প্রথাগত গারো আইন ও মাহারিস্বত্ব
প্রেক্ষিত : সংস্কার ও সংশোধন
Posted: 16 সেপ্টেম্বর, 2018
খগেন্দ্র হাজং
প্রথাগত গারো আইনের লেখক রেভা: সি.ডি. বলডুইন এবং মি. জবাং ডি. মারাক উভয় লেখকের বইগুলো পড়লে এবং নিখুঁতভাবে আলোচনা করলে বুঝা যাবে যে, গত ৮০/৯০ বছরের ব্যবধানে তাদের লিখিত গারো উত্তরাধিকার আইনের অনেকখানি পরিবর্তন ও শিখিল হয়ে গেছে।
গারো সমাজে এ সমস্ত পরিবর্তনগুলো এসেছে প্রথমতঃ আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া; দ্বিতীয়তঃ বিশ্বায়ন ও আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব তৃতীয়তঃ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার বিষয়ে জ্ঞান লাভ করা, চতুর্থতঃ সরকারি/বেসরকারির বিভিন্ন সংস্থায় চাকুরি করে আত্মনির্ভরশীল হওয়া; পঞ্চমতঃ ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদির প্রসার ও উন্নয়নের কারণে এ সমস্ত পরিবর্তন ও শিথিলতাগুলো এসেছে। তথাপি বাংলাদেশে গারো এবং খাসিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে মাতৃতান্ত্রিক উত্তরাধিকার আইন এখনো বলবৎ রয়েছে। তবে একথা ঠিক যে, গারো মাতৃতান্ত্রিক উত্তরাধিকার আইন কিংবা হিন্দু পিতৃতান্ত্রিক আইন বলেন, কোন উত্তরাধিকার আইডন, বর্তমান প্রচলিত মানবাধিকার আইনের পক্ষে নয়। গারো মাতৃতান্ত্রিক আইন গারো পুরুষদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছে। আবার হিন্দু পিতৃতান্ত্রিক আইন হিন্দু মহিলাদের সম্পদ-সম্পত্তি থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত রেখেছে। দু’টোই মানবতা বিরোধী মৌলবাদী আইন। পরিবর্তনশীল সমাজে এই আইনগুলো সংস্কার হওয়া প্রয়োজন। নিম্নে প্রথাগত গারো আইনের কতগুলো ধারা সংক্ষিপ্ত আকারে উল্লেখ করা হলো। যথা:
কোন গারো পুরুষ পারিবারিক/মাতৃসম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারবে না। একজন গারো যুবক পুরুষ বিবাহের পূর্বে মাতৃগৃহে থাকাকালীন অবস্থায় যা কিছু বিষয় সম্পত্তি আয় উপার্জন করবে তা সমস্তই তার মাতৃসম্পত্তি রূপে পরিগণিত হবে। অনুরূপভাবে একজন গারো পুরুষ বিবাহ পরবর্তী জীবনে স্ত্রী গৃহে থাকা অবস্থায় যে সমস্ত বিষয় সম্পত্তি আয় উপার্জন করবে তা সমস্তই তার স্ত্রীর সম্পত্তি হিসাবে গণ্য হবে এবং স্ত্রীর মৃত্যু হলে উক্ত সম্পত্তি স্বামীর না হয়ে স্ত্রীর কন্যা/কন্যাদের হবে।
কোন গারো পুরুষ, স্ত্রী অথবা স্ত্রীর অবর্তমানে বয়স্কা কন্যাদের অনুমতি ছাড়া দান, বিক্রয়, কিংবা যে কোনো উপায়ে পরিবারের সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারবে না। তবে স্বামী বৈধ প্রয়োজনে সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারবে যদি পরিবার থেকে কোনো প্রকার আপত্তি না থাকে। গারো পারিবারিক সম্পত্তি কোনো অবস্থাতেই বিভাজন বা বিভক্ত করা যাবে না।
