নাব্য সঙ্কটে ব্রহ্মপুত্র নদ

Posted: 07 জানুয়ারী, 2018

কিশোরগঞ্জ সংবাদদাতা : হোসেনপুরে ব্রহ্মপুত্র নদ নাব্য সঙ্কটে এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে সেচসহ জীববৈচিত্র্য। এ কারণে স্থানীয়রা এ নদ খননে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করে জরুরি প্রতিকার দাবি করেছেন। সরেজমিনে হোসেনপুর-গফরগাঁও সড়কের খুরশিদ মহল সেতু সংলগ্ন এলাকার স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিগত ৬০-৭০ বছরেও কোনো খনন না করায় নদের তলদেশে পলি জমে এর নাব্য হ্রাস পেয়ে এককালের উত্তাল নদ ছন্দ হারিয়ে আজ মরা খালে পরিণত হয়ে উঠেছে। আর এতে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্যসহ মৎস্য সম্পদ ও নানা জলজ প্রাণী। হাজার হাজার জেলে পরিবার এখন তাদের আদি পেশা ছেড়ে বেকারত্ব ঘোচাতে বেছে নিয়েছে অন্য পেশা। খেয়া পারের মাঝিরা বৈঠা ছেড়ে কলের নৌকা চলিয়েও শেষ অবধি ছাড়তে হয়েছে বাপ-দাদার পেশা। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা শাখা নদীগুলোও এখন বিত্তবানদের ফসলি জমি। স্থানীয় বয়োবৃদ্ধ জয়নাল মিয়া, রফিক মিয়াসহ অনেকেই আক্ষেপ করে বলেন, কালের উত্তাল ব্রহ্মপুত্র নদ আজ স্মৃতির গহীনে হারিয়ে যাচ্ছে। ভয়াবহ নাব্য সঙ্কট ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় পরিবেশ বিপর্যয়সহ কৃষি আবাদে নেমে এসেছে স্থবিরতা। নদীর তলদেশে পানি না থাকায় সেচনির্ভর কৃষকরা পড়েছে মহাসঙ্কটে। তাই ব্রহ্মপুত্র নদের দুপাড়ের মানুষের প্রাণের দাবি অতিদ্রুত নদের ড্রেজিং করে পানির প্রবাহ পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। সূত্র মতে, নাব্য সঙ্কটে হোসেনপুর, গফরগাঁও ও ময়মনসিংহ দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র নদের অস্তিত্ব এখন প্রায় বিলীন। পানির প্রবাহ না থাকায় নদের তলদেশে চলছে চাষাবাদ। এ সুযোগে একটি প্রভাবশালী মহল সিন্ডিকেট তৈরি করে কোটি কোটি টাকার বালু ও মাটি অবৈধভাবে বাণিজ্য করে রাতারাতি কোটিপতি বনে যাচ্ছে। ফলে একদিকে সরকার হারাচ্ছে মোটা অঙ্কের রাজস্ব, অন্যদিকে হুমকির মুখে রয়েছে এলাকার ব্রিজ-কালভার্ট। শুকনা মৌসুমে পানি কমে গেলে বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল দখলে নিতে প্রতি মৌসুমেই মারামারিতে প্রাণহানি ঘটে। ফলে ব্রহ্মপুত্রের খাস জমি ও বালু ব্যবসার আধিপত্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক অসন্তোষ বেড়েইে চলছে। খুরশিদ মহল গ্রামের মামুন মিয়া, ওয়াদুদ মিয়াসহ অনেকে জানান, নদী ভাঙ্গন রোধে কোন কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় বর্ষা মৌসুমে নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম, বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, স্কুল-মাদ্রাসা। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বারবার প্রশাসনের কাছে ধর্ণা দিলেও নেয়া হয়নি কোনো সরকারি উদ্যোগ। নাব্য সঙ্কটের কারণে শুকনো মৌসুমে সাধারণ নৌকাগুলোও চলতে সমস্যায় পড়তে হয়। ফলে নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ায় ব্যবসা বাণিজ্যেতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। প্রাকৃতিক জলবৈচিত্র ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় প্রাণিকূলের ভারসাম্য হারিয়ে যাচ্ছে। জনশ্রুতি রয়েছে, তৎকালীন বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে নৌ-বহর নিয়ে হোসেনপুর এলাকা দিয়ে যাতায়ত করতেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নৌ-বহর ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে নিয়মিত টহল ও রসদ সরবরাহের নিরাপদ পথ হিসেবে ব্যবহার করত। হোসেনপুরে তারা নীলকুঠিও স্থাপন করেছিল। সমৃদ্ধ ইতিহাস আজ কেবল স্মৃতি, নাব্য সঙ্কটে ব্রহ্মপুত্র বিপন্ন। তাই এলাকাবাসীর প্রাণের দাবি, ব্রহ্মপুত্র নদ সরকারী উদ্যোগে ড্রেজিং করে নাব্য ফিরিয়ে আনা।