গুণগত মানের শিক্ষা : করণীয় কী?

এ. এন. রাশেদা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আমার কোনো এক লেখার শেষে অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর ‘আমাদের শিক্ষার সংকট’ প্রবন্ধের অংশবিশেষ তুলে ধরেছিলাম। আর আজ প্রথমেই উল্লেখ করছি তারই একটু অংশবিশেষ। কারণ পাকিস্তান ও স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকেই এই বাস্তবতার বাইরে আমরা আজও বেরিয়ে আসতে পারি নাই। তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র সম্পর্কিত প্রগতিশীল মূল্যবোধকে বিসর্জন দেয়ার ফলে সৃষ্ট সংকট; তথা রাজনীতিরই সংকট। সমাজ জীবনে দুর্নীতি, উৎকোচ, নারী নির্যাতন, খুন, রাহাজানি, ছিনতাই, কিশোর-অপরাধ প্রভৃতির সংকট, তথা সামাজিক সংকট। শিক্ষার সংকট মোচন করতে চাইলে আমাদের সামগ্রিক সংকটের প্রকৃতি উপলব্ধি করতে হবে এবং জাতীয় ভিত্তিতে সুসমন্বিত ব্যাপক কর্মোদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।’ কিন্তু না, তা হবে না। পরিবর্তিত আওয়ামী লীগের সরকার তা করবে না। কারণ– এই দল এবং তাদের সৃষ্ট প্রশাসনযন্ত্রের মধ্যেই তা নিহিত। আজ প্রশাসন ক্যাডারের হাতে রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা হস্তান্তরিত– সেখানে এমপি, মন্ত্রীরাও নাকি অসহায়! যাই হোক, আজ একটু ভিন্ন কথা বলতে চাই। তা হলো– সবাই বলে ‘গুণগত মানের শিক্ষা চাই’। আর তাই তো প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন। এই গুণগত পরিবর্তনের সঙ্গে অনেক কিছুই জড়িত। প্রয়োজন, প্রথমেই শিক্ষায় বিনিয়োগ। শিক্ষার ব্যয় হয় না, হয় বিনিয়োগ। এর ফল সুদূরপ্রসারী। শিক্ষাব্যবস্থা হচ্ছে সমাজব্যবস্থার আয়না। তাই শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের সাথে সমাজের সার্বিক উন্নয়নই জড়িত। এমন কি ঢাকা শহরের রাস্তার যানজটও। রাস্তার যানজট হবে না যদি এলাকায় শিশু-কিশোরদের উন্নতমানের স্কুল থাকে এবং শিক্ষার্থীরা অর্থাৎ মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, উচ্চবিত্তের সন্তানরা প্রত্যেকে পায়ে হেঁটে স্কুলে আসতে পারে। কোনো যানবাহন যেন প্রয়োজন না পড়ে। সকালের নির্মল বায়ু সেবনে শিক্ষার্থীদের দেহমন যেমন সতেজ থাকবে তেমনি অনাকাক্সিক্ষত ব্যাধির হাত থেকেও তারা মুক্ত থাকবে। এলাকার শিক্ষার্থীরা এলাকায় পড়াশুনা করবে। বাবা-মা’কে লোন করে গাড়ি কেনার চিন্তা করতে হবে না। আর সে কারণেই স্কুলে ভালো লেখাপড়া বা শিক্ষাদানের জন্য প্রয়োজন মেধাবী, সৃজনশীল ও যোগ্যতাসম্পন্ন একদল শিক্ষক এবং সে কথা প্রাথমিক থেকে বিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বত্রই তা সত্য। আজকাল বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকে, তাঁদের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমাদের প্রাথমিক স্কুলে খুব ভালো অংকের বা বাংলার খুব ভালো শিক্ষক ছিলেন। তাই অংকের ভীতি আমার ছেলেবেলাতেই কেটে গেছে। আবার কেউ বলেন আমাদের স্যার আমার কবিতা দেখে বলেছিলেন, ‘লিখে যা, তোর মধ্যে সম্ভাবনা আছে।’ আবার কেউ বলেন, আমাদের অমুক স্যার, আমাদের নিয়ে বাগান করেছিলেন, তখনই আমার মধ্যে গাছপালার প্রতি, ফুলের প্রতি, প্রকৃতির প্রতি কেমন যেন ভালোলাগা জন্মেছিল। তাই পরবর্তীতে আমি কৃষি বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম। এজন্যই বিশ্বব্যাপী শিক্ষাদানকে সৃজনশীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং বিশ্বাস করা হয় যে, ভবিষ্যতের শিক্ষিত জনসম্পদের গুণাগুণ নির্ভর করে শিক্ষক সমাজের ওপরই। তাই শিক্ষার সকল স্তর অর্থাৎ প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সবচাইতে মেধাবী, সৃজনশীল ও যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদেরই শিক্ষকতায় নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন বলে শিক্ষাবিদেরা মনে করেন। এবং তাঁরা এ-ও মনে করেন যে, শিক্ষকতাকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে উপযুক্ত মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে কোনো উন্নয়ন প্রচেষ্টা সফল হতে পারে না। উন্নত বিশ্বে প্রাথমিক পর্যায়ে যারা শিক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত– তারা সমাজে কোনোভাবেই অবহেলিত নন। কিন্তু আমাদের দেশ আজও তাদের সেই সম্মান দিতে পারে নাই। তাই প্রধান শিক্ষকের ১৯তম স্কেলে মূল বেতন ১৩,১৩০ টাকা, বাসা ভাড়া ৪৫% ও ৪০% শহর ও গ্রাম ভেদে, চিকিৎসা ভাতা ১,৫০০ টাকা ও টিফিন ২০০ টাকা এবং সহকারী শিক্ষক ১৩তম স্কেলে ১১,৫৫০ টাকা, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা ও টিফিন একই। যদিও এই বেতন ও স্কেল বর্তমান সরকার আগের তুলনার বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু এই স্কেলে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের রাখলে বর্তমানের ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেটের দেশে শিক্ষকদের মর্যাদা সম্মানজনক হয় না। তবে সরকারি ছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে যে সব স্কুল আছে শহরে গ্রামে-গঞ্জে, সেই সব শিক্ষকদের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ বলে ধারণা করা হয়। গণমুখী এবং সর্বজনীন শিক্ষার দাবি ছিল পাকিস্তানি শাসনামলেই। বঙ্গবন্ধু সেই ঘোষণাই দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ চারবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকে দেশ পরিচালনা করছে তাই এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী যারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করছে– তাদের দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে এবং শিক্ষকদের পাশে দাঁড়াতে হবে। মর্যাদা দিতে হবে। ইউনেস্কো প্রদত্ত শিক্ষকদের মর্যাদা বিষয়ক সুপারিশমালা তাদের ১৯৬৬ সালে প্যারিস বৈঠকে নির্ধারিত হয়ে পরবর্তীতে সংশোধিত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী তা স্বীকৃত এবং বাংলাদেশ তার স্বাক্ষরদাতা। এখানে উল্লেখ করা হলো প্রাথমিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদাদানের সামান্য একটু চিত্র। আবার মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের ১৩টি মত মেনে যারা নিজ উদ্যোগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন এবং ৬ বছর বেতন না চাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শিক্ষকতা পেশা বেছে নিয়েছেন এবং ৬ বছর পরে ২০১১ সাল থেকে ক্রমান্বয়ে প্রতিবছর ঢাকা প্রেসক্লাবের সামনে এসে তাদের দাবি জানাচ্ছেন; ২০১৮ সালে প্রেসক্লাবে মাসাধিককাল অবস্থান ধর্মঘট এবং আমরণ অনশন করেছেন আর প্রতিবছরই তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্লাসে পাঠানো হয়েছে। প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, এর মধ্য দিয়ে কি সরকারের শিক্ষাবান্ধব নীতির প্রতিফলন ঘটছে? ইউনেস্কোর সুপারিশালার প্রতি সম্মান দেখানো হচ্ছে? আবার এমপিও প্রাপ্তদেরও আছে নানা বঞ্চনার কাহিনী। সবুজ হাসান নামে একজন শিক্ষক ফেসবুকে লিখেছেন, ‘প্রতি মাসের বেতন বিলের সাথে বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীদের অঙ্গীকারনামা দিতে হয়। এটি না দিলে ব্যাংক বিল জমা রাখে না’। এক সময় সরকার বেসরকারি শিক্ষদের ১০০/- টাকা বাসাভাড়া দিয়ে লিখে নিত– ‘আমি আর অন্য কোথা থেকে বাসা ভাড়া নেই না’। পাঠক এবার বুঝুন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের কী রকম হীন চোখে দেখে! শিক্ষক যদি মনঃকষ্টে থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীদের সাথে ভালো আচরণ করবে কিভাবে? তারা যখন নিজেরাই নিগ্রহের শিকার হবেন তখন কিভাবেইবা শিক্ষার্থীদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন? কাজেই শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি করতে চাইলে শিক্ষার সকল স্তরের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদেরই বাছাই করে নিতে হবে সর্বোচ্চ বেতন প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিয়ে এবং তাদের সেই মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। কেননা শিক্ষার মান নির্ভরশীল শিক্ষকদের মানের ওপর। শিক্ষকদের কাছে জাতি