মা পুত্র সন্তানকে দয়াবশতঃ যদি কোনো স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি দান করে থাকেন, ওই পুত্র কেবল তার জীবদ্দশাতেই ভোগ দখল করতে পারবে। মায়ের আগে পুত্র সন্তান মারা গেলে মায়ের দেয়া সম্পত্তি মাতৃগৃহেই প্রত্যাবর্তিত হবে।
গারো পুরুষ প্রথম স্ত্রীর এবং তার চ্রাদের (মাতৃ গোত্রের পুরুষ লোকগণ) সম্মতি নিয়ে দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারবে। তবে কোনো অবস্থাতেই দ্বিতীয় স্ত্রীর কন্যা ‘নকনা’ (উত্তরাধিকারী কন্যা) নির্বাচিত হতে পারবে না। তবে প্রথম স্ত্রী যদি বন্ধা হয়ে থাকে এবং দ্বিতীয় স্ত্রী যদি প্রথম স্ত্রীর মাহারিভুক্ত হন, তখন দ্বিতীয় স্ত্রীর কন্যা সন্তান ‘নকনা’ হতে পারবে।
যদি কোনো গারো স্ত্রী স্বামীকে পরিত্যাগ করে গৃহত্যাগী হয়ে অন্য পুরুষের ঘর করে, তখন ওই স্ত্রী নিজ সম্পত্তি থেকে অধিকার হারাবে। এ ক্ষেত্রে গৃহত্যাগী স্ত্রীর নাবালিকা কন্যা সন্তান থাকলে উক্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে এবং পিতা অভিভাবক হিসাবে ওই গৃহে অবস্থান করবে। গৃহত্যাগী স্ত্রীর চ্রাগণ যদি স্বামীর জন্য দ্বিতীয় স্ত্রী প্রদান করে তবে ওই সম্পত্তি দ্বিতীয় স্ত্রী অথবা তার মেয়ে প্রথম স্ত্রীর মেয়ের সাথে অংশীদার হয়ে ভোগদখল করবে। প্রথম স্ত্রীর কোনো কন্যা সন্তান না থাকলে দ্বিতীয় স্ত্রী অথবা তার কন্যা সম্পত্তির উত্তরাধিকার হিসাবে গণ্য হবে। কোনো গারো পুরুষের স্ত্রী মারা গেলে তার মৃতা স্ত্রীর মাহারির লোকজনেরা যদি দ্বিতীয় স্ত্রী প্রদানে ব্যর্থ হয়, তবে উক্ত বিপত্মীক পুরুষ নির্দিষ্ট সময় শেষে তার পছন্দমত দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ করতে পারবে এবং সেই স্ত্রী যদি মৃতা স্ত্রীর মাহারির হয়ে থাকে তবে দ্বিতীয় স্ত্রী মৃতা স্ত্রীর সম্পত্তির ভাগীদার হবে। কিন্তু তিনি যদি অন্য মাহারির হয় তা হলে ওই সম্পত্তিতে কোনো ভাগিদার হবে না। সে ক্ষেত্রে বরং স্বামী-স্ত্রী উভয় ওই সংসার পরিত্যাগ করতে বাধ্য হবে।
‘নকনা’ নির্বাচিতা কন্যা যদি তার পিতার আপন ভাগ্নেকে স্বামী হিসাবে গ্রহণ করতে অসম্মতি প্রকাশ করে এবং নিজের পছন্দমত অন্য কাউকে বিয়ে করে– তবে সে নকনার অধিকার হারাবে। অর্থাৎ সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে।
পরিবারের সর্বকনিষ্ঠা কন্যাকে নকনা নির্বাচন করা হয়। তবে সর্বকনিষ্ঠা কন্যা যদি কোনো কারণে অযোগ্য বিবেচিত হয় তাহলে পরিবারের অন্য যে কোনো মেয়েকে নকনা নির্বাচন করা যায়। এ ক্ষেত্রে মায়ের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। তারপরেও চ্রাদের সমর্থন থাকা আবশ্যক। এখানেও নকনা তার পিতার আপন ভাগ্নেকে বিয়ে করতে রাজী থাকতে হবে।
পরিবারের নকনা কন্যার সহোদয় ভগ্নীগণ যাদেরকে গারো ভাষায় আগাত্তে বলা হয়, তারা পারিবারিক সম্পত্তির অংশীদার হবে না। নকনা যদি অনুগ্রহ করে কিছু সম্পত্তি দেয়, তাহলেই কেবল সম্পত্তি পাবে। নকনার অকাল মৃত্যু ঘটলে তার বিপত্মীক স্বামীর জন্য যদি অন্য কোনো বোনকে স্ত্রী হিসাবে প্রদান করা হয়, তবে সেই বোন নকনার পূর্ণ মর্যাদা পাবে।
অন্য কোনো কারণে নকনা যদি গৃহত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায়, সে ক্ষেত্রে নকনার অধিকার হারাবে না। তবে পরবর্তীতে মাহারির চ্রাদের আহ্বানে নকনাকে স্ব-গৃহে ফেরত আসতে হবে। ইহাতে কোনো প্রকার অনিচ্ছা প্রকাশ করতে পারবে না। যদি অনিচ্ছা প্রকাশ করে স্বগৃহে আসতে রাজি না হয় তখন নকনা তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
স্ত্রীর মৃত্যুর পর কন্যাগণ বিপত্মীক পিতাকে লালন পালনে বাধ্য থাকবে। যদি লালনে অস্বীকৃতি প্রকাশ করে তখন ভরণ-পোষণ বাবদ সম্পত্তির কিছু অংশ দিতে বাধ্য থাকবে।
নাবালক অবস্থায় কোনো পিতামাতা উভয়ে মারা গেলে মাতৃগোষ্ঠীর যে কোনো নিকটতম আত্মীয়া কিংবা তাদের অভাবে মাতৃগোষ্ঠীর যে কোনো মহিলা ওইসব অসহায় নাবালকদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং তিনিই অভিভাবক হিসেবে গণ্য হবেন। পরবর্তীতে নাবালিকা কন্যাগণ সাবালিকা হলে তাদের মধ্য হতে নকনা নির্বাচন করা হলে সেই কন্যাই সম্পত্তির মালিক হবেন।
মাহারিবাদকে প্রধান্য দিয়েই গারো মাতৃতান্ত্রিক আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। জানা যায়, গারো জাতি যখন তিব্বত থেকে আসাম হয়ে দলে দলে এসে গারো হিলস্ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করতে থাকে, তখন গারোরা গারো পাহাড়ের ভূমি, বনাঞ্চল, জঙ্গল, বন, তাদের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছিল। এই গারো গোত্রগুলো ছিল মাতৃগোত্র এবং মাতৃগোত্রকেই বলা হয় মাহারি। এক এক মাহারির জন্য এক এক অঞ্চলের ভূমির সীমা নির্ধারণ করে বণ্টন করে দেয়া হতো। ওই সমস্ত অঞ্চলের বণ্টনকৃত ভূমিকে বলা হতো “আখিং” ভূমি। “আখিং” ভূমি কোনো একজনের সম্পত্তি নয়, ইহা ওই মাহারির সমস্ত লোকজনের যৌথ সম্পত্তি। মি: জবাং ডি. মারাক তাঁর “The Garo Law”-এর ৭৮ নং ধারায় আখিং ভূমির শ্রেণিবিভাগ দিয়েছেন। তার বর্ণনা অনুযায়ী চার প্রকারের আখিং ভূমি আছে। যথা– (১) প্রথম শ্রেণির আখিং ভূমিকে বলা হতো ‘আ’ জোমা। ‘আ’ মানে ভূমি এবং জোম মানে এজমালি। এই ভূমি গোটা মাহারির যৌথ সম্পত্তি। ইহা কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়। (২) দ্বিতীয় শ্রেণির আখিং ভূমিকে বলা হতো ‘আ’ জিকসি। ‘আ’ জিকসি শব্দের অর্থ হচ্ছে দম্পত্তি। এই সম্পত্তি নকনা ও নক্রম দুই মাহারির হয়ে থাকে। (৩) তৃতীয় শ্রেণির আখিং ভূমিকে বলা হয় ‘আ’ মাৎথে। ‘আ’ মাৎথে এমন একটা আখিং ভূমি যার একটা অংশ অন্য এক ব্যক্তি বা মাহারি ক্রয় করে নিয়েছে। (৪) চতুর্থ প্রকারের আখিং ভূমিকে বলা হয় ‘আ’ মিল্লাম। মিল্লাম শব্দের অর্থ তরবারি। যুদ্ধের মাধ্যমে যে ভূমি প্রাপ্ত হয় তাকে ‘আ’ মিল্লাম বলা হয়। অতীতে এক মাহারির সাথে আরেক মাহারির যুদ্ধ হতো। গ্রামের সাথে গ্রামের যুদ্ধ হতো। এরূপ যুদ্ধের দ্বারা যে ভূমি দখল করা হতো তাকেই ‘আ’ মিল্লম আখিং ভূমি বলা হয়। এই ‘আ’ মিল্লাম ভূমি এক অথবা দুই মাহারির সম্পত্তি হিসাবেও ব্যবহৃত হতো। মাহারির এ সমস্ত সম্পত্তিকে বা এজমালি সম্পত্তিকে আমরা প্রাচীন আদিম সাম্যবাদ সমাজের প্রতিচ্ছবি হিসাবে ধরে নিতে পারি। কারণ আদিম সাম্যবাদ সমাজেও ব্যক্তির কোনো একক সম্পত্তি ছিল না। যা ছিল যৌথ সম্পত্তি। মাহারি সম্পত্তিতে সেই ধারণা প্রতিফলিত হয়। প্রাচীন গারো সমাজ বিশেষ করে গারো পাহাড়ের গারোরা আখিং ভূমিতে (মাহারি সম্পত্তি) সুখে শান্তিতে মনের আনন্দে ঝুম চাষ করতো। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে প্রচুর আখিং ভূমি বা ঝুম চাষের জমি ছিল। কাজেই তখনকার সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও স্বোপার্জিত সম্পত্তির ব্যবহার তেমনভাবে প্রচলিত ছিল না। সুতরাং, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও স্বোপার্জিত সম্পত্তি ব্যবহৃত না হওয়ার ফলে তৎকালীন গারো পাহাড়ের গারো সমাজ স্বোপার্জিত সম্পত্তি ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা ভুলে যায়। অত্রএব তাদের চিন্তা-চেতনার মধ্যে এই ভ্রান্ত ধারণাই প্রতিষ্ঠিত হলো যে, গারো সমাজে পুরুষের কোনো নিজস্ব সম্পত্তি থাকতে পারে না। এ সমস্ত প্রথা রীতিনীতি তৎকালীন সময়ে গারো সমাজে পাওয়া গিয়েছিল এবং সেটাকে (১) মি: জবাং ডি. মারাক (২) রেভা: সি.ডি. বলডুইন ও মেজর প্লেফেয়ার লিখিত আকারে লিপিবদ্ধ করেছেন। পরবর্তীতে মি: জবাং ডি. মারাক-এর “The Garo Law” রেভা. সি.ডি. বলডুইন-এর “Garo Law” এবং মেজর প্লেফেয়ার এর “The Garos” বইগুলো গারো আইন হিসাবে প্রচলিত হয়। মি. জবাং মারাক “The Garo Law” এর প্রথম অধ্যায়ের ১নং ধারায় লিখেছেন “মাতৃতান্ত্রিক আইনে গারো পুরুষ সম্পত্তির অধিকারী হতে পারে না। একইভাবে ব্যাখ্যার মাধ্যমে রেভা. সি.ডি. বলডুইন তাঁর “Garo Law”এর প্রথম অধ্যায়ের ১নং ধারায় লিখেছেন “গারোদের মধ্যে প্রচলিত মাতৃতন্ত্র অনুযায়ী কোনো পুরুষ কোনো প্রকার সম্পত্তির অধিকারী হইতে পারে না। পুরুষ সন্তান বয়প্রাপ্ত হউক বা না হউক সে যাহা কিছু অর্জন করে বা অন্যের নিকট হইতে লাভ করে সমস্তই তাহার মাতার বা ভগ্নীদের সম্পত্তি হইবে। বিবাহিত পুরুষ যাহা কিছু অর্জন করে সমস্তই তাহার পত্নীর সম্পত্তি হইবে বা পত্নী বিয়োগ ঘটিলে তাহার কন্যার সম্পত্তি হইবে। এখানে ব্যতিক্রমভাবে মেজর প্লেফেয়ার যিনি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পূর্ব বাংলার ডেপুটি কমিশনার ছিলেন। তিনি তার গবেষণালব্ধ তথ্যাদি দিয়ে “The Garos” নামক গ্রন্থটি ১৯০৯ সালে প্রকাশ করেন। ওই গ্রন্থের ৭১ পৃষ্ঠায় লেখা আছে “গারো পুরুষ সম্পত্তির স্বত্বাধিকারী হতে পারে যদি সে তা নিজে অর্জন করে থাকে, যদিও সে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারে না। এখানে বিশেষ স্মরণে থাকা প্রয়োজন যে, (১) মি. জবাং ডি. মারাক (২) রেভা: সি.ডি. বলডুইন (৩) ফাদার গুলিও কস্তা প্রমুখ গারো আইন লেখক। তাঁরা কেবল গারো সমাজের মাহারিস্বত্বকে, মাহারি প্রথাকে প্রাধান্য দিয়ে গারো আইন প্রণয়ন করেনি। কিন্তু ব্যক্তির স্বোপার্জিত সম্পত্তির বিষয়ে তাহারা কোনো আইন প্রণয়ন করেনি। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে আমরা জানি যে, সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশ গারো সমাজে মাহারি সম্পত্তি নেই। আখিং ভূমি নেই।
এই সমাজে আছে ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং এ সমস্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তিগুলো পুরুষের শ্রমের দ্বারা অর্জিত রক্ষিত হয়ে এসেছে। বর্তমানে গারো পুরুষেরা সরকারি/বেসরকারি চাকুরি করে নিজের নামে সাব-কবলা জমি ক্রয় করে চাষাবাদ করছে। কোনো শিক্ষিত গারো যুবক পূর্বের ন্যায় ঘর জামাই যায় না। বরং যুবতীরাই এখন জামাইয়ের ঘরে বউ হয়ে আসতে শুরু করছে। কই ২০১৭ সালের কোনো মাহারি স্বত্ব বলে না, গারো পুরুষেরা নিজের নামে জমি ক্রয় করতে পারবে না? তাদের কেনা জমি সমস্তই মাতৃসম্পত্তিতে পরিণত হবে? এ পরিবর্তনগুলো হঠাৎ হয়নি। ধীরে ধীরে এ সমস্ত পরিবর্তনগুলো এসেছে। সময়ের নিরলস তাগিদের কারণে এ সমস্ত পরিবর্তনগুলো এসেছে। সংবিধান, আইন বিধি-বিধান, প্রথা, আচার রীতিনীতি পরিবর্তন, সংস্কার ও পরিবর্ধন করা যায়। কারণ, এগুলো তো কোরআনের সুরা নয়, পরিবর্তন, সংস্কার করা যাবে না। মানুষের জন্য আইন হয়, মঙ্গলের জন্য আইন হয়। যে আইন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে, যে আইন ভাইয়ে ভাইয়ে ব্যবধান বাড়ায়, যে আইন বোনে বোনে অন্যায্যতা সৃষ্টি করে, সেই আইন তো কখনো ভাল আইন নয়, ভাল বিধান নয়। প্রাচীন গচ্ছিত রাখতো। কিন্তু আজকের বাস্তবতা তাকে সঠিক বলে মনে করে না। ধারণা করা হয় প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে চলা গারো মাতৃতান্ত্রিক আইন বা প্রথাগত আইনের সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশে গারো এবং খাসিয়া এই দুই জাতি মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় বিশ্বাসী। তবে কোনো বিষয়ে খাসিয়ারা পিতৃতান্ত্রিক নিয়মও পালন করে থাকে। (একাধিক গারো উত্তরাধিকার আইন লেখকদের মধ্যে একমাত্র মেজর এ প্লেফেয়ার ব্যতিক্রমভাবে তাঁর “The Garos” গ্রন্থে ৭১ পৃষ্ঠায় লিখেছেন “গারো পুরুষ সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারে। অর্থাৎ গারো পুরুষ জীবদ্দশায় তার স্বোপার্জিত সম্পত্তি ভোগদখল, বিক্রয় করতে পারে। তবে মৃত্যুর পর সম্পত্তি মাতা বা ভগিনী বা স্ত্রীর স্বত্বাধিকারে চলে যায়)।
লেখক : কলামিস্ট