অ্যান্টিব্যালিস্টিক মিসাইল

Posted: 07 জানুয়ারী, 2018

মনির তালুকদার : আধুনিক বিশ্বে যত রকমের যুদ্ধাস্ত্র আছে তার অন্যতম একটি হচ্ছে এ্যান্টিব্যালিস্টিক মিসাইল বা সংক্ষেপে এবিএম। এটি একটি আত্মরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্র, যার উদ্দেশ্য শত্রু দেশ থেকে আসা আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে তার লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানোর আগেই ঘায়েল বা ধ্বংস করে দেয়া। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরমাণু, রাসায়নিক, জীবাণু বা প্রচলিত বোমা বয়ে নিয়ে অর্থাৎ অনেক উঁচু দিয়ে উড়ে গিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে। আর অ্যান্টিব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সেই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে ধ্বংস করে। কিভাবে করে সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে কিছু আলোচনা করে নেয়া ভাল। ব্যালিস্টিক শব্দের অর্থ হলো ‘অবিক্ষিপ্ত বস্তুর আবক্র পথে চলার গতিবিষয়ক বিজ্ঞান’। আধুনিক যুগের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রথম উদ্ভাবন করে নাৎসি জার্মানি। ওয়ানার ভন ব্রাউনের পরিচালনায় ১৯৩০ এর দশকে এটি উদ্ভাবিত হয় এবং সাফল্যের সঙ্গে প্রয়োগ করা হয় ১৯৪০-এর দশকের প্রথম দিকে। তখন এটি ভি-২ রকেট নামেই অধিক পরিচিত ছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ওই প্রযুক্তির আরো অনেক উৎকর্ষ ঘটায়। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থল থেকে, চলমান প্ল্যাটফর্ম, ট্রেন, ট্রাক, সাবমেরিন, জাহাজ এমনকি উড়োজাহাজ থেকে ছোড়া যেতে পারে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বিভিন্ন পাল্লার হতে পারে– স্বল্প, মাঝারি ও দূরপাল্লার। ঘণ্টায় এগুলোর গতি হতে পারে ১৫ হাজার কিলোমিটার। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে যায় না। এগুলো উপরে উঠার পর নেমে আসে। উপরে ওঠার জন্যে এগুলোকে জ্বালানি পুড়িয়ে বেগ দিতে হয়। একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছার পর আর জ্বালানি পুড়িয়ে বেগ দিতে হয় না, তখন আপন বেগেই চলতে পারে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে প্রচলিত বোমা থেকে শুরু করে পরমাণু অস্ত্র পর্যন্ত যে কোনো ধরনের অস্ত্র থাকতে পারে। আজ বিশ্বের ৩৫টির মতো দেশের হাতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আছে। তবে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তথা আইসিবিএস মূলত যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার হাতেই রয়েছে। তবে সম্প্রতি উত্তর কোরিয়া দাবি করেছে তাদের কাছেও আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আছে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র টার্গেটে আঘাত হানার আগেই সেগুলো ধ্বংসের ধারণায় অ্যান্টিব্যালিস্টিকের জন্ম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান ভি-১, ভি-২ কর্মসূচি চালু করার সময় থেকে। ব্রিটিশ জঙ্গি বিমান ও বিমান বিধ্বংসী কামানের গোলাবর্ষণের সাহায্যে ভি-১ রকেট ধ্বংসে খানিকটা সাফল্য পাওয়া গেলেও বিমান বা আর্টিলারি দিয়ে ভি-২ রকেট ধ্বংস করা অসম্ভব ছিল। কারণ ভি-২ ছিল সত্যিকারে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। তখন মিত্রশক্তি ভি-২ উৎক্ষিপ্ত হবার আগেই সেগুলো খুঁজে বের করে ধ্বংস করে দেয়ার জন্যে চালু করে ‘অপারেশন-ক্রাসবো”। এই অভিযানটি বহুলাংশেই অকার্যকর ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বন্দি জার্মান বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়েই রকেট প্রযুক্তির সমস্ত রহস্য জেনে যায়। উভয় দেশেই শুরু হয় ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের জোর উদ্যোগ। এদিকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৫৭ সালে বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উদ্ভাবনে অনেক দূর এগিয়ে যায়। ১৯৫৭ সালের ১ জুন আমেরিকার প্রথম আইসিবিএম এটলাস-এর সফল পরীক্ষামূলক উৎপেক্ষণ হয়। আর সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম আইসিবিএমআর-৭ এর সফল উৎক্ষেপণ হয় ১৯৫৭ সালের আগস্ট মাসে। আগেই বলা হয়েছে যে, অ্যান্টিব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উদ্ভাবনের ধারণার জন্ম চল্লিশের দশকের প্রথম দিকে জার্মান ভি-২ রকেট চালু হবার সময় থেকে। তবে এবিএম-এর প্রথম বাস্তব ও সফল পরীক্ষার কাজ চালায় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৬১ সালের ১ মার্চ। সারি-মাগান পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে উৎক্ষিপ্ত একটি ভি-১০০০ ক্ষেপণাস্ত্র কাপুসতিন ইয়ার কসমোড্রোম থেকে উৎক্ষিপ্ত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আর ১২’র ছেড়ে দেয়া একটি ডামি পরমাণু বোমা ধ্বংস করে দেয়। উৎক্ষেপণের ১৪০ সেকেন্ড পর ২৫ কিলোমিটার (৮২ হাজার ফুট) উচ্চতায় ১৮ হাজার টাংস্টেন কার্বাইড স্ফেরিকাল ইমপ্যাক্টারের আঘাতে ওটা ধ্বংস করা হয়। তবে ভি-১০০০ ক্ষেপণাস্ত্রটি যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি বিধায় এটি পরিত্যাগ করা হয়। সোভিয়েতের প্রথম সার্থক আইসিবিএম বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ছিল এ-৩৫ অ্যান্টিব্যালিস্টিক মিসাইল। মস্কোকে আইসিবিএম-এর হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে এটি ১৯৭১ সালে চালু করা হয় এবং মসোকআর চারপাশের চারটি স্থানে মোতায়েন করা হয়। গোড়াতে এটি ছিল একধাপ বিশিষ্ট এবং বায়ুমণ্ডলের বাইরে শত্রু আইসিবিএম’কে বাধা দেয়াই ছিল এর কাজ। পরে এর অনেক উৎকর্ষ ঘটানো হয়। ওদিকে যুক্তরাষ্ট্র যে হাত গুটিয়ে বসেছিল তা কিন্তু নয়। এবিএম এর প্রথম চেষ্টা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বানায় নাইক-জিউস। এটি তৎকালীন বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নত সংস্করণ। তবে এটা অকার্যকর প্রমাণিত হওয়ায় পরবর্তীতে নাইক এক্স উদ্ভাবিত হয়। নাইক এক্স দুটি ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার ও কন্ট্রোল ব্যবস্থার একটি সমন্বিত রূপ। মূল ক্ষেপণাস্ত্রটি ছিল এলআইএম-৪৯ স্পার্টান। দূরপাল্লার এবং বায়ুমণ্ডলের বাইরে এক্সরের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে শত্রুর মারণাস্ত্র ধ্বংস করার জন্যে এতে ৫ মেগাটনের বোমা সংযোজিত থাকে। দ্বিতীয় ক্ষেপণাস্ত্রটি অপেক্ষাকৃত স্বল্পপাল্লার। নাম স্প্রিন্ট। অত্যন্ত দ্রুতগতির। নিক্ষিপ্ত হবার ৪ সেকেন্ডের মধ্যে এটি ঘণ্টায় ১৩ হাজার কিলোমিটার বেগে ছুটতে পারে। শত্রুর মারণাস্ত্র কোনোভাবে স্পার্টানের হাত ফসকালে সেটিকে ধ্বংস করাই এর কাজ। পরবর্তীকালে এবিএম-এর আরও যে কত উন্নত সংস্করণ বেরিয়েছে তার ঠিক নেই। এবিএম বলতে মূলত আজ আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলার ব্যবস্থাকে বোঝায়। কিন্তু এর পাশাপাশি কিছু কিছু এবিএম আছে যেগুলো আইসিবিএকে ঠেকাতে পারে না– শুধু স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে ধ্বংস পারে। এগুলো হচ্ছে স্বল্পপাল্লার ট্যাকটিক্যাল এবিএম। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট, ঈজিস, টার্মিনাল হাই আল্টিচুড এরিয়া ডিফেন্স (থার্ড)। ইসরাইলের অ্যারো মিসাইল, রাশিয়ার স্রাম ক্ষেপণাস্ত্রের মডেলে তৈরি এসএ-১০, এসএ-১২, এসএ-২০ এবং এসএ-২১ থেকে ২৫। চীন, ভারত, ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালিও ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী প্রযুক্তিতে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এদের সবারই আসিবিএম বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র আছে– তেমনি আছে স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও, যা দিয়ে আইসিবিএম না হলেও অন্যান্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করে দেয়া সম্ভব। এবিএম উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ব্যবধান দ্রুত কমে আসছে। ওদিকে ভারত ও তার নিজস্ব প্রযুক্তিতে অ্যান্টিব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়ন ঘটিয়েছে। ২০১১ সালের মে মাসে ঘোষণা করা হয়েছিল যে, ভারত নির্মাণ প্রতিরক্ষার এমন এক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে যে, শত্রুপক্ষের যে কোনো ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ভারতের আকাশসীমায় প্রবেশ করার আগেই ৫ হাজার কিলোমিটার দূরে থাকতেই ঘায়েল করা যাবে।