গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম

Posted: 21 জুলাই, 2019

মনোজ দাশ: ‘প্রত্যেকটা সাধারণ গণতান্ত্রিক প্রশ্নকে সামনে তুলে ধরা, তাকে শাণিত করে তোলা এবং সমাধানের ব্যাপারে সবার চেয়ে অধিক ভূমিকা রাখার দায়-দায়িত্ব যে ভুলে যায় সে স্যোসাল ডেমোক্রাট নয়।’ (লেনিন: করণীয় কি? আমাদের আন্দোলনের জরুরি প্রশ্ন) গণতন্ত্র হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে প্রিয় আকাক্সক্ষার একটি। গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামকে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত জনগণের সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন থেকে কখনো পৃথক করা যাবে না। সমাজতন্ত্রের মধ্যেই গণতন্ত্র পূর্ণ বিকশিত হওয়ার শর্ত তৈরি হয়। কিন্তু আজও পর্যন্ত বাংলাদেশের শাসকশ্রেণির মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তো দূরের কথা, তাদের নিজেদের শ্রেণি প্রবর্তিত বুর্জোয়া গণতন্ত্রকেও কোনও স্থায়ী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারেনি। বুর্জোয়া গণতন্ত্রের বদলে এখন বাংলাদেশের লুটেরা বুর্জোয়ারা তাদের শোষণ-লুণ্ঠন-দুর্নীতি-দখলদারিত্বকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের মাধ্যমে এক দুঃসহ ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করেছে। তাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। ফ্যাসিবাদী শাসনকে পরাজিত করে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামই এ মুহূর্তের জরুরি কর্তব্য হয়ে দেখা দিয়েছে। আমাদের সমাজতান্ত্রিক প্রত্যয় মুহূর্তের জন্য গোপন না করে সমগ্র জনগণের সামনে এ মুহূর্তের কর্তব্যগুলিকে তুলে ধরা আমাদের দায়িত্ব হয়ে পড়েছে। জনগণের প্রকৃত ভ্যানগার্ড হিসেবে এটা আমাদের করতেই হবে। লেনিন বলেছিলেন, ‘আমরা নিজেরা নিজেদেরকে ভ্যানগার্ড ভাবাই যথেষ্ট নয়, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে আমাদের এমনভাবে কাজ করা চাই যাতে অন্যান্য সব বাহিনী এটা মানে এবং স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে, আমরা এগিয়ে এসেছি সর্বাগ্রভাবে।’ শেখ হাসিনার মাধ্যমে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার দিবা-স্বপ্ন কারও কারও মধ্যে থাকলেও অধিকাংশ মানুষই মনে করেন গণতন্ত্রের জন্য এখনই নতুন স্তরের সংগ্রাম শুরু করা দরকার। কিন্তু সংগ্রাম শুরু করার ক্ষেত্রে আসল কথা হলো সেটা করতে হবে কীভাবে, আর সেটা করতে কী দরকার। প্রথমত গণতান্ত্রিক আন্দোলন জোরদার করার ক্ষেত্রে শ্রেণি-পেশার মানুষের অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলনের অনেক গুরুত্ব আছে। এজন্য শ্রমজীবী মানুষসহ অন্যান্য পেশার অর্থনৈতিক দাবির ভিত্তিতে পরিচালিত আন্দোলন-সংগ্রামের ধারায় তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও সংগঠিত করার চেষ্টা আমাদের করতে হবে। এক্ষেত্রে পার্টি পরিচালিত গণসংগঠনগুলির বিরাট ভূমিকা থাকতে হবে। কিন্তু শুধুমাত্র এভাবেই শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা আসে না। লেনিন আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ‘শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের রাজনৈতিক চেতনা গড়ে ওঠে কেবলমাত্র অর্থনৈতিক সংগ্রামের ভেতর থেকে, এই সংগ্রামকে একমাত্র আরম্ভস্থল করে, এটাকে একমাত্র ভিত্তি করে, এমন অভিমত আমূল ভ্রান্ত।’ লেনিন যুক্তি দেখিয়েছেন, ‘অর্থনৈতিক সংগ্রামের মধ্যেই রাজনৈতিক প্রকৃতি সঞ্চারিত করতে আমরা যতই চেষ্টা করি না কেন, এই কাঠামোর মধ্য থেকে আমরা শ্রমজীবী মানুষের রাজনৈতিক চেতনা স্যোসাল ডেমোক্রেটিক রাজনৈতিক চেতনার মাত্রায় বিকশিত করতে সমর্থ হবো না কখনই , কেননা ঐ কাঠামোটা খুবই সংকীর্ণ।’ ফ্যাসিবাদের বর্তমান অধ্যায়ে আমাদের অর্থনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামের মাঠ প্রস্তুত করতে হবে। এ ধরনের সংগ্রামকে আমরা অবহেলা করতে পারি না, বরং গড়েপিঠে তুলবো, নিজ সমাজতান্ত্রিক প্রত্যয় ও গণতান্ত্রিক দাবি-দাওয়া সবার সামনে হাজির করার জন্যে যত ছোটই হোক প্রত্যেকটা ঘটনাকে কাজে লাগাতে আমাদের সক্ষম হয়ে উঠতে হবে। এ ধরনের আন্দোলনের শুরু আমাদের জন্য সব সময় অপেক্ষা করেও থাকবে না। লুটপাটতন্ত্র-গণতন্ত্রহীনতা-শোষণ-বৈষম্য-বঞ্চনা-নিপীড়ন ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে সারা দেশের মানুষ ফুঁসছে। ছাত্র-যুব-শ্রমিক-কৃষক মেহনতি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের উত্থান যেকোন সময় দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাবে। আমরা যাতে এসব বিশাল কাজের মোকাবিলা করতে অপ্রস্তুত না হয়ে পড়ি, সেদিকে আমাদের খেয়াল করতে হবে। এই অপ্রস্তুত অবস্থা আমাদের সবার জন্যই দূর্ভোগ বয়ে আনবে। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত উত্থান নিরবচ্ছিন্ন ও অব্যাহত গতিতে এগিয়ে গেলে, যেখানে সেটা আরম্ভ হয়েছিল সেইসব জায়গায় এটা স্থির হয়ে থাকবে না। এটা ছড়িয়ে পড়বে নতুন নতুন এলাকায় এবং জনসমষ্টির নতুন নতুন স্তরে। আমরা বিপ্লবীরা যদি আমাদের তত্ত্ব ও ক্রিয়াকলাপ, উভয় দিক থেকেই জনগণের এ উত্থান ও আলোড়নের পিছনে পড়ে থাকি, আন্দোলনগুলিকে যদি নেতৃত্ব দিতে সক্ষম না হই তাহলে ইতিহাস এই দায় থেকে আমাদের রেহাই দেবে না। দ্বিতীয়ত, ফ্যাসিবাদের আমলে, তার পতনের জন্য সংগ্রামে শ্রেণি-পেশার মানুষের অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলনই যথেষ্ট নয়। শ্রেণি-পেশার মানুষের অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলনের পাশাপাশি আমাদের নামতে হবে রাজনৈতিক সংগ্রামে। আমরা যেন ‘লেজুরবাদীদের’ মতো গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটাবার জন্য শুধুমাত্র অতীত পর্বগুলোতে পড়ে না থাকি। গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে আমাদের যেতে হবে জনসমষ্টির সমস্ত শ্রেণির মধ্যে, কর্মীবাহিনীকে পাঠাতে হবে সমস্ত দিকে, শুধুমাত্র শ্রমজীবী শ্রেণির কাছে গেলেই চলবে না। কারণ দেশের আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজির মালিক-লুটেরা ধনিকশ্রেণি ও কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী বাদে ক্ষুদে ও মাঝারি বুর্জোয়া এবং সাধারণভাবে জাতীয় বুর্জোয়ার ধারায় বিকাশমান বুর্জোয়া শ্রেণি নানা দোদুল্যমানতাসহ ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াইয়ে অবদান রাখার সম্ভাবনা বহন করে। গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে এ সব শ্রেণি ও পেশার মানুষকে ধারণ করার জন্য আমাদের একটি বিকল্প কর্মসূচি থাকতে হবে। ফ্যাসিবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের মৌলিক ধারণার ভিত্তিতে এ কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে। এ কর্মসূচিটিকে বিষয়গত ও বিষয়ীগত বাস্তবতার আলোকে ক্রমেই আরও সুনির্দিষ্ট রূপ প্রদান করার প্রয়োজন হবে। এ কর্মসূচির প্রচারক হিসেবে, জনগণকে উদ্দীপ্ত করার জন্য, জনগণকে সংগঠিত করার জন্য জনসমষ্টির সমগ্র শ্রেণির মধ্যে আমাদের যেতে হবে। যেখানে একটুও রাজনৈতিক চেতনা আছে, জনসমষ্টির এমন প্রত্যেকটা অংশে আমাদের রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে তাদের জাগিয়ে তুলতে হবে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ক্ষীণ ও ভীরু কণ্ঠের উচ্চারণের বদলে আমাদের যুক্তি ও সাহসের ওপর দাঁড়াতে হবে। আকাশ থেকে সাহস ও যুক্তি এসে পড়বে না। বিদ্যমান বাস্তবতার মধ্যেই যুক্তি ও সাহস খুঁজে নিতে হবে। জনগণকেই শেষ ভরসাস্থল মানতে হবে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শক্তিটাকে জনগণের মধ্যে আবিষ্কার করতে হবে। তাকে গড়ে তুলতে হবে। গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম শুরু হলে, বাম ও কমিউনিস্টরা যদি সেখানে অগ্রবাহিনীর ভূমিকা পালন করতে পারে কেবলমাত্র তখনই জনগণ আমাদের হয়ে উঠবে। ফ্যাসিবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক কর্মসূচির ভিত্তিতে সংগঠিত করার মধ্য দিয়েই জনগণ অবশেষে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের বস্তুগত শক্তিতে পরিণত হবে। ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামের ধারায় গড়ে ওঠা এ বস্তুগত শক্তির ওপরে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে রাষ্ট্র ও সমাজের গণতান্ত্রিক পরিবর্তন ঘটাবার মতো সামর্থ ও যোগ্যতাসম্পন্ন বাম-গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল বিকল্প শক্তি সমাবেশের উত্থান ঘটবে। কিন্তু ‘এমন শক্তি হয়ে উঠতে হলে আমাদের নিজেদের চেতনা, উদ্যোগ আর কর্মশক্তি উন্নীত করার জন্য অধ্যবসায় সহকারে আরও লেগে থেকে বিস্তর কাজ করা দরকার।’ তৃতীয়ত এটা আমাদের মনে রাখা দরকার ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই মানে প্রধানত তার দেশীয়-আন্তর্জাতিক সমর্থক ও শ্রেণিভিত্তি লুটেরা বুর্জোয়া-সামাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, এদের সহযোগী সামরিক-বেসামরিক আমলা-গ্রামাঞ্চলের পরগাছা কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই। কিন্তু এসব শক্তি তাদের ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করেছে বর্তমান শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের মাধ্যমে। সেজন্য ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াই মানে বর্তমান শাসক দলের নেতৃত্বে পরিচালিত সরকারের বিরুদ্ধে একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক লড়াই। এসব নিয়ে বিভ্রান্তি থাকা চলবে না। শাসকশ্রেণির মধ্যে গোষ্ঠী দ্বন্দ্বে তারা রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। তাদের মৌলিক স্বার্থের অভিন্নতা যেমন আছে, তেমনি তাদের মধ্যে ক্ষমতা নিয়ে কামড়াকামড়িও আছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা তাদের কোনও এজেন্ডা নয়। গণতান্ত্রিক আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য, অথবা না বুঝে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। কমিউনিস্টদের গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে এ সমস্ত প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিতে হবে সামঞ্জস্যপূর্ণ দ্বান্দ্বিকতায়, মার্কসবাদের ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃত বিকৃতিকে প্রশ্রয় দেয়া চলবে না। আমরা শক্তিশালী না হওয়া পর্যন্ত ফ্যাসিবাদকে ক্ষমতায় থাকার গ্যারান্টি কেউ দিতে পারে না। শ্রেণিবিচ্ছিন্নভাবে ব্যক্তির প্রতি কোনও মোহ থাকা ঠিক নয়। ফ্যাসিবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের মৌলিক ধারণার ভিত্তিতে আমাদের আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সমস্ত সামাজিক শ্রেণির মধ্যে প্রচার এবং রাজনৈতিক আলোড়ন সৃষ্টি করার মত শক্তি আমাদের আছে কি না। আমাদের শক্তি যথেষ্ট নয়। অর্থনৈতিক-মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক সংগ্রাম ও বৈচিত্র্যময় কাজের মধ্য দিয়ে নিরন্তরভাবে এই শক্তি অর্জনের প্রচেষ্টা আমাদের চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু শক্তি অর্জনের পরে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করবো, এ ভাবনাটাও ঠিক নয়। অন্যদের সাথে নিয়ে শুরু করার মতো অভিজ্ঞতা ও ন্যূনতম শক্তি আমাদের আছে। আমরা বিকল্প হতে চাইলে ফ্যাসিবাদকে চ্যালেঞ্জ করার এখনই সময়। দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সমাজের অভ্যন্তরে বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি, বহু শক্তি, সর্বস্তরের জনগণ ফুঁসছে। এসব শক্তিকে কাজে লাগিয়ে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে যথোপযুক্ত কাজ দিতে আমরা অপারগ হলে, সেটা হবে আমাদের আন্দোলনের একটি বুনিয়াদি ও সাংগঠনিক ত্রুটি। সমগ্র জাতির সর্বস্তরের জনগণের সমবেত শক্তি সামর্থের সম্মিলন এবং বাস্তবতার নিরিখে তার সৃজনশীল প্রয়োগের মাধ্যম গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে আমাদের বিজয় অর্জন করতে হবে। সকল দেশপ্রেমিক শ্রেণি-স্তর ও ব্যক্তির সম্মিলিত প্রয়াস, শক্তি-সম্পদ-মেধা ও সমবেত সংগঠন শক্তির মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াইয়ে আমাদের জিততেই হবে। দেশের এই সংকটময় সময়ে আমাদের পার্টিসহ সকল বাম-গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তিকে গণতন্ত্রহীনতার বিরুদ্ধে এবং রুটি-রুজি ভাত-কাপড়ের দাবি আদায়ের জন্য গণসংগ্রাম গড়ে তোলা ছাড়া অন্য বিকল্প খোলা নেই। লেখক : সভাপতি, খুলনা জেলা কমিটি, সিপিবি