এখানে ভাত পাওয়া যায়

Posted: 18 আগস্ট, 2019

দীনা আফরোজ: প্রচণ্ড গরম, কপাল কুঁচকে আকাশের দিকে তাকিয়ে মেঘ খোঁজা। কিরে কি দেখছিস? আকাশের দিকে যে বেশ সময় ধরে এভাবে তাকিয়ে আছিস। চোখে মশাল জ্বলে উঠবে যে! না গো বাবু, কি আর দেইখবো! সেই সকাল বেলা সূর্য উঠলো গরমে যে আর টিকতে পারছিনে। যদি মেঘ থাইকতো বুঝতে পাইতাম ও-বেলায় বিষ্টি হবি। কিন্তু তার যে কোনও দেখা পেলাম না গো। এমন খরা পড়লো বাবু এক্কেবারে নাজেহাল করে ছাড়ছে। ঘেমে নেয়ে একাকার। আকাশের কি আর কোন ঠিক ঠিকানা আছে, কখন যে কাঁদবে কখন যে হাসবে। বুঝা মুশকিল। হাল্কা রঙের শাড়ি। বামবাহুতে জড়ানো আঁচলের এক অংশ আঁটোসাটো করে কোমরে বাঁধা। ডানবাহুতে স্নিগ্ধ ঘাম, গায়ের গন্ধ বিলাচ্ছে। গ্রামের মেয়ে ব্লাউজ পরার অভ্যাস নেই। এভাবেই রাহেলা আরাম অনুভব করে। শহরের একপাশে একটা ছোট্ট ভাতের দোকান। যদিও নিজের পেটে তিনবেলা ভাত জুটে কিনা সন্দেহ। গায়ের রঙ কালো হলেও দেখতে মনে হয়, যেন বাঁশ বাগানের ওপর জোছনা ফুটে থাকা রূপালি চাঁদ, ভাঙা আয়নার মতো ঝলমল করছে। বাহুতে লেগে থাকা ঘামের বিচরণ যেন একবিন্দু শীতের শিশির, ঘাসের ওপর বসে আছে। শরীরে কোনো অলংকার নেই। তবু সৌন্দর্যের আলাদা উপলব্দি লক্ষ্যণীয়। অনেক কিছুর অভাব ছিলো তার জীবনে। কিন্তু অনেক পূর্ণতাও ছিলো সৌন্দর্যে। হয়তো সেটা সে নিজেও জানতো না। অনেকেই রাহেলার রূপের কাছে মাথানিচু করেই অল্প দামের খাবার খেতে আসতো। হয়তো অনিমেষ তাদেরই একজন। টাকা ব্যয় করে নামি দামি হোটেলে খাবার কিনে খাওয়ার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও রাহেলার নিম্নমানের খাবারের স্বাদ তার অমৃত মনে হতো। সকাল বা রাত, যতই দূরত্ব হোক না কেন, ছুটে আসে অনিমেষ। ভাত না থাকলেও কোন অসুবিধে হয় না। এক গ্লাস পানি বা কম কিসের। তা দিয়েই তার ক্ষুধা-তৃষ্ণা মিটে। যাকে খুব শখ করে রাহেলা বাবু মানেই ডাকছে। সন্ধ্যায় রাহেলা উনুনে ভাত চাপিয়ে বসে আছে। মাটির উনুনে কাঠের টুকরো দিয়ে রান্না। খানিকক্ষণ পর পর কাঠের টুকরো উনুনের ভেতর দিতে হয়। তাতেই ঝলসে উঠা আগুনের মতো রাহেলার মুখ। আগুনের তাপে রাহেলা লোহায় শান দেওয়ার মতো পুড়ছে। মনে হবে ঠিক যেন হাতুড়ির আঘাতে আরো বেশি মজবুত ও দৃঢ় হয়ে উঠছে। রান্না শেষে বসে থাকে ক্রেতা সাধারণের জন্য। মানুষকে খাইয়ে, যে আনন্দ তার চেহারায়। অন্য কিছুতেই হয়তো সে পায়নি কখনো। নারী হিসেবে তার ভেতর আলাদা কোনো অস্তিত্বের অনুভূতি জন্ম নেয়ার ইচ্ছে প্রকাশ কিঞ্চিৎ পরিমাণেও হয়নি, বোধ হয়। তার ধারণা খেটে খাওয়া শরীর নারী আর পুরুষ কীসের, সব তো সমান। সারাদিন খাটুনির পর মাদুরের মাঝেই বিছিয়ে দিতো শরীরকে। এলোমেলো ভাবে মাটিতে পেতে রাখা