মে দিবসের জয় হোক

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
পহেলা মে, মহান মে দিবস। গত ১৩৬ বছর ধরে এই দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে। এ দিনটি হলো শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিক সংহতির দিন। বিশ্বব্যাপী শ্রমিকের বিজয়ের দিন। আনন্দ ও উৎসবের দিন। নতুন সংগ্রামের শপথ নেয়ার দিন। যদিও করোনাকালীন দুর্যোগে মানুষ আজ আতংকিত দিশাহারা, তবুও তার মাঝে থেকেই 'মে দিবস' পালিত হচ্ছে। গত বছরও এরকমই হয়েছিল। একারণে 'মে দিবসের' মর্মবানী বিন্দুমাত্র হালকা হয়নি। বরঞ্চ 'মে দিবসের' প্রাসঙ্গিকতা আরও তীক্ষ্ণ হয়েছে। ‘মে-দিবসের কবিতা’-য় সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন - "চিমনির মুখে শোনো সাইরেন - শঙ্খ, গান গায় হাতুড়ি ও কাস্তে, তিল তিল মরণেও জীবন অসংখ্য জীবনকে চায় ভালবাসতে। --- --- শতাব্দি লাঞ্ছিত আর্তের কান্না প্রতি নিঃশ্বাসে আনে লজ্জা; মৃত্যুর ভয়ে ভীরু বসে থাকা, আর না - পরো পরো যুদ্ধের সজ্জা। " মে দিবস হলো সংগ্রামের অপর নাম। একাধিক কারণে তার এই সংগ্রামের পরিচয়। প্রথম কারণ হলো, সংগ্রামের মধ্য দিয়েই এই দিবসটির জন্ম হয়েছিল। দ্বিতীয় কারণটি হলো, শ্রমিকদের জন্য মে দিবস পালন করাটিও একেবারে শুরুর দিন থেকে একটি সংগ্রামের ব্যাপার হয়ে থেকেছে। শতাব্দিকালেরও বেশি সময় ধরে মে দিবস উদযাপনের সুযোগের জন্য দেশে দেশে শ্রমিকশ্রেণিকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। সইতে হয়েছে নানা মাত্রার পুলিশী নির্যাতন, জেল-জুলুম-হুলিয়াসহ দমন-পীড়ন। এখনো বিশ্বব্যাপী কম-বেশি একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আমাদের দেশেও দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মে দিবস উদযাপনের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে। তাছাড়া, মে দিবস পালন করতে দেয়া হলেও তার তাৎপর্য ও মর্মবাণীকে বিকৃত, পানসে, ম্লান করে করে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। এখনো তা অব্যাহত আছে। বৃটিশ যুগেতো বটেই, এমনকি পাকিস্তানের যুগে সরকারগুলো মে দিবস পালন করাটাকে গুরুতর অপরাধ বলে গণ্য করতো। মে দিবস পালনকে বিবেচনা করা হতো কমিউনিস্ট অন্তর্ঘাত, বিদ্রোহ-বিপ্লবের প্রস্তুতি কাজ ও বৃটিশ রাজ ও পাকিস্তানের অস্তিত্বের জন্য ‘খাতারনাক’ হিসেবে। প্রবল নজরদারী ও রক্তচক্ষুকে ফাঁকি দিয়ে সেসময় এসবের মাঝেই মে দিবস পালন করতে হতো। সে সময় সরকারের দালাল বা সংস্কারবাদী ধারার ট্রেড ইউনিয়নগুলোর উদ্যোগে মে দিবসের প্রকাশ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। এতদসত্ত্বেও এসব অনুষ্ঠানে শ্রমিকরা উপস্থিত হতেন। ট্রেড ইউনিয়নগুলো তাদের মে দিবসের অনুষ্ঠানের আয়োজন শিল্পাঞ্চলেই করতো। আদমজীর বালুর মাঠ, ডেমরার পুকুর পাড়ের খেলার মাঠ, ঢাকেশ্বরী কটন মিল, লক্ষ্মী নারায়ণ কটন মিল এলাকায় অনুষ্ঠান হতো। সেসব অনুষ্ঠানে আমরা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীরা দল বেঁধে শ্রমিক নেতাদের কথা শুনতে এবং শ্রমিকদের সাথে কিছুটা সময় কাটাতে ও তাদের সঙ্গে গল্প করতে যেতাম। সন্ধ্যার পর তৃণমূলের পার্টি-শাখাগুলো ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে হারিকেন জ্বালিয়ে, পেছনে লাল পতাকা টানিয়ে, সীমিত পরিসরে মে দিবসের অনুষ্ঠান করতাম। এ ধরনের অনুষ্ঠানে হয়তো উপস্থিতির সংখ্যা থাকতো হাতেগোণা ১০-১২ জন। প্রবল প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও এভাবে আমরা কমিউনিস্ট কর্মীরা মে দিবস পালনের মধ্য দিয়ে শ্রমিকশ্রেণির মুক্তির সংগ্রাম অব্যাহত রাখার শপথ নিতাম । বেশ মনে আছে যে, ১৯৬৫ সালে সর্বপ্রথম আমি মে দিবস পালনের আনুষ্ঠানিক আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। তৎকালীন গোপন কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে ঢাকার উপকণ্ঠে কল্যাণপুরে মে দিবস উপলক্ষে এক গোপন সভার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে আমরা অর্ধশতাধিক ছাত্র-তরুণ কমিউনিস্ট কর্মী উপস্থিত ছিলাম। সে সময় আত্মগোপনে থাকা পার্টি নেতাদের মধ্যে কমরেড আজাদ (মণি সিংহ), কমরেড আমিন (অনিল মুখার্জী), কমরেড করিম (জ্ঞান চক্রবর্তী), কমরেড কবির (মোহাম্মদ ফরহাদ) প্রমুখ সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন। কিংবদন্তীর এই নেতাদের স্বচক্ষে দেখতে পেয়ে আমরা অভিভূত হয়েছিলাম। পাকিস্তান আমলে এভাবেই আমাদেরকে গোপনে মে দিবস উদযাপন করতে হতো। ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর মে দিবস উদযাপনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হয়েছিল। মে দিবসের অনুষ্ঠান প্রকাশ্যে আয়োজন হতে শুরু হয়েছিল। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রণাঙ্গণেই আমরা মে দিবসের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মে দিবস পালন করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানাদির পাশাপাশি শ্রমিকরা তাদের ট্রেড ইউনিয়নগুলোর উদ্যোগে প্রকাশ্যে ঢাক ঢোল পিটিয়ে আনন্দ উল্লাস সহযোগে সমাবেশ-মিছিল-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যম শহরের কেন্দ্রে ও নিজ নিজ এলাকায় মে দিবস পালন করে থাকে। দিনটি ১৯৭২ সাল থেকেই সরকারি ছুটির দিন। এসব অর্জন সম্ভব হয়েছে পাকিস্তান আমলে ও মুক্তিযুদ্ধের সময়ের জাতীয় সংগ্রামে এদেশের শ্রমিক শ্রেণির অমূল্য অবদানের ফলশ্রুতিতে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ 'আনুষ্ঠানিকভাবে' মে দিবস পালনের ক্ষেত্রেও 'মুক্তি' এনে দিয়েছিল। মে দিবস এখন শ্রমিকদের উৎসবের দিনে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর এই দিনে গার্মেন্টস, পরিবহন, ট্যানারি, নির্মাণ শ্রমিক, হোটেল শ্রমিক ইত্যাদি বিভিন্ন সেক্টর ও কারখানার ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন জাকজমকপূর্ণভাবে মে দিবসের কর্মসূচি পালন করে। শ্রমিকরা দলে দলে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে, রঙ ছিটিয়ে এসব অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। পুরুষের পাশাপাশি এখন নারী শ্রমিকরাও মে দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দেন। মে দিবসে ঢাকা শহর আজকাল শ্রমিকের উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়। মে দিবস এখন 'সরকারী মর্যাদা' পেয়েছে ঠিকই। কিন্তু যাদের রক্তে রাঙানো সংগ্রামের স্বীকৃতিরূপে এ দিবসটি পালিত হয়, সেই শ্রমিক ও মেহনতি মানুষরা এদেশে আজও রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কোনো ক্ষেত্রেই তাদের ন্যূনতম মর্যাদা ও অধিকার লাভ করেনি। মে দিবসকে 'মাকাল ফল' বানিয়ে রাখা হয়েছে, উপরে-উপরে আনুষ্ঠানিকতায় বাহারি ছাপ লাগলেও ভেতরটা অন্তঃস্বারশুন্য করে রাখা হয়েছে। এ যেন - ‘তোমার পুজার ছলেই তোমায় ভুলে থাকি’-র মতো ব্যপার। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ সাম্রাজ্যবাদের পদলেহনকারী লুটেরা পুঁজিবাদীদের পরিচালিত আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় শ্রমিক ও মেহনতি শ্রেণি শোষণ-বঞ্চনা-অবহেলা-অমর্যাদা ছাড়া অন্য কিছু আশা করতে পারে না। বাংলাদেশে তারা ‘তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক’ রূপে ৫০ বছর ধরে দিন কাটাচ্ছে। এই সমাজে শ্রমিকদেরকে 'মানুষ' হিসেবে গণ্য করা হয় না। একজন শ্রমিক মরলো কি বাঁচলো তাতে মালিক বা সরকারের যেন কিছুই আসে যায় না। রহিমা, সালেহা, মকবুল অথবা আকবর নামের একজন গার্মেন্টের শ্রমিক মরলে পরদিনই তার বদলে ২০০/২৫০ টাকায় আরেকজন হালিমা, মাজেদা, হোসেন অথবা শামসুলকে পাওয়া যায়। তাদের মূল্য কেবল এই কারণে যে তারা শ্রম-শক্তির যোগানদাতা। মানুষের শ্রম-শক্তি এমন একটি ‘পণ্য’যার ব্যবহার দ্বারা ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ সৃষ্টি হয়। উৎপাদনের উপকরণাদির ওপর তার মালিকানার সুবাদে মালিক এককভাবে এই উদ্বৃত্ত মূল্য নিয়ে নেয়। মালিকানার এই ‘অধিকারকে’ বুর্জোয়া রাষ্ট্র তার আইন-কানুন, বিচারালয়, প্রশাসন ইত্যাদির মাধ্যমে সুরক্ষার ব্যবস্থা করে। পরিচালিত হয় 'মজুরি-দাসত্বের' আধুনিক শোষণ ব্যবস্থা। মে দিবস হলো বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে শ্রমিকদের একটি নিজস্ব দিন। এ দিনটি হলো তাদের জন্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে উজ্জীবীত হওয়ার দিন। মে দিবস পালনের ক্ষেত্রে এখন আপেক্ষিক বিচারে কিছুটা মুক্ত পরিবেশ তৈরি হলেও, লাখো শহীদের জীবনের বিনিময়ে অর্জিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারার মতোই, এদেশে ‘মে দিবসের মুক্তি’-ও হোঁচট খেয়েছে। পরিত্যাগ করা হয়েছে মেহনতি মানুষের মুক্তির প্রশ্নটি। শোষণ-বঞ্চনা ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত হয়ে প্রতিটি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন হলেও, আজ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। এমনকি আজ সেই স্বপ্নটিকেও বরঞ্চ ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার পথে অগ্রসর হওয়ার লক্ষ্যে ১৯৭২-এর সংবিধানে ‘সমাজতন্ত্র’কে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির অন্যতম হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু হত্যা-ক্যূ-ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে দেশকে আজ সে ধারা থেকে সম্পূর্ণ সরিয়ে নেয়া হয়েছে। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে শ্রমিকশ্রেণি ও জনগণের অধিকার ও কর্তৃত্ব স্বীকার করা হলেও, আজও পর্যন্ত তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং দেশের সম্পদ ও উৎপাদনব্যবস্থার কর্তৃত্ব জনগনের হাতে তুলে দেয়া হবে বলে দেশের সংবিধানে সুষ্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সেই কতৃত্ব আজ প্চরায় সম্পুর্ণভাবে চলে গেছে লুটেরা শ্রেণির হাতে। সংবিধানের ১৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “উৎপাদনযন্ত্র, উৎপাদনব্যবস্থা ও বণ্টনপ্রণালীসমূহের মালিক বা নিয়ন্ত্রক হইবেন দেশের জনগণ। ” ১৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে মেহনতী মানুষকে - কৃষক ও শ্রমিকের এবং জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্ত করা। ” ২০(১) অনুচ্ছেদে কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস রচিত কমিউনিস্ট ইশতেহার উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, “কর্ম হইতেছে কর্মক্ষম প্রত্যেক নাগরিকের পক্ষে অধিকার, কর্তব্য ও সম্মানের বিষয় এবং ‘প্রত্যেকের নিকট হইতে যোগ্যতা অনুসারে ও প্রত্যেককে কর্মানুযায়ী’ -এই নীতির ভিত্তিতে প্রত্যেকে স্বীয় কর্মের জন্য পারিশ্রমিক লাভ করিবেন। ” সংবিধানে এসব