নজিরবিহীন ভোট ডাকাতি : গাইবান্ধায় প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতা

Posted: 06 জানুয়ারী, 2019

মো. কিবরিয়া ; ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮, বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো দিন হিসেবেই মানুষ মনে রাখবে। সারাদেশে নজিরবিহীন ভোট ডাকাতি, ক্ষমতাসীন দল ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যে কুৎসিত চেহারা উন্মোচিত হলো, তাতে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির গায়ে তৈরি হয়ে গেলো গভীর ক্ষত। মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের বীর শহীদদের প্রতি চূড়ান্ত অবজ্ঞা করে সাধারণ জনগণের ভোটাধিকার যেভাবে কেড়ে নেওয়া হলো, সম্ভাব্য সকল উপায়ে যেভাবে ভোটে জালিয়াতি করা হলো, ন্যূনতম নীতি-নৈতিকতাকে যেভাবে বুড়ো আঙুল দেখানো হলো, তা মানুষ ভুলতে পারবে না। অথচ মানুষ এবার ভোট দিতে উন্মুখ হয়ে ছিলো। ২০১৪ সালে একতরফা নির্বাচন হওয়ায়, দীর্ঘ দশ বছর পর মানুষ ভোট প্রদান করার সুযোগ পেয়েছে বলে মনে করা হয়েছিলো। অতীতে কোনো দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার রেকর্ড না থাকায়, বিরোধীদলগুলোর দাবি অগ্রাহ্য করে সংসদ ভেঙে না দিয়ে, বিতর্কিত নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করায় নির্বাচন যে অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না, তা আগে থেকেই সকলে আঁচ করতে পেরেছিলো। কিন্তু রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বাহিনী এবং দলীয় ক্যাডার বাহিনীর সমন্বয়ে চক্ষুলজ্জাবিহীন নির্বিচার ভোট ডাকাতি যে মাত্রায় সংঘটিত হলো, তা অনেকে কল্পনাও করতে পারে নি। নির্বাচনের শেষ সপ্তাহে বিভিন্ন জেলা সফর করে আমি গাইবান্ধায় নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেই। গাইবান্ধা-২ সদর আসনে সিপিবি মনোনীত বাম গণতান্ত্রিক জোটের প্রার্থী মিহির ঘোষ এলাকায় বেশ জনপ্রিয় একজন প্রার্থী। উপজেলা নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক ভোট পাওয়ায় তাকে নিয়ে মানুষের মাঝে আলোচনা ছিলো। সিপিবির কর্মীরা রাত দিন খেটে বিভিন্ন এলাকা চষে বেড়িয়েছেন, উঠান বৈঠক, পথসভা করেছেন অনেকগুলো। কাস্তে মার্কার এই প্রচার প্রচারণা এবং তার পক্ষে মানুষের সমর্থন দেখে লোকজন বলাবলি করছিলো নৌকা-ধানের শীষের সাথে এবার লড়াই হবে কাস্তের। বিভিন্ন পত্রপত্রিকাতেও লেখা হচ্ছিল যে এবার গাইবান্ধায় হবে ত্রিমুখী লড়াই। গাইবান্ধায় কাস্তে মার্কার নির্বাচনী প্রচারণায় সরাসরি কোনো হামলা বা আঘাত করা হয়নি। কিন্তু ভোটের দুদিন আগে থেকেই শুরু হয় ভয়ভীতি দেখানো। বিএনপির নেতাকর্মীদের নামে অনেকগুলো মামলা তো ছিলোই, তাদের বিভিন্ন এলাকা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো। শেষ দিকে কাস্তে মার্কার কর্মীদের নানাভাবে হুমকি