রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব

Posted: 03 নভেম্বর, 2019

মানব সভ্যতার ইতিহাসে রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এক অনন্য ঘটনা। বর্তমান বিশ্বে যেখানে চলছে সাম্রাজ্যবাদের একচেটিয়া দাপট, সেখানে রুশ বিপ্লব খুবই প্রাসঙ্গিক, অনেক বেশি জীবন্ত। সেই বিপ্লবকে জানা ও বোঝা এবং তার শিক্ষাকে আত্মস্থ করা আমাদের জন্য অপরিহার্য। রুশ বিপ্লবই প্রথম একটি সমাজতান্ত্রিক দেশ ও সমাজ তৈরি করেছিল। হাজার হাজার বছর পর মানুষ প্রথম পেয়েছিল মুক্তির স্বাদ। সেটা ঘটেছিল রাশিয়ায়। রাশিয়াসহ জার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য রাজ্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। সেই সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবার পরও সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পিত অর্থনীতির মাধ্যমে মাত্র আড়াই বছরে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অর্থনৈতিক অবস্থায় ফিরে যেতে সক্ষম হয়েছিল। ১৯১৭ সালের অক্টোবর মাসে (নতুন ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নভেম্বর মাসে) রুশ দেশে বিপ্লবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল এক নতুন সমাজ-সমাজতন্ত্র। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উম্মোচনকারী ঘটনা। এই রুশ বিপ্লব শ্রেণি শোষণের চির অবসান ঘটিয়ে যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে লালিত শোষণমুক্তির স্বপ্নের বাস্তব রূপদান করে। এ বিপ্লব মানুষের ওপর মানুষের, শ্রেণির ওপর শ্রেণির শোষণের অবসান ঘটিয়েছিল। রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং বিপ্লবজাত রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন রাশিয়া এবং অন্যান্য রিপাবলিকের জনগণের জীবনের অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করেছিল। রাশিয়ার ১৭৫ টি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ১২৪ টির কোনও হরফ ছিল না। ৭৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক জনগণ ছিল নিরক্ষর। জার আমলে হিসাব করে নির্ধারণ করা হয়েছিল রাশিয়ার পুরুষদের শতভাগ স্বাক্ষরতা অর্জন করতে লাগবে দেড়শত বছর এবং নারীদের শতভাগ স্বাক্ষরতা অর্জন করতে লাগবে দুইশত বছর। রুশ বিপ্লব এ অসম্ভবকে সম্ভব করেছে মাত্র পনের বছরে। ১৯৩৭ সালের মধ্যে রাশিয়ার শতভাগ মানুষ স্বাক্ষরতাসম্পন্ন হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সকল জাতিগোষ্ঠী নিজের ভাষার বর্ণমালা এবং ভাষার লেখ্য রুপ পেয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন যুব সমাজকে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিয়েছিল। রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কেবল মাত্র রাশিয়ার জনগণের অবস্থার পরিবর্তন সাধন করেনি, সারা পৃথিবীর নিপীড়িত জনগণের মুক্তির সংগ্রামকে এগিয়ে দিয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। ঔপনিবেশিক শোষণ থেকে মুক্তির লড়াইয়ে নিপীড়িত জাতিসমূহের পাশে দাঁড়িয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। বাংলাদেশের মানুষ সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি কৃতজ্ঞ। কারণ ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদেরকে নৈতিক, মানবিক ও সামরিক সহযোগিতা দিয়েছিল। বারবার পাকিস্তানী ঘাতক সরকারকে তাদের গণহত্যা বন্ধের জন্য বার্তা পাঠিয়েছে সোভিয়েত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র বন্ধের হুমকি দিয়ে বাংলার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। শুধু মুক্তিযুদ্ধে নয়, দেশ পুনর্গঠনের সময়ও সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে পাকিস্তানীদের পাতা মাইনমুক্ত করতে গিয়ে অনেক সোভিয়েত নাবিক আত্মদান করেছে। পৃথিবীর নিপীড়িত, ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত জাতিসমূহের মুক্তি ও তাদের জাতি ও রাষ্ট্র বিনির্মাণ ও পুনর্গঠনে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা অনস্বীকার্য। রুশ বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল একটি পশ্চাদপদ অনুন্নত পুঁজিবাদী দেশে। বিপ্লবের পর সে দেশে সমাজতন্ত্র সাম্যবাদ কায়েমের লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করায় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষের জীবনমানের যে উন্নয়ন হয়েছিল অন্য কোন সমাজ ব্যবস্থায় তা ছিল অকল্পনীয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকার ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা সমাজতন্ত্রের যে মর্যাদা বেড়েছিল তার প্রভাবে পূর্ব ইউরোপের দেশসমূহ এবং এশিয়ার কয়েকটি দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। শোষণহীন সমাজ, সাম্য, সমাজতন্ত্র- মানুষের বহু শতাব্দী লালিত স্বপ্ন। সমাজতন্ত্রের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ উপস্থিত করেছিলেন কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস। সেই মতাদর্শকে ধরেই প্রথম সফল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ছিল রুশ বিপ্লব । রুশ বিপ্লবের দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নে এখন আর সমাজতন্ত্র না থাকলেও রুশ বিপ্লবের বা লেনিনবাদের প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে যায়নি। রুশ বিপ্লবের প্রাসঙ্গিকতা তাই এখনও রয়ে গেছে। কারণ সমাজতন্ত্রের শোষণমুক্তির এবং শতকরা ৯৯ জন মানুষের জন্য সত্যিকারের গণতন্ত্রের স্বপ্ন এখনও হারিয়ে যায়নি। যাবেও না কোনোদিন।