অনুচ্ছেদ এখনো বহাল থাকলেও তথাকথিত মুক্তবাজার নীতির নামে ‘উৎপাদনযন্ত্র, উৎপাদনব্যবস্থা ও বণ্টনপ্রণালী’র মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ জনগণের হাত থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছে। পাটকল সহ অসংখ্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান মুষ্টিমেয় ব্যক্তির হাতে তুলে দিয়ে দেশের শিল্পায়নের পথকে খর্ব ও ধ্বংশ করা হয়েছে। ‘কৃষক ও শ্রমিকের এবং জনগণের অনগ্রসর অংশের’ উপর এখনো চলছে নানামাত্রিক শোষণ-নিপীড়ন। ন্যায্য মজুরি ও অন্যাান্য ন্যূনতম স্বীকৃত অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে শ্রমিকদের। নারী শ্রমিকদের ওপর চলছে অধিকতর বঞ্চনা ও বৈষম্য। ফলে, শ্রমিক-স্বার্থের অনুকূল প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনা নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও, গত ৫০ বছরে সেখান থেকে বাংলাদেশ শুধু পিছিয়েই আসেনি, সে এখন চলছে একেবারে উল্টো পথে। মে দিবস উদযাপনের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়েছে। মে দিবসের আনুষ্ঠানিকতা এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রদর্শনবাদ, রাজনৈতিক শো-ডাউন, চাটুকারিতা, নেতা-নেত্রীভজন ইত্যাদির মধ্যে বন্দি হয়ে গেছে। এক কথায়, মে দিবস পরিণত হয়েছে অনেকটাই স্থুল আনুষ্ঠানিকতায়। এই দিনটি যে শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক সংগ্রামের অংশ - সে বিষয়টি ক্রমস্ব ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ, মে দিবসের ইতিহাসের দিকে নজর দিলেই শ্রমিক-অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রামের ধারায় রচিত এ দিবসটির সেই মৌলিক বিপ্লবী চরিত্রটি স্পষ্ট হয়ে উঠবে। আমেরিকার শিকাগো শহরে সংগঠিত সংগ্রামী ঘটনাবলীর মধ্য দিয়েই সেই ইতিহাসের সূচনা। আমেরিকার শিকাগো শহরে সংগঠিত সংগ্রামী ঘটনাবলীর মধ্য দিয়েই সেই ইতিহাসের সূচনা। ১৮৮৬ সালের ১ মে তারিখে আমেরিকার ১১ হাজারেরও বেশি কল-কারখানায় প্রায় ৪ লাখ অংশগ্রহনকারী শ্রমিকদের ধর্মঘটের মূল দাবি ছিল ৮ ঘণ্টা কাজের অধিকার প্রতিষ্ঠা। প্রথম দু’দিনের রক্তাক্ত সংঘাতের পর ওই কর্মসূচির অংশ হিসেবে ৪ মে হে মার্কেট স্কোয়ারের বিশাল সমাবেশে মালিক ও সরকারের সশস্ত্র বাহিনীর নির্বিচার গুলিতে শ্রমিকের রক্তে লাল হয়ে উঠেছিল হে মার্কেট চত্বর। আমেরিকার শ্রমিকদের দাবির সমর্থনে দেশে-দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল সংহতি আন্দেলন। ‘দুনিয়ার মজদুর এক হয়ে’ তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পথে নেমেছিল। দেশে-দেশে সে আন্দোলন অব্যাহতভাবে এগিয়ে গিয়েছিল। এর ফলশ্রুতিতে বিভিন্ন স্থানে মালিকরা ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হতে শুরু করেছিল। ১৮৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের শতবার্ষিকী উপলক্ষে ফ্রেডেরিক এঙ্গেলসের নেতৃত্বে প্যারিসে দ্বিতীয় কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই বছরই 'সোস্যালিস্ট লেবার ইন্টারন্যাশনালের' সম্মেলনে জার্মান কমিউনিস্ট নেত্রী ক্লারা জেটকিনের ঘোষণা অনুযায়ী ১৮৯০ সাল থেকে প্রতিবছর ১ মে ‘মে দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত হয়। এভাবেই আন্তর্জাতিকভাবে মে দিবস পালনের সূচনা হয়। অর্থাৎ, মে দিবসের সামগ্রিক ইতিহাসই হলো শ্রমিকশ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠা, মুক্তি অর্জন ও আন্তর্জাতিক সংহতির লক্ষ্যে ধারাবাহিক সংগ্রামের ইতিহাস। আট ঘণ্টা কাজের