বাস্তবতা বিবর্জিত বাজেটে উপেক্ষিত জীবন-জীবিকার প্রশ্ন

রাজু আহমেদ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
সাধারণ মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের উপর করোনার প্রভাব নিয়ে গত বছরের অক্টোবরে একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। জরিপের তথ্য, করোনাকালে সাধারণ মানুষের আয় কমে গেছে ২০ শতাংশ। ২০১৯ সালের মার্চে পরিবার প্রতি মাসিক গড় আয় ছিল ১৯ হাজার ৪২৫ টাকা। করোনা পরিস্থিতিতে গত বছরের আগস্টে তা ১৫ হাজার ৪৯২ টাকায় নেমে আসে। বিবিএসের হিসাবে, পরিবার প্রতি মাসিক গড় আয় কমেছে ৩ হাজার ৯৩৩ টাকা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০ মাসে দেশে কাজ হারিয়েছেন ৭ দশমিক ৯ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষ। সাময়িকভাবে কাজ হারিয়েছেন আরো ১ দশমিক ৭ শতাংশ। আর কাজ না থাকায় পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছেন ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। এই প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যায়, বেতন বা মজুরির বিনিময়ে কাজ করেন এমন কর্মীদের মধ্যে ৬২ শতাংশের আয় ২০১৯ সালের তুলনায় কমে গেছে। স্বকর্মসংস্থানে নিয়োজিতদের মধ্যে আয় কমেছে ৮০ শতাংশের। এরমধ্যে ২ শতাংশের কাজ বা ব্যবসা একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। এতো গেলো আয় কমার হিসাব। বিভিন্ন গবেষণায় করোনার প্রভাবে মানুষের আর্থিক অবস্থা পরিবর্তনের যে চিত্র উঠে আসছে- তা আরো ভয়াবহ। করোনায় দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়ে যৌথভাবে গবেষণা করেছে দ্য পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)। কিছু দিন আগে সেই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, করোনা মহামারির অর্থনৈতিক ধাক্কায় দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ। এক বছরে মোট জনসংখ্যার ১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ মানুষ দরিদ্র হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই আশা করা হয়েছিল, এবার জাতীয় বাজেটের মূল ফোকাস হবে মানুষের জীবন-জীবিকার উপর প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ প্রভাব। কিন্তু করোনাকালের দ্বিতীয় বছরে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে যে বাজেটটি দিলেন, তাতে ভুলক্রমেও উচ্চারিত হয়নি মানুষের আয়ের পথ হারানো, নতুন করে দরিদ্র হয়ে যাওয়ার এই প্রামাণ্য চিত্র। ফলে বাজেটের পরিকল্পনা, বরাদ্দ ও বণ্টন ব্যবস্থাপনার কোথাও ঠাঁই পায়নি করোনায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কোটি কোটি মানুষ। যদিও অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম ‘জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ’। শিরোনামটি ছাড়া পুরো বাজেট বক্তৃতা ও আর্থিক বিবরণীর সর্বত্রই উপেক্ষিত হয়েছে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন। জীবন বাঁচাতে এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ কাজ দু’টি- করোনা নিয়ন্ত্রণ এবং জীবিকার পথ তৈরি। দু’টি বিষয়েই বাজেটে দেখা গেলো খামখেয়ালী। দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে চান অর্থমন্ত্রী। প্রতি মাসে ২৫ লাখ মানুষ টিকা পাবেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাহলে দেশের মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ অর্থাৎ, ১৩ কোটির মতো মানুষকে টিকার আওতায় আনতে সময় লাগবে ৪ বছরের বেশি। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রীও জানিয়েছেন, নতুন বাজেটে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার স্বাস্থ্য খাত। কিন্তু এখানেও রয়ে গেলো শুভঙ্করের ফাঁকি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেয়া হয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) শূণ্য দশমিক ৯ শতাংশ। মোট বাজেটের অংশ হিসেবে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা ছিল ৫.১ শতাংশ। এবার স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মোট বাজেটের ৫.৪ শতাংশ। করোনার মহাবিপদে স্বাস্থ্য খাতের চরম দুর্বলতা প্রকাশিত হওয়ার পরও মাত্র ০.০৩ শতাংশ বাজেট বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা অসম্ভব। স্বাস্থ্য খাতের এই বরাদ্দ শুধু অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা বা সেবার জন্য নয়। এরমধ্যে আছে ভবন নির্মাণ, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনা, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বেতন ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়। বাজেটের অর্ধেকের বেশি এসব কাজে ব্যয় হয়। আর উন্নয়ন কাজের প্রায় সবটাই যায় ভবনসহ অবকাঠামো নির্মাণে। গবেষণা ও স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক উন্নয়নে ব্যয় একেবারেই কম। ফলে সামান্য বরাদ্দ বাড়িয়ে সস্তা বাহবা নেয়াই অর্থমন্ত্রীর মূল লক্ষ্য বলে ধারণা করা যায়। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার শুরুর দিকে আছে, ‘২০২১-২২ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটটিও প্রণয়ন করা হচ্ছে কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে বিশ্বব্যাপী চলমান একটি ক্রান্তিকালে।’ ব্যস, এ পর্যন্তই! করোনা ভাইরাসের বিদ্যমান চিত্র বাজেট বক্তৃতার আর কোথাও উঠে আসেনি। বাংলাদেশে যে এখন দ্বিতীয় ঢেউ চলছে এবং তার প্রভাবে মানুষের জীবন-জীবিকা আবারো চরম সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে– অর্থমন্ত্রী তার ধার ধারেননি। পুরো বাজেট কাঠামোর কোথাও জাতীয় অর্থনীতিতে করোনার প্রভাবের প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে সব দিক থেকে বিচার করলেই প্রস্তাবিত বাজেটটি হয়েছে গতানুগতিক, বাস্তবতা বিবর্জিত, কাল্পনিক এবং মানুষের জীবন-জীবিকার সাথে সম্পর্কহীন। আশা করা হয়েছিল, করোনায় কর্মহারা মানুষের জন্য আয়ের পথ তৈরির কোনো একটি রাস্তা দেখাবেন অর্থমন্ত্রী। নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া মানুষের জন্য আর্থিক পরিকল্পনা ঘোষণাও ছিল জরুরি। কিন্তু বাজেটে এ নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারিত হয়নি। ফলে ‘জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য’ দেয়ার শ্লোগান হয়ে গেছে ফাঁকা বুলি। বরাবরের মতোই বাজেটের মূল লক্ষ্য হয়ে উঠেছে উচ্চ প্রবৃদ্ধি। যেনো প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেই বাংলাদেশের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু জিডিপি বাড়লেই যে মানুষের জীবন বদলাবে না– তা ইতোমধ্যেই প্রমাণ হয়েছে। বছর বছর গড় মাথাপিছু আয় বাড়লেও দেশে ধনী-গরিবের বৈষম্য ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে। সরকারি হিসাবই বলছে, দেশে সাধারণ মানুষের আয়ের চেয়ে ব্যয় ও ভোগব্যয় বৃদ্ধির হার বেশি। সরকারের অর্থনৈতিক সমীক্ষাই বলছে, দেশের সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ মানুষ মোট জাতীয় আয়ের ২৮ শতাংশ ভোগ করছে। আর নিচের দিকের ৫০ শতাংশ মানুষ ভোগ করছে ১৯.