উপনিবেশবাদ ও নিপীড়ন-বিরোধী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Posted: 18 আগস্ট, 2019

এম. এ. আজিজ মিয়া: ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষে সূচিত হয়েছিলো প্রথম সংগঠিত স্বাধীনতা আন্দোলন। ব্রিটিশ শাসকরা তাকে বলেছিলেন ‘সিপাহী বিদ্রোহ’; আর মণীষী কার্ল মার্কস (১৮১৮–১৮৮৩) যাকে ‘ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। ঠিক তার চার বছরের মধ্যেই ১২৬৮ বঙ্গাব্দের (১৮৬১ সালে) ২৫ বৈশাখ জন্মগ্রহণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ; বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১)। তাঁর প্রায় পঁয়ষট্টি বছর পরে এদেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন আর একজন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬–১৯৪৭)। বাংলার একটি সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করে সুকান্ত যেভাবে এদেশটাকে ক্ষুব্ধ দেখেছিলেন, ঐশ্বর্য ও প্রতিপত্তির মধ্যে বেড়ে ওঠা জমিদার নন্দন রবীন্দ্রনাথের মধ্যে সে-চেতনা গড়ে ওঠেছিলো অভিজ্ঞতা ও শিক্ষার মধ্যদিয়ে ধীর লয়ে। মনোজগতের কারবারী রবীন্দ্রনাথ প্রথম পাঠ লাভ করেছিলেন মানুষ হওয়ার সাধনা। আর সে-সাধনায় তিনি সারা জীবন ব্যাপৃত রেখেছিলেন। তাই মনুষ্যত্বের নিপীড়ন-নির্যাতন ও অপমান-অবনমন তাঁর কমলচিত্তকেও ক্ষুব্ধ করেছে। ফলে কিশোর বয়সেই তিনি ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী শাসন-শোষণ ও নির্যাতন-বিরোধী সংগঠন ‘সঞ্জীবনী সভা’-র সদস্যপদ গ্রহণ করেছিলেন এবং জীবনভর মানবতা ও শান্তির জন্য লড়ে গেছেন। তারপর ১৯৪১ সালে ১ বৈশাখ যখন তাঁর জীবনকালের শেষ জন্মদিন উপলক্ষে শান্তিনিকেতনের অনুষ্ঠানে ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে তিনি অকপটে পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির অন্তরের সম্পদ-বিশ্ববোধে চিড় প্রত্যক্ষ করেই আশাহত বাণী শুনিয়েছিলেন। চতুর্দিকে দানবীয় বিশ্বযুদ্ধের শাণৈ শাণৈ রব শুনে আর বিশ্বাস রাখতে পারছিলেন না। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘একেবারে দেউলিয়া হয়ে গেল।’ যদিও তিনি সারাজীবন মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানোকে পাপ মনে করতেন। অবশেষে তিনি যখন শুনলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়া ফ্রন্টে ফ্যাসিস্ট জার্মান বাহিনীকে কিছুটা হলেও ঠেকানো গিয়েছে তখনই তিনি আশ্বস্ত হয়ে ওঠেছেন। ১৯৪১ সালের ৩০ জুলাই তাঁর দেহে অস্ত্রোপচার হলো, আর ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ (৭ আগস্ট ১৯৪১) তিনি চিরদিনের জন্য চক্ষু মুদলেন। ভারতে উপনিবেশবাদী শাসন, শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পাশাপাশি ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে গড়ে ওঠেছিলো বিপ্লবী আন্দোলনের ধারা। রবীন্দ্রনাথের শিশুকালে ১৮৬৭ সালে নবগোপাল মিত্র (১৮৪০–১৮৯৪), রাজনারায়ণ বসু (১৮২৬–১৮৯৯) হিন্দু মেলার প্রচলন করেন। পরে প্রতিষ্ঠিত হয় ন্যাশনাল সোসাইটি, ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন, সঞ্জীবনী সভা। গুপ্ত সমিতি ‘সঞ্জীবনী সভা’-র সদস্য ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তার সভাপতি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের গৃহশিক্ষক ও বিশিষ্ট সমাজসেবক রাজনারায়ণ বসু এবং সম্পাদক ছিলেন রবীন্দ্রনাথের জ্যৈষ্ঠ ভ্রাতা জ্যেতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪৯–১৯২৫)। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন : জ্যোতি দাদা এক পোড়ো বাড়িতে এক গুপ্তসভা স্থাপন করেছেন। একটা পোড়ো বাড়িতে তার অধিবেশন, ঋগ্বেদের পুঁথি, মরার মাথার খুলি আর খোলা তলোয়ার নিয়ে তার অনুষ্ঠান, রাজনারায়ণ বসু তার পুরোহিত। সেখানে আমরা ভারত উদ্ধারের দীক্ষা পেলাম। (আত্মপরিচয়–রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পৃ. ৮) ১৮৮৫ সালে গঠিত হয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। ১৮৮৬ সালে কোলকাতায় অনুষ্ঠিত তার প্রথম সম্মেলন। সেখানে রবীন্দ্রনাথ গাইলেন ‘মিলেছি আজ মায়ের ডাকে’ গানটি। তারপর কংগ্রেসের আরো কয়েকটি সম্মেলনেও তিনি উপস্থিত ছিলেন, গান গেয়েছেন। তারপর ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ চলে আসেন শুধু ঘরের বাইরে নয়– রাজপথে। সে-স্মৃতিচারণ করে অবণীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন : রবিকাকা একদিন বললেন, রাখীবন্ধন-উৎসব করতে হবে আমাদের, সবার হাতে রাখী পরাতে হবে।...ঠিক হল সকালবেলা সবাই গঙ্গায় স্নান করে সবার হাতে রাখী পরাব। এই সামনেই জগন্নাথ ঘাট, সেখানে যাব–রবিকাকা বললেন, সবাই হেঁটে যাব, গাড়িঘোড়া নয়।...রওয়ানা হলুম সবাই গঙ্গাস্নানের উদ্দেশ্যে রাস্তার দুধারে বাড়ির ছাদ থেকে আরম্ভ করে ফুটপাথ অবধি লোক দাঁড়িয়ে গেছে– মেয়েরা খৈ ছড়াচ্ছে শাক বাজাচ্ছে, মহাধুমধাম– যেন একটা শোভাযাত্রা। দিনুও ছিল সঙ্গে, গান গাইতে গাইতে মিছিল চলল– বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল– পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান॥ (রবীন্দ্রনাথ ও বিপ্লবী সমাজ-চিন্মোহন সোহানবীশ, পৃ. ২) রবীন্দ্রনাথ স্বদেশী বিপ্লবীদের উৎসাহিত করার জন্য অনেকগুলি গান রচনা করেছিলেন এবং কয়েকটি গান তিনি নিজে গেয়েও শুনিয়েছিলেন। এ সম্পর্কে অনুশীলন সমিতির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা যতীন্দ্রনাথ শেঠ (১৮৮৮–১৯৭৪) মন্তব্য করে লিখেছিলেন : স্বদেশী আন্দোলনের উত্তাল মুহূর্তে অনুশীলন সমিতির প্রধান কার্যালয় কলিকাতাস্থ ৪৯ কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট সন্নিকটে মদন মিত্র লেনস্থিত ক্রীড়া প্রাঙ্গণে শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় সমিতির যুব সঙ্ঘের সহিত কয়েকবার (মতান্তরে একবার) মিলিত হন এবং সামান্য একটি কাঠের টুলে বসিয়া তাঁহার নবরচিত কয়েকটি বাউল গান প্রাণের উত্তাপে গাহিয়া শোনান। সেগুলির সাধরণ্যে প্রচার এইরূপে হয়। নিম্নলিখিত গানগুলি এইরূপে সমিতির সভ্যদিগকে তাহাদের ব্রতে উৎসাহিত করিবার জন্য মুখ্যতঃ রচিত হয়। কবির উদাত্ত কণ্ঠে গীত আহ্বানের শ্রোতা এখনও কয়েকজন জীবিত আছেন। ১. ও আমার দেশের মাটি ২. যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে ৩. তোর আপন জনে ছাড়বে তোরে ৪. আপনি অবশ হলে বল দিবি তুই কারে ৫. নিশিদিন ভরসা রাখিস ৬. আমি ভয় করবো না ভয় করবো না ৭. এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে ৮. নাই নাই ভয় হবে হবে জয় ৯. ওদের বাঁধন যতই শক্ত হবে ১০. আমার সোনার বাংলা ইত্যাদি। (অনুশীলন সমিতির ইতিহাস–জীবনতারা হালদার। পৃ. ৬৬–৬৭) ১৯০৭ সালের জুলাই মাসে কৃষ্ণকুমার মিত্রের কন্যা কুমুদিনী মিত্রের ‘সুপ্রভাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিলো রবীন্দ্রনাথের ‘সুপ্রভাত’ কবিতাটি। তার দুটি লাইন ছিলো নিম্নরূপ : উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ভয় নাই ওরে ভয় নাই, নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই। (রবীন্দ্রনাথ ও বিপ্লবী সমাজ, পৃ. ১৯) ১৯০৭ সালের ২৩ আগস্ট বিপ্লবী আন্দোলনের প্রাণপুরুষ শ্রী অরবিন্দ ঘোষ (১৮৭২–১৯৫০) রাজদ্রোহ মামলা থেকে মুক্তি লাভের পর রবীন্দ্রনাথ লেখেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা–‘অরবিন্দ রবীন্দ্রের লহো নমস্কার’; ...দেবতার দীপ হস্তে যে আসিল ভবে সেই রুদ্র দূতে বলো, কোন রাজা কবে পারে শাস্তি দিতে! বন্ধন-শৃঙ্খল তার চরণবন্ধনা করি করে নমস্কার– কারাগার করে অভ্যর্থনা।.... (রবীন্দ্রনাথ ও বিপ্লবী সমাজ, পৃ. ১৭) তারপর বিপ্লবী আন্দোলনে অনেকে আত্মদান করেছেন, অনেকের ফাঁসি হয়েছে এবং চরম নির্যাতন ও নিপীড়ন ভোগ করেছেন। অনেক বিপ্লবীকে তিনি শান্তিনিকেতনে আশ্রয় দিয়েছেন, নানাভাবে সহায়তাও করেছেন। রাজনীতির ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের বরাত দিয়ে তাঁর মনোভাব ব্যক্ত করে সুধীরচন্দ্র কর (১৯০৫– ১৯৭৭) লিখেছেন : আমি বলে বুঝাতে চাই না যে রাজনীতিতে এমন কোনো দোষ আছে। কিন্তু তা আশ্রমের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। (অনুবাদ) (রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ও সাধনা– সুধীর চন্দ্র কর, পৃ.২১১) রবীন্দ্রনাথ ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ স্বরূপ ব্রিটিশদের দেয়া ‘নাইট’ উপাধি বর্জন করেন। ১৯১৯ সালের ২৯ মে একপত্রে ব্রিটিশরাজকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন : ‘রাজাধিরাজ ভারতেশ্বর আমাকে ‘নাইট’ উপাধি দিয়া সম্মানিত করিয়াছেন সেই উপাধি পূর্বতন যে রাজপ্রতিনিধির হস্ত হইতে গ্রহণ করিয়াছিলাম, তাঁহার উদারচিত্ততার প্রতি চিরদিন আমার পরম শ্রদ্ধা আছে। উপরে বিবৃত কারণবশত বড় দুঃখেই আমি যথোচিত বিষয়ের শ্রীল শ্রীযুক্তের নিকট অদ্য এই উপরোধ উপস্থিত করিতে বাধ্য হইয়াছি যে, সেই ‘নাইট’ পদবী হইতে আমাকে নিষ্কৃতিদান করিবার ব্যবস্থা করা হয়। (অরিত্র, জুলাই ২০০৮, পৃ. ৪০) রবীন্দ্রনাথ যখন দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণ করেছেন তখন ১৯২৪ সালের ২৪ অক্টোবর দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠিতে সংবাদ পেলেন বাংলা সরকার এক অর্ডিন্যান্স জারী করে বহু তরুণকে আটক করেছে। ২০ ডিসেম্বর তার জবাবে তিনি পাঠিয়েছিলেন একটি কবিতাপত্র। তার কয়েকটি লাইন ছিলো নিম্নরূপ : দুঃখ যাহার তপস্যাতে হোক বাঙালির জয়– ভয়কে যারা দানে তারাই জাগিয়ে ভয়, মৃত্যুকে যারা এড়িয়ে চলে মৃত্যু তারেই টানে, মৃত্যু যারা বুক পেতে লয় বাঁচতে তারাই জানে। (রবীন্দ্রনাথ ও বিপ্লবী সমাজ, পৃ. ৬০–৬১) ১৯২৯ সালে বিপ্লবী যতীন দাস (?–১৯২৪) লাহোর জেলে ৬৩ দিন অনশন করার পর জোর করে খাবার খাওয়ানোর সময় মারা যান। সে ঘটনায় রবীন্দ্রনাথের বিচক্ষণতা ও বেদনার সুন্দর চিত্রটি এঁকেছেন শ্রী শান্তিদেব ঘোষ। রবীন্দ্রসংগীত গ্রন্থে তিনি লিখেছেন : ...শেষ পর্যন্ত যতীন দাসের মৃত্যু হল। এই সংবাদ যখন শান্তি নিকেতনে এসে পৌঁছল, সেইদিন গুরুদেব মনে যে বেদনা পেয়েছিলেন তা ভুলবার নয়। সন্ধ্যায় ‘তপতী’ অভিনয়ের মহড়া বন্ধ না রাখার কথা হল। কিন্তু বহুবার তিনি পাঠের খেই হারাতে লাগলেন, বহুবার চেষ্টা করেও কিছুতেই ঠিক রাখতে পারছিলেন না, অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলেন। শেষ পর্যন্ত মহড়া বন্ধ করে দিলেন। সেই রাত্রেই লিখলেন ‘সর্ব খর্বতারে দহে তব ক্রোধ দাহ’ গানটি। ‘তপতী’ নাটকে এটিকে জুড়ে দিলেন। এগানটি যে তাঁর অন্তরের কী তীব্র বেদনার প্রকাশ, আজ সে কথা হয়তো অনেকেই জানেন না; জানা থাকলে এগানটি সকলের কাছে আরো সত্য হয়ে উঠবে। (রবীন্দ্রনাথ ও বিপ্লবী সমাজ, পৃ. ৬২) ১৯৩১ সালের ৩০ আগস্ট চট্টগ্রামে অত্যাচারী পুলিশ অফিসার আহসানুল্লাকে তরুণ বিপ্লবী হরিপদ ভট্টাচার্য গুলি করে হত্যা করার ফলে শহরে পুলিশী তাণ্ডব ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়। তছাড়া ১৬ সেপ্টেম্বর হিজলী জেলে পুলিশের গুলিতে দুই রাজবন্দী সন্তোষ মিত্র ও তারকেশ্বর সেনের মৃত্যু হলে হিজলীর নৃশংস ঘটনাবলির প্রতিবাদে ১৯৩১ সালের ২৬ অক্টোবর কোলকাতা গড়ের মাঠে অকটারলোনি মনুমেন্টের পাদদেশে অনুষ্ঠিত এক বিরাট জনসভায় সভাপতির ভাষণে রবীন্দ্রনাথ বলেন: প্রথমেই বলে রাখা ভালো, আমি রাষ্ট্রনেতা নই। আমার কর্মক্ষেত্র রাষ্ট্রিক আন্দোলনের বাইরে। কর্তৃপক্ষের কোনো অন্যায় বা ত্রুটি দিয়ে সেটাকে আমাদের রাষ্ট্রিক খাতায় জমা করতে আমি বিশেষ আনন্দ পাইনে। এই–যা-কিছু আমার বলবার সে কেবল অবমানিত মনুষ্যত্বের দিকে তাকিয়ে। (রবীন্দ্র রচনাবলী (দ্বাদশ খণ্ড), ঐতিহ্য সংস্করণ, পৃ. ৭১২–১৩) ১৯৩৩ সালের ১২ মে আন্দামানের ৩৯ জন বন্দী অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। কেননা সরকার পূর্ব প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করায় তারই প্রতিবাদে রবীন্দ্র জীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছেন : রবীন্দ্রনাথ দার্জিলিঙ হইতে বন্দীদিগকে এইভাবে আত্মাহুতি দান করিতে নিষেধ করিলেন, টেলিগ্রাম করিলেন; কবির অনুরোধ রক্ষিত হইয়াছিল। ‘তোমাদের মাতৃভুমি তার পূর্ণবিকশিত ফুলগুলিকে কোনোদিন ভুলিবে না। (অনুবাদ) এই বন্দীরা যে উত্তর পাঠিয়েছিলেন তা তাঁর কাছে পৌঁছেনি। (রবীন্দ্রনাথ ও স্বদেশী সমাজ, পৃ. ৭০) ১৯৩৬ সালের ১০ মে সুভাসচন্দ্র বসু (১৮৯৭–১৯৪৫)-র মুক্তি দাবীতে ‘সুভাষ দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত হয়। রবীন্দ্রনাথ যে বিবৃতি দিয়েছিলেন শ্রী দিলীপ মজুমদারের ভাষায় তার শেষাংশ নিম্নরূপ : ... এই দেশব্যাপী অভিসম্পাতের আক্রমণ হতে যদি কোনোদিন নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারি তাহলেই আমাদের প্রত্যেক অন্যায়ের প্রতিবাদ প্রতিধ্বনিত হবে দেশ-বিদেশে। (রবীন্দ্রনাথ ও বিপ্লবী সমাজ, পৃ. ৭৪) ১৯৩৬ সালে ‘ব্যক্তি স্বাধীনতা সংঘ’ গঠিত হলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সর্বভারতীয় কমিটির সভাপতির পদ গ্রহণ করতে সম্মত হন। সে বছর ২২ নভেম্বর আনন্দবাজার পত্রিকায় তিনি একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন। ১৯৩৭ সালের ২ জুলাই থেকে ১৮৭ জন (পরে ঐ সংখ্যা ২১১-এ দাঁড়ায়) আন্দামানে বন্দী অনশন শুরু করেন। ২ আগস্ট কোলকাতা টাউন হলে আন্দামান বন্দীদের দেশে ফিরিয়ে আনা এবং মুক্তিদানের দাবিতে যে বিশাল জনসভা হয়, সেখানে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভাষণে বলেন : আপনারা সকলেই জানেন আমি রাজনৈতিক নহি। সুতরাং আপনাদের স্মরণে রাখিতে হইবে যে, আমি এই সন্ধ্যায় রাজনৈতিক কোনো উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কিছু বলিব না। কারণ রাজনীতির গণ্ডি স্বভাবতই সীমাবদ্ধ। আজিকার সন্ধ্যায় আমি ন্যায়বিচার ও মানবতার আহ্বানে আমি সাড়া দিতেছি। এই আহ্বান উপেক্ষা করিলে বিপদ অনিবার্য। (রবীন্দ্রনাথ ও বিপ্লবী সমাজ, পৃ. ৭৯) সে সভায় রবীন্দ্রনাথ স্বাক্ষরিত একটি টেলিগ্রাম আন্দামান বন্দীদের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয় এবং ‘আন্দামান রাজনৈতিক বন্দী সাহায্য কমিটি’ নামে একটি কমিটি গঠিত হয়। তার সভাপতি হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯৩৭ সালের ২৮ আগস্ট আন্দামান বন্দীরা অনশন ধর্মঘট প্রত্যাহার করলেন। কিছু কিছু রাজবন্দী মুক্তি পেতে শুরু করলেন। তাঁদের সাহায্য ও পুনর্বাসনের জন্য রিলিফ কমিটি গঠিত হয় এবং তহবিলে মুক্ত হস্তে দান করার জন্য ১৯৩৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর সংবাদপত্রে একটি আবেদন প্রকাশ করা হয়। সেই আবেদনে স্বাক্ষর করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। ১৯৩৮ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকা জেলে অনশনরত রাজবন্দী হরেন্দ্র মুনশীর মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়। ২ ফেব্রুয়ারি আন্দামান বন্দীদের সর্বশেষ দলের ১০৯ জন বন্দী তাঁদের দাবি না মানলে আবার অনশন করার সিদ্ধান্ত নেন। এ-পরিস্থিতিতে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটি ৮ ফেব্রুয়ারি ‘রাজনৈতিক বন্দী দিবস’ পালন উপলক্ষে কংগ্রেস সভাপতি সুভাষচন্দ্র বসুর অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ বাংলা সরকারের উদ্দেশ্যে একটি আবেদন জানান। বিপ্লবী কল্পনা দত্ত (পরে যোশি) ছাড়াও অনেকের জন্য তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগও নিয়েছিলেন। কল্পনা দত্তের বাবার কাছে এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন : তোমার কন্যার জন্য যা আমার সাধ্য তা করেছি, তার শেষ ফল জানবার এখনও সময় হয়নি, আশা করি চেষ্টা ব্যর্থ হবে না। (রবীন্দ্রনাথ ও বিপ্লবী সমাজ, পৃ. ৮৭) ১৯৩৯ সালে রবীন্দ্রনাথ সুভাষচন্দ্রকে দেশনায়ক রূপে বরণ করে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। ব্রিটিশ-বিরোধী বিপ্লবীদের নিয়ে তিনি গল্প, উপন্যাস রচনা করেছেন। তাঁর অনেক কবিতা ও গান তো ছিলো বিপ্লবীদের জীবনধারণের শেষ অবলম্বন। বিপ্লবীদের আত্মদানের অপরিসীম ক্ষমতা বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের দৃঢ় বিশ্বাসের কথা লিখেছেন শান্তি নিকেতনের সুজিতকুমার মুখোপাধ্যায় : ...সন্ধ্যাবেলার উদয়নের চত্বরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে আবছা আলো অন্ধকারে রবীন্দ্রনাথ বসে আছেন; আচার্য ক্ষিতিমোহন সেন মহাশয়, শিষ্য (লেখক) সহ সেখানে নিঃশব্দ আসন গ্রহণ করলেন। কবি দেশকর্মীদের দুঃখবরণের কথা তুললেন। তারপর কত কথা যেন মনের অজান্তেই বলে চললেন–‘তাদের সঙ্গে এদের তুলনা হয় না। সে কি সহ্য শক্তি! কী আশ্চর্য মনোবল! সে যে না দেখেছে সে বুঝবে না। (রবীন্দ্রনাথ ও বিপ্লবী সমাজ, পৃ. ৮৯) রবীন্দ্রনাথ তাঁর সর্বশেষ প্রকাশ্য সভায় ১৩৪৮ সনের ১ বৈশাখ শান্তিনিকেতনে ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে উচ্চারণ করেছিলেন : একথা আজ বলে যাব, প্রবল প্রতাপশালীর ও ক্ষমতার মদমত্ততা আত্মম্ভরিতা যে নিরাপদ নয় তারই প্রমাণ হবার দিন আজ সম্মুখে উপস্থিত হয়েছে; নিশ্চিত এ সত্য প্রমাণিত হবে যে– অধর্মেণৈধতে তাবৎ ততো ভদ্রাণিপশ্যতি। ততঃ সম্পত্নান্ জয়তি সমূলস্তু বিনশ্যতি ॥ (রবীন্দ্র রচনাবলী, ত্রয়োদশ খণ্ড, পৃ. ৭৮৬) উপনিবেশবাদ সম্পর্কে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একথার পর আর কোনো কথা বলার দরকার পড়ে কি? জয়তু রবীন্দ্রনাথ! বাংলার জয় হোক !! বাঙালির জয় হোক!!! ঢাকা, ২৭ জুলাই ২০১৯ তথ্য নির্দেশিকা : ১. রবীন্দ্রনাথ ও বিপ্লবী সমাজ– চিন্মোহন সেহানবীশ, বিশ্বভারতী গ্রন্থবিভাগ (১৪০৪), কোলকাতা। ২. আত্মপরিচয়– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কোলকাতা। ৩. অনুশীলন সমিতির ইতিহাস– জীবনতারা হালদার, কোলকাতা। ৪. রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ও সাধনা– সুধীরচন্দ্র কর, কোলকাতা। ৫. অরিত্র, জুলাই ২০০৮, ঢাকা। ৬. রবীন্দ্র রচনাবলী, ঐতিহ্য সংস্করণ, ঢাকা। ৭. সুকান্তের জীবন ও কাব্য– ড. সরোজমোহন মিত্র, কোলকাতা। লেখক : লেখক ও প্রাবন্ধিক।