আন্তোনিও গ্রামসি : প্রত্যয়জনিত আশার ফেরিওয়ালা

Posted: 07 জানুয়ারী, 2018

সোহেল তারেক: আন্তোনিও গ্রামসির জীবনকাল ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত; কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত জীবনেই তিনি এত বেশি কাজ করে গেছেন যে একক কোনো অভিধায় তাকে চিহ্নিত করাটা বেশ কঠিন। একাধারে রাজনীতি, সাংবাদিকতা, ইতিহাস, দর্শন, ভাষাতত্ত্ব, সাহিত্য-সমালোচক প্রভৃতি কাজে তিনি তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। এতকিছুর পরেও মার্কসবাদী তত্ত্বকে তিনি যেভাবে বিশ্লেষণ করেছেন তা সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে। এটা বলা অসঙ্গত হবে না যে, মার্কসবাদকে আরো বিকশিত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন তাদের মধ্যে আন্তোনিও গ্রামসি সর্বাগ্রে ছিলেন। ইতালির খুব অনগ্রসর, পশ্চাদপদ সার্দিনিয়া নামক একটি প্রদেশে গ্রামসির জন্ম হয়েছিল। ১৮৯১ সালে যে সময় তিনি ইতালিতে জন্মগ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে তার বেড়ে ওঠার যে সময়, সেই সময়টাতে ইতালিও একটি নতুন দেশ, নতুন জাতি হিসেবে গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। ইতালির বেশিরভাগ অংশই তখনো ছিল বৃহৎ জমিদারের অধীন, শিল্প অবকাঠামোও তখনো গড়ে ওঠা শুরু করেনি; কৃষকরাই ছিল সংখ্যাগুরু, যারা ছিল বিক্ষিপ্ত ও দরিদ্র। ছাত্র অবস্থাতেই এরকম পরিস্থিতিতে গ্রামসির মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতার ভ্রুণ বিকশিত হয়েছিল সার্দিনীয় জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে। এই আদর্শে তিনি প্রথম জীবনে ইতালির দক্ষিণাঞ্চলীয় অনুন্নত ও উপনিবেশিত অংশের স্বাধিকার আন্দোলনেও অংশ নিয়েছিলেন। এভাবেই আন্দোলনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই তিনি সাধারণ মানুষের সর্বাঙ্গীন মুক্তির দিশা খুঁজতে থাকেন এবং ধীরে ধীরে তিনি জাতীয়তাবাদী অবস্থান থেকে সরে এসে মার্কসবাদী চিন্তার দিকে ঝুকে পড়েন। এরপরে তিনি ইতালিয় সোস্যালিস্ট পার্টিতে (পিসিআই) সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করেন; পিসিআই ছিল ইউরোপীয় বাম আন্দোলনের সবচেয়ে বড় ও পুরোধা সংগঠন। ১৯২১ সালে গ্রামসি ইতালিয় কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সমিতির সভ্য নির্বাচিত হন। ১৯২৪ সালে তিনি হন পার্টির সাধারণ সম্পাদক। ফ্যাসিস্ট মুসোলিনীর কোপানলে পরে এর ঠিক দুই বছর পরে তিনি কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। মুসোলিনির জেলেই তাঁর জীবনের পরবর্তী এগারো বছর কেটেছিল অনিদ্রা, ক্ষুধামন্দা, রক্তবমির মধ্যে। এই সকল প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেই তিনি লিখে গেছেন তাঁর মৃত্যুর দিন পর্যন্ত। তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে এসে বান্ধবী ও স্ত্রী জুলিয়ার বোন তাতিয়ানা ঘর থেকে নিমিষে সরিয়ে ফেলেন যে পা-ুলিপি, তাই অধুনাখ্যাত Prison Notebooks. গ্রামসি