দাবিটি ছিল ঐতিহাসিক মে দিবসের সংগ্রামের প্রধান দাবি। শ্রমিকরা বলেছিল, দিনের ২৪ ঘণ্টাকে আমরা তিন ভাগে ভাগ করে চলতে চাই। ৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম ও ৮ ঘণ্টা বিনোদন। পরে অবশ্য 'বিনোদন' শব্দ পরিবর্তন করে উচ্চারিত হতে থাকে 'সংগ্রাম' শব্দটি । শ্রমিক শ্রেণীর সচেতন সংগ্রামী অংশ থেকে ‘৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম, ৮ ঘণ্টা সংগ্রাম’ - এই আওয়াজ তুলে ধরা হয়। সে সংগ্রাম শোষণ থেকে মুক্তির জন্য, শোষণমুক্ত মানবিক সমাজের জন্য, মুক্ত মানুষের মুক্ত বিশ্ব প্রতিষ্ঠার জন্য, সমাজতান্ত্রিক-সাম্যবাদী সভ্যতা নির্মাণের জন্য। এখন অবশ্য অনেক দেশেই শ্রমিকদের দাবি আরো অগ্রসর হয়েছে। ‘সপ্তাহে ৩৫ ঘন্টা বা ৪০ ঘন্টার বেশি কাজ নয়’, - এখন এই দাবি উঠেছে এবং অনেক স্থানে তা আদায় করাও সম্ভব হয়েছে। মহান মে দিবসের ঐতিহাসিক মূল দাবির মর্মকথাটি শুধু ঘড়ির কাটার হিসেবে ৮ ঘণ্টা কাজের বিষয় নয়, তার অন্তর্নিহিত মর্মার্থ হলো ‘কাজের সময় কমাতে হবে’। 'মজুরি বাড়াতে হবে' - এটি শ্রমিকদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, জরুরী ও জনপ্রিয় দাবি। তবে, এই দাবিটির তুলনায় 'কাজের সময় কমাতে হবে' - এই দাবির সামাজিক-রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক বেশি গভীর ও উন্নত মাত্রিকতার। বিষয়টি ভালোভাবে বোঝা দরকার। পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিকরা কাজ করে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। অন্য আর দশটি পণ্যের মতোই সে তার শ্রম শক্তিকে মজুরির বিনিময়ে বিক্রি করে। প্রাপ্ত মজুরি দিয়ে তাকে তার ক্ষয়ে যাওয়া শ্রমশক্তি পুনরুৎপাদন নিশ্চিত করতে হয়। সেজন্য তাকে তার নিজের ও পরিবারের ভরণ-পোষণ, শিক্ষা-চিকিৎসা, মাথা গোঁজার ঠাই ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে হয়। শ্রমশক্তি অব্যাহত রাখার জন্যই পরিবারের সকলের শরীর ঠিক রাখতে প্রয়োজন হয় ন্যূনতম ঘুম, বিশ্রাম ও বিনোদনের। এসবই হলো একজন শ্রমজীবী মানুষের বেঁচে থাকার আয়োজনের ব্যাপার। রান্নার কাজে হাড়ি, পাতিল, চুলা, মসলা-পাতি, রান্নার উপকরণাদি ইত্যাদির ব্যবস্থা করাটা হলো রান্নার 'আয়োজন' মাত্র। কিন্তু রান্নার 'মূল কাজ' করাটি হলো ভিন্ন ব্যাপার। সেই আসল কাজটির জন্যই তো এতো সব আয়োজন। ঠিক তেমনই, বেঁচে থাকার 'আয়োজন' তথাত ব্যবস্থা-পাতি করার উদ্দেশ্যেই শ্রমিক মজুরির বিনিময়ে তার শ্রমশক্তি বিক্রি করে। কিন্তু বেঁচে থাকার আয়োজন করার মধ্যেই বেঁচে থাকার আসল তাৎপর্য্য সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। শ্রমিককে তার সেই বেঁচে থাকার তাৎপর্য খুঁজে নিতে হয় তার শ্রম বিক্রি, বিশ্রাম আর বিনোদনের সময়ের বাইরে। কাজের সময় না কমাতে পারলে তার প্রকৃত বেঁচে থাকার সময় বের করা সম্ভব নয়। আর বাঁচার সময় বের করতে পারলে তখনই কেবল শ্রমিক শুধু আর শ্রমশক্তি প্রদানের একটি উৎস রূপে সীমাবদ্ধ থাকে না, সে হয়ে ওঠে একজন জীবন্ত মানুষ। জীবন তার কাছে অর্থবহ আনন্দময় হয়ে ওঠে। তার সৃজনশক্তি অবারিত হয়ে ওঠে। সে হয়ে ওঠে মানব সভ্যতার সচেতন সৃজনশীল স্রষ্টা, মুক্ত মানবের মুক্ত সমাজের এক বিহঙ্গসম মুক্ত সত্তা। শোষণের জিঞ্জির ভেঙে সাম্যবাদী সভ্যতা নির্মাণের মহাসংগ্রামের সে হয়ে ওঠে একজন বিপ্লবী সৈনিক। মজুরি বৃদ্ধির দাবির তুলনায় কাজের সময় কমানোর দাবিটি অনেক বেশি শ্রেণীতাৎপর্য সম্পন্ন। মজুরি নির্ধারণ একটা দরকষাকষির ব্যাপার। এটা ব্যক্তিগত স্তরে অথবা যৌথভাবে - উভয় আকারে হতে পারে। এক্ষেত্রে