শোষণমুক্তির আকাঙ্ক্ষায় মে দিবস

অমিত রঞ্জন দে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
শ্রম ছাড়া উৎপাদন সম্ভব নয়, শ্রমের মর্যাদা ছাড়া গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা ছাড়া উৎপাদনশীল মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব না। শ্রম এবং মেধা দিয়ে যে উৎপাদন তা থেকেই সমাজ বিকশিত হয়, পুঁজি বিকশিত হয়। কিন্তু মানুষ যখন কৃষি থেকে বিচ্যুত হয়ে শিল্পে এসেছে তখন থেকে পুঁজিপতিরা ক্ষুদ্র থেকে দ্রুতই বড় হতে শুরু করে এবং যে মানুষ কৃষক থেকে শ্রমিকে রূপান্তরিত হয়েছে তারা সত্যিকার অর্থে সর্বহারা শ্রেণী হিসেবে আরো কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ে। পুঁজির মালিক শ্রমিকের সাথে ক্রীতদাসের মত আচরণ শুরু করে, তাদের উপর চালাতে থাকে শোষণ, নির্যাতন। শ্রমিকদেরকে এমনভাবে পুঁজির জালে আবদ্ধ করে ফেলে যে তাঁরা বাঁচার জন্য ১২ ঘন্টা, ১৪ ঘন্টা, ১৬ ঘন্টা, ২০ ঘন্টা কাজ করতে বাধ্য হয়। ভবিষ্যতে একটা সুন্দর পৃথিবীর কথা চিন্তা করারও সময় তারা পায় না। এই পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে একটি সমতার সমাজে উত্তরণ ঘটানোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নেতারা সমাজবিপ্লবের দায়িত্ব পালন করলো। ১৮৭৯ সালে প্যারিসে প্যারি কমিউন বিপর্যয়ের পর শ্রমিকরা আট ঘন্টা কাজের দাবিতে রাস্তায় নেমে পড়ে। আমেরিকার শিকাগো শহরের প্রায় ৪০ হাজার কারখানার শ্রমিকদের নিয়ে আট ঘন্টা কাজের দাবিতে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। তারা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করতে থাকে। কিন্তু মালিকরা ভীত হয়ে অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপ শুরু করে এবং আন্দোলনকারীদের নামে নানা ধরনের অপপ্রচার চালাতে থাকে। তারা ১৮৮৬ সালের ১লা মে শ্রমিকদের যে সমাবেশ হয় সেখানে আক্রমণ চালায় এবং তাতে অনেক লোক মারা যায়। একটা পর্যায়ে মালিক শ্রেণী আট ঘন্টা কাজের দাবি মেনে নেয়ার ঘোষনা দিতে বাধ্য হয়। ১৮৮৬ সালের সেই রক্তাক্ত মে দিবসের পর ১৩৫ বছর পার হয়েছে। এইদিনে আমেরিকার শিকাগো শহরের শিল্পাঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষ ৮ঘন্টা কাজের দাবিতে যে সংগ্রাম গড়ে উঠে সে সংগ্রামে অসংখ্য শ্রমিক রক্ত ঝরায়, মিথ্যা মামলায় অনেক শ্রমিক নেতাকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। তাদের রক্ত ও জীবনের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রমিকের ৮ঘন্টা কাজের দাবি। যে কারণে সারা দুনিয়ার শ্রমজীবী মানুষের কাছে মে দিবস একটি ঐতিহাসিক দিবসে পরিণত হয়। সে সত্যটি আজ চাপা পড়ে গেছে। অভিজ্ঞতা আমাদেরকে এই শিক্ষা দেয় যে, শোষণমূলক ব্যবস্থা বহাল রেখে শ্রমিকের অধিকার, গণতন্ত্র, মানবাধিকার কোনো কিছুই প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না। সম্প্রতি বাঁশখালিতে ঘটে যাওয়া ঘটনা তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ। মে দিবসে ৮ ঘন্টা কাজের দাবি ছিল প্রাকাশ্যে কিন্তু এর অন্তরালে ছিলো শোষণমুক্তির আকাঙ্ক্ষা। এক মানবিক কর্মপরিবেশের সার্বজনীন অধিকারের অনুরণন তোলার লক্ষ্যে মে দিবস যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল তা আজ বাংলাদেশসহ সারাবিশে^র শ্রমিকরা অর্জন করতে পারেনি। বরং তারা মালিকের হাতের পুতুল হয়ে ‘যেমনে নাচায় তেমনে নাচে।’ বেঁচে থাকার মত মজুরি বা বকেয়া মজুরি আদায়ে শ্রমজীবী মানুষকে বারবার আন্দোলনে নামতে হচ্ছে। শ্রমজীবী মানুষের শ্রমের ফলেই উৎপাদন বাড়ছে, রপ্তানি আয় বাড়ছে। জিডিপি বাড়ছে কিন্তু শ্রমিকের মজুরি ন্যায়সঙ্গতভাবে বাড়ছে না। মজুরি বৃদ্ধির সাথে সাথেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ঘটছে ফলে শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়ন কঠিন হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে বকেয়া মজুরি চাইতে গেলে তাদের উপর নির্বিচারে গুলি চালানো হচ্ছে। রাষ্ট্রকাঠামো সেখানে মালিকের তাবেদার হয়ে নীরব দর্শক। অপুষ্টিতে ভুগছে বিশে^র যে বিপুল সংখ্যক মানুষ এদের অধিকাংশই শ্রমজীবী। উৎপাদন ও বন্টনের এক চরম বৈষম্য পরিলক্ষিত সর্বত্র। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জনসংখ্যা যেমন বেড়েছে খাদ্য উৎপাদনও বেড়েছে তার থেকে অধিক হারে। কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি, তাদের অপুষ্টি কমেনি। বৈশি^ক মহামারি করোনার অভিঘাতে সে সংকট আরো প্রকট হয়েছে। ক্রমাগত লগডাউন, কারখানা বন্ধ, শ্রমিক ছাঁটাইয়ে শ্রমজীবী মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। অন্যদিকে বিশে^র ধনীদের সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ৬ এপ্রিল প্রকাশিত ফোর্বস ম্যাগাজিনের ৩৫তম বার্ষিকীতে প্রকাশিত বিলিয়নদের তালিকা থেকে জানা গেছে সম্পদের পাশাপাশি ধনীদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বহুজাতিক আর্থিক পরামর্শ দানকারী প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ এক্স-এর সম্প্রতি এক গবেষণায় গত এক দশকের (২০১০-২০১৯) সম্পদ পর্যালোচনা ও সামনের ১০ বছরের সম্পদ বন্টনের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে যে প্রতিবেদন দিয়েছে তাতে দেখা গেছে ধনী দেশগুলোর প্রথম দশটির মধ্যে ৬টি দেশের অবস্থান এশিয়াতে এবং এই তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম। বিশে^র প্রায় সবদেশেই ধনী-গরীবের বৈষম্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ এ বৈষম্য দুর করে মানবিক সমাজের প্রত্যাশাতেই মহান মে দিবসে শ্রমঘন্টা কমানোর দাবি উঠেছিল। ১৩৫ বছর আগে এতোগুলো জীবনের বিনিময়ে যে সংগ্রাম গোটা পৃথিবীকে বদলে দেয়ার পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল আজ তা আবার পুঁজির শাসন ছিনিয়ে নিয়েছে। অত্যন্ত সুকৌশলে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। আইনগতভাবে ট্রেড ইউনিয়ন করতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু আইনগুলোতে ফাঁক ফোকর রেখে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে, কোনো শ্রমিক যদি ট্রেড ইউনিয়ন করতে যায় তাহলে সে তার চাকরি হারাবে। কারণ মালিককে অধিকার দেয়া হয়েছে ১২০ দিনের বেতন দিয়ে সে যে কোনো পর্যায়ের কর্মীকে যখন খুশি ছাটাই করতে পারবে। এরপর রয়েছে অসংখ্য মামলা দিয়ে তাকে হয়রানি করা হয়। এভাবেই সুকৌশলে শ্রমিক আন্দোলনের পথ রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি অত্যন্ত সুকৌশলে অর্থ বিনিয়োগ করে সেমিনার সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে ভালো ভালো কথা বলে মালিকের বিরুদ্ধে শ্রমিকের যে ক্ষোভ, ধিক্কার, তাদের অধিকারের কথা বলার যে শক্তি সেটাকে অবদমিত করে রাখছে। এদের ভোজবাজিতে একজন ভালো শ্রমিক নেতা ক্রমান্বয়ে সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবীতে পরিণত হচ্ছে। ফলে শ্রমিক অধিকার আদায়ের যে স্বপ্ন তা স্বপ্নই থেকে যাচ্ছে। পুঁজির কাছে শ্রমিকের দাসত্ব আরো প্রলম্বিত হচ্ছে। ১৮৮৬ সালে আমেরিকাতে যে শ্রমিক আন্দোলন হয়েছিল তার বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের সবটাই কিন্তু সেদিন শ্রমিকরাই করেনি। সেখানে যুক্ত হয়েছিলেন বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীরা। তারা শ্রমিকের উপর ঘটে যাওয়া জুলুম-নির্যাতনকে অন্যায় মনে করতেন। যেকারণে তারা শ্রমিকদের সংগঠিত করতে, তাদের চিন্তা-চেতনা এবং লড়াইটাকে একটি উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, শ্রেণী সংগ্রামে রূপদান করে সমাজ বিপ্লবের চেতনাকে জাগ্রত করতে তারা নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। শ্রমিকদের সাথে থেকে আন্দোলনের ভেতর দিয়ে তাদেরকে সমাজ বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করে তুলেছিলেন। বর্তমানে শ্রমজীবী মানুষের চেতনার জায়গায় ভয়াবহ অবনতি হয়েছে। পঁচিশ-ত্রিশ বছর আগেও শ্রমিকদের চেতনা যে স্তরে ছিল এখন সে অবস্থানে নেই। কারণ তারা আজ বিভ্রান্ত হয়ে দ্বি-দলীয় রাজনীতির পুতুল হয়ে গেছে। তারা নির্দিষ্ট একটা জায়গায় আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এখান থেকে শ্রমিকদের বের করে এনে তাদের নিজস্ব শক্তিতে দাঁড় করাতে হবে। তার জন্য ১৮৮৬ সালের মত মানবতাবাদী, সংস্কৃতিসেবক ও বুদ্ধিজীবীদেরকে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। শ্রমিক আন্দোলনের সাথে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সংযোগ তৈরি করতে হবে। শ্রমিকের চেতনার জায়গাটাকে আরো তীক্ষè-ধারালো করে তুলতে হবে। শ্রমিকের যে অধিকার আছে, তারা যে দাবি করতে পারে, তাদের যে দাবি করার অধিকার রয়েছে সেই বোধ বা চেতনা জাগাতে হবে। তাদের মধ্যে এই বোধ তৈরি এবং তাদের দুর্বলতম ক্ষেতসমূহ চিহ্নিত করে শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী ও শ্রমিক শ্রেণীর যুথবদ্ধতায় শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হবে। শ্রমজীবী মানুষকে সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক চেতনায় জাগিয়ে তুলতে পারলে তারা আজকের এই মানবেতর জীবন-যাপন করছে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। আজকে দেশের অভ্যন্তরে আয় বৈষম্য যে রুদ্রমুর্তি ধারণ করেছে, পুঁজিপতি মালিক, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও ধর্মব্যবসায়ীদের যে আতাত গড়ে উঠেছে সেটাকে প্রতিহত করে তারা একটি শক্তিশালি শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে। প্রতিহত করা যাবে লুটপাটতন্ত্র, অন্যায়, নির্যাতন, সন্ত্রাসবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতার মত সকল অশুভ শক্তিকে। শ্রমজীবী মানুষ আর শোষণমুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে যারা লালন করেন সেইসমস্ত শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী-রাজনীতিকের মিলিত চেষ্টায় মেদিবসের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন একদিন ঘটবেই। আর সেদিন আমরা শে^তকপোত আঁকা শান্তি পতাকা হাতে পা রাখতে পারবো মুক্ত মানবের মুক্ত সমাজে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..