বিছানা। তাতেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতো রাহেলার শরীর। নিরব নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ জীবনের সব কিছু গুটিয়ে রাখে রাত। রাহেলা ঘুমায় শহর ঘুমিয়ে গেলে। শহরের বহুতল ভবনের ছিঁটেফুটা আলো চিরচির করে রাহেলার ভাঙা ঘরের বিছানায় উঁকি দেয়। আর এই বিবস্ত্র আলোর সাথে বিরতিহীন নিদ্রা চলতে থাকে রাহেলার। রাতের পর সকাল এলেই রাহেলা তৈরি হয় মানুষের পেটের খাবারের জন্য। এভাবেই তার নিত্যনৈমিত্তিক পথ তৈরি হয়। ঝলসানো ইট কয়লার মাঝে রঙিন ঢাকা শহর কোথাও চোখে পড়ে নি। ভাতের হাঁড়ির মধ্যেই রাত আসে আবার সকাল হয়। বাবুরা আসে খেয়ে যায় পয়সা দেয়। জীবনের এই চক্র আগুন আর পেটের সাথে সম্পর্ক। রাহেলা জানে পেটে ভাত না থাকলে কোন কিছুই রঙিন থাকে না। ২. রাত পৌনে বারটা। রাহেলা দোকান বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নিছক কৌতূহলবশতঃ চাঁদের আলোর দিক চোখ পড়লো রাহেলার। আজ চাঁদটা কত্তো বড় হয়ে গেছে। ভালোই তো লাগছে দেখতে। মিনিট দুই চাঁদের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে আছে সে। এমন সময় কেউ একজন তার কানের কাছে বিড়বিড় করে বলে উঠলো- ‘আমি আছি, পূর্ণিমা দেখবো বলে বসে আছি।’ - আমি কোন নভোচারী নই, যে চাঁদকে দেখে নিকট ভবিষ্যতের আবাস হিসেবে। - আমিও কোন জ্যোতির্বিদ নই, যে চাঁদকে জানে একটি মৃত উপগ্রহ বলে। রাহেলা চুপ করে শুনতে লাগলো। হঠাৎ ট্রাকের বিকট শব্দ। অনিমেষ থেমে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো, দূর মুডটাই নষ্ট করে দিলো। প্রচণ্ড রাগে মাটির হাঁড়ির মতো ফাটতে লাগলো সে। এই ট্রাক ড্রাইভারকে পেটানো দরকার। রাতের বেলায় এত শব্দ করে হর্ন বাজানো তার উচিত হয়নি। রাহেলা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো অনিমেষের দিকে। হঠাৎ অনিমেষের দৃষ্টি গিয়ে পড়ে রাহেলার চোখে। অনিমেষ লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নেয়। - ও রাহেলা খুব ক্ষুধার্ত, আমি ভাত তো দাও। নইলে না খেয়েই মরতে হবে। - কিছু বলতে চাই বাবু। আপনি টাকাওয়ালা মানুষ। আমার মতো অর্থহীন ছোটলোকের কথা কে শুনবে বাবু! অনিমেষ চটপটিয়ে উঠে- এটা তোমার ভারি অন্যায়। আমাকে বলতে পারো, আমি বলছি। অনিমেষ ডান হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল- এবার আমার হাতে তোমার হাত রাখো। দেখো তো কোথাও কোনও আলাদা অনুভূতি পাও কি না। রাহেলা হাসতে হাসতে বলল: এ হাত উষ্ণতায় ভরা, আমি ধরলে তুমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে তো বাবু! - কেন রাহেলা, তোমার একটা রাত কি আমার জন্য হতে পারে না? - বাবু, কতো রাত বিক্রি হয়েছি। আর তুমি মাত্র এক রাত বলছো। - হ্যাঁ রাহেলা, বলতে পারো সে সব রাতের কথা। যদি তুমি বলতে চাও। জোর করছি ভেবো না। - শুনে কি লাভ বাবু। সে সব নষ্ট রাতের কথা। শুধু নোংরা অস্বস্তি ছাড়া আর কিছুই পাবে না। অনিমেষ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। রাহেলা অনিমেষের পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে কাঁদতে থাকে। ৩. রাহেলার দুচোখে জল। চার বছর আগে নয়ন মিয়া বিয়ে করে নিয়ে আসে ঢাকায়। কোনওদিন তাকে রিকশা চালাতে দেখিনি। বিয়ের আগে বলেছিল সে রিকশাচালক। এক বছর ভালোই চলছিলো আমাদের দুজনের সংসার। একদিন হঠাৎ সে নেশা করে বাড়ি ফিরলো। তাকে যখন জিজ্ঞেস করলাম কেন সে নেশা করলো। সে উত্তরে বললো একথা বলার আমি কে। সে রাতে অনেক মারধর করার পর কিছুই না বলে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। এরপর দু’দিন সে বাসায় ফিরল না। তৃতীয় দিন ফিরলো একজন মেয়ে মানুষ সাথে নিয়ে। সেদিনই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিলো আমাকে। জায়গা জুটল রান্না ঘরে। জানতে পারলাম আমি ওর দলিলি বউ। এক বছরের জন্য বিয়ে। ওরা থালা ভরে ভাত খেতো, আমাকে দিতো না। পেটে শুধু ক্ষুধা, মনে হতো ভাতের থালা কাইড়া নিই। সারাদিন পর এঁটো ভাত থাকলে তাই দিতো। অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টাও অজানা ছিলো। যখন বুঝতে পারলাম, তখন দেরি হয়ে গেছে। কয়েকদিন পর দু’জন লোক এলো। সেদিন রান্না ঘরের দরজা বন্ধ করে কি নোংরামিটাই না করলো। কতো চিৎকার চেঁচামেচি করেছি, কেউ এলো না। ওই লোকগুলো বললো আমাকে নাকি বিক্রি করা হয়েছে তিরিশ হাজার টাকায়। জানো বাবু লোকগুলো কাপড় খুলে আমাকে এমনভাবে দেখতে লাগলো মনে হলো বাজারের মাছ বা মাংস। শরীরের প্রতিটি স্থানে উচ্ছৃঙ্খল হাতের স্পর্শ। মনে হয় পাকা আম কিনতে এসেছে। কী করতে পারি! এই নর্দমা থেকে উদ্ধার কেউ করবে না। ওদের বললাম তোমরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে বলো! সেখানে যেতে রাজি, তবে ভাত দিতে হবে? অনেক ভাত। আমি ভাত খাবো। তিন মাস পর। দুপুরে ভাত আর অনেক রকমের খাবার। এতো খুশি ছিলাম সেদিন। খাবার পর অনেক ঘুম পাচ্ছিলো। শুয়ে পড়লাম ঘুম ঘুম চোখে। চারজন মাতাল ঘরের ভেতর। এলোমেলো ভাবে বিবস্ত্র করতে লাগলো। কোন রকম সক্রিয়তা ছাড়াই নিজেকে বিসর্জন দিলাম ওদের কাছে। মাতালদের বিশ্রী রুচির অন্তর্দহনে পুড়ছিলাম। একটা সময় রক্ত ভাঙা শুরু হলো। কী অসহ্য ব্যাথা! এরপর কি হলো বুঝতে পারিনি। জ্ঞান ফেরার পর হাসপাতালের বারান্দায় পড়ে আছি টের পেলাম। সন্তান হারানোর পর আর কিছু অবশিষ্ট থাকল না। কত কিছু করতে চেয়েছি। কেউ দিল না ভালোভাবে থাকতে। পুরুষের হাতগুলো আমার শরীরে বেয়ে