মার্কসীয় দর্শনের সৃষ্টিশীলতা ও প্রাসঙ্গিকতা

Posted: 14 জানুয়ারী, 2018

মনোজ দাশ : মার্কসের জন্মের দুইশো বছর পরেও তাঁর দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা একটুও কমেনি। মার্কসীয় দর্শনের সমালোচনামূলক মনোভাব ও তার সৃজনশীল চেতনাই এ প্রাসঙ্গিকতার চাবিকাঠি। মার্কসীয় দর্শনের এ সৃষ্টিশীলতার সাথে মতান্ধতা ও সংশোধনবাদের বিরোধ আছে। মতান্ধতা (উড়মসধঃরংস) হচ্ছে একপেশে, ছকে বাঁধা চিন্তা, যা অন্ধ মতগুলি নিয়ে কাজ করে এবং অধিবিদ্যাগতভাবে পরিবর্তমান অবস্থা ও সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি বিচার না করে অন্ধ বিশ্বাসে তত্ত্বের স্রেফ পুনরাবৃত্তি করে। মতান্ধতার ভিত্তি হলো কোনো কর্তৃত্ব ক্ষমতায় অন্ধ বিশ্বাস এবং অচল-সেকেলে প্রতিজ্ঞাগুলি সমর্থন। সাধারণত ধর্মীয় চিন্তার মধ্যে এটা দেখা যায়। শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনে মতান্ধতার ফলে দেখা দেয় মার্কসবাদের বিকৃতিসাধন, বামপন্থি সুবিধাবাদ, সংকীর্ণতাবাদ ও রাজনৈতিক হঠকারিতা। মার্কসীয় দর্শন মতান্ধতার মোকাবিলা করে তত্ত্বের সৃষ্টিশীল বিকাশ ও মূর্ত সত্যের দ্বান্দ্বিক নীতি দিয়ে। মতান্ধতা পরিবর্তমান অবস্থা ও পরিস্থিতি নির্বিচারে এককের সুনির্দিষ্টতাগুলিকে উপেক্ষা করে। তারা সর্বজনীন বৈশিষ্ট্যের উপরে জোর দেয়। তারা নতুন পরিস্থিতির যথাযথ বিশ্লেষণ ছাড়াই সর্বজনীন সূত্রগুলি স্রেফ পুনরাবৃত্তি করে। এজন্য জীবনের সঙ্গে ও জনসাধারণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আবার কোনো তত্ত্বের সর্বজনীন বৈশিষ্ট্যের ভূমিকা অস্বীকার এবং সুনির্দিষ্ট ও এককের উপরে অপ্রয়োজনে জোর দেওয়াও সমানভাবে গুরুতর ভুল ডেকে আনে। এই ভুলটাই দক্ষিণপন্থি সংশোধনবাদের অন্যতম তত্ত্বগত উৎস। যেমন, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের যে সমানুবর্তিতাগুলি সকল দেশের পক্ষেই অভিন্ন, সংশোধনবাদীরা সেগুলিকে অস্পষ্ট করে রাখতে চেষ্টা করে অথবা তার অস্তিত্বই অস্বীকার করে। তারা একক দেশগুলির সুনির্দিষ্টতার গুরুত্বকে বাড়িয়ে দেখে। মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন তত্ত্বের অতি সরলীকরণ ও গোঁড়ামিপূর্ণ ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে নিরলস সংগ্রাম করেছেন। অতি সরলীকরণ তত্ত্বকে বিকৃত করে দেয়। তার প্রাণশক্তিকে হরণ করে। একসময় তা সংশোধনবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। আর গোঁড়ামির ফলে তত্ত্ব ও বৈপ্লবিক রণনীতি সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে পড়ে। তার প্রভাব কমে যায়। সমাজের ব্যাখ্যা করতে তা সক্ষম হয়ে ওঠে না। জগতকে পরিবর্তন করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। মার্কসীয় দর্শনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে গোঁড়ামি যেসব সংগঠনের মাথায় ভর করে সেইসব সংগঠন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মত হয়ে পড়ে। নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। প্রকৃত সামাজিক প্রক্রিয়ার সাথে অতি ক্ষীণভাবে সম্পর্কযুক্ত সংগঠনে পরিণত হয়। মার্কসবাদ একটা বিজ্ঞান; এ কথাটার সরল ব্যাখ্যা করে তাকে কতকগুলো সূত্রের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখা সঠিক কাজ নয়। প্রথমত, মার্কসীয় দর্শন পরিবর্তমান বিজ্ঞানসম্মত বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির সাধারণ তত্ত্বগত ভিত্তি তৈরি করে। পৃথিবীতে নতুন কিছু সৃষ্টি বা পৃথিবীর ব্যবহারিক বিপ্লবী পরিবর্তনের জন্য দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ মানুষকে প্রকৃতি, সমাজ ও চিন্তার নিয়মগুলি সম্বন্ধে জ্ঞানের যোগান দেয়। একদিকে তা বিশেষ বিশেষ বিজ্ঞানগুলিকে ও সামাজিক কর্মপ্রয়োগকে পারিপার্শ্বিক জগতের অস্তিত্বের মূল নীতিসমূহ ও বিকাশের মূল নিয়মগুলি সম্বন্ধে ধারণা দেয়। সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও মানুষের ব্যবহারিক ক্রিয়াকলাপকে তা চালিত করে সঠিক পথে। অন্যদিকে মার্কসীয় দর্শন সমৃদ্ধ ও মূর্ত নির্দিষ্ট হয় বিশেষ বিশেষ বিজ্ঞানগুলির উপাত্ত ও সামাজিক কর্মপ্রয়োগ দিয়ে। দ্বিতীয়ত, মার্কসীয় দর্শন সৃষ্টিশীল এ কারণেও যে, তা প্রতিষ্ঠিত ধারণার সমালোচনমূলক বিশ্লেষণের চাবিকাঠি, তা সমালোচনা ও আত্মসমালোচনামূলক। যেসব সিদ্ধান্ত ও প্রতিজ্ঞা বাস্তবসম্মত ও সমাজ প্রগতির চাহিদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এই দর্শন শুধু সেগুলোকেই ধারণ করে রাখে। মার্কসের দর্শন কোনো অন্ধমত নয়, কর্মের পথনির্দেশক। লেনিন বলেছেন, ‘মার্কসের তত্ত্বকে আমরা সম্পূর্ণকৃত ও অলংঘনীয় একটা কিছু মনে করি না। এই বিজ্ঞানটিকে বিকশিত করে তুলতে হবে সমাজতন্ত্রীদের, সবদিক দিয়েই, যদি তারা জীবনের সাথে পা মিলিয়ে চলতে চায়।’ তৃতীয়ত, এই দর্শন সৃষ্টিশীল, কারণ তা নতুন কোনো বক্তব্যের সারসত্তা বিবেচনা না করে তাকে নাকচ করে দেয় না। সত্যানুসন্ধানের সম্ভাব্য সব সুযোগকেই তা কাজে লাগায়। একটা সৃষ্টিশীল দর্শন হিসেবে তা মানবজাতির বিকাশমান জ্ঞানের জগৎ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের জ্ঞান অর্জনের প্রচেষ্টা চালায়। মার্কস নিজেও এরিস্টটল থেকে শুরু করে মার্কসের পূর্ববর্তী সময়ে সমাজ গবেষণায় যত জ্ঞান সঞ্চিত হয়েছিলো সমালোচনার দৃষ্টিতে সৃষ্টিশীলভাবে তা সংশ্লেষণ করেছিলেন। চতুর্থত, এই দর্শন সৃষ্টিশীল, কারণ ডায়ালেকটিকস তত্ত্বচর্চার ক্ষেত্রে গতানুগতিক ছক বাঁধা পদ্ধতির চিন্তাধারাকে প্রত্যাখ্যান করে। চিন্তার গতানুগতিক ধারা তত্ত্বকে ব্যাকরণের নিয়ম বা গণিতের সূত্রের মত মনে করে এবং তত্ত্বচর্চাকে একটা নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রেখে তত্ত্বের বিকাশে বাধার সৃষ্টি করে। কিন্তু মার্কসীয় তত্ত্বচর্চার ক্ষেত্রে আলস্য, গণ্ডিবদ্ধতা, গোঁড়ামি, সরলীকরণ, মডেলভিত্তিক ও ইউটোপিয় চিন্তাধারার কোনো স্থান নেই। সৃষ্টিশীল একটা দর্শন কর্মপ্রয়োগের জন্য অনুসরণ করা যায় কি-না এই প্রশ্নটি অনেকেই করে থাকেন। কেউ কেউ মনে করেন, যে দর্শন সৃষ্টিশীল ও পরিবর্তিত হয়ে চলে সে ধরনের দর্শন অনুসরণ করা সম্ভব নয়। মার্কসীয় দর্শনের ক্ষেত্রে এ কথা খাটে না। কারণ মার্কসীয় দর্শন একদিকে সৃষ্টিশীল, আবার অন্যদিকে নির্দিষ্ট সময়ের কর্মের পথনির্দেশক হিসেবে তা একটি নির্দিষ্ট তত্ত্বকে হাজির করে। দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি অনুসরণ করে একদিকে যেমন প্রতিনিয়ত মার্কসীয় তত্ত্বের বিকাশ হয়, অন্যদিকে নির্দিষ্ট সময়ের কর্মের পথনির্দেশক হিসেবে সেই তত্ত্ব প্রাসঙ্গিক, তা অনুসরণীয়, তা যথাযথভাবে অনুসরণ ও প্রয়োগ করে নির্দিষ্ট সময়ের কাজ সঠিকভাবে সম্পাদন করা যায়। এঙ্গেলস ‘ডায়ালেকটিকস অব নেচার’-এ বলেছেন, ‘ঝুঁকি ব্যতিরেকে ডায়ালেকটিকসকে অবজ্ঞা করা যাবে না।’ কেউ অস্বীকার করে না যে, এর প্রয়োগ ফলপ্রসূ হবে না, যদি তা হয় গোঁড়ামিপূর্ণ ও সেকেলে স্বতঃসিদ্ধভিত্তিক। ডায়ালেকটিকস এমন কোন স্বয়ংক্রিয় চাবি নয় যা যেকোন বৈজ্ঞানিক রহস্যের জট খুলে দিতে পারে। কিন্তু এটা বাস্তবের প্রতি বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহনে সহায়তা করে, কর্মের পথনির্দেশক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু মার্কসের দর্শনের প্রাসঙ্গিকতাকে কাজে লাগাতে হলে সৃজনশীলভাবে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া দরকার। প্রথমত, বস্তু বা প্রক্রিয়ার বাস্তবসম্মত চিত্র উপস্থিত করতে হবে। কোনো ধরনের সংযোজন, সরলীকরণ বা জটিলীকরণ না করেই একটা বস্তু বা প্রক্রিয়াকে দেখতে হবে। সেগুলি বাস্তবিকই যেমন সেভাবেই ঐ বস্তু বা সামাজিক প্রক্রিয়ার এক বাস্তবসম্মত চিত্র উপস্থিত করতে হবে। তার বিকাশের প্রধান প্রধান প্রবণতা খুঁজে বের করা এবং সেই বিকাশের পেছনকার শক্তিগুলি খুঁজে বের করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সামাজিক প্রক্রিয়া ও ব্যাপারসমূহের এক সামগ্রিক সর্বাত্মক ব্যাখ্যা করতে হবে। একটি বস্তু বা প্রক্রিয়ার সাথে অন্যান্য বস্তু বা প্রক্রিয়ার মধ্যে বিদ্যমান সব সংযোগ ও সম্পর্কের এক সর্বাত্মক বিশ্লেষণের মাধ্যমেই ঐ নির্দিষ্ট বস্তু বা প্রক্রিয়াটির সারগত সংযোগ, গুণ-ধর্ম ও বৈশিষ্ট্যগুলিকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। তৃতীয়ত, যে কোনো প্রতিজ্ঞা বা সামাজিক প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করতে হবে শুধু ঐতিহাসিকভাবে, শুধু অন্যগুলির সাথে সংযুক্তভাবে, শুধু ইতিহাসের নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতার সাথে মিলিয়ে। চতুর্থত, বিকাশের অভ্যন্তরীণ উৎস খুঁজে বের করতে হবে, এর পেছনের বিরোধ–যে বিরোধগুলি তাকে সংগঠিত করেছে তাকে উদঘাটন করতে হবে। পঞ্চমত, বৈজ্ঞানিক অবধারণা ও ব্যবহারিক কাজের জন্য প্রধান কাজ বা গ্রন্থিটি নির্দিষ্ট করে দেখাতে সক্ষম হতে হবে। প্রধান কাজ হচ্ছে নিয়ামক শর্ত ও সংযোগ খুঁজে বের করা। এই নিয়ামক সংযোগ ও শর্তই শেষ পর্যন্ত সমাজ প্রগতির চরিত্র ও গতিমুখ নির্ধারণ করে। প্রধান গ্রন্থিটি খুঁজে বের করা সহজ নয়। সমাজ একটি জটিল ও বিকাশশীল অবস্থা। তার অভ্যন্তরে কাজ করে অসংখ্য বিষয়গত ও বিষয়ীগত উপাদান। মার্কসীয় দর্শনের সৃষ্টিশীল প্রয়োগের মধ্য দিয়েই প্রধান কর্তব্যগুলি বিজ্ঞানসম্মতভাবে নির্ধারণ করা যায়। মার্কসীয় দর্শন শুধুমাত্র সমগ্র মার্কসবাদের সারনির্যাস, গোটা মার্কসবাদের অন্তরাত্মাই নয়, এই দর্শন গোটা মানবজাতির জন্য সৃষ্টি করেছে সর্বশ্রেষ্ঠ মতাদর্শিক দিকনির্দেশনা। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়কার সামাজিক অবস্থায় সর্বোৎকৃষ্ট এবং সবচেয়ে সত্য যে দর্শন সৃষ্টি করা সম্ভব ছিল তা হলো মার্কসীয় দর্শন। মার্কসীয় দর্শন হচ্ছে বিপ্লবের বীজগণিত। প্রত্যেক যুগের সমাজ বিকাশের ধারায় তার অর্থনীতি-রাজনীতি-সংস্কৃতির বিকাশে প্রধান প্রধান সমস্যা খুঁজে বের করা এবং তাকে প্রগতিশীল ধারায় রূপান্তরিত করার জন্য মার্কসীয় দর্শনই প্রধান হাতিয়ার। এজন্য অক্টোবর বিপ্লবের আগে ও পরে লেনিন দ্বন্দ্বতত্ত্ব ব্যবহারে সক্ষম তাত্ত্বিকরূপে পার্টি ক্যাডারদের একটি অংশকে গড়ে তোলার জন্য প্রশিক্ষণের দায়িত্ব নির্ধারণ করে দেন। বর্তমান বিশ্বের চলমান প্রক্রিয়াকে বিজ্ঞানভিত্তিকরূপে অনুধাবন করতে হলে এবং বিশ্বজনীন বিকাশের সম্ভাবনাকে জানতে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের সৃষ্টিশীলতাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হবে। এই শতাব্দীতে আমরা যেসব প্রয়োজনের মুখোমুখি সেগুলোর সাথে তত্ত্বের সঙ্গতিপূর্ণ বিকাশও ঘটাতে হবে। মার্কসীয় দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার দ্বন্দ্বতত্ত্ব ও দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির ব্যবহারে ব্যর্থ হলে এই দায়িত্ব সম্পাদন করা যাবে না। বিশ্বজনীন সমস্যাবলির বিশাল বর্ণচ্ছটা, আমাদের দেশ ও সমগ্র মানবজাতি যার মুখোমুখি হচ্ছে মার্কসীয় দর্শন সেখানে তার দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করতে সক্ষম। এখন দরকার হচ্ছে মার্কসীয় দর্শনের সমালোচনামূলক মনোভাব ও তার সৃজনশীল চেতনাকে সত্যিকারভাবে পুনরুজ্জীবন ও চিত্তাকর্ষক করে তোলা। আর এজন্যই মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ মতাদর্শিক পথনির্দেশনা ‘মার্কসীয় দর্শনকে’ সব ধরনের সরলীকরণ, জটিলীকরণ, বিকৃতি ও মতান্ধতা থেকে রক্ষা করে সৃষ্টিশীলভাবে চর্চা করতে হবে নিরলস ও অব্যাহতভাবে। লেখক : সভাপতি, সিপিবি, খুলনা জেলা কমিটি