নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জাবিতে আন্দোলন

Posted: 17 নভেম্বর, 2019

একতা প্রতিবেদক : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের অপসারণের দাবিতে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই বিক্ষোভ মিছিল করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে গত ১৩ নভেম্বর দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুরাদ চত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি শুরু হয়ে পুরাতন প্রশাসনিক ভবনের সামনে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ছাত্র ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতির বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। এ দিনের সমাবেশে ছাত্র ইউনিয়নের সহ-সভাপতি অলিউর রহমান সান বলেন, আমাদের শান্তিপূর্ণ ও যৌক্তিক এই আন্দোলনে হামলা করা হয়েছে। এরপর হল ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করেও এই আন্দোলন বন্ধ করতে পারেনি। শুধু দুর্নীতি নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন যে অচলাবস্থা সে জন্যই এই উপাচার্যের পদত্যাগ করা উচিত। দর্শন বিভাগের অধ্যাপক কামরুল আহসান বলেন, এখানে যে আন্দোলন হচ্ছে তা বিশ্ববিদ্যালয়কে রক্ষার আন্দোলন। প্রশাসন ভয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে বন্ধ ঘোষণা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিলে, আবারও সবাই আন্দোলনে আসবে। সরকারের উচিত তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুত চালু করে তা সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে সচল করা। আন্দোলনের সমন্বয়ক অধ্যাপক রায়হান রাইন বলেন, আমরা দীর্ঘদিন আন্দোলন করে যাচ্ছি। কিন্ত এখনো পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা ইউজিসি থেকে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। এদিকে আন্দোলনের ভয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও হল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবুও আমাদের আন্দোলন থেমে যায়নি। এত বাধার পরেও আমাদের ন্যায়ের পক্ষের এ সংগ্রাম চলবে। বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে অন্যদের মধ্যে নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক খবির উদ্দিন, জামাল উদ্দিন রুনু, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শামীমা সুলতানা, অধ্যাপক তারেক রেজা, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার হাসান মাহমুদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্রফ্রন্ট (মার্কসবাদী), জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের জাবি শাখার নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। আন্দোনকারীদের বিরুদ্ধে জিডি: জাবি উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামকে ‘অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ’ এবং ‘শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত’ করার হুমকি দেয়ার অভিযোগে ৭ আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গত ১৩ নভেম্বর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা সুদীপ্ত শাহিন ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের সভাপতি নজির আমিন চৌধুরী জয় ও ছাত্রফ্রন্ট (মার্কসবাদী) জাবি শাখার সভাপতি মাহাথির মুহাম্মদের নাম উল্লেখসহ আরো পাঁচজন অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় এ জিডি করেন। উপাচার্যকে হুমকির অভিযোগের বিষয়ে মাহাথির মুহাম্মদ বলেন, এটা একটা মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক অভিযোগ। আমরা অনুমতি নিয়েই তার কার্যালয়ে প্রবেশ করেছি। আন্দোলনকারীদের ওপর এমন ন্যক্কারজনক হামলার পর আমরা তাকে দায়িত্ব পালন না করতে অনুরোধ জানাই। এটাকে হুমকি হিসেবে সাজানো হয়েছে। এটা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। নজির আমিন চৌধুরী জয় বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয়ে শিক্ষার্থীরা কথা বলতে গেলে সেটাকে যদি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাহলে সেটি দুঃখজনক। এর মধ্য দিয়ে উপাচার্য কতটা অসহিষ্ণু মনোভাবের তা বোঝা যায়। এর আগে গত ১ নভেম্বর সহকারী প্রক্টর মহিবুর রৌফ শৈবালের ওপর হামলার অভিযোগে অজ্ঞাত ৫০-৬০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। জনগণের টাকায় স্বৈরাচারি অহমিকা আর কত? : ‘বিগত কয়েক দিন ধরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান আন্দোলন ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে অবিবেচকের মতো মন্তব্য করে চলেছেন। যা সারা বাংলাদেশের ছাত্র সমাজকে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে।’ গত ১০ নভেম্বর দেওয়া এক বিবৃতিতে এমনটাই বলেছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। বিবৃতিতে সংগঠনের সভাপতি মেহেদী হাসান নোবেল ও সাধারণ সম্পাদক অনিক রায় বলেন, ৭৩’র অধ্যাদেশ অনুযায়ী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। স্বায়ত্ত্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশে সকল সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জনগণের অর্থ সুষম বণ্টন করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু সরকার এই অর্থ পায় দেশের কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের দেওয়া ভ্যাট, ট্যাক্স ও রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে। গত কয়েক দিন ধরে প্রধানমন্ত্রী বারংবার ‘সরকার টাকা দেয়, আমরা টাকা দেই’ এ ধরনের বক্তব্য প্রদান করছেন, যা খুবই আপত্তিজনক। যেকোনো স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে সরকার জনগণের টাকা দেয় দক্ষ মানবশক্তি তৈরির জন্য। জনগণের টাকায় পরিচালিত একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন দুর্নীতি ও ঈদ সেলামির নামে টাকার ভাগ বাটোয়ারা চলে এবং দায়িত্বে থাকা একজন সরকারপ্রধান অভিযোগ খতিয়ে না দেখে বরং অভিযোগকারীদের হয়রানির করার লক্ষ্যে নানারকম অযৌক্তিক বক্তব্য ও আন্দোলনকারীদের পরিবারকে হয়রানি করে দুর্নীতির মতো অভিযোগকে আড়াল করার চেষ্টা করছেন তা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, বিশ্বের আর কোথাও বাংলাদেশের মতো এত স্বল্প খরচে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ এই প্রেক্ষিতে বলেন জার্মানি, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, ফ্রান্স, স্লোভেনিয়াসহ বিশ্বের আরও অনেক দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে কোনো ফি লাগে না। শিক্ষা যেখানে বাংলাদেশের নাগরিকের মৌলিক অধিকার সেখানে জনগণের টাকায় পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অর্থের বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন করা নিতান্তই বোকার মতো কাজ। নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, জনগণের টাকায় প্রধানমন্ত্রীর স্বৈরাচারি অহমিকা আর কত দিন? আমরা তাকে মনে করিয়ে দিতে চাই এরকম দাম্ভিকতা নিয়ে আইয়ুব-ইয়াহিয়ারাও বাংলাদেশের ছাত্র সমাজকে নিয়ে কটাক্ষ করেছিল এবং এর খেসারত তাদেরকে দিতে হয়েছে। তাই আমরা প্রধানমন্ত্রীকে এ ধরনের বক্তব্য ও চিন্তা থেকে সরে আসার এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান আন্দোলনকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানাচ্ছি।