যদি উন্নতমানের শিক্ষাদান প্রক্রিয়া আশা করে তাহলে তা শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতার ওপর হবে না। প্রয়োজন আরও অনেক কিছু। যেমন জাতির প্রতি শিক্ষকসমাজের কর্তব্য সম্পর্কে ধারণা, গঠনমূলক সহায়তার ইচ্ছা, প্রকৃতি পরিবেশ সম্পর্কে জ্ঞান, শিক্ষার্থীদের নিবিড়ভাবে ভালোবাসতে পারার ক্ষমতা, শুধু বিদেশি নয় বরং দেশীয় সহজলভ্য শিক্ষাদানকে সহজ করার চিন্তাভাবনা থাকা ইত্যাদি। শিক্ষকদের এই মহান দায়িত্ব পালনের জন্যই তাদের সেই যোগ্যতম স্থান দিতে হবে। শুধু দেশের তো নয়, বিশ্বের সকল পেশার জ্ঞানীগুণী, উদ্ভাবক, বিজ্ঞানী, কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, মনোবিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সমাজসেবক, সমাজবিজ্ঞানী, প্রকৃতিবিজ্ঞানী, কৃষিবিজ্ঞানী, কারিগর তৈরি হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই; শিক্ষকদের সততা, আদর্শবাদিতা ও মহৎ কর্মপরিকল্পনার মধ্য দিয়েই। আজ সারাবিশ্ব এক মহামারির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। সবার অভিযোগ যাদের এই প্রণোদনা পাওয়া উচিত, তাদের অধিকাংশই বঞ্চিত হয়েছে। এবং যারা সরকারি অনুদান নিতে চায়নি যেমন হেফাজতে ইসলাম– তাদের জোর করে ১০ কোটি টাকাও দেয়া হয়েছে। কিন্তু ৫ হাজার ২৪২টি যে, নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৭৫-৮০ হাজার শিক্ষক কর্মচারী আছেন– তাদের কানাকড়িও দেয়া হলো না। কোনো বেষ্টনির মধ্যেই এলো না। আর হেফাজতের টাকার যে প্রয়োজন নেই– তা তারা জানালেও, তাদের দেয়া হলো। ২৬ মার্চ ২০২১ তাদের তা-বের পর কত সত্যই না বেরিয়ে আসছে। কিন্তু সরকারের গোয়েন্দা বাহিনী কি এসব তথ্য জানত না? এদিকে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি বা প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও তো ছিল– যারা শিক্ষার্থীদের দেয়া বেতন থেকেই কর্মচারী ও শিক্ষকদের বেতন-ভাতাদি পরিশোধ করতো। করোনাকালে স্কুল যখন বন্ধ তখন কিভাবে বেতন আদায় হবে এবং যেখানে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের অনেকেই নিঃস্ব হয়ে গেছে– তা হলে এইসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীরা কি বাতাস খেয়ে জীবন ধারণ করবে? এ ব্যাপারে সরকার একেবারেই নির্বিকার। কাজেই যা হবার তাই হচ্ছে। পাকিস্তানি শাসনামল থেকেই যে, গণমুখী অর্থাৎ সর্বজনীন শিক্ষা দাবি উচ্চকিত ছিল– তা আজ নিষ্ঠুরভাবে, অমানবিকভাবে শৃঙ্খলিত, পদদলিত। তাই সমাজে বেড়েছে খুন, ছিনতাই, রাহাজানি, ধর্ষণ, ঘুষ, দুর্নীতিসহ সকল প্রকার অন্যায়, অবিচার– যা অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর বক্তব্যে সামাজিক সংকট এবং যার উৎপত্তি শিক্ষার সংকট থেকেই। এই সংকট থেকে উত্তোরণের জন্য শিক্ষা ও শিক্ষকদের যতদিন কাজে লাগানো না যাবে ততদিন এ সমাজ গলিত লাশে পরিণত হবে। স্বপ্নের পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বিলাসবহুল হোটেল, মোটেল, চোখ ধাধানো গাড়ি কোনো কিছুই পচন ঠেকাতে পারবে না। আজ কেউ কারো কাছে নিরাপদ না। স্বামী স্ত্রীর কাছে স্ত্রী স্বামীর কাছে, কন্যা পিতার কাছে, মাতার কাছে, বান্ধবী বন্ধুর কাছে, বন্ধু বান্ধবীর কাছে– এখন বুঝুন সমস্যা কোন গভীরে অবস্থান করছে! তবে জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতো বলা যায়, ‘তবু আশা নিয়েই মানুষ বেঁচে থাকে। আর ইতিহাসের শিক্ষাও এই যে, সমাজশক্তির বিন্যাস ও সংঘাতে অপ্রত্যাশিত মুহূর্তেও অনেক সময়ে অনেক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয়।’ যা তিনি লিখেছিলেন ‘বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য’ প্রবন্ধে। – হয়তো বা তাই। তবে প্রয়োজন সেই লক্ষ্যে যাবার প্রস্তুতি নেয়া– হাত, পা গুটিয়ে নয়, বিপ্লবী চেতনা ধারণ করেই পচাগলা সমাজের কবর রচনা করতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে শিক্ষক সমাজকেই। সমাজের অনগ্রসর অংশকে সাথে নিয়ে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের নিয়ে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..