ধামকি দেওয়া হচ্ছিলো। গাইবান্ধার দাঁড়িয়াপুর এবং তার আশেপাশের এলাকায় কমিউনিস্ট পার্টির ভোট ব্যাংক রয়েছে। সেখানে পরিকল্পিতভাবে নানা মিথ্যে তথ্য প্রচার করে, পার্টির সংগঠকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করা হয়, কাস্তে মার্কার এজেন্ট হতে নিষেধ করা হয়। ক্ষমতাসীনদের একজন নেতা প্রকাশ্য সমাবেশে বলে, কাস্তে মার্কায় ভোট দিতে হলে আগে বাড়িতে কবর খুঁড়ে আসতে হবে। নানা ভয়ভীতির মধ্যেও গাইবান্ধা-২ আসনে ১০১টি কেন্দ্রের মধ্যে ৭৫টি কেন্দ্রে কাস্তে মার্কার দেড়শতাধিক পোলিং এজেন্ট দেওয়া হয়। নির্বাচনের আগের রাতেই আমরা খবর পাচ্ছিলাম নির্বাচনকেন্দ্রিক নানা অপতৎপরতার খবর। নির্বাচনের আগের রাতে সিপিবি প্রার্থী এসব কথা ডিসি এবং এসপিকে জানালে তারা কোনো আশ্বাসবাণী দেওয়া তো দূরের কথা, বরং তাদের আচরণেই কিছুটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে পরদিন নির্বাচনের নামে একটা প্রহসন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তা স্বত্ত্বেও পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গাইবান্ধাতেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মাঠে থাকার সিদ্ধান্ত হয়। বিশেষত যেসব এলাকা কমিউনিস্ট পার্টির ঘাঁটি এলাকা হিসেবে পরিচিত, যেখানে বরাবরই মিহির ঘোষ সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোট পেয়ে আসছেন সে জায়গাতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। আমাদের ভোটারেরা যাতে সকাল সকাল ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সে ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৩০ ডিসেম্বর সকাল থেকেই স্পষ্ট হতে শুরু করে যে, এবারের ভোট ডাকাতি হবে চক্ষুলজ্জাবিহীন। যেখানে যেখানে কাস্তে মার্কার ভালো ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা সেখানে সকাল থেকেই প্রশাসনের সহায়তায় আমাদের এজেন্টদের বের করে কেন্দ্র দখল করা হয়। সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে আমরা খবর পাই আমাদের বেশি ভোট পাবার সম্ভাবনা যেসব কেন্দ্রে তার মধ্যে কূপতলা উচ্চ বিদ্যালয়, গিদারী উচ্চ বিদ্যালয়, দ্বীন মোহাম্মদ প্রাথমিক বিদ্যালয়, ধূতিচোরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কেন্দ্র দখল করে অবাধে নৌকায় সিল মারা হচ্ছে। সকালে সাড়ে আটটার দিকে প্রার্থী মিহির ঘোষ তার ভোট কেন্দ্র শহরের বয়েজ স্কুলে ভোট দিতে যান, তার সাথে আমিও যাই। সেসময় ভোটকেন্দ্র ছিলো খালি। অথচ ব্যালটবাক্স প্রায় অর্ধেক ছিলো ভরা। ওখান থেকে ফেরার সময় দেখা হয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী আব্দুর রশিদ সরকারের সাথে। তিনি বলেন, সকালেই অধিকাংশ জায়গায় তার এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, বা বের করে দেওয়া হয়েছে। বয়েজ স্কুলে ভোটদানের পর বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করতে মিহির ঘোষের বের হওয়ার কথা। মিহির ঘোষের নিজস্ব গাড়ি না থাকায় তাকে একটি গাড়ি ভাড়া করতে হয়। নির্বাচন কমিশনের অনুমোদনযুক্ত স্টিকারসহ সেই গাড়ি তখনো আসেনি। পরে জানতে পারি, সেই গাড়ির চালককে ভয়ভীতি দেখিয়ে আটকে রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত প্রধান নির্বাচনী এজেন্টের স্টিকারযুক্ত গাড়িতে আমরা বের হই। সকাল ন’টার দিকে খোলাহাটি দিগন্ত উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে গিয়ে দেখি সেখানে ঠিকঠাক ভোট হচ্ছে। আমাদের এজেন্টও সেখানে আছে। সেখান থেকেই খবর পাই, দাঁড়িয়াপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে জোর করে ব্যালটে সিল মারা হচ্ছে। আমরা সেদিকে রওনা হই। কিছুক্ষণ পরে খোলাহাটির এই কেন্দ্রটিও দখল হওয়ার খবর আমরা শুনতে পারি। সেসময় ডিসি এসপিকে বারবার ফোন করা হলেও তারা ফোন ধরেননি। দাঁড়িয়াপুর যেতে যেতে আমরা শুনি শহরের বিভিন্ন কেন্দ্রে একতরফাভাবে সিল মারা হচ্ছে। অনেক জায়গায় আমাদের এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে। দাঁড়িয়াপুর হাইস্কুল কেন্দ্রে গিয়ে দেখি বাইরে সবই শান্ত। ভিতরে গিয়ে শুনি এখানে গায়ের জোরে তিনশ ব্যালট কেড়ে নিয়ে সিল মারা হয়েছে একটি বুথে। কর্তব্যরত পোলিং অফিসার সেটি স্বীকারও করলেন। প্রিসাইডিং অফিসারকে খুঁজতে গিয়ে দেখলাম তিনি এক রুমের দরজা বন্ধ করে শুয়ে আছেন। ডাকাডাকির পর তিনি দরজা খুললে অভিযোগ জানানো হলো, তিনি নির্বিকার থাকলেন। আমরা সেখান থেকে বের হয়ে স্থানীয় জনগণকে বললাম ভোটকেন্দ্র পাহারা দিতে, তারপর অন্যান্য সেন্টারে ঘুরতে গেলাম। বাবুরিপাড়া হলো মিহির ঘোষের গ্রামের বাড়ির সেন্টার। ওই সেন্টারের দিকে যাওয়ার সময় একজন ভোটার আমাদের গাড়ি আটকালেন। অবাক হয়ে দেখলাম তিনি মিহির ঘোষের হাতে দুইশ টাকা তুলে দিলেন। গাইবান্ধায় যেখানে অন্যান্য প্রার্থীরা কোটি কোটি টাকা খরচ করছেন, সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থীকে পঙ্গু ভিক্ষুক, রিকশাওয়ালা, ক্ষেতমজুর যেভাবে অর্থসাহায্য করেছেন তা দেখে বিস্মিত হয়েছি। বাবুরিপাড়ায় মিহির ঘোষের ভোটার প্রায় সকলে। দু’তিনশ লোক কেন্দ্রের আশেপাশে আছে। আওয়ামী লীগের এজেন্টরা সেখানে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। সাড়ে দশটা পর্যন্ত আমরা সেখানে ছিলাম। ওখান থেকে ফেরার কিছুক্ষণ পর শুনি ওই কেন্দ্রের আশেপাশে থেকে লোকজন সরিয়ে দিয়েছে পুলিশ। বিনা বাধায় তখন কেন্দ্রে ঢুকে সিল মেরেছে আওয়ামী লীগের লোকজন। ঝাউবাড়ি কেন্দ্রে আমরা গিয়ে দেখলাম, সেখানেও আমাদের লোকজন কেন্দ্রের আশেপাশে আছেন, সাড়ে দশটা পর্যন্ত সেখানে ভোট ঠিকঠাক হচ্ছে। সেসময় শোনা গেলো আবারো দাঁড়িয়াপুর স্কুল কেন্দ্রে ঝামেলা হয়েছে, প্রকাশ্যে সিল মারছে আওয়ামী লীগের লোকজন। আমরা সেই কেন্দ্রের