তাঁর ক্ষণস্থায়ী জীবনে যা কিছু লিখেছেন, তার সবই নিজস্ব কাজের অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন মনীষীর লেখা পত্র পাঠের প্রকাশ। জীবনচ্যুত কিছুই তিনি গ্রহণ করেননি। ইতালিয় ইতিহাস ও স্থানিকতার ভিত্তিতে তিনি মার্ক্সবাদের আদর্শ গ্রহণ করেছেন। তিনি মার্ক্সবাদকে চলমান এক প্রক্রিয়া হিসেবেই মেনেছেন। বিশেষ করে তার ‘প্রিজন নোটবুকসে’ স্থানিক পর্যায়ে মার্ক্সীয় তত্ত্ব প্রয়োগের যে সকল সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয় সেগুলোকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তুলে ধরেন এবং উত্তরণের পথ নির্দেশ করেন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল- তিনি যে নতুন শব্দ ও আইডিয়াগুলো ব্যবহার করার মাধ্যমে এই বিচার বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন তা শুধু স্থানিকতার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সকল পশ্চাদপদ সমাজের ক্ষেত্রেই সমানভাবে কার্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়। এখানেই গ্রামসির চিন্তার সবচেয়ে বড় তাৎপর্য যে, তা এমনভাবে অভিযোজিত হতে পারে যে, যেকোন সমাজে যেকোন সময় তা খাপ খেয়ে যেতে পারে। বর্তমান সময়ের মার্কসবাদী বিশ্লেষকরা গ্রামসির চিন্তার এই প্রবাহমানতা বা মুক্ততার দিকটিকেই তাঁর চিন্তার সবচেয়ে প্রভাবশালী দিক বলে বিবেচনা করেন। উল্লেখ্য, গ্রামসি যখন মেকিয়াভেলী পাঠ করেছিলেন, তখন তিনি নিজেও এই মুক্ততার গুণকে অন্যতম শক্তির চিহ্ন হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ‘The Modern Prince’ গ্রন্থে প্রথম লাইনটিই তিনি শুরু করেছিলেন এভাবে ‘The Prince’ নিয়ে আমার মৌলিক ধারণা হচ্ছে, এটা কোনো গতানুগতিক কাজ নয়, বরং একটি জীবন্ত কাজ। তার নিজের কাজের ক্ষেত্রেও এটা সমানভাবে সত্য। তিনি তার পাঠককে যথেষ্ট চিন্তা করার বা ভাবার জায়গা দেন। Prison Notebooks–এর ইংরেজি ভার্সনের সম্পাদক গ্রামসির অর্ধসম্পাদিত ও খণ্ডিত কাজের প্রতি তার অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন, আমাদেরকে এ নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। বরং আমরা মনে করি, এটা তার আমাদের বলার একটা পদ্ধতি যে, সকল প্রকল্পই শেষ পর্যন্ত শেষহীন... যার কাজ বিরামহীনভাবে চলতে থাকে। আগেই উল্লিখিত হয়েছে যে, গ্রামসি ফ্যাসিস্ট মুসোলিনীর জেলে অন্তরীণ থাকাকালীন সময়েই তাঁর বেশিরভাগ লেখা লিখেছিলেন; যে কারণে জেল কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি এড়িয়ে তাঁকে তার লেখাগুলো লিখতে হয়েছে। আর একারণেই গ্রামসি তার ‘প্রিজন’স নোটবুক’এ প্রচলিত পরিভাষা বর্জন করে অন্য শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। যেমন ‘মার্কসবাদ’ কথাটা তিনি কোথাও ব্যবহার করেন নি, বলেছেন ‘প্রাক্সিসের দর্শন’। মার্কসের নামও ব্যবহার করেন নি। বলেছেন ‘প্রাক্সিসের দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা’। অর্থাৎ তিনি তাঁর চিন্তায় নতুন আইডিয়ার সাথে নতুন শব্দও প্রচলিত করেন, যা গ্রামসি পাঠ ও চর্চ্চা করার ক্ষেত্রে অনেকসময় বিভ্রান্তির তৈরি করে। গ্রামসির রচনার বহুল ব্যবহৃত দুটি শব্দ হলো ‘সাবলটার্ন’ ও ‘হেজেমনি’। ‘সাবলটার্ন’ শব্দটি গ্রামসি ব্যবহার করেছেন অন্তত দুটি অর্থে। প্রথমত, একটি অর্থে এটি সরাসরিভাবে ‘প্রলেতারিয়েত’ এর প্রতিশব্দ। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় ‘সাবলটার্ন শ্রেণি’ হল শ্রমিকশ্রেণি। আর এর ঠিক বিপরীতে যে শ্রেণি থাকে অর্থাৎ পুঁজির মালিক বুর্জোয়াশ্রেণি, তাকেই তিনি বলছেন ‘হেজেমনিক শ্রেণি’। দ্বিতীয়ত, আরও সাধারণ অর্থেও ‘সাবলটার্ন’ কথাটা গ্রামসি তার লেখায় ব্যবহার করেছেন। কেবল পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় নয়, শ্রেণিবিভক্ত সমাজের অন্যান্য ঐতিহাসিক পর্বেও ‘সাবলটার্ন’ শ্রেণির কথা বলেছেন গ্রামসি। স্পষ্টতই এখানে ‘সাবলটার্ন’এর অর্থ শিল্পশ্রমিক শ্রেণি নয়। বরং যেকোন শ্রেণিবিভক্ত সমাজে ক্ষমতাবিন্যাসের কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যের কথা উঠছে এখানে। এই বিন্যাসকে গ্রামসি দেখছেন একটি সামাজিক সম্পর্কের প্রক্রিয়ার মধ্যে, যার এক মেরুতে অবস্থিত প্রভুত্বের অধিকারী ‘ডমিন্যান্ট’ শ্রেণি, অপর মেরুতে যারা অধীন সে ‘সাবলটার্ন’ শ্রেণি। বহুক্ষেত্রেই অবশ্য গ্রামসি বিশেষ বিশেষ ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে কর্তৃত্ব, প্রভুত্ব, শাসন এই শব্দগুলিকে সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ফলে কর্তৃত্বের অধিকার, প্রভুত্বের অধিকার, শাসনের অধিকার এই ধারণাগুলির মধ্যে পার্থক্য আছে কি না, গ্রামসির আলোচনা থেকে তা বোঝা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। সাবলটার্ন/হেজেমনিক শ্রেণির সামাজিক সম্পর্কের বিষয়ে গ্রামসির যে বিশ্লেষণ তা আধুনিক মার্কসবাদী আলোচনায় এক বিশিষ্ট অবদান রেখেছে। গ্রামসি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, ঐতিহাসিকভাবে বুর্জোয়াশ্রেণি কেবল শাসনতন্ত্রে তার প্রভুত্বই প্রতিষ্ঠা করে না; বরং এক সার্বিক সামাজিক কর্তৃত্ব বা ‘হেজেমনি’ সৃষ্টি করে। এই যে সার্বিক সামাজিক কর্তৃত্ব তারা তৈরি করছে এটা শুধু রাষ্ট্রীয় শক্তিকে অবলম্বন করে প্রতিষ্ঠিত হয় না। বরং তারা এর নৈতিক ভিত্তি হিসেবে সংস্কৃতি ও ভাবাদর্শের জগতে এক আমূল পরিবর্তন ঘটায় এবং এর মাধ্যমে তারা শ্রমিক শ্রেণির কাছ থেকে সামাজিক সম্মতিও আদায় করে নেয়। আর ঠিক একারণেই গ্রামসির বিশ্লেষণে রাষ্ট্রের সঙ্গে বৃহত্তর নাগরিক সমাজের সম্পর্ক, জাতি, জনগণ, বুর্জোয়াশ্রেণি ও অন্যান্য শাসকগোষ্ঠীর পারস্পরিক সম্পর্ক, জাতীয় জীবনের একচ্ছত্র প্রতিনিধি হিসেবে জাতীয় রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, বুর্জোয়া শ্রেণির সার্বিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা ইত্যাদি প্রশ্ন। গত শতকের ষাট দশকের আগে ইতালির বাইরে গ্রামসি খুব একজন পরিচিত ব্যক্তি ছিলেন না এবং ইতালিতেও গ্রামসি সম্বন্ধে অন্যদের ধারণা