বেড়াতো। সত্তর বছরের বৃদ্ধ যখন বুকের মধ্যে হাত রাখলো, মাথার মধ্যে আগুন জ্বলে উঠলো। বাজারের মধ্যেই চেঁচিয়ে উঠলাম। যার ইচ্ছে রাতে বাড়ি চলে আসিস। টাকা ছাড়া কোন মাগির পুলা বাড়ির সামনে যাস না। জানো বাবু, সে রাতেই বৃদ্ধের উপস্থিতি ঘরের ভেতর। ক্ষমতা নেই তবুও সারারাত কাটালো। জানো বাবু, বৃদ্ধের বিশ্রি রুচির অভিব্যক্তি মনে হলে আজো শিউরে উঠি। সেই থেকে প্রতিরাতেই নতুন পুরুষের আসা যাওয়া, ভাঙা এই ঘরে। অভ্যাসে পরিণত হলো পুরুষমানুষ, ভাতের জন্য। একদিন ভাতগন্ধি মানুষের ভিড়ে ফিরতে ইচ্ছে হলো। তাই নিজেকে মানুষের মতো করে তুলতে এই সংগ্রাম। তুমি বলো, আবার ফিরে যাবো সে জীবনে? যে জীবনে কান্না ছাড়া কিছুই নেই। তোমরা পুরুষমানুষ বাবু। মানুষ মনে করো না ক্যান আমাদের! মাইয়া মানুষের তকমা লাগিয়ে ঝুলিয়ে রাখো। তোমাদের ঐ বীভৎস হাতগুলো থেকে রেহাই মিলবো না কোনওদিন? - এভাবে বলো না রাহেলা তোমাকে দেখলে হেলোসনেশন হয়। কেমন যেনো অস্পর্শী-বিমূর্তে ডুবে যাওয়া। বলতে পারো নিশ্বাসে পিওর অক্সিজেনের অনুভূতি পাই। পৃথিবীটা একটা অদ্ভুত মায়া। তাই কোনও ইচ্ছেকেই ছেড়ে দিতে নেই। তোমাকে পাওয়ার যে শক্তি আমার মনে। তা সম্পূর্ণ পবিত্র। তুমি চাইলে সারাজীবন পাশে থাকতে চাই। কোন কন্ট্রাক্ট বিয়ে নয়। না কোন লোভ। না কোন নোংরামি মানসিক চিন্তা। তোমাকে একটা সুন্দর আকাশের নিচে নিয়ে যেতে চাই। এক থালা ভাত না হয় ভাগ করেই খাবো। পারবে না থাকতে? - বাবু তুমি রসিকতা করছো! অনিমেষ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। কিছু না বলেই বের হয়ে আসে। রাহেলা বাবু বাবু বলে দৌড়ে আসে। ততক্ষণ অনিমেষ অস্তিত্বহীন। ৪. বাঁধভাঙ্গা যে মায়ার টোল গালে আঁকা রাহেলার, অনিমেষের দুর্ভেদ্য চোখে শুধু তারই ছবি স্বপ্ন ছড়ায়। অনিমেষ নারীদের চোখে চোখ রাখতে পারে না, সে রাতের পর থেকে। শুধু রাহেলার সেই সব প্রশ্ন। যদিও বা রাহেলাদের পথে নানা রকম কাঁটা ছড়ানোর কাজ কোনওদিন অনিমেষ করেনি। কিন্তু যারা করে তাদের লজ্জার তেঁতো অনিমেষ গলাধকরণ করে প্রতিদিন। এরপর এই মুখ নিয়ে কোনওদিন সে রাহেলার সামনে যায়নি। কারণ পূর্ণমর্যাদা দিতে হয়তো কোথাও সে ব্যর্থ। পরিবার আর ধর্ম কোনটাই অনিমেষের পিছু ছাড়লো না। বিচ্ছিন্ন এক রাতে। নেশায় বোধ হয়ে রাহেলার কাছে ফিরলো অনিমেষ। এভাবেই আবার বিক্রি হলো রাহেলা। অনিমেষ অন্যদের থেকে পিছিয়েই বা থাকবে কীভাবে। দানব পুরুষ। দানব পুরুষেরাই যে নারীর ভাগ্য তৈরি করে! অনিমেষকে সে রাতে রাহেলা তার ঘরে দেখে কম্পিত হাসি দিয়ে বললো। - জীবন মানেই ভাত। আমি যে ভাতের থালায় সবটুকু জীবন দেখতে পাই বাবু। আর ভাতের জন্য কত্তোবার যে বিক্রি হয়েছি। মনে করেন আজো বিক্রি হচ্ছি বাবু।