এবার চাপবে নতুন ভ্যাটের বোঝা

Posted: 19 মে, 2019

রাজু আহমেদ : আসছে বাজেট। সংসদে উপস্থাপনের আগে মাস দুয়েক ধরে নানা হাঁক-ডাক, পরামর্শ, দাবি-দাওয়া শোনা গেলেও অধিকাংশ সময়ই বাংলাদেশের বাজেট গতানুগতিকতার বাইরে যেতে পারে না। বিদেশি ঋণের সুদ আর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন ভাতায় বিশাল বরাদ্দের পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ একটু এদিক-সেদিক করে প্রতিবারই বাজেটের রাজস্ব ব্যয়ের হিসাব সামলান অর্থমন্ত্রী। উন্নয়ন ব্যয়ের নামে বিশাল বরাদ্দ দেয়া হলেও জনস্বার্থের প্রকল্পগুলো খুব বেশিদূর বাস্তবায়িত হয় না। বাড়তি ব্যয়ের জন্য অর্থ যোগাতে সাধারণ মানুষের ওপর চাপে করের বোঝা। ফলে প্রতিবছর ঘোষিত বাজেট সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষকে চাপে ফেলে দেয়। কারণ রাজস্ব আয় বাড়াতে মূলত পরোক্ষ করের আওতা বাড়াতেই বেশি ঝোঁক সরকারের। বড় ব্যবসায়ীদের জন্য অনেকক্ষেত্রেই তা হয় শাপে বর। কারণ সরকার যতটুকু পরোক্ষ কর আরোপ করে ব্যবসায়ীরা আদায় করে তারচেয়ে বেশি, আর মানুষের কাছ থেকে যতটুকু কর আদায় করা হয়– সরকারের কোষাগারে জমা পড়ে তারচেয়ে কম। এবারের বাজেটও এর ব্যতিক্রম হবে– এ আশা করা বাতুলতা মাত্র। বরং এবার বাজেটে সাধারণ মানুষের ওপর নতুন মাত্রায় করের বোঝা চাপছে। কারণ ১ জুলাই থেকে বাস্তবায়ন হচ্ছে নতুন ভ্যাট আইন। ২০১৭ সালে এই আইনটি কার্যকর করার সব আয়োজন সম্পন্ন করেছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংসদে উপস্থাপিত বাজেটে সেই ঘোষণাও দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু ‘সামনে ভোট’ সেই বিবেচনায় জনস্বার্থবিরোধী আইনটি তখনকার মতো কার্যকর করতে দেননি প্রধানমন্ত্রী। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় আসতে তাদের অবশ্য আর মানুষের ভোট লাগেনি। তাই নতুন মেয়াদের প্রথম বাজেটেই ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে জনস্বার্থ বিবেচনার প্রয়োজন পড়ছে না! মূলত বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের পরামর্শ মেনেই ১৯৯১ সালে এদেশে মূল সংযোজন কর (ভ্যাট) চালু করা হয়। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে ভ্যাটের আওতা বেড়েছে। মুক্তবাজার নীতি বাস্তবায়নে বাজার উদারীকরণের ধারায় বিভিন্ন পণ্যের আমদানি শুল্ক কমাতে কমাতে প্রায় শূণ্যের পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে। এর বিপরীতে দেশের মানুষের ওপর চাপানো হয়েছে ভ্যাটের বোঝা। অর্থাৎ, বিদেশি পণ্যের আমদানি শুল্ক কমানোর ফলে সরকারের রাজস্ব আয়ের উপর যে প্রভাব পড়েছে, তা পুষিয়ে নিতেই বাড়ানো হয়েছে ভ্যাটের আওতা। এতেও সন্তুষ্ট নয় আইএমএফ, ভ্যাট ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজিয়ে সর্বস্তরে এই কর আরোপের জন্য নতুন আইন করার শর্ত বেঁধে দিয়েছে সংস্থাটি। এর বিনিময়ে ইসিএফ কর্মসূচির আওতায় সরকারকে দেয়া হবে মাত্র ১০০ কোটি ডলারের ঋণ। নতুন আইনে ভ্যাট আদায়ের পরিধি ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে। এ আইনে আমদানি বা উৎপাদন, পাইকারি ও খুচরা– এই তিন স্তরে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া পণ্য ছাড়াও সেবা, স্থাবর সম্পদ, অনুদান, লিজ, লাইসেন্স, পারমিট, রাইট, ফ্যাসিলিটি ইত্যাদির ওপর ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ভ্যাটের মূলনীতি থেকে সরে এসে সরকার অধিক হারে রাজস্ব আদায়ের দিকেই বেশি মনোযোগী হয়েছে বলে খোদ ব্যবসায়ীরা অভিযোগ তুলেছেন। তারা বলছেন, কোন পণ্য বা সেবার বিপরীতে যে পরিমাণ মূল্য সংযোজিত হবে, তার ওপরই ভ্যাট প্রযোজ্য হওয়ার কথা। অর্থাৎ, একশ’ টাকার কোনো পণ্য ১২০ টাকা বিক্রি করা হলে শুধু সংযোজন হওয়া মূল্য ২০ টাকার উপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ হওয়ার কথা। কিন্তু তা না করে মোট মূল্য অর্থাৎ, ১২০ টাকার উপরই ভ্যাট আদায় করা হচ্ছে। এ ধরনের ব্যবস্থা। নীতবিরুদ্ধ ও জনগণের সঙ্গে প্রতারণার সামিল। বিদ্যমান ভ্যাট ব্যবস্থায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় বহু পণ্য ও সেবা খাতকে ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। নতুন আইনে মৌলিক খাদ্য, নির্ধারিত জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, গণপরিবহণ সেবা, গণস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, কৃষি, মৎস্য চাষ, দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অবাণিজ্যিক কার্যক্রম, অলাভজনক সংস্কৃতি সেবার মতো কিছু খাত বাদে বাকি সব ক্ষেত্রেই আমদানি, উৎপাদন, খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ে অভিন্ন অর্থাৎ, ১৫ শতাংশ ভ্যাট বসবে। এতে বাড়তি খরচের চাপে পড়বে জনগণ। বর্তমান ভ্যাট আইনে পণ্য ও সেবায় মূল্য সংযোজনের ওপর একাধিক ‘হ্রাসকৃত’ হারে ভ্যাট আদায়ের সুযোগ রয়েছে। নতুন আইনে এ সুযোগ থাকছে না। এর পরিবর্তে সব ক্ষেত্রে ‘অভিন্ন ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হবে। সব খাতে সমান হারে ভ্যাট আরোপের ফলে সামগ্রিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ বেড়ে যাবে। বাড়বে জিনিসপত্রের দাম। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হলে জিনিসপত্রের দামে এর প্রভাব পড়বে না। কারণ বিভিন্ন স্তরে পরিশোধ করা ভ্যাটের উপর ব্যবসায়ীরা রেয়াত সুবিধা পাবেন। মূলত যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ হিসাব সংরক্ষণে আধুনিক ব্যবস্থা রয়েছে, তাদের পক্ষেই রেয়াত সুবিধা নেয়া সম্ভব হবে। কারণ রেয়াত নিতে হলে ব্যবসায়ীকে সব স্তরে ভ্যাট পরিশোধের প্রমাণ দাখিল করতে হবে– যা দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আবার এই ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীদের সুবিধা হলেও ক্রেতা বা ভোক্তা এর সুফল পাবেন না। ধরা যাক, কোনো পণ্য আমদানিতে ১৫ শতাংশ মূসক আদায় করা হলো। এতে ১০০ টাকার পণ্যটির দাম হবে ১১৫ টাকা। আমদানিকারক পরিবেশকের কাছে ৫ টাকা লাভে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করবে। এরসঙ্গে ১৫ শতাংশ মূসক ধরে এই স্তরে পণ্যটির দাম হবে ১৩৮ টাকা। এরমধ্যে ভ্যাট ১৮ টাকা। এক্ষেত্রে আমদানিকারক আগে পরিশোধ করা ১৫ টাকা ভ্যাট রেয়াত পাবেন। ফলে তিনি সরকারের কাছে জমা দিবেন ৩ টাকা। এভাবে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত প্রতি স্তুরে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট ধরে পণ্য বিক্রি হবে। এখানে ব্যবসায়ীরা আগে পরিশোধ করা ভ্যাট রেয়াত পেলেও ক্রেতা বা ভোক্তা পর্যায়ে ১৫ শতাংশ হারে তিন স্তর মিলিয়ে কর ভার হবে ৪৫ টাকা। সব মিলিয়ে বাজেটের আগে ‘ভ্যাট আতঙ্কে’ ভুগছেন ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিকেরা। কারণ প্রতি স্তরে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায়ের প্রভাবে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমবে। এতে বিক্রি কমে গেলে ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। শুধু ভ্যাট নয়, বর্তমান বাজেট ব্যবস্থার বৈষম্যমূলক করনীতি দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্যকে তীব্র করে তুলছে। বিদ্যমান ব্যবস্থার ফলে দেশে ধনীক শ্রেণি তাদের ওপর আরোপিত কর ফাঁকি দিলেও গরিব মানুষ প্রতিদিনই নানাভাবে কর পরিশোধ করছে। প্রতি বছর যে পরিমাণ রাজস্ব সংগ্রহ করা হয় তার ৮০ শতাংশের উৎসই অপ্রত্যক্ষ কর। অপ্রত্যক্ষ করের পুরো চাপটাই পরে দেশের সাধারণ ও দরিদ্র জনগণের ওপর। কারণ কোনো সরকারই ধনিক শ্রেণিকে ক্ষ্যাপাতে চায় না। ফলে তারা প্রত্যক্ষ কর আদায়ে সক্ষম হয় না। কিন্তু রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে পরোক্ষ কর নির্ভরতা কমিয়ে প্রত্যক্ষ কর বাড়াতে না পারলে বাজেট কখনোই গরিব মানুষের জন্য স্বস্তি বয়ে আনতে পারবে না। সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে প্রত্যক্ষ করকেই আয়ের প্রধান উৎসে পরিণত করতে হবে। বাজেটে ধনীদের আয় ও সম্পত্তির ওপর অধিক কর আরোপ এবং তা শক্ত হাতে আদায় না করে তাদের অর্জিত বিপুল পরিমাণ কালো টাকা সাদা করার সহজ সুযোগ দেয়া হয়। মুক্তবাজারের নামে ধনীদের ব্যবহৃত বিলাসপণ্যের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার বা হ্রাস করা হয়। আর এসব কারণে সরকারের যে আয় ঘাটতি হয় তা পুষিয়ে নেয়া হয় সাধারণ জনগণের কাছ থেকে মোটা আয়তনের ‘ভ্যাট’ বা এ ধরনের পরোক্ষ কর চাপিয়ে। আর এর ফলে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষকে পরোক্ষ করের বোঝা থেকে মুক্তি দিতে হলে বাজেটে ধনীদের আয়ের ওপর কর হার বাড়ানোর পাশাপাশি বিলাস পণ্যের সব রকম শুল্ক-কর বৃদ্ধি করতে হবে।