধিও প্রতিযোগিতা। এক কর্পোরেট আরেক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের কাছে এগিয়ে বা পিছিয়ে পড়ার প্রতিযোগিতা। মুনাফার এ প্রতিযোগিতায় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের গাঁটছাড়া আবার ক্ষমতাবলয়ের সাথে বাঁধা। এখানে আবার আরেক ধাঁধা রয়েছে। যা কখনো দৃশ্যমান, কখনো অদৃশ্য। প্রচারমাধ্যমগুলোর নিয়ন্ত্রণ যেমন কর্পোরেটদের হাতে একচ্ছত্র ঠিক ক্ষমতাবলয়ের নিয়ন্ত্রণ ততোটা নয়। এখানে কর্পোরেট ও ক্ষমতাবলয়ের মাঝে একটা মজার খেলা চলে। খেলাটা টানটান উত্তেজনার হলেও এর শেষটা মধুর। আমরা আগাম অনুমান করে নিতে পারি, ঘটনা যাই ঘটুক এর পরিসমাপ্তিতে জেতে মুনাফাবৃদ্ধির কৌশলগুলোই। জনমানুষ সেখানে অসহায়। তার কিছু বলবার নেই। কিছু করবার নেই। কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যম সেখানে একচেটিয়া দাপটের সাথে খেলে যায়। মানুষকে যা গেলাতে চায়, দেখাতে চায়, শোনাতে চায়, বোঝাতে চায়। বাধ্যত মানুষকে তাই গিলতে হয়, দেখতে হয়, শুনতে হয়, বুঝতে হয়। মানুষ কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যমগুলোর সামনে হয়ে উঠে খেলার পুতুল মাত্র। তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবার কোনো বাস্তবতা কি আজকের দুনিয়ায় অবশিষ্ট আছে? ক্ষমতার উৎস যেমন– রাজনীতি, তেমনই রাজনীতির নিয়ন্ত্রক কেনা-বেচার মডেল। এ কেনা-বেচার দাপটের সামনে বিকল্প শক্তি-সামর্থ কতোখানি? প্রচার-মাধ্যমের চলমান ধারার বিপরীতে প্রান্তিকের রয়েছে নিজস্ব মূল্যবোধ, দর্শন এবং বিশ্বাস, ক্ষেত্র-বিশেষে নিজস্ব বাকভঙ্গি। যা কখনো আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে পরিস্ফূট হয়ে ওঠে। সেই সব প্রান্তজনের মূল্যবোধ, দর্শন, বিশ্বাস এবং বাকভঙ্গিটুকু তুলে ধরার পরিসর সৃষ্টিতে বিকল্প গণমাধ্যম নির্মাণ করা সম্ভব। হয়তো চকচকে মনকাড়া সব গণমাধ্যমের ভিড়ে বিকল্প গণমাধ্যম শুরুতে নিতান্তই সামান্য, অনুজ্জ্বল। সীমাবদ্ধতাগুলোকে নিয়েই প্রান্তকীকরণের বিরুদ্ধে লড়াইটা গণমাধ্যমের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারে। প্রান্তিকীকরণের বিপরীতে মানুষের অপার সম্ভাবনা, অদম্য সাহসে আস্থা রয়েছে। আবহমানকাল ধরে এ জনপদ একদিকে নদীবিধৌত পলিমাটির মতো অনমনীয়, অন্যদিকে নদীভাঙনের মতো মতো রুদ্ধ। কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যমের এ বৃত্তের বাইরে বিকল্প জনমাধ্যম গড়ে তোলার লড়াইটা সহজ নয়। আট. গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা তৈরি বিভ্রম। শাসকচক্রের প্রচারণা কৌশলের দাপটে আমরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ব্যক্তির স্বাধীনতা থেকে আলাদা করে ভাবতে শুরু করেছি। এ একরকম ফাঁদ। এ ফাঁদে পা দিয়ে আমরা বিস্মৃত হতে থাকি, ব্যক্তি হিসেবে আমাদের অধিকারের সীমানা চৌহদ্দি। এ সুযোগে শাসকচক্র আমাদের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার রূপকথা শোনায়। স্বাধীনতার অমিয় স্বাদ পেতে আমরা অনায়াসে গলাধকরণ করতে থাকি গণমাধ্যমকে। লেখক: সহকারী সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, যুব ইউনিয়ন

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..