অর্জনের স্থায়িত্বের নিশ্চয়তা নেই। কারন শোষক শ্রেণির পক্ষে যে পরিমাণে মজুরি বাড়বে, দ্রব্যমূল্য তার চেয়ে বেশি বাড়িয়ে দিয়ে শ্রমিককে ক্রমাগত ঠকানোর ব্যাপারটা খুব কঠিন না। তাই মজুরি বৃদ্ধির সংগ্রাম শ্রমিকদেরকে সাময়িক সুবিধা দিলেও এর দ্বারা তার প্রকৃত সুবিধা প্রাপ্তির স্থায়ীত্ব মোটেও নিশ্চিত হয় না। কিন্তু কাজের সময় কমানোর ক্ষেত্রে সাফল্য সমগ্র শ্রমিক শ্রেণীকে প্রকৃত সুফল এনে দেয়। কারণ, কাজের সময় কমালে উৎপাদন পূর্বের হারে অব্যাহত রাখার জন্য মালিককে নতুন শ্রমিক নিয়োগ দিতে হয়। অন্তত, নিয়োজিত শ্রমিকের সংখ্যা কমানোর সুযোগ মালিকের থাকে না। বাংলাদেশে ৮ ঘণ্টা কাজের নিয়ম এখনো বেশিরভাগ জায়গায় অকার্যকর রয়েছে। গ্রাম ও শহরের অসংগঠিত নানা খাতে নিয়োজিত সিংহভাগ শ্রমজীবী মানুষের ক্ষেত্রে এটি একটি নিদারুণ অভিশাপ হিসেবে বিদ্যমান। ক্ষেতমজুর, দিনমজুর, গৃহকর্মী ইত্যাদির অবস্থা অতি করুণ। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-খামার প্রভৃতিতে কাজের সময় নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্যও কেউ নেই। এমনকি বড়-মাঝারি অনেক শিল্প-প্রতিষ্ঠানেও ৮ ঘণ্টা কাজের সময় কার্যকর থাকে না। আইন থাকলেও তার বাস্তবায়ন নেই। 'ওভারটাইম' কাজ করাকে অপরিহার্য্য করে তোলার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে কাজের সময় বাড়িয়ে দেয়া হয়। ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি এখনো বাংলাদেশে মে দিবসের অনুষ্ঠানমালায় শ্রমিকদের একটি প্রধান দাবি হয়ে আছে। মোদ্দা কথা হল, কত ঘণ্টা কাজ করতে হবে মানবিক দিক থেকে এ বিষয়টি যেমন খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এই দাবির মাঝে ‘কাজের সময় কমানোর' যে মর্মার্থ অন্তর্নিহিত রয়েছে তার গুরুত্বের মাত্রা আরো বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা বিলুপ্ত করে সাম্যভিত্তিক সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের নেতা বিপ্লবী মহামতি কার্ল মার্কস তার ‘ক্যাপিটাল’ পুস্তিকায় লিখেছেন - "পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থাটি (মূলত উদ্ধৃত্ত মূল্যের উৎপাদন ও উদ্ধৃত্ত শ্রম শুষে নেয়া) শ্রমিকের কাজের সময়টি বাড়িয়ে দিয়ে মানবিক শ্রমশক্তির স্বাভাবিক, নৈতিক, শারীরিক ক্রিয়াকর্মের ও উন্নতির সম্ভাবনাকে কেড়ে নিয়ে কেবল তার অবনতিই ঘটায় না, এই উৎপাদন ব্যবস্থা মানুষের শ্রমশক্তির অকাল শ্রান্তি-ক্লান্তি-মৃত্যুও ঘটায়। শ্রমিকের প্রকৃত আয়ু কমিয়ে দিয়ে নির্দিষ্টকালের মধ্যে তার উৎপাদনের সময়টি বাড়িয়ে দেয়’। সুতরাং শারীরিকভাবে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে সময় নিয়োজিত করার পর প্রকৃত ‘বেঁচে থাকার’ জন্য কিছুটা বেশি সময় বের করে নেয়ার ক্ষেত্র প্রসারিত করার জন্য ‘কম সময় কাজ করে বাঁচব’ - এই মর্মবাণী সম্পন্ন দাবি নিয়ে আন্দোলন একটি বিরাট ঐতিহাসিক-সামাজিক-রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে। " ‘মে দিবসের’ আট ঘণ্টা কাজের কেন্দ্রিক-দাবিটির কালোত্তীর্ণ গুরুত্ব ও তাৎপর্যের একটি প্রধান উপাদান এখানেই। এবারের মে দিবসে শ্রমিকদের সামনে ‘কর্মক্ষেত্রে জীবনের নিরাপত্তা’সহ উপযুক্ত কার্যপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আজ থেকে ৮ বছর আগে ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভার বাজার স্ট্যান্ডে অবস্থিত রানা প্লাজা বিল্ডিং ধসে পড়ে শত-শত গার্মেন্ট শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল। এই সংখ্যা ছিল 'নাইন-ইলেভেনে' আমেরিকায় টুইন টাওয়ারে দুনিয়া কাঁপানো হামলার ঘটনায় মৃতের সংখ্যার অর্ধেকের বেশি। চতুর্দিকে ছিল শ্রমিকদের লাশ। আকাশ-বাতাস ভরে উঠেছিল হাজার হাজার আহত শ্রমিকের ও অগণিত স্বজনের আর্তনাদ ও আহাজারিতে। এর আগে আশুলিয়ার স্পেকট্রাম ও তেজগাঁর ফোনিক্স কারখানা একইরকম ভাবে ধসে পড়ে এবং অসংখ্য কারখানায় আগুনে পুড়ে সহস্রাধিক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল। আশুলিয়ায় তাজরীন গার্মেন্টসে এবং আদাবরে স্মার্ট গার্মেন্টসে দেড় শতাধিক শ্রমিক আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছিল। এ্যতো মানুষের মৃত্যু! তাছাড়া এগুলো শুধু আকস্মিক কোন দুর্ঘটনার বিষয় ছিল না। । এভাবে একটির পর আরেকটি, ঘটনার পর ঘটনা ঘটে চলেছে। যেহেতু একই ধরনের অবহেলার কারণে উপুর্যপরি এসব হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটছে তাই এগুলোকে 'সচেতন ও পরিকল্পিত অবহেলাজনিত হত্যাকান্ড' বলে আখ্যায়িত করা যায়। শত-সহস্র মানুষের এধরনের মৃত্যুকে এক ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা বলে চিহ্নিত করাও যুক্তিসংগত। অথচ এসব হত্যাকান্ডের জন্য আজ পর্যন্ত একজন মালিককেও উপযুক্ত শাস্তি দেয়া হয়নি। তাই, শ্রমিক হত্যা চলছেই। বাংলাদেশের শ্রমিকদের কাছে এবারের মে দিবসে অপর প্রধান দাবিটি হলো জাতীয় ন্যূনতম মজুরি হিসাবে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি। দারিদ্রসীমার উপরে থাকতে হলে একজন মানুষের যে পরিমান ক্যালরি খাদ্য হিসাবে আহার করা অপরিহার্য সেটুকু নিশ্চিত করতে দৈনিক প্রয়োজন হয় ১৪০ টাকার বেশি। একজন শ্রমিককে তার আহারের পেছনে ব্যয় করতে হয় তার আয়ের ৪৫%। অবশিষ্ট ৫৫% প্রয়োজন হয় বাসস্থান, চিকিৎসা, কাপড়-চোপড় ইত্যাদির জন্য। সেই হিসেবে অবশিষ্ট এসবের জন্য প্রয়োজন হয় আরো ১৭৫ টাকার মতো। অর্থাৎ দারিদ্রসীমার উপরে থাকার জন্য একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মোট ৩১৫ টাকা অত্যাবশ্যক হয়। সেই হিসেবে চারজনের একটি পরিবারকে দারিদ্র সীমার উপরে রাখতে দৈনিক ১২৬০ টাকা রোজগার করা প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ সংসারের মাসিক আয় হওয়া উচিৎ ৩৭ হাজার ৮০০ টাকা। পরিবারে দুইজন কর্মক্ষম মানুষ থাকলে প্রতিজনের আয় কমপক্ষে ১৮ হাজার ৪০০ টাকা হওয়া অপরিহার্য। এ বিষয়টি এখন বিশ্বব্যপী স্বীকৃত যে শুধু ক্যালরি দিয়ে নয়, মানুষের ন্যূনতম বহুমাত্রিক চাহিদার হিসাবটি করতে হবে তার মৌলিকচাহিদা পূরণের প্রয়োজনীয়তা অনুসারে। অতএব, ২০ হাজার টাকা জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের দাবিটি হলো, কোনোক্রমে নিছক দারিদ্র সীমায় বেঁচে থাকার প্রয়োজনের সাথে সংগতিপূর্ণ, যুক্তিযুক্ত ন্যূনতম দাবি। এ দাবিকে অগ্রাহ্য করার অর্থ হলো কোটি- কোটি শ্রমজীবী মানুষকে দারিদ্র্যের মাঝে রেখে তাদের রক্ত নিংড়ানো শ্রম প্রসূত উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাৎ করে মুনাফার পাহাড় গড়ার সুযোগ সৃষ্টি করা। এবারের মে দিবসে এদেশের শ্রমিকদের সামনে আরেকটি বড় ইস্যু হলো শ্রম আইন। শ্রম আইন নিয়ে বহুদিন ধরে তালবাহানা করা হচ্ছে। সমঝোতামূলকভাবে প্রস্তুত করা শ্রম আইনের খসড়াটি মালিকদের সংগঠন একধরনের ভেটো দিয়ে আটকে রেখেছিল। তাদের আপত্তির কারণ ছিল এই যে, খসড়াটি যথেষ্ট পরিমাণে মালিকবান্ধব নয়। শ্রম আইন প্রনীত হওয়ার কথা প্রধানত শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষার জন্য । সেটি শ্রমিক বান্ধব হবে, এমনটা প্রত্যাশা করাই স্বাভাবিক। সেটা কেন আরো মালিকবান্ধব হলো না - এমন প্রশ্নও যে এক্ষেত্রে তোলা যেতে পারে, সেটিও একটি চরম তামাশার বিষয়। পাগলামি আবদার ছাড়া এসবকে আর কি বলা যায়। অবশেষে যে শ্রম আইন অনুমোদন করা হয়েছে সেখানে শ্রমিকের স্বার্থ পরিপূর্ণভাবে রক্ষা না করে মালিকের স্বার্থরক্ষার প্রতি অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। শ্রমিকের স্বার্থে শ্রম আইনের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য এবারের মে দিবসে শ্রমিকরা শপথ নিবে। শ্রমিক ও মেহনতি মানুষদের ভাত-কাপড়ের সমস্যার শেষ নেই। উন্নত জীবনের জন্য তাদেরকে শ্রেণি সচেতন হয়ে রুটি-রুজির সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া ছাড়া তেদের কোন গত্যান্তর নেই। কিন্তু দেশের অন্যান্য ঘটনাবলীর প্রতিও তারা চোখ বন্ধ করে রাখতে পারে না। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা, পরিবেশ রক্ষা, সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্ব ও ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা ও সম্প্রসারণ, সাম্প্রদায়িকতা রুখে দাঁড়ানো ইত্যাদি বিষয়গুলো শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বিশ্বব্যাপী প্রগতিশীল আন্দোলনগুলোকে সমর্থন জানিয়ে সংহতি গড়ে তোলার কাজটিও সব দেশের শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। এবারের মে দিবসে সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে মোকাবেলায় সংগ্রাম জোরদার করার আওয়াজটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসব সংগ্রামে শুধু শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বার্থ রয়েছে, এমন কথা ঠিক নয়। এই দাবির সাথে শ্রমিকদের প্রত্যক্ষ স্বার্থ জড়িত। সাম্প্রদায়িক জঙ্গীবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা রুখে দাঁড়ানো দেশের স্বাধীনতাকে রক্ষা ও সংহত করার জন্যই অত্যাবশ্যক। আর স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হলে শ্রমিক শ্রেণিই ক্ষতিগ্রস্থ হবে বেশি। পাকিস্তানের যুগে শ্রমিকদের ওপর পাকিস্তানি শাসকরা সবচেয়ে বেশি শোষণ করেছে। সাম্প্রদায়িক ধর্ম ব্যবসায়ী জামাতী-হেফাজতীরা শ্রমিক শ্রেণির ঐক্য বিনষ্ট করার জন্য এবং মানুষের দৃষ্টি তার ভাত-কাপড় ও রুটি-রুজির ইহলৌকিক সমস্যাগুলো থেকে অন্যদিকে সরিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে পবিত্র ধর্মের অপব্যবহার করে থাকে। শ্রমিকের বাস্তব অভিজ্ঞতা হলো, ধর্মীয় পরিচয় বা সে বিষয়ে পারদর্শীতা বিবেচনা করে মালিক কখনো মজুরির হার কম বেশি করে না। মালিকের কাছে শ্রমিকের শ্রম শক্তিই হলো কাংক্ষিত সম্পদ। সে শ্রম-শক্তি মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ যেকোন ধর্মাবলম্বী মানুষেরই হোক না কেন। শোষণের ক্ষেত্রে মালিক ধর্ম বিচার করে না। অথচ শ্রমিকরা যেন শ্রেণি হিসেবে এক হওয়ার পথে না যেতে পারে সেজন্য জামাতী-হেফাজতীরা মালিকের স্বার্থ রক্ষার্থে তাদেরকে ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক বিভাজনের চিন্তায় আচ্ছন্ন করে রাখতে চায়। এসব বিষয় এবং আরো অনেক বিষয় জমতে জমতে দেশে তা আজ এক বিভিষিকাময় পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। এদেশের শ্রমিকরা এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। এসবের মাঝেই এবারের মে দিবস পালিত হবে। ‘রোদন ভরা এ বসন্ত’। তবুও বসন্ত বসন্তই! মনে রাখতে হবে - 'এই দিনই দিন নয়, আরও দিন আছে। এই দিনকে নিতে হবে সেই দিনের কাছে'!

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..