আমিনা আক্তার: এক সংগ্রামী জীবনের অবসান

জেবুন্নেছা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
১০ মার্চ, ২০২১ তারিখ সকাল ৯.৩০ মিনিটে কমরেড আমিনা আক্তার আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর ৭৫ শতাংশ ফুসফুসে খতিগ্রস্ত এবং অক্সিজেন সেচুরেশন নেমে যাছিল। হাই ফ্লো অক্সিজেন মাক্সের জন্য তাঁকে আইসিইউ তে রাখা হয়। সে সঙ্গে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট ছিল। তাছাড়া তিনি আগে থেকেই কিডনি সমস্যায় ভুগছিলেন। করোনার কারণে কিডনির সমস্যাগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পায়। শেষ মুহূর্তে কিডনি ডায়ালিসিসের পর্যায় চলে যায়। কিন্তু শ্বাসকষ্ট এবং অক্সিজেন সেচুরেশনের কারণে ডায়ালিসিস করা সম্ভব হয়নি। অতঃপর ডাক্তার-নার্সদের শতচেষ্টা সত্ত্বেও তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। গোপীবাগের কবরস্থানে স্বামীর কবরে তাঁকে সমাধিত করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। তিনি ১৯৩১ সালে সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ওসমান গণি ও আশাতুননেসা দম্পতির তৃতীয় সন্তান ছিলেন। আমিনা আক্তার একজন অতি সাধারণ গৃহবধূ ছিলেন, হয়তো তাই থাকতেন। কিন্তু পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকে তাঁর স্বামী আবদুল গফুরের অনুরোধে ঢাকায় আসেন। তিনি ঢাকায় প্রথমে যে বাসায় উঠেন সেটি ছিল নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির গোপন আস্তানা। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর। সেই বয়সে নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির গোপন আস্তানায় যোগ দিয়েছিলেন না জেনে। সেই থেকে পুরো পাকিন্তান আমলে সেই কঠিনতম দুঃসময়ের দিনগুলোতে এই দম্পতি গোপন কমিউনিস্ট পার্টির ঘাঁটি আগলে রেখেছেন।লক্ষ্মীবাজারের সেই ভাড়া বাসায় আগে থেকেই লক্ষ্মী ছদ্মবেশে এবং ছদ্মনামে প্রখ্যাত কমিউনিষ্ট নেতারা পাকিস্তান সরকারের হুলিয়া মাথায় নিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। এদের মধ্যে ছিলেন কমরেড মনি সিং (ছদ্মনাম আজাদ/বড় ভাই), কমরেড বারীণ দত্ত (সালাম ভাই), কমরেড জ্ঞান চক্রবর্তী (করিম ভাই), কমরেড নেপাল নাগ (রহমান ভাই), কমরেড রমেন মিত্র (কাদের ভাই), কমরেড মো: ইলিয়াস ছাত্রনেতা (বুলবুল ভাই)। এছাড়া আরো দুজন ছিলেন কমরেড আফজাল হোসেন পরামানিক (চাচা) ও আবদুল গফুর (সাহেব)। শেষের দুজন চাকুরিজীবী ছিলেন। এদের উপর গোপন আস্তানার দেখভালের সমগ্র দায়িত্ব ছিল। আমিনা আক্তার এখানে আসার বেশ কিছুদিন পর আসেন কমরেড বারীন দত্তের স্ত্রী শান্তি দত্ত (সেতারা ভাবি) ও কমরেড নেপাল নাগের স্ত্রী নিবেদিতা নাগ (রিজিয়া আপা) ও সুনীল ঘোষ (সানি ভাই)। মাঝে মধ্যে বৈঠকে যোগ দিতে আসতেন কমরেড খোকা রায় এবং তাঁর স্ত্রী জঁইফুল রায়। প্রাথমিক অবস্থায় আমিনা আক্তারের কাছে সব কিছুই গোপন রাখা হলেও অবশেষে আমিনা আক্তারের নানা প্রশ্নের জবাব দেয়ার জন্য পার্টি থেকে নির্দেশে দেয়া হয়। কমিউনিস্ট পার্টি সম্পর্কে জানা ও বোঝার হাতে খড়ি হয় কমরেড আফজাল হোসেন পারামানিকের (চাচা) কাছে। তাঁর কাছে প্রথম জানতে পারেন তৎকালিন সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে, জানতে পারেন সমাজতন্ত্রের কথা। সেই শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা তথা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের এই কমরেডরা রাত-দিন পরিশ্রম করে চলেছেন। কিন্তু এ দেশের সরকার এর বিরুদ্ধে। এদের নামে হুলিয়া জারি করেছে। দেখা মাত্রই গ্রেফতার করবে পুলিশ। সে কারণে ছদ্মবেশে এখানে আত্মগোপন করে আছেন। আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য যে কোনও মূল্যে এদের রক্ষা করা। এজন্য তোমাকেও এখানের সকল নিয়ম -কানুন মানতে হবে। বাড়ির বাহিরে বা ছাদে বা আশেপাশে কোনও বাড়িতে যাওয়া চলবে না। গ্রামের ঘুরে বেরানো মেয়েটি শেষ পর্যন্ত এখানে এসে গৃহবন্দি হয়ে পরলেন। তাতে তাঁর কোনও আপত্তি ছিল না। এ সময় সমাজতন্ত্রের পাঠ হিসেবে তাঁর হাতে তুলে দেয়া হয় ম্যাক্সিম গোর্কির “মা’’। ক্রমান্বেয়ে তাঁর হাতে আসে ‘ছোটদের রাজনীতি’, ‘ছোটদের অর্থনীতি’। এগুলো পড়ে তিনি নিজেকে সমৃদ্ধ করে তোলেন। পঞ্চাশ দশক থেকে ষাট দশক পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টির আর্থিক অবস্থা করুণ ছিল। মানুষগুলো আধপেটা খেয়ে বেঁচে আছে। তিনি অনেক কষ্ট করে সংসার চলাতেন। সেটাও তিনি কমরেড জ্ঞান চক্রবর্তীর চাচার কাছ থেকে শিখে ছিলেন। তাছাড়া তিনি মা-চাচিদের থেকে শিখেছিলে কিভাবে প্রতিদিন ভাত রান্নার চাল থেকে দুবেলা দুমুঠো চাল অন্য হাড়িতে তুলে রাখতে হয়। যখন চাল কেনা সম্ভব তো না , তখন মুষ্ঠির চাল বের করে রান্না করতেন। সেই অল্প ভাত সবাই মিলে ভাগ করে খেতেন।মাঝে মাঝে চাচা মিনতির মাথায় বড় ঝাকায় করে বাজার নিয়ে আসতেন। আমিনা আক্তার ভাবতেন বাজার তো একটুখানি ছোট মাছ আর কিছু তরকারি, তবে এত বড় ঝাকায় কেন? চাচা বলতেন এত বড় বাড়িতে থাকি ঝাকায় বাজার না করলে লোকে সন্দেহ করবে। সে সময় এ মানুষগুলোর প্রচণ্ড সংযম দেখে তিনিঅবাক হতেন। আর ভাবতেন, তাঁর যদি কোনদিন সম্ভব হয় তবে অনেক ভাল ভাল খাবার রান্না করে কমরেডদের খাওয়াবেন। সে সুযোগ তিনি বহুবার পেয়েছেন এবং কমরেডদের তৃপ্তি ভরে রান্না করে খাইয়েছেন। এ বাড়িতে থাকা অবস্থায় একদিন জ্ঞান চক্রবর্তী গ্রেফতার হলেন। এর কয়েকদিন পর একদিন পুলিশ বাড়িটি ঘেরাও করলে সকল কমরেডরা দেয়াল টপকে বাইরে নিরাপদে চলে গেলেন। আমিনা আক্তার একাই বাড়িতে রইলেন, তাঁকে বলা হলো পুলিশ কিছু জিজ্ঞাসা করলে বলতে, সে কিছু জানে না। তবে সেদিন পুলিশ অবশ্য নীচ থেকেই চলে যায়।ওরা মূলত নীচ তলার প্রেসটিতে হানা দেয়, কিছু না পেয়ে চলে যায়। সেদিন তিনি অল্পের জন্য বেঁচে যান। ১৯৫৬ সালে বাড়িওয়ালার অনুরোধে লক্ষ্মীবাজারের বাড়ি ছেড়ে দিয়ে মালিবাগে একটি ভাড়া বাড়িতে উঠে যান আমিনা দম্পতি। সঙ্গে এলেন শুধু চাচা।একদিন কমরেড নেপাল নাগ নতুন দুজন কমরেডকে নিয়ে উপস্থিত হন মালীবাগের বাসায়। এরা ছিলেন কমরেড অনিল মুখার্জি (আমিন ভাই) এবং কমরেড সত্যেন সেন (শাজাহান ভাই)। কমরেড সত্যেন সেন এখানে থাকাকালীন আমিনা আক্তারকে সব সময় কিছু লেখা জন্য উৎসাহ দিতেন। এ কথা শুনে তিনি বলেতেন আমি তো তেমন লেখাপড়া জানি না। তখন বিখ্যাত সাহিত্যিক সত্যেন সেন বলতেন ,তোমার পুতুল খেলার গল্প গুলো সাজিয়ে লিখে আমাকে দেখাবে। কিন্তু সেই সময় তিনি কথা সাজাতে পারেন নাই। কমরেড সত্যেন সেনের মৃত্যুর অনেক বছর পর, আমিনা আক্তার যখন বার্ধক্যে পৌঁছেছেন তখন কথা সাজাতে সক্ষম হন এবং তা বই আকারে ২০১৭ সালে ছাপা হয়। বইটির নাম “রুদ্ধদিনের স্মৃতিগাথা”। এ বইয়ে তিনি তাঁর সেইসময়ের সামাজিক অবস্থা এবং গোপন আস্তানার বিভিন্ন অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। ১৯৫৮ সালে আবার বাড়ি বদল করে শান্তিনগরের চামেলীবাগে আসেন। সাথে ছিলেন কমরেড অনিল মুখার্জি (আমিন ভাই)। দীর্ঘ সাত বছর এক সাথে থাকার পর পারিবারিক ও পার্টির সিদ্ধান্তে রায়েরবাজারে ভাইয়ের নিজস্ব বাড়িতে আসলেন আমিনা-গফুর দম্পতি। ঐ সময় পার্টির কেউ এখানে থাকতেন না , তবে কমরেড অনিল মুখার্জি এ পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখতেন। এক বছর বাদে ১৯৬৬ সালে মোহাম্মদপুরের জহুরী মহললায় পুনরায় আমিনা-গফুর দম্পতিকে নিয়েকম্উিনিষ্ট পার্টির গোপন আস্তানা গড়ে উঠে। কমরেড মনি সিং ছদ্মনামে এ দোতলা বাড়িটি ভাড়া নেন। বাড়ির মালিক ছিলেন একজন অবাঙ্গালী। নীচ তলায় কমরেড অনিল মুখার্জিসহ আমিনার পরিবার আর দোতালায় কমরেড মনি সিং ও কমরেড আদুস সামাদ এর পরিবার এবং বিভিন্ন সময়ে নতুন নতুন কমরেডরা আসতেন এবং থাকতেন। কমরেড মো: ফরহাদ প্রথম এই আস্তানায় আসেন। এ বাড়িতে আর যাদের সাথে পরিচয় হয় তাঁরা হলেন অমর সেন (পরবর্তীতে বসন্ত রোগে পরলোক গমন করেন ), কমরেড হারুনূর রশীদ চৌধুরী, কমরেড আলতাফ হোসেন, ন্যাপের অধ্যাপক মুজাফফর আহমেদ , সাংবাদিক শীদুললাহ কায়সার , তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের খান ওয়ালী খান। এনারা এখানে আসতেন বিভিন্ন সময়ে সভা করতে। দোতলার দায়িত্বে ছিলেন কমরেড হাবিবুর রহমান (বাহার)। আমিন আক্তার কমরেডদের নিরাপত্তার ব্যাপারের ভীষণ সর্তক থাকতেন। এমন কি প্রয়োজনে কঠিন ত্যাগ শিকার করতেও পিছপা হতেন না। এর প্রমাণ পাওয়া যায় জহুরী মহললার বাড়িতে। সেদিন সেখানেএকটি গোপন মিটিং ছিল। আগের দিন হঠাৎ বিনা খবরে আমিনার বড় ভাই উপস্থিত হলেন। তিনি তো কমরেডদের ব্যাপারে কিছু জানতেন না। মিটিং জন্য আগে থেকেই সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছিল। আমিনা আক্তার ভিষন বিপদে পরে গেলেন। কি ভাবে ভাইকে চলে যেতে বলবেন। অবশেষে তিনি ভাইকে মিথ্যা বললেন , আমিন ভাইয়ের (তিনি চিরকুমার) পরিবার আজ রাতেই আসবেন এবং কয়েকদিন এখানে থাকবেন। সেজন্য আপনাকে অন্য কোথাও ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি মন খারাপ করে বললেন আমার তো তুমি ছাড়া ঢাকায় কেউ নেই। এসেছিলাম চাকুরির জন্য পরীক্ষা দিতে। যাহোক সেদিন তিনি মন খারাপ করে চলে গিয়েছিলেন। আমিনা আক্তারের মন খারাপ হলেও নিরাপত্তার কারণে এ ব্যবস্থা তাঁকে নিতে হয়েছিল। ১৯৬৭ সালে একদিন সকালে কমরেড মনি সিং এ বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। এর আগে কয়েকদিন ধরে এখানে সাবেক পশ্চিম পাকিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশ থেকে আগত নেতৃস্থানীয় নেতাদের নিয়ে বিভিন্ন জেলার পার্টির নেতাদের একটি সভা চলে। বোধকরি সেই সভাতেই কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হয়ে যায়। পর দিন পত্রিকায় কমরেড মনি সিং এর ছবিসহ গ্রেফতারের খবর ছাপা হলে আমিনা আক্তার আতংকিত হয়ে পড়েন ছেলে-মেয়েদের জন্য। ছবি দেখামাত্র ওরা চিনে ফেলবে। আসল নামের সাথে ছদ্মনামের পার্থক্য কি করে বোঝাবেন। ওরা যে এখন এসব কিছু জানেনা। এ কঠিন সমস্যা থেকে আমিনা আক্তারকে উদ্ধার করলেন কমরেড অনিল মুখার্জি। সেদিন তিনি কি বুঝিয়েছিলেন তা আজ আর মনে নেই। রাতে আঁধারে সব কমরেডরা একে চলে গেলেন অন্যত্র। পেছনের দরজা দিয়ে দোতলার সব জিনিসপত্র ট্রাকে করে সরিয়ে ফেলা হলো। গভীর রাতে (রাত ১০/১১ টা) যখন ছোট ট্রাক আসতো জিনিসপত্র নিয়ে যেতে তখন মনে হতো পুলিশ এসেছে, এই বুঝি সবাইকে ধরে নিয়ে যাবে। এমনি আতংকের মধ্যে কয়েকদিন কাটার পর হঠাৎ একদিন কমরেড মো. ফরহাদ শুক্রাবাদের একটি বাসার খোঁজ দিয়ে বলে গেলেন ওখানে চলে যেতে। শুকরাবাদের বাসা শুধু আমরাই এলাম। তবে মাঝে মাঝে কমরেড মো. ফরহাদ রাতের বেলা এসে আমাদের খোঁজ নেয়ে যেতেন, আর আসতেন অনিল মুখার্জি।এ ভাবে চলেছে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত। প্রয়োজনে এ আস্তানাটি ব্যবহার করেছে নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টি গোপন আস্তানা হিসেবে। কমরেডদের প্রতি এই দম্পতির অদ্ভুত এক ভালবাসা ছিল। মাঝেমধ্যে ভাল ভাল রান্না করে এদের খাওয়াতে ভালবাসতেন। আমিনা আক্তারের রান্নার সুখ্যাতি ছিল। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ, কালরাত্রি। খাটের নিচে কাটালেন। এ অবস্থায় কমরেডদের সাথে যোগাযোগ করা অসম্ভব। দেশে কারফিউ চলছে। ঘর ভর্তি পার্টির চার-পাঁচ বাক্স গোপন দলিল ওবইপত্র ছিল যা দুজনে মিলে উঠোনের মধ্যে গর্ত করে মাটি চাপা দিয়ে রাখলেন। পরদিন একটু সময়ের জন্য কারফিউ উঠে গেলে কমরেড মো: ফরহাদ এলেন খোঁজ নিতে। তিনি বইপত্র ও দলিলগুলো ব্যবস্থা করা হয়েছে শুনে খুশি হলেন এবং যাবার সময় বলে গেলেন, আপনারা সুযোগ বুঝে এখান থেকে চলে যাবেন, আমি হয়তো আর আসার সুযোগ পাবো না। এর মধ্যে বৃষ্টি হয়ে সব বইপত্র ভিজে নষ্ট হয়ে গেলো। অসম্ভব দুঃসাহসের সাথেভিজা বইগুলো রোদে শুকিয়ে বাক্স ভরে ঘরের সিলিংয়ের উপর রেখে দিলেন। কিন্তু বেশিরভাগ বই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ঢাকার অবস্থা আরো খারাপের দিকে গেলে তারা সিরাজগঞ্জ চলে যান। মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাস এখানে সেখানে ছোটাছুটি পর নভেম্বরের দিকে ঢাকায় চলে আসেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি প্রকাশ্যে কাজ শুরু করলে আমিনা আক্তার প্রকাশ্যে কাজ করার সুযোগ পান। এবার তিনি আনন্দের সাথে শুক্রাবাদ, তললাবাগ, সোবাহানবাগ ও জুট কলোনিতে পার্টির গ্রুপ গড়ে তোলেন। এলাকা জুড়ে পার্টি সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘একতা’ বিলি করতেন। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের শুক্রাবাদ শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। এর ধারাবাহিকতায় তিনি ঢাকা সিটির সহ-সভানেত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯৩ সালে পর্যন্ত মহিলা পরিষদে সাথে নানা কাজে ছিলেন। ১৯৭৩ সালে তিনি শুক্রাবাদে বয়স্ক স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। কবি বেগম সুফিয়া কামাল স্কুলটি উদ্বোধন করেন। এখানে মূলত বস্তির মেয়েরা লেখাপড়া করত। তাঁর উদ্যোগে এলাকায় সমবায় সমিতি গড়ে উঠে। এ সমিতির উদ্যোগে স্বল্পমূল্যে শিশুখাদ্য, শাড়ি, লুঙ্গি, তেল, সাবান ইত্যাদি বিক্রি হতো। ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষের সময় তিনি শুক্রাবাদ শাখা থেকে মিরপুর লঙ্গরখানায় খিচুরী রেঁধে পাঠাতেন দুর্ভিক্ষপীড়িতদের জন্য। ১৯৮৮ সালে বন্যায় তিনি বস্তিবাসীদের আশ্রয় ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি তাঁর এই বহুমুখী কাজ এবং পার্টি কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ায় একাগ্রতা, বিশ্বস্ততা ও সাহসিকতার ফলস্বরূপ ১৯৭৪ সালে পার্টির সদস্যপদ লাভ করেছিলেন। আমিনা আক্তার যে স্বপ্নের দেশের গল্প শুনে গোপন কমিউনিস্ট পার্টির দায়িত্বভার কাঁধে নিয়েছিলেন, সেই স্বপ্নের দেশ তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়েছিলেন ১৯৮৪ সালে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে। তাঁকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি থেকে সেখানে পাঠানো হয়েছিল। যে সমাজতন্ত্রের জন্য তিনি এত সংগ্রাম করছেন, সেই সমাজতান্ত্রিক দেশ দেখতে পেরে খুব খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু নিজের দেশে সমাজতন্ত্র দেখার আশা পূরণ হয়নি। পার্টির মধ্যে মতাদর্শে পার্থক্য দেখা দিলে ১৯৯৩ সালে থেকে তাঁরা চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। তবে কমিউনিস্ট মতাদর্শ থেকে কখনই সরে দাঁড়াননি। শেষ বয়সে এসে লেখালেখি করা, খবরের কাগজ পড়া, কাপড় দিয়ে নানা রকমের পুতুল বানানো, বিভিন্ন ধরণের রান্না করে আত্মীয়-স্বজনদের খাওয়ানোই ছিল তাঁর আনন্দ। আজ আর সেই কমরেডরা কেউ বেঁচে নেই। জীবনসঙ্গী আবদুল গফুরও চলে গেছেন দীর্ঘ আট বছর হলো। এবার তিনিও সেই পথে পাড়ি জমালেন। লোকচক্ষুর অন্তরালে পার্টির এসকল নিবেদিতপ্রাণদের আর কেউ কোনদিন মনে রাখবে কি-না জানি না। মৃত্যুকালে তিনি দুই মেয়ে, এক ছেলে, নাতি-নাতনি, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধব রেখে গেছেন। কমরেড আমিনা আক্তার লাল সালাম। লেখক: আমিনা আক্তারের মেয়ে

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..