ধরিত্রী রক্ষা

Posted: 08 সেপ্টেম্বর, 2019

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। অধিকন্তু এই বৃদ্ধির গতিও বাড়ছে। ফলে বদলে যাচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। বেড়ে যাচ্ছে সমুদ্রের পানির উত্তাপ। গলে যাচ্ছে পাহাড়ের মাথার বরফ, মেরু অঞ্চলের হিমপ্রবাহ। জলোচ্ছ্বাসের প্রকোপ বাড়ছে, প্লাবিত হচ্ছে বিস্তৃীর্ণ অঞ্চল। সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি মানুষ ও জীবজন্তুর আবাসভূমি ও বনাঞ্চল। এসব বিপদ আরো বাড়তে থাকবে। আরো ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস উত্তাপ বাড়লেই বাংলাদেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভূমি সমুদ্রে তলিয়ে যাবে বলে গবেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। পরিস্থিতির ক্রমাবনতি ঘটতে থাকবে চক্রাকারে। পরিবেশ ও প্রকৃতির উপর মানব সমাজের ‘অত্যাচার’ ইতোমধ্যে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সে এখন প্রতিশোধ নিতে শুরু করেছে। ‘উন্নয়ন’ ও ‘সভ্যতার অগ্রগতিকে’ বৈষয়িক উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে এমনভাবে সমার্থক করে ফেলা হয়েছে যে, খোদ ধরিত্রীর অস্তিত্বই এখন হুমকির মুখে। উন্নয়নের ‘ঠেলায়’ বাতাসে যে পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস নির্গমন হচ্ছে, তা শোধন করার ক্ষমতা ধরিত্রীর বনাঞ্চলের নেই। একদিকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস নির্গমন ক্রমাগত বাড়ছে, আর অন্যদিকে ‘উন্নয়নের’ নামে বনাঞ্চল উজাড় হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে আরো বেশি পরিমাণে কার্বন-ডাই-অক্সাইড, মিথেন, ক্লোরোফ্লুরোকার্বন সহ আরো কিছু মারাত্মক ক্ষতিকর গ্যাস মজুত হয়ে গ্রিন হাউজ প্রভাব সৃষ্টি করেছে। তাতে সূর্যের তাপ যে পরিমাণে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করছে, তার সবটা বের হতে পারছে না। তাছাড়া, বায়ুমণ্ডলের বাইরের দিকে যে ওজোন গ্যাসের আবরণ আছে, এসব গ্যাসের প্রভাবে তা ক্রমেই ক্ষয় হচ্ছে। উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরুর উপরিভাগের ওজোন আবরণে ইতোমধ্যে বড় ফাটল সৃষ্টি হয়ে তা ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে। ওজোন আবরণের ফলে আগে যেভাবে পৃথিবীর বুকে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির আগমন বাধাগ্রস্ত হতো, এই ফাটলের ফলে তার প্রবেশ এখন আর সেই পরিমাণে আটকানো যাচ্ছে না। গত ৬ বছরে ‘জলবায়ু পরিবর্তনের’ আত্মঘাতি প্রক্রিয়া রোধ করা যায়নি। বরঞ্চ পরিবেশ ও প্রকৃতি আরো বেশি মানববসতির অনুপযোগী হয়ে উঠেছে। প্যারিসে পুনরায় শুরু হচ্ছে রাষ্ট্রপ্রধান, সরকার প্রধানসহ পৃথিবীর সব দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে অনুরূপ আরেকটি বিশ্ব ধরিত্রী সম্মেলন। এ সম্মেলন কি ধরিত্রী রক্ষার্থে পরিবেশ-প্রকৃতির ওপর মনুষ্য প্রভাবজনিত ক্ষতিসাধনের ক্রিয়াকর্ম বন্ধ করতে স্বক্ষম হবে? এটি হলো একটি ‘মরা-বাঁচার’ প্রশ্ন। ২০১৫ সালের ১৩ নভেম্বরর আইএস-এর সন্ত্রাসী হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্যারিস বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত নাম হয়ে উঠেছিল। এই ঘটনার ১৭ দিন পরে বিশ্ব ধরিত্রী সম্মেলনের সফলতার মাধ্যমে প্যারিস আবার বিশ্ববাসীর মনে আশার আলো জাগিয়ে তুলে সবচেয়ে আলোচিত নাম হয়ে উঠতে পারবে, সেটিই বিশ্ববাসীর একান্ত কাম্য ছিলো। পুঁজিবাদ এমন একটা ব্যবস্থা যার মূল প্রণোদনা হলো ব্যক্তিগত ‘মুনাফা’ অর্জন। মুনাফার জন্য গলাকাটা প্রতিযোগিতা তাকে সামন্ততন্ত্রের সামাজিক শৃঙ্খল ভাঙতে, প্রযুক্তির ক্রমাগত উন্নয়ন সাধন করতে বাধ্য করে। আরো উৎপাদন করা, শোষণের মাত্রা বৃদ্ধি করা, উদ্বৃত্ত মূল্য আরো বর্ধিত পরিমাণে আত্মসাৎ করা এবং এই ব্যবস্থাকে এপাশ-ওপাশে ও উপরমুখিভাবে বিস্তৃত করা- এসবই পুঁজিবাদের মুনাফা। তাড়নার অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য। বৈষয়িক সম্পদ বৃদ্ধির এই উন্মাদনা আজ এমন স্তরে এসে দাঁড়িয়েছে যে সসীম ধরিত্রীর পক্ষে এই অসীম স্ফীতি ধারণ করা আর সম্ভব হচ্ছে না। এবং ইতোমধ্যে এই অবস্থা এরূপ ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে, যখন পৃথিবীর মাত্র এক-চতুর্থাংশ দেশ তথাকথিত উন্নত পুঁজিবাদের পর্যায়ে উপনীত হতে সক্ষম হয়েছে। যদি অবশিষ্ট তিন-চতুর্থাংশ অনুন্নত ও স্বল্পোন্নত দেশগুলো একই পুঁজিবাদী পথ অনুসরণ করে ‘উন্নত’ দেশে পরিণত হয় তাহলে পরিবেশ দূষণ, ধরিত্রীর উষ্ণায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি কোন মাত্রায় গিয়ে পৌঁছাবে তা হিসাব করে বোঝানোর প্রয়োজন হয় না। বাংলাদেশের রামপালে কয়লা চালিত তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করে সুন্দরবন ধ্বংস করার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। এর ফলে সুন্দরবন ধ্বংস হবে। পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ যেখানে মূল কর্তব্য, সেখানে ধরিত্রী ধংসের পথে এরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ করাটা হবে একটি ক্ষমাহীন অপরাধ। তাই, সুন্দরবন রক্ষা করতে হবে। রামপালে কয়লা চালিত তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। দেশকে জামাত-শিবির, সাম্প্রদায়িকতা, অনাচার-অবিচার, শোষণ-বঞ্চনা, সংঘাত-নৈরাজ্য, দুঃশাসন-অপশাসন ইত্যাদি থেকে বাঁচানোর জন্য সংগ্রামের পাশাপাশি ধরিত্রীকে বাঁচানোর সংগ্রামও কম গুরুত্বপূর্ণ তো নয়ই, বরঞ্চ তা আরো বেশি জরুরি।