যাদুকাটায় চলছে ড্রেজার তাণ্ডব

Posted: 12 মে, 2019

সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা : মেঘালয়ের পাদদেশ থেকে নৈসর্গিক সৌন্দর্যের রূপলাবণ্য ঝরে পরে পর্যটকের চিত্তাকর্ষণ করত যে নদী তার পাড়ে এখন শ’ শ’ ড্রেজার। তাহিরপুর উপজেলায় ভূ-সৌন্দর্যে ধ্বংসযজ্ঞ চলছে দিনে রাতে। ড্রেজার ও বোমা মেশিনের বেপরোয়া তা-বে অতিষ্ঠ পর্যটক ও এলাকাবাসী। অবৈধভাবে বালু পাথর উত্তোলনসহ সীমাহীন চাঁদাবাজির ফলে বালি-পাথর ব্যবসা ও নদীর দুই পাড়ের বাড়িঘর ও স্থাপনা পড়েছে হুমকির মুখে। ক্রিস্টাল ক্লিয়াল বা স্বচ্ছজল খ্যাত যাদুকাটার পানিতে পর্যটকের নৈসর্গিক সৌন্দর্যে উপভোগ কিংবা প্রাণজুড়ানো সাঁতারকাটা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ড্রেজার ও বোমা মেশিনে গভীর গর্তেও মরণ ফাঁদ সৃষ্টি হয়েছে। এক সময় নদীটিতে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে বালি উত্তোলন করতেন হাজারও শ্রমিক। ফলে উজান থেকে নেমে আসা বালি-পাথর উত্তোলনের পাশাপাশি নদীর নাব্য বজায় থাকত। নদীর উপর নির্ভর করে পরিচালিত হতো শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা। অন্যদিকে যাদুকাটার স্বচ্ছ জলে চিত্ত জুড়াত হাজার হাজার পর্যটকের। ড্রেজার ও বোমা মেশিনের তা-বে কর্মস্থল হারিয়ে শ্রমজীবীরা বিপাকে। অন্যদিকে শ্রী হারিয়ে পর্যটক বিমুখ হচ্ছে যাদুকাটা। কালোধোঁয়া ও শব্দ দূষণে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। নদী তীর কেটে বালি-পাথর উত্তেলনের ফলে নদী ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নদীর দুই পাড়ের বাড়িঘর ও স্থাপনা। জানা যায়, হাইকোর্টের রীট পিটিশনের নির্দেশ মোতাবেক যাদুকাটা নদীতে কোনো ধরনের যান্ত্রিক মেশিন দিয়ে বালি পাথর উত্তোলন করা যাবে না আদেশ দেয়া হয়। পরবর্তীতে লাউরেরগড় গ্রামের এক মহিলা শ্রমিককে বাদী করে হাইকোর্টে রীট পিটিশন দায়ের করেন নদীতে ছোট শ্যালু মেশিন ব্যবহার করে পানির পাইপ দিয়ে সেচের কাজ করা যাবে এবং দেশীয় প্রযুক্তিতে বেলছা, কোদাল দিয়ে বালি পাথর উত্তোলন করা যাবে। কিন্তু হাইকোর্টের দুটি বেঞ্চের আদেশ অমান্য করছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র। যাদুকাটায় ড্রেজার ও বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করছে লাউরেরগড় গ্রামের মৃত গোলাম কিবরিয়ার ছেলে শাহজাহান মিয়া। তার নেতৃত্বে যাদুকাটা নদীতে পাথর কোয়ারির নামে ব্যাবসায়ীদের কাছ থেকে কোয়ারি পজিশন বাবদ ১০ হাজার টাকা এবং প্রতি মাহিন্দ্র ট্রলি গাড়ি থেকে ৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চাঁদাবাজচক্র তাদের নির্ধারিত চাঁদা দেয়া শর্তে শ্রমিকদের ড্রেজার ও বোমা মেশিনে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজে লাগাচ্ছে। আর এসব কিছু হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপন্ন করে। হাইকোর্টকে অপব্যবহার করে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে চলছে শ’ শ’ কোয়ারি। পাশাপাশি চলে নামে-বেনামে চাঁদা আদায়ের রমরমা বাণিজ্য। হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এই চক্রটি নদীর তীরবর্তী শাহ আরেফিন (রহ) এর আস্তানার পশ্চিম পার্শ্বে এবং বারেকের টিলার পূর্বপাড়ে জেগে উঠা নদীর তীরে শতাধিক ড্রেজার ও বোমা মেশিন বসিয়ে নদীর তলদেশ প্রায় ৫০/৬০ ফুট গর্তেও মড়ণফাঁদ তৈরি করে বালি-পাথর তুলছে। গভীর গর্তে শ্রমিদের নামতে বাধ্য করা হচ্ছে। এসব মড়ণফাঁদে প্রাণ হারাচ্ছে শ্রমজীবীরা। এই ঘটনাগুলোকে কালো টাকা দিয়ে তা লোকচক্ষুর অন্তড়ালে রেখে দিচ্ছে চক্রটি। এদিকে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে গেছে। পানি প্রবাহ হুমকির মুখে পড়ছে। নদীর দুইপাড়ের ২০/২৫টি গ্রাম পড়েছে নদী ভাঙ্গনের কবলে। স্থানীয় কোয়ারি ব্যবসায়ী সমিতির সেক্রেটারি শাহজান মিয়া জানান, বালি-পাথর বহনকারী প্রতিটি ট্রলি থেকে টিপপ্রতি ২০০ টাকা। প্রতিদিনের এসব টাকার ভাগ দেয়া স্থানীয় প্রশাসনকে। এছাড়াও কিছু গণমাধ্যম কর্মীরাও এই ভাগের অংশীদারিত্ব পাচ্ছে। তিনি আরও জানান, এই সিন্ডিকেটের মূলহোতা পোড়ান লাউর গ্রামের খাজা মাঈনুদ্দিন, শাহজাহান মিয়া, আক্কাস মিয়া, লোহাজুরী ছড়ার পাড় গ্রামের মোস্তফা মেম্বার, হেলাল উদ্দিন, বিল্লাল হোসেন, রমিজ উদ্দিন, নুরু মিয়াসহ ১৫/২০ জনের। তাদের নিয়ন্ত্রণে বোমা মেশিন ও ড্রেজার চলে প্রতিদিন দিনেরাতে। বিভিন্ন নাম ভাঙ্গিয়ে চলছে বেপরোয়া চাঁদা আদায়ের মচ্ছব। ড্রেজার ও বোমা মেশিনের তা-বের বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল আহাদ বলেন, ড্রেজার ও বোমা মেশিনে বালি-পাথর উত্তোলন অবৈধ। দেশীয় পদ্ধতিতে কেবলমাত্র ফাজিলপুর খোয়ারি থেকে বালি উত্তেলনের অনুমতি দিয়েছে সরকার। তিনি আরও জানান, যারা এই অবৈধ কাজ করছে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।