২৪ শতাংশ। সবচেয়ে নিচে থাকা ১০ শতাংশ মানুষ পাচ্ছে জাতীয় আয়ের ১ শতাংশ। অর্থাৎ, দেশে যতো সম্পদ তৈরি হচ্ছে তার প্রায় পুরোটাই চলে যাচ্ছে উপরের দিকের ৫ শতাংশ মানুষের দখলে। বৈষম্য পরিস্থিতি নির্ধারণ করতে যে সূচকটি ব্যবহার কা হয় তার নাম ‘জিনি অনুপাত’। এই সূচক ০.৫০ অতিক্রম করলে বৈষম্য পরিস্থিতি মারাত্মক বলে ধরে নেয়া হয়। বাংলাদেশে ২০১০ সালে এই অনুপাত ছিল ০.৪৫৮। বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ০.৪৮৩। ধনী-দরিদ্রের এই বৈষম্য ধারাবাহিকভাবে বাড়তে বাড়তে মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছলেও সরকারের এ নিয়ে মাথাব্যথা নেই। আয়বৈষম্য ও ভোগবৈষম্য দূর করতে এবারো বাজেটে কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। বরং এমন কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে– যা বৈষম্য আরো বাড়িয়ে তুলবে। বৈষম্য কমাতে সরকারের হাতে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার কর ব্যবস্থাপনা। যার সম্পদ ও আয় বেশি, সে বেশি কর দেবে– এটাই হলো ন্যায়বিচার। ধনীদের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ কর আদায় করে সরকার এমনভাবে তা বিনিয়োগ করবে- যাতে সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে কর ব্যবস্থাপনায় ধনী-গরিবের কোনো ব্যবধান নেই। ধনীদের বেশি না ঘাটিয়ে পরোক্ষ করের উপর নির্ভর করে সরকার। এবারো বাজেটে মোট কর রাজস্বের ৬৮ শতাংশ আসবে পরোক্ষ কর থেকে। আর প্রত্যক্ষ কর বা আয়কর থেকে আসবে ৩২ শতাংশ। এই অসামঞ্জস্য দূর করতে ব্যক্তি ও কর্পোরেট খাতের আয়কর বাড়ানো জরুরি হলেও নতুন বাজেটে উল্টো বড় ব্যবসায়ীদের কর কমিয়ে দেয়া হয়েছে। বাজেটের কর ব্যবস্থাপনায় আগের বছরের চেয়ে যতটুকু পরিবর্তন এসেছে তার সবটাই করা হয়েছে ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে। গত বছর বাজেটে কর্পোরেট কর হার আড়াই শতাংশ কমানো হয়েছিল। এবার কমেছে আরো আড়াই। পর পর দু’ বছর মিলিয়ে ব্যবসায়ীরা ৫ শতাংশ কর ছাড় পেলেন। বার বার হার কমানো হলেও কর্পোরেট করে বিশাল ফাঁকি রোধে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেই সরকারের। অথচ করোনায় আয় কমে গেলেও সাধারণ মানুষকে চাপে রেখেছে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি। কিন্তু ব্যক্তি খাতে করমুক্ত আয়সীমায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। আগামী অর্থবছরে ৭.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে কৃষির পাশাপাশি শিল্প খাতেও বড় অগ্রগতি অর্জন করতে হবে। আর এক্ষেত্রে সরকার পুরোপুরি নির্ভর করছে বেসরকারি খাতের উপর। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের প্রেসক্রিপশনে শিল্প উৎপাদনে সরকারি বিনিয়োগ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পাট, বস্ত্রসহ ভারি শিল্প খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বিক্রি, বন্ধ বা অকেজো করে দেয়া হয়েছে। যেসব রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা চালু রয়েছে সেগুলোও নতুন বিনিয়োগের অভাবে আধুনিকায়ন করতে পারছে না। সরকার নীতিগতভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতবিরোধী হওয়ায় এসব কারখানা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না। ফলে শিল্প প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকারকে বেসরকারি খাতের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। আর এই বেসরকারি খাতে গত কয়েক বছর ধরে বিরাজ করছে বিনিয়োগ স্থবিরতা। অথচ শিল্প খাতে সরকার একের পর এক প্রণোদনা দিচ্ছে। মূলত শিল্প উদ্যোক্তার নামে লুটেরা মানসিকতা ব্যাপক হয়ে উঠার কারণেই শিল্প খাতের অগ্রগতি থমকে আছে। শিল্পের নামে ব্যাংক ঋণ নিয়ে এক শ্রেণির উদ্যোক্তা আর তা ফেরত দিচ্ছে না। খেলাপী ঋণের এই সংস্কৃতি বন্ধে বাজেটে কিছু হুমকি-ধমকি আছে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ নেই। ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা রোধে দু’ বছর আগে একটি কমিশন গঠনের কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত তার বাস্তবায়ন নেই। বাজেট বক্তৃতায় এ বিষয়ে কিছু বলেননি অর্থমন্ত্রী। দেশে বিনিয়োগ না করে সম্পদশালীরা বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে। এই পাচার ঠেকাতে বাজেটে কোনো ঘোষণা নেই। বেসরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি সরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্যও অর্জিত হবে বলে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে ধারণা পাওয়া যায় না। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) হিসেবে এবার সরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। বাজেটের এই বরাদ্দ হলো লুটপাটের সবচেয়ে বড় জায়গা। সরকারের ছোট-বড় প্রকল্পে দেয়া টাকার কতোটা সত্যিকারের কাজে লাগে, আর কতোটা লুটপাট ও অপচয় হয়– সে বিষয়ে নতুন করে কিছু বলার প্রয়োজন পড়ে না। যদিও অদক্ষতার কারণে কখনো এডিপির পুরো বরাদ্দ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। করোনা পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছরের বাস্তবায়ন পরিস্থিতির আরো করুণ দশা। এরপরও এডিপির আকার বাড়ানোর যৌক্তিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া গেলো না। বাজেটে শিল্পসহ উৎপাদনশীল খাতের সামগ্রিক বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনায় সরকারের ভূমিকা বাড়ানোর কোনো প্রচেষ্টা নেই। বেসরকারি খাতের বিকাশের পাশাপাশি বৃহৎ শিল্পে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও এক্ষেত্রে চরম উদাসীন সরকার। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে বিদেশি পণ্যের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করার জন্য নতুন কোনো পদক্ষেপ বাজেটে নেই। বাজেটে স্থানীয় শিল্প রক্ষায় বেশ কিছু পদক্ষেপ থাকলেও তা কেবল গাড়ি, মোটরবাইক, ফ্রিজের মতো বিলাসপণ্য কেন্দ্রিক বৃহৎ শিল্পের জন্যই রাখা হয়েছে। ২০২১-২০ অর্থবছরের বাজেটে সরকারের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। এরমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে আসবে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। বিদায়ী অর্থবছরের মূল বাজেটেও একই লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে সংশোধিত বাজেটের চেয়ে এই লক্ষ্য ২৯ হাজার কোটি টাকা বেশি। তবে বাস্তবতা হলো চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এনবিআর আয় করতে পেরেছে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের এই ধারা বজায় থাকলে চলতি বাজেটের সংশোধিত ও নতুন বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আয় করা সম্ভব হবে না। তার উপর আবার কর্পোরেট কর হার হ্রাস করার কারণে সরকারের রাজস্ব আয় অনেকটাই কমে যাবে। বাড়তি করের বোঝা চাপবে সাধারণ মানুষের উপর। ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি। অর্থাৎ, শুরুতেই বাজেটের তিন ভাগের এক ভাগ আয়ের পথ খুঁজে পাননি অর্থমন্ত্রী। ঘাটতি মেটাতে ১ লাখ ১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা নেয়া হবে বিদেশি অনুদান ও ঋণ। ফলে বাংলাদেশে ঋণদাতা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রণ আরো শক্ত করবে অর্থমন্ত্রীর কল্পনার ফানুস উড়ানো এই বাজেট।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..