সোনালী আঁশে দুর্দশা

Posted: 06 অক্টোবর, 2019

রফিকুজ্জামান লায়েক : শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীরা এখন আর জানেন না যে, পাটের অপর নাম কেন ‘সোনালি আঁশ’। ৫০ বছরের ওপরে যাঁদের বয়স, তাঁরা ছোটবেলায় পাটের বিষয়টি জানতে পারতেন। বুঝতে পারতেন কেন পাটকে ‘সোনালি আঁশ’ বলা হয়। পাট রপ্তানি করে দেশ যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হতো এবং কৃষক বা পাটচাষি হাট-বাজারে পাট বিক্রি করে নগদ টাকা পেয়ে খুবই আনন্দিত হতেন। একসময় আমাদের দেশের প্রধান রপ্তানি দ্রব্য ছিল পাট। অর্থাৎ পাট রপ্তানি করে আমরা প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতাম। সেজন্য পাটকে ‘সোনালি আঁশ’ বলা হত। এখন আর পাটের সেই সুদিন নেই। গত বেশ কয়েক বছর পাট, পাটচাষি ও পাটশিল্প নিয়ে পত্রিকাগুলিতে অনেক লেখা ছাপা হয়েছে। টেলিভিশনে অনেক আলোচক এ বিষয়ে আলোচনা করতেন। পাটচাষিদের পক্ষে যেসব আন্দোলন-সংগ্রাম হতো, তার খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হতো এবং অল্প হলেও টেলিভিশনের কিছু চ্যানেলে দেখাত। কিন্তু এ বছর দেখছি পত্রিকায় পাট সংক্রান্ত লেখা কেউ লিখছেন না, টিভিতেও কোনো খবর নেই। তার কিছু কারণ আছে বোধ হয়। ২/১টি বহুল প্রচারিত দৈনিক পত্রিকায় পাট বিক্রির পর কৃষকের হাসিমুখের ছবি ছাপছে। আর লিখছে যে, এ বছর (২০১৯) পাটের ফলন ভালো, দামও ভালো, তাই কৃষক খুশি। আসলে তা ঠিক নয়। ফলন ভালো হয়েছে, এ কথার কোনো ভিত্তিই নাই। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, এ বছর আবহাওয়ার কারণে কিছু এলাকার পাট ভালো হলেও বেশিরভাগ এলাকার পাট ভালো হয়নি। গত কয়েক বছরে দেশে পাটের ফলন কেমন ছিল আর এ বছর কেমন হয়েছে, সে বিষয়ে আরও ভালো বলতে পারবেন দেশে কৃষি কর্মকর্তারা। অনেক বছর ধরে পাটচাষিরা পাটের লাভজনক দাম তো দূরের কথা, উৎপাদন-খরচও পাচ্ছেন না। পাটচাষির জীবনের সংগ্রাম, উৎপাদনের জন্য প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম এবং লাভজনক দামের জন্য সংগঠিত যে সংগ্রাম তার কোনো খবর না ছাপিয়ে, কথার ফুলঝুরি ঝরিয়ে ‘পাটচাষির সুদিন’ বলা হচ্ছে। এসব নিছক ভাওতাবাজি। পাটচাষির ঘরে গেলে প্রকৃত সত্য জানা যায়, বোঝা যায়। জীবনভর কষ্ট করে কী খায়, কী পরে, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে কীভাবে সেসব খবর আমরা কত জন রাখি? বর্তমানে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া মিডিয়াতে কৃষকের সংগ্রামের সংবাদ প্রকাশ করা হয় না। পাটের অর্থনৈতিক গুরুত্ব শুধু কৃষকের একার জন্য নয়, জাতীয়ভাবেই পাটের অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। পাট উৎপাদন ও পাটশিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে রয়েছেন কয়েক কোটি মানুষ। অনেকের তো এই খাত হলো তাঁর উপার্জনের প্রধান বা একমাত্র পথ। বাঙালি মধ্যবিত্তের বিকাশের শুরুর সঙ্গে পাট জড়িত। কারণ পাট বিক্রির টাকা দিয়েই কৃষক তাঁর সন্তানকে স্কুল-কলেজের বেতন ও বই-খাতা কিনে দিয়েছেন। আজ কেউ কেউ হয়তো এ ইতিহাস মানতে চাইবেন না। কিন্তু ইতিহাস তো কথা বলে। শাসকশ্রেণির উদাসীনতা ও দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্রের কারণে আজ পাট ও পাটশিল্প ধ্বংসের পথে। এক সময়ে পাট ও পাটশিল্পই বিশ্ব দরবারে আমাদেরকে পরিচিত করেছিল। অতীতে ইরানকে সুরমার জন্য, সৌদি আরবকে খেজুরের জন্য, আফগানিস্তানকে সুদের ব্যবসার জন্য, বেলজিয়ামকে কাঁচের জন্য, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাকে ফুটবলের জন্য মানুষ চিনত। আর আমাদের চিনত পাটের জন্য। এ বছরসহ গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে সাড়ে ৭ লাখ হেক্টর জমিতে পাটচাষ হচ্ছে। পাট চাষের জন্য কোনো কোনো বছর জমির পরিমাণ সামান্য কমবেশি হয়ে থাকে। সব জেলাতেই কমবেশি পাটের আবাদ হয়ে থাকে। তবে পাট উৎপাদনে বৃহত্তর ফরিদপুর, ময়মনসিংহ উল্লেখযোগ্য। খরা মৌসুমে জমিতে পাট ছাড়া অন্য ফসল ভালো হয় না। ফলে কৃষক অনেকটা বাধ্য হয়েই তাঁর জমিতে পাট চাষ করে থাকেন। পাটের উৎপাদন খরচ কত? তা সঠিকভাবে নিরূপণ করা একটি কঠিন কাজ। সরকারিভাবে এবং কিছু মিডিয়াসহ অন্য মাধ্যমগুলো বীজ, সার, সেচ, নিড়ানি, পাটকাটা, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ইত্যাদি খরচ মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বের করে থাকে। কিন্তু কৃষক তো তাঁর নিজের জমিতে চাষ করেছেন। প্রায়ই এই হিসাবের সময় জমির ভাড়া ধরা হয় না। পাটচাষি নিজে এবং তাঁর পরিবারের অন্যরা কয়েকমাস ধরে যে শ্রম দিয়েছেন, সে শ্রমের মজুরি কখনও ধরা হয় না। অঞ্চলভেদে পাটের উৎপাদন খরচ কম-বেশি হয়ে থাকে। আবার পাটের মান অঞ্চল ও পানি ভেদে ভিন্ন-ভিন্ন রকমের হয়। কালো পানি ও ঘোলা পানিতে জাগ দিয়ে পাটের রং আলাদা হয়ে থাকে। ফলে দামেরও তারতম্য হয়। চলতি সময় হলো পাটের ভরা মৌসুম। মানভেদে পাটের দাম হলেও পাট বিক্রি করে কৃষক উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না। যাঁরা পাট, পাটচাষি ও পাটশিল্প রক্ষার আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত, তাঁরাই জানেন পাটচাষির প্রকৃত অবস্থা কী। বর্তমানে মানভেদে পাট মণপ্রতি ১২০০ টাকা থেকে ১৮৫০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। সর্বোচ্চ দামে যে পাট বিক্রি হচ্ছে তার পরিমাণ হলো মোট উৎপাদিত পাটের এক-চতুর্থাংশ। অর্থাৎ মোট উৎপাদিত পাটের চার ভাগের তিন ভাগ পাট বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ দামের থেকে কয়েকশ টাকা কম দরে। বৃহত্তর ফরিদপুর ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের পাটের দামের চেয়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের পাটের দাম সব সময়ই কম হয়ে থাকে। ফলে সেখানে পাটের দাম আরও কম। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করেন যে, পাটকাঠির তো অনেক দাম। কিন্তু পাটচাষিদের ঘরে বসে আলাপ করে শুনেছি যে, একমণ পাটের বিপরীতে যে কাঠি পাওয়া যায় তার দাম ১০০-১৫০ টাকা। যদিও খুচরা ক্রেতার কাছে দাম বেশি পড়ে। পাট ও পাটকাঠি মিলিয়ে গড়ে কৃষক যে দাম পাচ্ছেন, তাতে তাঁর উৎপাদন খরচ উঠছে না। আমরা আমাদের সভা-সমাবেশের মাধ্যমে পাট ও পাটশিল্পের স্বার্থে কয়েকটি দাবি তুলে ধরার চেষ্টা করি। পাট বিক্রি করে কৃষক যা পাচ্ছেন, একটু পরিকল্পনা নিয়ে এগোলে মণপ্রতি আরও কয়েকশ টাকা বেশি পাওয়া সম্ভব। আমাদের দেশে এখন ১৭ কোটি মানুষের বাজার। কয়েক বছর আগেও আমরা দেখেছি শহরে-হাট বাজারে প্লাস্টিকের বস্তার ছড়াছড়ি। সরকার ধান-চাল, গম-আটা, ভুট্টা, ডাল, চিনি, ময়দা, তুষ-কুড়াসহ মোট ২৬টি পণ্যের মোড়কের জন্য পাটজাত দ্রব্যের ব্যবহারের আইন করেছেন। সামান্য কিছুটা কার্যকর হয়েছে। কিন্তু এটা যদি পুরোপুরি কার্যকর করা যেত তাহলে একদিকে যেমন পাট ও পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ত অন্যদিকে পাটশিল্প তার হারানো গৌরব ফিরে পেত। আমাদের দেশে বর্তমানে ২৬টি সরকারি পাটকলের মধ্যে ২৫টি পাটকল চালু রয়েছে। এর মধ্যে ২২টি মিল জুট সেক্টরে চালু রয়েছে। এই পাটকলগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্থায়ী শ্রমিক, বদলি শ্রমিক ও দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক মিলে মোট ৬২ হাজার মানুষ কর্মরত আছেন। সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রায়ই বলা হয় যে, পাটকলগুলো লোকসান করছে। কিন্তু আমাদের একটি সহজ প্রশ্ন হলো, তাহলে বেসরকারি পাটকল বাড়ছে কীভাবে। সময়মতো কাঁচামাল সংগ্রহ করা, দুর্নীতি বন্ধ করা, কারখানাগুলোকে আধুনিকায়ন করে পরিকল্পিতভাবে উৎপাদন করলে জুট সেক্টর থেকে লাভ করা সম্ভব। পাটজাত দ্রব্য যেমন- বস্তা, চট ও শপিং ব্যাগের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকরণের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা যদি তৎপর হতেন, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যে এই সেক্টরের চেহারা পাল্টানো সম্ভব। ২০০২ সালে তৎকালীন সরকার শপিং ব্যাগ হিসেবে পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু তা আজও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। বরং ইদানীং আবার পলিথিনের ব্যবহার বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে। প্রশাসনের সামনেই গড়ে উঠছে ক্ষতিকর কারখানা। পাট ও পাটশিল্পের জন্য আরও একটি সম্ভাবনার ক্ষেত্র বর্তমানে তৈরি হয়েছে। উন্নত বিশ্বসহ সর্বত্র আজ বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মী, পরিবেশবাদীরা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য এবং পরিবেশকে বাঁচানোর জন্য পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলন করছেন। এই আন্দোলনের ফলাফল কিন্তু বাংলাদেশের পাটচাষির পক্ষে আনা সম্ভব। সরকার যদি আন্তরিক হয়, তবে বিদেশে আমাদের পাট ও পাটজাত দ্রব্যের বাজার বাড়ানো সম্ভব। দেশের বাজার বৃদ্ধি করা এবং বিদেশে সরকারিভাবে ও বেসরকারি রপ্তানিকারকদের প্রণোদনা দিয়ে পাটশিল্পের বিকাশ সাধন আজ সময়ের দাবি। এই আন্দোলনের সঙ্গে আমরা যারা জড়িত, তারা পাটের মণ ৩০০০ টাকা দাবি করছি। গ্রামে-গ্রামে এবং হাট-বাজারে সভা করে আমরা আমাদের দাবির পক্ষে উপরোক্ত যুক্তিগুলো তুলে ধরছি। সার্বিক নিম্নগতির এই সময়ে আমাদের দেশের এই পাট ও পাটশিল্প রক্ষা করতে হলে সংগঠিত রাজনৈতিক ও কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। আমরা দেখছি এই আন্দোলন বেগবান করা সম্ভব। কারণ পাট ও পাটশিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত মানুষের কাছে গেলে কেউ আমাদের ফিরিয়ে দিচ্ছেন না। আমাদের যুক্তি এবং যুক্তিগুলির যৌক্তিকতা নিয়ে স্বাধীনতার পর গত ৪৯ বছরে আমরা ছাড়া আর কেউ কথা বলছেন না। পাটের মূল্যবৃদ্ধির এই আন্দোলন নিছক অর্থনৈতিক আন্দোলন নয়। এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত রয়েছে আমাদের দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তা হলো পাট আমাদেরকে বিশ্বদরবারে পরিচিতি এনে দিয়েছে এবং জাতীয় অর্থনৈতিক বিকাশে সহায়তা করেছে। পরিবেশ ও প্রকৃতির জন্য ক্ষতিকর পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার বাদ দিয়ে পাটজাত দ্রব্যের ব্যবহার বাড়াতে রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক আন্দোলনও গড়ে তোলা প্রয়োজন। কেননা এই আন্দোলন শুধু কৃষকের একার নয়। সামগ্রিকভাবে পাট, পাটচাষি ও পাটশিল্প রক্ষা ও বিকাশের যে লড়াই, অর্থনীতি ও পরিবেশের কথা বিবেচনায় নিলে তাকে জাতীয় স্বার্থের লড়াই বলা যায়। ফলে খণ্ডিতভাবে না দেখে এই আন্দোলনকে সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে। আমরা সেই বিবেচনা থেকেই এই লড়াইকে অগ্রসর করার চেষ্টায় আছি। পাট চাষ ও পাটশিল্প রক্ষায় সংগ্রামী মানুষের ঐক্যবদ্ধ লড়াই গড়ে তুলতে হবে।