ইতালির কমিউনিস্ট পার্টি এবং তার অন্তরঙ্গ বন্ধু, সহযোদ্ধা ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী পালমিতো তোগলিয়াত্তির কাছ থেকেই এসেছিল। ১৯৫৭ সালে তোগলিয়াত্তি নিজেই ইতালির কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় ‘The Present Relevance of Gramsci’s Theory and Practice’ এই শিরোনামে লেখাটি Reniscita–তে প্রকাশনা উপলক্ষে এক বক্তৃতায় গ্রামসি সম্পর্কে এক নতুন বিতর্কের সূচনা করেন। উল্লিখিত নিবন্ধে গ্রামসিকে চিরাচরিত দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে তার চিন্তার অনন্যতাকে স্পষ্ট করে তুলে ধরেন। এরপর থেকেই বিভিন্ন মার্কসীয় ধারার মধ্যে গ্রামসিকে নিয়ে গুরুত্ব দেয়া শুরু হয়। পূর্ববর্তী মার্কসবাদীদের সাথে গ্রামসির তফাত এখানেই যে পার্টির ধারণায় গ্রামসি অনেক জটিলতা মানতে রাজি ছিলেন। তিনি মানতে রাজি ছিলেন যে উন্নত সমাজচেতনা না থাকলেও তথাকথিত ধর্মান্ধ কৃষক শোষণের বিরুদ্ধে বৈপ্লবিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হতে পারে। পার্টির কাছে তার আবেদন ছিল, শ্রমিকশ্রেণি এই তথাকথিত পশ্চাদপদ কৃষককে অবজ্ঞা না করে বা দূরে সরিয়ে না দিয়ে বোঝার চেষ্টা করুক কৃষক চেতনায় অথবা নিম্নশ্রেণির লোকসংস্কৃতিতে প্রতিরোধের সূত্রগুলো কোথায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গ্রামশির চিন্তায় গোটা সমাজকে নেতৃত্ব দিতে পারে এমন একটা সংগঠিত সমাজচৈতন্যের ভূমিকা অপরিহার্য থেকে গিয়েছে। উল্লেখ্য, গ্রামসি কৃষি ও কৃষক প্রশ্নকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখেছিলেন; মাও যে দং ছাড়া আর কোনও মার্ক্সিস্টই কৃষিকে এত গুরুত্ব দেননি। বুদ্ধি যেখানে নৈরাশ্যের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, গ্রামসি সেখানেও দেখছেন প্রত্যয়জনিত আশা। আশার কারণ, গ্রামসি কিন্তু জনহিতকর ক্ষমতার ধারণাটাকে মোটেই ছেড়ে দিচ্ছেন না। এবং কোনটা জনহিতকর সেটা যে একটা নির্দিষ্ট সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে অখণ্ড, যুক্তিসিদ্ধ, সমাজচেতনার রুপ ধারণ করতে পারে, এ বিশ্বাসও গ্রামসির ছিল। তাই গ্রামসির সমস্ত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল পার্টি শ্রমিকশ্রেণির বৈপ্লবিক পার্টি, যা এই অখণ্ড যুক্তিসিদ্ধ সমাজচেতনাকে বহন করবে। তথ্যসূত্র: ১। Antonio Gramsci, Selections from the Prison Notebooks, ed. & trans. Quintin Hoare and Geoffrey Nowell Smith, London, Lawrence and Wishart. ২। গ্রামসি: পরিচয় ও তৎপরতা; সম্পাদনা- ফকরুল চৌধুরী; সংবেদ প্রকাশনী। ৩। ভারতে গ্রামসি: গুরুর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি; রণজিত গুহ; ২০০৭ সালের এপ্রিলে রণজিত গুহ রোমে Gramsci Foundation কর্তৃক আয়োজিত এক কনফারেন্সে পঠিত প্রবন্ধ। ৪। ইতিহাসের উত্তরাধিকার; পার্থ চট্টোপাধ্যায়; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড। লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা