মে দিবস: কেমন আছেন শ্রমজীবী মানুষ

সুতপা বেদজ্ঞ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মানুষ যে সভ্যতার বড়াই করে, যে উন্নয়নের গল্প শোনায় সে উন্নয়ন বা সভ্যতা নির্মাণ করে শ্রমিকের সুগঠিত হাত। অথচ এখনো পর্যন্ত শ্রমিক থাকে অভূক্ত, ফাঁকিতে পরে শ্রমিকের মজুরি ও কর্মঘন্টা। শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্য, পেটে দু’মুঠো খাবার যোগানোর আশায় তারা মুখবুজে তাদের ওপর ঘটে যাওয়া সব অন্যায় যুগের পর যুগ সহ্য করে চলে। বছরের পর বছর মহান মে দিবস শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির বার্তা নিয়ে আসে ঠিকই, কিন্তু অধিকাংশ শ্রমজীবী মানুষের কাছে আজও সে বার্তা পৌঁছায় না, অথবা এমনভাবে পৌঁছায় যাতে শ্রমজীবী মানুষের মুক্তি মেলে না। একথা সত্য একসময় পৃথিবীতে কোন মালিক ছিল না। যখন শ্রমই ছিল সব মানুষের পেশা। ধীরে ধীরে দাসপ্রথা এল। মালিক-শ্রমিক তৈরি হল। সামন্ত ও বর্তমান পুঁজিবাদ দাস ব্যবস্থারই মোডিফায়েড রূপে শ্রমিককে মজুরি কম দিয়ে এবং অতিরিক্ত সময় কাজ করিয়ে উদ্বৃত্তমূল্যের পরিমাণ বাড়িয়ে সম্পদের পাহাড় গড়তে শুরু করল। তারই প্রতিবাদে জন্ম হলো মে দিবসের। দিবসটি পুঁজিবাদী শোষণ ব্যবস্থার দগদগে ঘা কে স্মরণ করিয়ে দেয়, যা আজো পর্যন্ত মালিকশ্রেণি মলম দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা করে চলেছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিকেরা কখনোই নিরাপদ ছিল না, আজও নেই। কিন্তু করোনাকাল সেই নিরাপত্তাহীনতা বহুগুন বাড়িয়ে তুলেছে, শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকাকে ফেলে দিয়েছে চরম বিপদের মধ্যে। শিল্পবিপ্লবের পর শ্রমিক বলতে শুধুমাত্র কল-কারখানায় কাজ করা শ্রমজীবী মানুষকে বোঝানো হতো। সময়ের সাথে সাথে শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষ এখন ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। রিক্সা-শ্রমিক, অটো-রিক্সা শ্রমিক, নির্মাণের সাথে যুক্ত শ্রমিক, হোটেল শ্রমিক, গৃহপরিচারিকা শ্রমিক, মৎস্যজীবী, দিনমজুরসহ অসংখ্য পেশার সাথে যুক্ত শ্রমিক যারা কায়িক পরিশ্রম করে সবচেয়ে বেশি কিন্তু মজুরি যা পায় তা দিয়ে জীবন চলে না। তাদের সংগঠনের অধিকার নেই, বিশ্রামের সময় নেই,স্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা নেই আর বিনোদনতো দূরের কথা। বর্তমান করোনাকালে এ সকল পেশার মানুষ অধিকাংশই বেকার হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে এ সংখ্যা বর্তমানে প্রায় চার কোটি। গত এক বছরে এ সকল শ্রমজীবীদের মধ্য থেকে মাত্র ৩৬ লক্ষ পরিবার সরকারি তহবিল থেকে ২৫০০ টাকা সহযোগিতা পেয়েছে। এ বছরেরও তারা পাবে বলে সরকারি মাধ্যম থেকে ঘোষণা করা হয়েছে। এ তো গেল অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক। এ সময়ে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকেরা কেমন আছে। এপ্রিল ২০২১ এ চট্টগ্রামের বাঁশখালিতে মালিকপক্ষের সরাসরি ইন্ধনে সরকারি পেটোয়াবাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে সাতজন শ্রমিক। আহত হয়েছে আরও অনেক শ্রমিক। ওরা দাবী করেছিল কর্মঘন্টা কমানোর, চেয়েছিল টিফিনের সময়। ২০২০ এর জুলাই মাসে যখন করোনার প্রথম ধাক্কা চলছে ঠিক তখন এক ঘোষণায় একসাথে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পঁিচশটি পাটকল বন্ধ করে দেয় সরকার। প্রায় ষাট থেকে সত্তর হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ল। জীবিকা কেড়ে নিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়া হল । বদলি শ্রমিকেরা সরকারি কোন সুযোগতো পেলই না অধিকন্তু তাদের ন্যায্য মজুরি পর্যন্ত এখনো দেয়া হয়নি। যখন করোনায় দেশে লকডাউন জারি হল তখন শুধুমাত্র গার্মেন্টস মালিকদের চাপে গার্মেন্টস খোলা রাখা হল। সরকার প্রনোদনা দিল গার্মেন্টস মালিকদের। হতভাগ্য শ্রমিকদের কপালে ন্যায্য মজুরিও জুটল না। অনেক গার্মেন্ট শিপমেন্টের সমস্যাসহ নানা সমস্যায় লোকসান দেখিয়ে কারাখানা বন্ধ করে রেখেছে। এ সময় প্রকাশিত ভার্চুয়াল এক জরিপের ফলাফল বলছে এই খাতের কর্মীদের দেনার দায় বেড়েই চলেছে। গত একবছরে বিভিন্ন খাতের হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়ে ঢাকা শহরে বাড়ি ভাড়া দিতে না পেরে গ্রামে ফিরে এসেছে। বিভাগীয় শহরসহ ছোট ছোট শহরগুলোতে এখনো পর্যন্ত অনেক শ্রমজীবী রয়েছেন যারা দু’তিন হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া পর্যন্ত দিতে পারছেন না। তাহলে তারা কেমন আছেন সে কথা সহজেই অনুমান করা যায়। ফিরে দেখা যাক মে দিবসের ইতিহাস। শিল্প বিপ্লবের পর থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কারখানাগুলোতে