প্রহসনের নির্বাচনে ফ্যাসিবাদের বিপদ সংগ্রামের তত্ত্ব ও পদ্ধতি

Posted: 06 জানুয়ারী, 2019

ডা. মনোজ দাশ: স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরেও বাংলাদেশে বুর্জোয়া গণতন্ত্র স্থায়ী ভিত্তির ওপরে দাঁড়াতে পারেনি। মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে ভুয়া নির্বাচনে ভুয়া ভোটের মাধ্যমে স্বৈরতান্ত্রিক-একনায়কত্ব ও কর্তৃত্ববাদী দুঃশাসনকে আরও শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদি করার ষড়যন্ত্রের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। প্রহসনের এই একতরফা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কোনো বিজয় হয়নি। নৈতিক পরাজয় হয়েছে তার। এই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রেখে আওয়ামী লীগ তার নৈতিক শক্তি আর ফিরে পাবে না। স্বৈরতান্ত্রিক-একনায়কত্ব ও কর্তৃত্ববাদী দুঃশাসনের মধ্য দিয়েই তাকে ক্ষমতায় টিকে থাকার গণবিরোধী পথ বেছে নিতে হবে। সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনকে পরাজিত করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু সংগ্রামের মাধ্যমে এই ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটানো কোনো হুকুমদারির কাজ নয়, বা এর বিরুদ্ধে বিজয়ের কোনো সোজা পথ নেই। কমিউনিস্টদের মূল রণনীতিগত কর্মসূচি ‘সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তন’ হলেও বর্তমান ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রাম মূলত মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও কার্যকর বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে। প্রাগমেটিজমের ওপর দাঁড়িয়ে এই ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রামে জয়যুক্ত হওয়া যাবে না। প্রাগমেটিজম খণ্ডিতভাবে ফ্যাসিবাদের একটি দিক দেখতে পায় তো অন্যটি দেখতে চায় না। উন্নয়ন দেখতে পায়, কিন্তু গণতন্ত্রহীনতা-ভোট ডাকাতি-শোষণ-লুণ্ঠন-বৈষম্য-নিপীড়ন-গুম-খুন দেখতে চায় না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গলা ফাঠায়, কিন্তু তার স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা-লক্ষ্য নিয়ে কথা বলে না। প্রাগমেটিজম ফ্যাসিবাদের মধ্যেই এক বিন্দু সুখের সন্ধান করে। যা দিয়ে বর্তমানের সামান্য কার্যসিদ্ধি হবে, তারা সেটাই করে। তারা সামগ্রিকভাবে বিচার করে না, বর্তমানের সাথে ভবিষ্যতের যোগসূত্র স্থাপনে তারা রাজী নয়। প্রাগমেটিজম শেষ পর্যন্ত বর্তমানকে, তথা ফ্যাসিবাদকেই বৈধতা দেয়। কিন্তু ‘কমিউনিস্টরা উপস্থিত লক্ষ্যসিদ্ধির জন্য, শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থসিদ্ধির জন্য লড়াই করে থাকে, কিন্তু আন্দোলনের বর্তমানের মধ্যেও তারা আন্দোলনের ভবিষ্যতের প্রতিনিধি, তার রক্ষক।’ কমিউনিস্টরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একটা কার্যকর বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তাদের আশু কর্মসূচি ও লক্ষ্যের সাথে দীর্ঘমেয়াদি রণনীতিগত কর্মসূচি ও লক্ষ্যের সংগতি বিধানের জন্য অনুসরণ করে দ্বান্দ্বিক-ঐতিহাসিক তত্ত্ব ও পদ্ধতি। তাই কমিউনিস্ট হিসেবে আমাদের দ্বান্দ্বিক-ঐতিহাসিক বস্তুবাদের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংগ্রামের সঠিক পথ ও পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে, যাতে আন্দোলন ও আন্দোলনরত সংগঠনের বিকাশ এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটানো সম্ভব হয়। সংগ্রামের যে পথ ও পদ্ধতিই নির্ধারণ করা হোক না কেন, সংগ্রামের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটানো এক লাগাতার ও কষ্টসাধ্য কাজ। প্রথমত ফ্যাসিবাদের অবসান অনেক ধরনের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সমাপতন বা একত্রে মেলার ওপর নির্ভর করে। দ্বিতীয়ত ফ্যাসিবাদের অবসান নির্ভর করে আন্দোলনে ব্যাপক জনগণের কোনো সাংগঠনিক নির্দেশ ও পরিচালনা ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসার ওপরে। গণতন্ত্রহীনতা-শোষণ-বৈষম্য-নির্যাতন-গুম-খুনের মধ্যে বাস করে জনগণের মধ্যে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের তাগিদ সৃষ্টি হয়। জনগণের এই তাগিদই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফ্যাসিবাদ মোকাবিলা করার সম্ভাবনা তৈরি করে। তৃতীয়ত ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করার সংগ্রামে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও ফ্যাসিবাদ বিরোধী রাজনৈতিক জোটের নেতৃত্ব ছাড়া, পার্টির সাংগঠনিক শক্তি ছাড়া ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয় ও সেই বিজয়কে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নেয়া যায় না। উপযুক্ত রাজনৈতিক শক্তির উপস্থিতি এবং সংগ্রামের উপযুক্ত ধরনই কেবলমাত্র জনগণের এই তাগিদকে বিকশিত করে বাস্তব কার্যকর শক্তিতে পরিণত করতে পারে। বাংলাদেশে নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ও রাষ্ট্রের দমনমূলক সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে এমনভাবে ঢেলে সাজানো হয়েছে দলীয় সরকারের অধীনে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কারও কোনো নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া সম্ভব নয়। তাই সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির ভিত্তিতে কার্যকর সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্যে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী এই দুঃশাসনকে পরাজিত করা ছাড়া মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব নয়। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শাসনকে পরাজিত করার লক্ষ্য নিয়ে সংগ্রাম করার মানে অবশ্য এটা নয় যে, অন্য সব গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে বাদ দিতে হবে। বরং গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করতে হলে সংগ্রামের অন্য গণতান্ত্রিক রূপগুলিকে পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করতে হবে। জনগণের বিশেষ বিশেষ স্থানীয় ও জাতীয়ভিত্তিক সমস্যা নিয়ে আন্দোলন, মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনসহ নানা ধরনের ছোট বড় আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানের ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়, জনগণের মধ্যে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মরণপণ সংগ্রামের তাগিদ সৃষ্টি করে। পার্টির নেতৃত্বে এখনই শ্রমিক-কৃষক-শিক্ষিত তরুণ সমাজকে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার গণসংগঠনের মধ্যে সংগঠিত করে ফ্যাসিবাদ মোকাবিলার মজুত বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু গণসংগঠনের বর্তমান ধরন বজায় রেখে এটা সম্ভব হবে না। পার্টি ও রাজনীতি নিরপেক্ষ কোনো গণসংগঠনের অস্তিত্ব মার্কসবাদী রাজনীতিতে অচল। পার্টির রাজনীতি ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে গণসংগঠনগুলিকে বিকশিত করতে হবে। নিষ্ক্রিয়তার ভূত তাড়িয়ে বিপ্লবী ধারায় শ্রেণি-পেশার গণসংগঠনগুলিকে বিকশিত করে তোলার পাশাপাশি এসব গণসংগঠনের মধ্যে জনগণের বিভিন্ন অংশকে সংগঠিত ও রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত করে পার্টি ও গণসংগঠনের নেতৃত্বে গ্রাম-শহরের প্রত্যেক ওয়ার্ডে-কলে কারখানায়-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানীয় ও জাতীয়ভিত্তিক ছোট-বড় আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলা এবং এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ভিত্তি এলাকা গড়ে তুলে পার্টির শক্তি-সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ এখনই শুরু করতে হবে। কিন্তু পার্টির সাংগঠনিক ক্ষমতা এখনও এমন নয় যে যার মাধ্যমে পার্টি এককভাবে পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সংগঠিত ও পরিচালনা করতে সক্ষম। এজন্য আরো বেশি ঝুঁকি ও নমনীয়তা নিয়ে বামপন্থিদের ঐক্যকে আরও প্রসারিত করতে হবে। অন্যান্য ফ্যাসিবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক শক্তিকে সাথে নিয়ে বৃহত্তর শক্তি বলয় গড়ে তোলার সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ত্যাগ করতে হবে। ফ্যাসিবাদের বিপদ আরো বেড়ে যাওয়ার এই নতুন পর্বে, এই বিপদ মোকাবিলা করার জন্য আরো বৃহত্তর পরিসরে জামায়াত বাদে যে সব শক্তি বর্তমান ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে সত্যিকার অর্থেই গণতান্ত্রিক লড়াই করতে চায় তাদের সাথেও যুগপৎ বা সমান্তরাল বা সম অভিমুখী কর্মসূচি গ্রহণের তাগিদ সৃষ্টি হতে পারে। তাই বর্তমান ফ্যাসিবাদী শাসনের এই কঠিন সময়ে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে– সমাজ ও রাষ্ট্রের বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের মূল লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতির সঠিক বিশ্লেষণের ওপর দাঁড়িয়ে আশু রাজনৈতিক কর্তব্য নির্ধারণ করা; নতুন ধারায় পার্টি ও গণসংগঠনকে বিকশিত করে তোলা ও আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালনা করার শক্তি অর্জন করা এবং পার্টির স্বাধীন উদ্যোগে ও ঐক্য-সমঝোতা-যুগপৎ ধারায় ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রাম গড়ে তোলা। এসব শর্ত পূরণের অব্যাহত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই স্বৈরতান্ত্রিক-একনায়কত্ব ও কর্তৃত্ববাদী দুঃশাসনকে পরাজিত করার জন্য জণগণের ক্ষোভ-বিক্ষোভ-তাগিদকে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির ভিত্তিতে আমরা সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্যে পরিচালিত করতে সক্ষম হয়ে উঠবো। লেখক : সভাপতি, খুলনা জেলা কমিটি, সিপিবি