বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ

Posted: 19 মে, 2019

আকমল হোসেন : আসছে ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরের বাজেট। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার পক্ষ থেকে প্রাক-বাজেট আলোচনা শুরু হয়েছে। যে যেমন পারছে তাদের মত করে বলার চেষ্টা করছে। সরকার বাহাদুর কোনটা গ্রহণ করবেন আর কোনটা করবেন না সেটা তাদের ব্যাপার। সংসদে এ বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করার তেমন সুযোগও নেই। কারণ বিরোধীদল বিহীন সংসদে সরকারের পক্ষ থেকে যা উত্থাপিত হবে সেটাই অনুমোদিত হবে। গত বছরের মত এবারও যদি সকল ক্ষেত্রে একইভাবে অর্ধ বরাদ্দ হয় তবে শিক্ষা নিয়ে যে সংকট তা দূর হওয়া কঠিন। তারপর এবার ২ হাজার ৭৬২টি নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিও করার সরকারি প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ২০১৫ সাল এসডিজি গৃহীত হওয়ার পর সেটি বাস্তবায়নে অনেক পরিকল্পনা করলেও অর্থ বরাদ্দ সেই তুলনায় বাড়েনি। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের জন্য ঘোষিত বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটই স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বেশি অঙ্কের এবং বড় বাজেট। জনসংখ্যা বৃদ্ধি দেশের প্রবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি সব মিলে টাকার অঙ্কে বড় হলেও পূর্বের তুলনায় আনুপাতিক হারে খুব যে বেশি তেমন বলা যাবে না, কারণ ১৯৭২ সালে একজন প্রথম শ্রেণির কর্মচারীর মাসিক বেতন ছিল ৩৭৫ টাকা, সেখানে আজ সেই বেতন ২২,০০০ টাকা। এক ভরি স্বর্ণের দাম ছিল ৭০ টাকা আর আজ তার দাম ৫০,০০০ টাকা। ১৯৭৩ সালে ১ জন হাইস্কুল শিক্ষকের বেতন ছিল ১২০ টাকা, ১ জন শ্রমিকের সর্বনিম্ন বেতন ছিল ১৬০ টাকা, তখন ১ মণ চাউলের দাম ছিল ৩০ টাকা। সেই দিক থেকে এটি একটি প্রবৃদ্ধিমূলক বাজেট, তবে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রচিন্তা অথবা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অর্থনৈতিক বৈষম্যহীন আর শোষণমুক্তির জন্য সরকার ও রাষ্ট্রের যে ধরনের বাজেট দেওয়া প্রয়োজন সে দিক থেকে কতটুকু প্রতিফলিত হবে সেটা বিবেচনার দাবি রাখে। বিগত বাজেটগুলির স্বরূপের আলোকেই এই শঙ্কা। এবং সে দিক থেকে এবারের বাজেটেও সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি, যার প্রতিফলন দেখা গেছে শ্রমজীবী, পেশাজীবী যাদের সংখ্যা সমাজে বেশি তাদের পক্ষ থেকে বাজেট নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া, যদিও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অধিকাংশ সময়ই বাজেট নিয়ে বিরোধিতার জন্যই বিরোধিতা করতে দেখা যাচ্ছে। বাজেট নিয়ে এবারের প্রতিক্রিয়াও ব্যতিক্রম নয়। বাজেট নিয়ে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের অবস্থান সবার জন্য একই দেখা যায়, এটির পেছনেও যৌক্তিক কারণ আছে, কারণ উভয়ের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শন একই। লুটেরা ভোগবাদী ও সুুবিধাবাদী তত্ত্বের বাজার অর্থনীতির আলোকে এই বাজেট প্রণীত। ফলে সরকারি আমলাদের উপসচিব থেকে উচ্চতর স্তরের প্রজাতন্ত্রের সকল কর্মচারির জন্য ৭৫০০০ টাকার আই ফোন, ৩০ লক্ষ টাকার সুদমুক্ত গাড়ি ক্রয়ে ঋণ, ঐ গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ড্রাইভারসহ পরিচালনা খরচ বাবদ মাসিক ৫০,০০০/- টাকা সুবিধা প্রদান এবং ৭৫ লক্ষ টাকা ফ্ল্যাট বাড়ি ঋণের ব্যবস্থা, সেখানে বিরাট সংখ্যক গ্রাম পুলিশ, আনসার, ভিডিপি ও বহুসংখ্যক নকলনবীশের চাকুরির অস্থায়িত্ব, ১৪ মাসের বেতন বকেয়া, ৭১৪৪ টি একাডেমিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৮০,০০০ শিক্ষক-কর্মচারী এখনও এমপিওভুক্ত হয়নি। এদের ১০/১৫ বছর ধরে বেতনভাতা চালু না হওয়া, অনার্স-মাস্টার্স পর্যায়ের ৫০০০ শিক্ষকের বেতন ভাতা না হওয়া, নবম বেতন কমিশন বাস্তবায়ন হলেও এমপিওভুক্ত ৫ লক্ষাধিক শিক্ষক-কর্মচারীদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ও বৈশাখিভাতা না পাওয়ার ঘটনা এখনও বিদ্যমান। পলিসি লেবেলের চাকুরেদের সুবিধা বাড়লেও পলিসিহীন নিচুস্তরের চাকুরেদের আর্থিক দৈন্যদশা দূর হচ্ছে না। বিদ্যমান এই অবস্থায় প্রদত্ত বাজেট মুক্তিযুদ্ধের আলোকে অসাম্প্রদায়িক বিজ্ঞানমনষ্ক সর্বজনীন ও গুণগত শিক্ষা বাস্তবায়নে সহজ হবে না বলেই মনে হচ্ছে। তবে সরকারের আন্তরিকতা জাতির ওপর দায়িত্ব ও কর্র্তব্যবোধ আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি আস্থা রেখে কাজ করলে আমাদের নিকটও এটি সহজ হতে পারে। তবে এখানে বড় সমস্যা সরকারের রাজনৈতিক কমিটমেন্ট ও অর্থায়নের। এসডিজি’র ১৭টি লক্ষ্যের মধ্যে ৪র্থ লক্ষ্যে “অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সবার জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা।” ৪র্থ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ১০টি টার্গেটও নির্ধারণ করা হয়েছে, যা টার্গেটের মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক, উচ্চতর শিক্ষা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্কদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, জনসাধারণের স্বাক্ষরতা ও গাণিতিক দক্ষতা শারীরিক ও মানসিকভাবে পিছিয়ে থাকা শিশুদের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে একীভূত ও সমতাভিত্তিক শিক্ষা, মানসম্মত শিক্ষা ও মানসম্মত শিক্ষকের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। শিক্ষা সকল কর্মকাণ্ডের মূল চাবিকাঠি। সবার জন্য শিক্ষা ২০১৫ সালের সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের সময় শিক্ষাকে বৃহত্তর পরিসরে যেমন, উচ্চ শিক্ষা এবং সবার জন্য জীবন ব্যাপী শিক্ষার সুযোগ দেয়ার কথা চিন্তা করা হয়েছে। শিক্ষার গুণগত মান নিয়ন্ত্রণের জন্য শিক্ষা প্রশাসনে দক্ষ, যোগ্য এবং অভিজ্ঞ লোকের প্রয়োজন। এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি পরিহার করা জরুরি। শিক্ষা কারিকুলামকে যুগোপযোগী করা, বিজ্ঞান ও কারিগরি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করা, দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের জন্য নিয়োগ ব্যবস্থাকে ত্রুটিমুক্ত করা, নিয়োগকৃত জনবলকে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা করা, আধুনিক শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করা। এই কাজগুলি করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। সেখানে ব্যক্তি পর্যায় থেকে কত সরবরাহ করবে সে বিষয়ে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। তবে যেহেতু শিক্ষা মৌলিক অধিকার এবং সে ক্ষেত্রে অর্থায়নে রাষ্ট্র এবং বিভিন্ন সময়ের আন্তর্জাতিক ঘোষণায় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। সেটা বাস্তবায়ন করা জরুরি। তবে বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দের চিত্র সরকারগুলির পূর্ব প্রতিশ্রুতির সাথে মিল পাওয়া যাবে না। এবারের বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ জিডিপি’র ২.০৯ এবং বাজেটের ১১.৬ শতাংশ যা পার্শ্ববর্তী এবং তৃতীয় বিশ্বের দেশ ভুটান মালদ্বীপ ও নেপালের চেয়েও অনেক কম। স্বাধীনতার পরে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ জিডিপির সর্বনিম্ন ১.৮ এবং সর্বোচ্চ ২.৫, আর বাজেটের সর্বোচ্চ ১৪%। যদিও বিভিন্ন সময়ের সরকারগুলি শিক্ষাখাতে জিডিপি ৭% (ইউনেস্কো) ৬% (ডাকার) ৫% (কুদরতই - খুদা শিক্ষা কমিশন) বরাদ্দের সুপারিশ ছিল কিন্তু সেটা না হয়ে ২% বা তার কম এ যাবৎ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ হয়ে আসছে। বরাদ্দকৃত অর্থেরও ১টি অংশ প্রতি বছরই অব্যবহৃত থেকে যায়, একটি অংশ প্রতিরক্ষা খাতের ক্যাডেট শিক্ষায় চলে যায়, আরেকটি অংশ অপচয় হয়ে যায়। ফলে শিক্ষাখাতে যেটি বরাদ্দ সেটিরও শতভাগ ব্যয় হয় না। বাজেটে টাকার অংকে শিক্ষাখাতে যেটি বরাদ্দ থাকে তারও একটি অংশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিখাতে চলে যায়। ২০১৫/১৬ অর্থ বছরে শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে বাজেটের ১১.৬ শতাংশ দেখালেও প্রকৃতপক্ষে শিক্ষায় বরাদ্দ ছিল বাজেটের ১০.৭১ শতাংশ। এইভাবে ফাঁকফোকড় রেখে শিক্ষায় সর্র্বোচ্চ বরাদ্দ দেখানের চেষ্টা করা হয়। ২০১৩/১৪, ২০১৪/১৫ ও ২০১৫/১৬ অর্থবছরে শিক্ষায় বরাদ্দ ছিল বাজেটের যথাক্রমে ১২.১৭, ১২.০৪ ও ১১.৬ ভাগ। অর্থাৎ প্রতিবছরই শিক্ষাখাতে আনুপাতিক হারে বরাদ্দ হ্রাস পাচ্চে। ২০১৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় বিশ্ব শিক্ষা ফোরামে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এসডিজি বাস্তবায়নে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষায় রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী দিয়ে আসলেও শিক্ষাখাতে বাজেট বৃদ্ধি না বেড়ে আরও কমেছে। এমনতর বাস্তবতায় এসডিজি’র ৪ নং ধারার “অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক মান সম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সবার জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষার” সুযোগ তৈরি কিভাবে সম্ভব সেটা বোঝা খুবই কঠিন। অন্যদিকে প্রকল্পের নামে বরাদ্দকৃত অর্থের অপচয় শিক্ষার উন্নয়নে আরেকটি অন্তরায়। সরকারের আন্তরিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আর মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গিকারের প্রতি দৃঢ় অবস্থানই শিক্ষাক্ষেত্রে শনির দশা কাটতে পারে বলে অনেকেরই বিশ্বাস। বাজেট এখনও চূড়ান্ত হয়নি। বাজেটে এখনও রদবদলের সুযোগ আছে, দরকার শুধু সরকারের আন্তরিকতা। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী বাকবিশিস নামক শিক্ষক সমিতির একটি সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেছিলেন, সুদের টাকা আদায় করে শিক্ষায় বরাদ্দ করলেই শিক্ষায় অর্থায়নের সমস্যা কেটে যাবে। বিষয়টি অর্থমন্ত্রীর ভেবে দেখা প্রয়োজন বলে এমপিওবঞ্চিত শিক্ষকরা মনে করেন। অনেক সাংবাদিক ও বিশেষজ্ঞ বলেছেন বাংলাদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থ আদায় করা সম্ভব হলে ১১টি পদ্মা সেতু তৈরি করা সম্ভব। এই সরকারের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী একবার বলেছিলেন লুটের টাকা আদায় করলে শিক্ষায় প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বরাদ্দ দেয়া সম্ভব। দেশের অনুৎপাদনশীল একটি বাহিনীর চুল দাঁড়ি কামানোর খরচ যেখানে রাষ্টীয় তহবিল তথা জনগণের খাজনা করের টাকা থেকে দেয়া সম্ভব হলে শিক্ষার মত মৌলিক অধিকার এবং দীর্ঘ মেয়াদি বিনিয়োগের টাকার সংস্থান করার জন্য কৌশলী বক্তব্য দেয়া শিক্ষাকে আবহেলার শামিল নয় কি? লেখক : কলেজ অধ্যক্ষ, সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (বাকবিশিস) কেন্দ্রীয় কমিটি