কাজের সময় ও মজুরি নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। শুরু হয় ছোট ছোট আন্দোলন। এ সকল আন্দোলনের বেশির ভাগই ছিল ধর্মঘট। ১৮৮১ সালে থেকে ১৮৮৪ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে বছরে গড়ে পাঁচশ ধর্মঘট হয়। এ সকল ধর্মঘটে প্রায় দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক অংশগ্রহণ করে। পরবর্তী বছরে এ সংখ্যা বেড়ে প্রায় সাতশ হয়ে যায় এবং প্রায় আড়াই লক্ষ শ্রমিক এ সকল ধর্মঘটে যোগদান করে। আন্দোলনের মাত্রা বাড়ার সাথে সাথে মালিকদের শোষণের মাত্রাও বাড়তে থাকে। ১৮৮৬ তে যক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকেরা উপযুক্ত মজুরি আর দৈনিক আটঘন্টা কাজের দাবীতে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলেন। কল-কারখানা তখন গিলে খাচ্ছিল শ্রমিকের গোটা জীবন এখনও যেমন খাচ্ছে। অসহনীয় পরিবেশে প্রতিদিন ১৬ ঘন্টা কাজ করতে হতো। সপ্তাহজুড়ে কাজ করে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য একেবারে ভেঙে যাচ্ছিল। শ্রমজীবী শিশুরা হয়ে পড়েছিল কঙ্কালসার। তখন দাবি উঠেছিল, কল-কারখানায় শ্রমিকের গোটাজীবন কিনে নেয়া যাবে না। ৮ঘন্টা শ্রম দিনের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনের সময় ঐ বছরের ১লা মে শ্রমিকেরা ধর্মঘট আহ্বান করে। প্রায় তিন লক্ষ মেহনতি মানুষ ঐ সমাবেশে অংশ নেয়। আন্দোলনরত ক্ষুব্ধ শ্রমিকদের রুখতে গিয়ে এক সময় পুলিশবাহিনী শ্রমিকদের মিছিলে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। গুলিতে ১১জন নিরস্ত্র শ্রমিক নিহত হন, আহত ও গ্রেফতার হন আরো অনেকে। শ্রমিকদের মধ্য থেকে ছয়জনকে আন্দোলনে অংশ নেয়ার অপরাধ ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। কারাগারে বন্দীদশায় এক শ্রমিক নেতা আত্মহনন করেন। এতে বিক্ষোভ আরো প্রকট আকারে সারা বিশে^ ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে আন্দোলনরত শ্রমিকেরদের দাবী মেনে নিতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার। পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় অবাধ বাণিজ্যের যুগে বুর্জোয়া শ্রেণির হাত ধরে ব্যক্তিমালিকানায় যেখানেই শিল্পের বিকাশ সম্প্রসারিত হয়েছে, সেখানেই শ্রমিকেরা নিষ্পেষিত হয়েছে এবং আন্দোলনের জন্ম হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার গৃহ নির্মাণ শ্রমিকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে আওয়াজ তুলেছিল-‘আট ঘন্টা কাজ, আট ঘন্টা আমোদ-প্রমোদ, আট ঘন্টা বিশ্রাম।’ এই দাবির পক্ষে বিশে^র সাধারণ জনগণ তখন যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই ফ্রান্সের প্যারিসে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ফ্রেদেরিক এঙ্গেলসের উপস্থিতিতে ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। পরে ১৯১৯ সালে আইএলও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সারাবিশে^ মে দিবস পালিত হয়ে আসছে। যদিও উন্নত সভ্যতার দাবিদার সেই আমেরিকাতে এখনো পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে মে দিবস পালিত হয় না। বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় ৮০টি দেশে মে দিবস সরকারি ছুটির দিন হিসেবে স্বীকৃত। শ্রমজীবী মানুষেরা ভালবাসার সাথে, সম্মানের সাথে স্মরণ করে তাদের পূর্বসূরিদের যারা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের জন্য সেদিন প্রাণ দিয়েছিল। সারা পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষ এখনো এদিনটিতে শ্রমদাসত্ব থেকে মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলছে। পৃথিবীর দেশে দেশে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার্থে আইন আছে, আদালত রয়েছে। এমনকি শ্রমিকেরা অন্যায্যতার শিকার হলে তার জন্য আন্তর্জাতিক আদালত পর্যন্ত রয়েছে। তা সত্বেও শ্রমিকেরা বঞ্চিত হয়েই চলেছে। কারণ মুনাফা ও মজুরির দ্বন্দ্ব-বিরোধে শ্রমিকরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও অসংগঠিত, এজন্য দুর্বল ও শোষিত। আগ্রাসী পুঁজিবাদ সমাজে ভোগের সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিয়েছে। শ্রমিকদের শোষণ করে অর্থবিত্ত তৈরি করে, সেই সংস্কৃতির একমাত্র ভোক্তা পুঁজিপতি। মালিকের অন্যায় আচরণ রুখতে হলে, শোষণমুক্ত সমতার সমাজ প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এজন্য মে দিবসের কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে। শ্রমজীবী মানুষ সংগঠিত হয়ে মুক্তির চেতনায় উজ্জীবিত হলেই কেবল মে দিবস তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..