দিকে রওনা দিলাম। দেখি ওখানেও পুলিশ আশপাশ থেকে লোকজন সরিয়ে দিয়েছে। শখানেক নারী ভোটারসহ কয়েকশ জন আমাদের গাড়ি ঘিরে ধরলেন, বললেন তাদের ভোট দিতে দেওয়া হচ্ছে না, কেন্দ্র থেকে বলা হচ্ছে ব্যালট পেপার শেষ। অনেকে ওখানে কাঁদতে থাকলেন ভোট দিতে না পেরে। সকলেই ক্ষুব্ধ। তারা যে করেই হোক ভোট দিতে চায়। ততক্ষণে আমরা জানতে পেরেছি, গোটা গাইবান্ধা শুধু নয়, সারা দেশেই পুলিশ-প্রশাসন আর আওয়ামী ক্যাডারেরা একজোট হয়ে নির্বাচনকে প্রহসনে রূপ দিয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে দু-একটি কেন্দ্রে প্রতিরোধ গড়ে তুলে লাভ হবে না, উল্টো হামলার মামলার শিকার হবে সাধারণ মানুষ। মিহির ঘোষ সেখানে উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করলেন, বললেন বৃহত্তর আন্দোলনের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য। বারোটার মধ্যেই আমরা জানতে পারি, কোনো কেন্দ্রেই আর আমাদের এজেন্টদের থাকার কোনো উপায় নেই। কামারজানিতে আমাদের এজেন্ট এমদাদুল ভাই, তালতলায় আমাদের এজেন্ট নজীব ভাই বললেন তাদের মারধোর করা হয়েছে। বাবুরিপাড়া, বল্লমঝাড়ে কেন্দ্র ধরে রাখা যায় নি। শহরের সব কেন্দ্রই দখলে চলে গেছে ক্ষমতাসীনদের। দুএকটি জায়গায় সেনাবাহিনীকে অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি। এই অবস্থায় নির্বাচন করার কোনো সুযোগই আর থাকে নি। মিহির ঘোষ তাই সাংবাদিকদের ফোন করে শহরে পার্টি অফিসে আসতে বললেন। কার্যত বারোটার পর সেখানে আমাদের নির্বাচন থেকে সরে আসতে হয়। আড়াইটার দিকে মিডিয়ার সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানান মিহির ঘোষ। এর পরেও আমরা জানতে পারি আরো কিছু তথ্য। আমাদের পরিচিতি প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসারেরা জানান তাদের অসহায়ত্বের কথা। শোনা যায় কীভাবে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট পেপারে সিল মারতে প্রশাসনের লোকজন তৎপর ছিলো। এভাবে সিল মেরেও নিশ্চিন্ত হতে না পেরে দিনের বেলাতেও কেন্দ্র দখল করেছে আওয়ামী ক্যাডারেরা। শুধু গাইবান্ধায় নয়, শুনতে পারি ভোট ডাকাতির এই চিত্র ছিলো সারা দেশেই। কেন্দ্র দখল, জাল ভোট দেওয়া এদেশে নতুন নয়। কিন্তু প্রশাসনকে ব্যবহার করে দিনেদুপুরে দেশের প্রায় সব কেন্দ্র দখল করে এতো ব্যাপকমাত্রায় এই ভোট ডাকাতি আগে দেখেনি মানুষ। নির্বাচনের ফলাফলে ক্ষমতাসীনদের প্রাপ্ত ভোট ও জয়ের ব্যবধান আরো স্পষ্ট করেছে ভোট ডাকাতির ব্যাপকতা। তবে, এইভাবে ভোট ডাকাতি করে সাধারণ মানুষের কাছে ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছে ক্ষমতাসীন দল ও সরকার। মানুষের মাঝে পুঞ্জীভূত এই ক্ষোভ কখন কীভাবে বিস্ফোরিত হবে তা সুনির্দিষ্টভাবে এখনি বলা না গেলেও, একথা বলা যায়, গণবিস্ফোরণ আজ অনিবার্য হয়ে গেছে। লেখক : সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি