অসংগঠিত সেক্টরে প্রয়োজন প্রশিক্ষিত ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী

রাহাতউল্লাহ্ জাহিদ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
ট্রেড ইউনিয়নিস্ট হবো না কমিউনিস্ট এমন একটা অদ্ভুত দোটানা আছে। 'কমিউনিস্ট' ট্যাগটা একটা বিশেষ বয়েসের দারুণ পছন্দের ঝোঁক। ঝাঁকে ঝাঁকে শিক্ষিত তরুণ প্রতি বছর বেরিয়ে আসেন। শিক্ষা, সংস্কৃতি, মনুষ্যত্বে উন্নত মেধাবী তরুণদের মধ্যে শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার মানসিকতা তৈরী না হওয়ার বিষয়টা সাধারণত তাদের ওপর চাপিয়ে পাশ কেটে আমরা বেরিয়ে যাই। কিন্তু আর দশটা সামাজিক মানুষের মতো তার টানাপোড়েন নিয়ে বোঝা ও যত্নবান কতটুকুই আমরা হলাম সে প্রশ্ন কি থেকে যায়না? ছাত্র আন্দোলন থেকে শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত আত্মত্যাগী বিপ্লবী তাজুলের কথা প্রসঙ্গত আমরা সবসময়ই বলে থাকি। কিছু বই পত্তরও পড়তে বলি। অনীল মুখার্জীর 'শ্রমিক আন্দোলনের হাতেখড়ি' অথবা জসিমউদ্দিন মন্ডলের 'জীবনের রেলগাড়ী'! রাশান বইগুলোর অনুবাদ বড্ড দাঁত কিড়মিড় করে। বই পড়লেই ধুম করে জীবন নিয়ে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা সম্ভব হয়না। বাস্তবও নয়। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে কার্যকর ভূমিকা নিতে হয় শ্রমিকশ্রেণীর পার্টিকে। পার্টিকেই শ্রমিক আন্দোলনে নিজস্ব সামর্থ্য যেটুকুই হোক তার বাস্তব উপলব্ধি অনুযায়ী একটি স্কোয়াড প্রস্তুত করতে হয়। রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল ছাড়া ভিন্ন উপায়ে সমাজ বদল সম্ভব নয় এবং শ্রমিকশ্রেণীর নিজস্ব পার্টি ছাড়াও তা নয় বলে। সব ট্রেড ইউনিয়নিস্টই কমিউনিস্ট নয়। তবে রাজনৈতিক প্রশিক্ষিত ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী গড়ে তোলা একটি সেনাবাহিনী গড়ে তোলারই মতো আর কারখানাগুলো হলো তার দূর্গ। স্বাধীনতার পর সত্তুর ও আশির দশকে শ্রমিকশ্রেণীর নিকটতম সংঘবদ্ধ অবস্থান অনুযায়ী পাট, সুতো, বস্ত্রকল ও প্রাতিষ্ঠানিক সেক্টর যথা রেল, বিভিন্ন কর্মচারী সংসদসমূহে পরিকল্পিত ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে ওঠে। যা একটি সাধারণ শুণ্যাবস্থা থেকে শ্রমিক আন্দোলনকে মাধ্যমিক স্তরে উন্নীত করে। রাজনৈতিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ হওয়ার লক্ষণের সাথে শ্রমিক আন্দোলনে গতি সঞ্চার হয়। এরশাদের আমলে পাটকলগুলোয় যে ব্যাপক ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে ওঠে প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শ্রমিকদের শক্তিশালী অংশগ্রহণ তার প্রতিফলন বহন করে। এসময় অসংগঠিত সেক্টরে সড়ক ও নৌ পরিবহন শ্রমিক সংগঠনগুলোও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। সংগঠিত ও অসংগঠিত সেক্টরে বিপ্লবী ধারার ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার যুগপৎ উদ্যোগ আশির দশকজুড়ে দেখা যায়। এসময় রাজনীতিতে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রাধান্য থাকায় শ্রমিক সংগঠনে কর্মরত বিপ্লবী কর্মীদের জাতীয় গণতান্ত্রিক কর্মসূচীভিত্তিক তাগিদ থাকায় এবং স্বৈরাচার পতন ও গণতন্ত্র মুক্ত করার সংগ্রামের সাথে শ্রেণীকর্তব্যের মধ্যে সমন্বয় করে কর্মসূচী ঠিক করতে হয়। প্রসঙ্গটি একারণে উল্লেখ করলাম যাতে বোঝা যায় যে, সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ঝোঁক কার্যত ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে চালিত করে। আজ যখন চতুর্দিক ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে বিপর্যস্ত ও বিক্ষিপ্ত দেখতে পাওয়া যায়, তারও অন্তর্নিহিত কারণও সেটিই। সোভিয়েটকেন্দ্রীক সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার বিপর্যয় যখন বাংলাদেশে বিকাশমান বিপ্লবী রাজনৈতিক শক্তিকে খন্ডিত করে ফেলতে সক্ষম হয় তখন অপেক্ষাকৃত দুর্বল অংশটিকেই চালকের আসনে বসতে হয়। স্বাভাবিকভাবে ট্রেড ইউনিয়নেগুলোতে বিপ্লবী কর্মীভবন গড়ে তোলার প্রক্রিয়া তার গৌরবময় অতীত হারায়। বিগত দুই দশকে লুটেরা ধনবাদী ধারার অর্থনীতি বিকশিত হলে ট্রেড ইউনিয়নগুলো তারই ঘেরাটোপে বন্দী হয় যা শাসকশ্রেণীকে ক্ষমতা অটুট রাখতে সহায়তা করে। চারদলীয় জোটের হাতে আদমজী আর বর্তমান মহাজোটের হাতে সমগ্র পাটশিল্পই বিশিল্পায়ন ও শিল্প বিলোপের ঝুঁকি বইছে। পুরনো প্রতিষ্ঠিত সিবিএ-নন সিবিএ ইউনিয়নগুলোতে শ্রমিক স্বার্থবিরোধী বিপথগামী দালাল নেতৃত্ব শতভাগ নিয়ন্ত্রণে থাকায় পাটকল আন্দোলনের বর্তমান পরিস্থিতি আমরা সবাই জানি। মূলতঃ সংগঠিত ও অসংগঠিত সেক্টরে বিগত চার দশকে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক কর্মীদের অনেকে শিবির বদলে ফেলায় শুণ্যাবস্থা তৈরী হয় যা বিদ্যমান এখনো। গার্মেন্টস শিল্প একটি মৌলিক শিল্প হিসেবে গড়ে না ওঠার ফলে তিন দশকে দেশের রপ্তানী খাতের বৃহত্তম অংশীদার বলা হলেও এর বিনিয়োগে পুঞ্জিভূত অর্থনৈতিক অগ্রগতি খুবই সামান্য। বাস্তবে লুটেরা মালিকদের বাড় বাড়ন্তই প্রতীয়মান। তথাপি গার্মেন্টস সেক্টরে সংখ্যায় কম হলেও বিপ্লবী ধারার ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীদের যোগদান সেক্টরটিতে এতদকাল চলমান তীব্র শোষণের বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি সত্যিকার সংগ্রামী চিত্র জাতীয় শ্রমিক আন্দোলনে নতুন এক দিকের উম্মোচন ঘটায়। কিন্তু সেখানেও এনজিও, উদ্যোক্তা, দালাল প্রবৃত্তির নেতৃত্ব আস্তে আস্তে প্রায় দখল করার পথে। তবে একটি কথা উল্লেখ করতে হয়। দালালদের অবস্থানে বিশালতা আছে বলেই শক্তিতে কম হলেও বিপ্লবী অংশটিকে চেনা যায়। দীর্ঘ পরিক্রমা আর অভিজ্ঞতা এই বলে দেয়, একটি জাতীয় রাজনৈতিক প্রয়োজনে যেমন একসময় সংগঠিত সেক্টরে বিপ্লবী ধারার ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীরা ঢুকে পড়ে, লেগে পড়ে ছিলেন আজ তার প্রয়োজন বেড়েছে আরো কয়েকগুণ। যেহেতু বিশিল্পায়ন, বহুজাতিক বিনিয়োগসহ অর্থনীতি সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর সেহেতু শ্রমিক শোষণ ও নিপীড়নের ক্ষেত্রে তার চরিত্র বহুলাংশে ফ্যাসিবাদ অনুগামী। এখন খোদ গার্মেন্টস মালিকদের বায়ারের চাপে ট্রেড ইউনিয়নের অস্তিত্ব দেখাতে হয়। আর অত্যাচার বেড়ে চলে দিনদিন। ঘাড় ফেরালে চাকুরী নেই। কোন শ্রম আইনেরই তোয়াক্কা নেই। দেশীয় মালিকদের দেখে বিদেশী মালিকেরাও শিখছে। আর শিল্প পুলিশ আছে লাঠি হাতে। আরো আরো বিবরণ আছে নাই বা লিখি। অসংগঠিত সেক্টরে আছে চরম মৃত্যু ঝুঁকিতে থাকা শিপ ব্রেকিং, নির্মাণ ইত্যাদি। আছে হোটেল, বেকারী, রিকশা-ভ্যান ইত্যাদি যেগুলো প্রাতিষ্ঠানিক শিল্প নয় অজুহাতে চরম নির্যাতন সহ্য করে কোনমতে বেঁচে থাকে শ্রমিকরা। এই যে, এতো বড় বড় খাত এখানে আমরা কাজ করার লোক পাইনা। ওদের সাথে কাজের ধরণটা অনেকেই অর্থনীতিবাদী বললেও আমার অভিজ্ঞতায় তা অস্তিত্ববাদী। হোটেল, বেকারী, পরিবহন (সড়ক ও নৌ), গার্মেন্টস, নির্মাণ ইত্যাদি খাতগুলোয় কাজ করা শ্রমিকের সংখ্যা মোট এখুনি আমার জানা নেই। কিন্তু গোটা দুই দশকে একটা নতুন জেনারেশন এখানে শ্রম দিচ্ছে যাদের চিন্তা মনন, বুদ্ধিবৃত্তিতে একটু বিপ্লবী অগ্নিসংযোগ ঘটালে এবং বিষয়ীগত লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর বাহিনী তৈরী করা ছাড়া দেশের আর্থসামাজিক পরিবর্তন কি আদৌ সম্ভব? এই দায়িত্বটা নেবে কে? সত্তুর আশির দশকের বর্ষীয়ানরা ন্যুয়ে পড়ছেন বয়েসের কাছে। নতুন এই জেনারেশনের শ্রমিকশ্রেণীর দায়িত্ব নিতে তাদেরই ভাষা বুঝতে পারা, তাদের শেখাতে ও তাদের কাছ থেকে শিখতে পারা একটা প্রশিক্ষিত রাজনৈতিক ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীবাহিনীর বিকল্প আমার জানা নেই। আবার আগের কথারই পূণরাবৃত্তি করি। বর্তমান সময়ের নির্ধারিত রাজনৈতিক কর্তব্যটি সঠিক সময়ে সমাধার জন্যেই শ্রমিকশ্রেণীর ভেতরে ঢুকে পড়া জরুরী। এটা পার্টিজানদের জন্যে বুনিয়াদী কর্তব্য। শ্রমিকশ্রেণীর চেয়ে এতোবড় শক্তি আর কারোই নেই যারা মুহুর্তে সবকিছু অচল করে দেয়ার ক্ষমতা আছে জেনেও সবকিছু সচল রাখে। লেখকঃ সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (টিইউসি), চট্টগ্রাম জেলা কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..