অর্থনৈতিক, মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক লড়াই জোরদার করুন

Posted: 04 আগস্ট, 2019

কাজী রুহুল আমিন : সমগ্র দেশের সর্বত্র গভীর সংকট বিরাজ করছে। এই সংকটের মৌলিক কারণ হলো শ্রেণিদ্বন্দ্ব। ধনিকশ্রেণি এখন লুটেরা ধনিকে পরিণত হয়েছে। লুটপাট-দুর্নীতি এখন সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্নীতি-লুটপাট করতে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকতে হবে তাই ভোট লুটে নিয়ে ক্ষমতায় থাকতে মরিয়া ধনিকশ্রেণি। ফলে আগেপিছে ভাবার সময় তাদের নেই। ছিল না। যারা বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসায় আনন্দিত তাদের মনে রাখা দরকার যে, গত ৩০ ডিসেম্বরের ভোট আগের রাতে লুটে নেওয়ায় আওয়ামী লীগ জিতেছে একই সাথে আওয়ামী লীগ পচেছে এবং রাজনীতিও পচেছে। এই লুটেরা ধনিকরা নানাভাবে কৌশল বদলায়, ধরন বদলায়। তবে শোষণের মাত্রা কমে না। দিন দিন শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের সুযোগ-সুবিধা কমে। যার কিছু চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে : মজুরি : ন্যায্য মজুরি, জীবনধারণ উপযোগী মজুরি নিয়ে নানারকম কথা থাকলেও মজুরি বৃদ্ধির দাবিটি সার্বজনীন। আইএলও কনভেনশন অনুসারে শ্রমিকের পরিবারের মানবিক জীবনযাপনের জন্য মজুরি প্রদানের কথা থাকলেও সরকার ও মালিকরা তা মানে না। আইন অনুসারে প্রতিমাসের মজুরি পরবর্তী মাসের ৭ কর্মদিবসের মধ্যে এবং মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক ছেদ হইলে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে শ্রমিকের সকল পাওনা পরিশোধের কথা থাকলেও তা কার্যকর নাই। সুস্থ শ্রমিকই কেবল শিল্পকে বিকশিত করতে পারে যা পুঁজিপতিরা মানতে চায় না। বিধায় আন্দোলনের চাপে মুদ্রার অংকে মজুরি বাড়ায় কিন্তু প্রকৃত মজুরি বা আসল মজুরি বৃদ্ধি পায় না। প্রতিদিনই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা শ্রম করবার শক্তি নিয়ে পুঁজিপতি মালিকরা বিবেচনা না করে তারা হিসাব কষে মজুরি আত্মসাতের আংশিক অসৎ উপায়ে খরচ করে কম মজুরি দিয়ে কিভাবে টাকার পাহাড় গড়ে তোলা যায়। এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার বাংলাদেশের মালিকরা বিশেষ করে গার্মেন্ট মালিকরা অতিমাত্রায় মুনাফা করে নব্য ধনিকশ্রেণিতে পরিণত হলেও বাংলাদেশের শ্রমিকদের মজুরি পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে কম। সামাজিক সুরক্ষা : মানুষ হিসেবে এই পৃথিবীতে জন্ম নেয়ার সাথে সাথে কতগুলো অধিকার থাকে যাকে বলা হয় মৌল মানবিক অধিকার। আবার শ্রমিক হিসেবে কতগুলো অধিকার সংবিধান, আইন-বিধি ও কনভেনশন দ্বারা স্বীকৃত। এর মধ্যে শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে রেশনিং বাসস্থান, চিকিৎসা এবং সন্তানদের শিক্ষালাভের সুযোগ ছিল যা কেড়ে নেয়া হয়েছে। ২২ পরিবারের যেসব কারখানা ছিল আদমজী, বাওয়ানী, মাড়োয়ারি ইত্যাদি কারখানায় শ্রমিকদের রেশনিং, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যবস্থা করে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছিল। তা আর বলবৎ নাই। এবারের বাজেট দেখেও বিস্মিত হতে হলো যে, শ্রমিকদের জন্য কোনো বাজেট বরাদ্দ নাই। এমনকি শ্রম মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেট সবচেয়ে কম। অথচ দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক শ্রমিক। যেই শ্রমিকদের অবদানেই দেশ এবং দেশের অর্থনীতি পরিচালিত সেই শ্রমিকদের জীবনে চলছে চরম দুর্দশা। দুর্দশা দূর করা শুধুমাত্র শ্রমিকদের দাবি নয় এটা আমাদের সামনে আজ জাতীয় কর্তব্য হিসেবে হাজির হয়েছে। ফলে শ্রমিকদের রেশনিং-বাসস্থান-চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে জাতীয় আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এসকল দাবি আদায় করতেই হবে। শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হলে জাতীয় অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে। ইতোমধ্যেই দক্ষ শ্রমিকের অনেক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। শ্রম আইন বিধি-নীতি : শত বছরের লড়াই সংগ্রামের ফলে কতগুলো আইন দ্বারা শ্রমিকদের কতিপয় অধিকার সংরক্ষণ এবং শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল, যেসব আইনি অধিকার ক্রমান্বয়ে খর্ব করা হচ্ছে। এর পরেও যেটুকু অধিকার রাখা হয়েছে তার কার্যকারিতা নাই এমনকি মালিকরা বলেই থাকেন যে, কারখানা করেছি আমরা তাই আমাদের বানানো নিয়মেই চলতে হবে। এখান থেকে উত্তোরণ ঘটাতে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যে, আইএলও গঠিত হয়েছিল মালিকদের দাবিতে শ্রমিক আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে। যখনই আইনের কোনো বিষয় শ্রমিকদেরকে শোষণ-নির্যাতনে অসুবিধা মনে করেন তখনই মালিকরা তা তাদের মতো করে সংশোধন বা পরিবর্তন করে নেয়। বার বার শ্রম আইনকে সংশোধন করতে করতে এখন এ আইনকে শ্রমিক নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ২০১২ সালে “জাতীয় শ্রমনীতি-২০১২” নামে একটি শ্রমনীতি প্রণয়ন করা হয়েছে যেখানে সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলা আছে কিন্তু কার্যক্রম তার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। কেননা– শ্রমনীতির ভূমিকাতেই বলা হয়েছে যে, স্বাধীনতার জন্য সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক সংগ্রাম ও নয় মাসের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অঙ্গিকার ছিল কৃষক-শ্রমিকসহ মেহনতি মানুষের জন্য শোষণমুক্ত, মর্যাদাসম্পন্ন ও সামাজিক ন্যায়বিচার ভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তী স্বৈরশাসন ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শ্রমজীবী মানুষ এক বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তি ও উন্নয়নে শ্রমজীবী মানুষের অবদান সর্বজনবিদিত। বর্তমান শ্রমনীতির মূল উদ্দেশ্য শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণে অধিকার সুরক্ষা। শোভন কর্মপরিবেশ ও সুস্থ শিল্প সম্পর্ক প্রতিষ্টা। জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও প্রত্যাশার পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বৈষম্য, শোষণ, দারিদ্র্য ও কুসংস্কার মুক্ত সৃজনশীল ও কর্মমুখী শ্রমশক্তি গড়ে তোলা। ক্ষমতাসীন লুটেরা সরকার এই শ্রমনীতি প্রণয়ন করে বাহাবা নেয়ার জন্য নীতিতে উল্লেখ করেছেন যে, এই রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক শ্রমমান, অন্যান্য সনদ ও ঘোষণা বাস্তবায়নে অঙ্গিকারবদ্ধ। সকল প্রকার বাধ্যতামূলক শ্রমের বিলোপ, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য নিরসন, সংগঠন করা ও দরকষাকষির অধিকার থাকবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্ব হ্রাস, শিক্ষার মান বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনশক্তি বিকশিত করবে। এর সবই এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র কাগজেই লেখা রয়ে গেছে। সরকার হাঁটছে এই শ্রমনীতির উল্টো পথে। কেননা সরকার নিজেই মালিকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাদের সকল কর্মকাণ্ড শুধু মালিকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য। এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে মালিকদের সরকার পরিবর্তন করে শ্রমিকশ্রেণির সরকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া এই নীতির একবিন্দুও কার্যকর হবে না। এমনকি মালিক শ্রমিকের বিরোধ মীমাংসা করে শিল্প পরিচালনার জন্য যে শ্রম আইন-বিধি তাও মালিকরা মানেন না। কেননা বর্তমান আইনে ৩৫৪টি ধারা সম্বলিত ২১টি অধ্যায় রয়েছে যার অংশ বিশেষ না বললেই নয়। বর্তমান আইনে শ্রমিক নিয়োগ, মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে সম্পর্ক, সর্বনিম্ন মজুরির হার নির্ধারণ, মজুরি পরিশোধ, দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, শিল্পবিরোধ উত্থাপন ও নিষ্পত্তি, শ্রমিকের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, কল্যাণ, পরিবেশ, কর্মঘণ্টা, ছুটি ইত্যাদি সম্পর্কে বলা থাকলেও তা কার্যকর নাই যেমন– নাম, ঠিকানা, পরিচিতি নম্বর, যোগদানের তারিখ, পদবী, মজুরি ও অন্যান্য ভাতা, ছবি, নিয়মাবলি এবং উভয় পক্ষের স্বাক্ষরসহ নিয়োপত্র এবং বিধিতে উল্লিখিত ফরমেট অনুযায়ী পরিচয়পত্র প্রদান করার কথা থাকলেও অধিকাংশ কারখানায় তা কার্যকর নেই। কোনো চাপে পড়ে প্রদান করলেও নানারকম জালিয়াতি করা হয়। মালিক শ্রমিকের সম্পর্ক ছেদের জন্য ৬টি ধারা থাকলেও সেখানে মালিক মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে শ্রমিকের সার্ভিস বেনিফিট আত্মসাৎ করে। ২০১৩ সালে আইন সংশোধন করে অতীতের তুলনায় সার্ভিস বেনিফিট অর্ধেকের নিচে নামিয়ে আনা হয়েছে। আইন অনুসারে চাকুরির বয়স ৬ মাস পূর্ণ হইলেই মোট বেতনের হারে ১৬ সপ্তাহ মজুরিসহ প্রসূতি কল্যাণ ছুটির অধিকার আছে। আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এমনকি ফৌজদারি অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও গর্ভধারণের পর জোরপূর্বক চাকুরিচ্যুত করা হয়। আইন অনুসারে প্রতি বছর ১০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি, ১৪ দিন পীড়া ছুটি, হাজিরা অনুযায়ী বাৎসরিক অর্জিত ছুটি, ১১ দিন উৎসব ছুটি থাকলেও উৎসব ছুটি ব্যতিত অন্য কোনো ছুটি প্রদান করা হয় না। ট্রেড ইউনিয়নের ক্ষেত্রে মালিকরা রীতিমত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালান কেননা ট্রেড ইউনিয়ন গঠিত হলে শ্রমিকদেরকে আইনানুগ সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। তাই যে কোনোমূল্যে হোক ট্রেড ইউনিয়ন করতে দেয়া হয় না। ট্রেড ইউনিয়ন করতে গেলেই শ্রমিকদেরকে হামলা-মামলা ও চাকুরিচ্যুতির স্বীকার হতে হয়। আর অপরদিকে আইন করেই ট্রেড ইউনিয়ন গঠন অত্যন্ত জটিল ও কঠিন করা হয়েছে। কোনো শ্রমিকের পক্ষে ট্রেড ইউনিয়নের আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করা সম্ভব নয়। আবার রেজিস্টার অব ট্রেড ইউনিয়ন স্বাধীন নয় তারা সরকার ও মালিকদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। শ্রমজীবী মানুষ কিছু অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য আমাদের সাথে সংগঠন করেন। কিন্তু রাজনীতিতে তারা লুটেরা ধনিকদের সঙ্গ ত্যাগ করে নিজের শ্রেণির মুক্তি সংগ্রামে সামিল হচ্ছে না। এমতাবস্থায় আমাদেরকেও শুধুমাত্র অর্থনীতিবাদী আন্দোলনে নয়। অর্থনীতিবাদী আন্দোলনের পাশাপাশি বিপ্লবী লড়াই জোরদার করতে হবে। সার্বিক পরিস্থিতি আজ শ্রমজীবী মানুষের বেঁচে থাকাকে কষ্টকর করে তুলেছে। পুঁজির কাছে দাসত্ব স্বীকার করে অমানবিক জীবনযাপনের মাধ্যমে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। এই অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে সমাজ পরিবর্তন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পরিবর্তন ব্যতিরেকে অন্য কোনো উপায় সামনে নেই। আর সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামের সাথে মেহনতি জনগণকে যুক্ত করতে হলে জনগণের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানের সংগ্রামে লেগে পড়ে থাকার বিকল্প নাই। তাই অর্থনৈতিক সংগ্রাম, মতাদর্শিক সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক সংগ্রাম জোরদার করতে হবে এক্ষেত্রে শ্রেণিচেতনা-শ্রেণি সংগ্রামে জোর দিতে হবে। মনে রাখতে হবে শ্রমছাড়া পুঁজি এক মুহূর্তও চলতে পারবে না। এই শ্রমকে শোষণের জন্য নয়, অধিকার, মর্যাদা এবং বিপ্লবের জন্য নিবেদিত করে আসুন সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম জোরদার করি। শোষণ-নির্যাতন-লুটপাট নয়, মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করি। লেখক : সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি