মৃত্যুঞ্জয়ী রাজু এই ক্যাম্পাসের প্রমিথিউস

Posted: 07 জানুয়ারী, 2018

তুহিন কান্তি দাস : দিনটি ছিলো ১৩ মার্চ। গোধূলির ঠিক আগ মুহূর্ত। নিয়মিত ক্লাস শেষে কেউ বাসায় ফিরছে লাল বাসে চড়ে, কেউবা হলে ফিরে গেছে, জীবন-জীবিকার রসদ যোগাতে কেউ যাচ্ছে টিউশনি করতে। চাইলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আট দশটা বন্ধু-বান্ধবীর মতো ঠাট্টা মশকরায় দিনটা কাটিয়ে দেয়া যেতো। কিন্তু রাজু শোষণহীন মানবিক সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিল। চেয়েছিল সন্ত্রাস দখলদার মুক্ত শিক্ষাবান্ধব গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়। সেই দায়ে রাজু সেদিন গিয়েছিল সন্ত্রাসবিরোধী মিছিলে। সদ্য স্বৈরাচার বিতাড়িত ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সর্বত্র থমথমে পরিস্থিতি বিরাজমান। ব্যালট ছিনতাইয়ের অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন মতামত প্রকাশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি (ডাকসু) বন্ধ হয়ে গেছে কিছুদিন আগে। পেশিশক্তির মহড়ায় অস্ত্রের ব্যবহার স্বাভাবিক বিষয় হিসেবেই পরিণত হয়েছে। গণতান্ত্রের আতুরঘর এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ-বিস্তার ও দখলদারিত্ব কায়েম করতে ছাত্ররূপী একদল সন্ত্রাসী অবস্থান নিয়েছে হাকিম চত্বর আর অন্যদল টিএসসি অভিমুখে। একপর্যায়ে শুরু হয় গোলাগুলি। ঠিক সেই সময় ন্যায্য অধিকারের দাবিতে ক্যাম্পাসকে সন্ত্রাস দখলদারিত্ব মুক্ত করতে সন্ত্রাসবিরোধী মিছিল বের করে কিছু স্বপ্নবান সচেতন শিক্ষার্থী। রাজু, সেই মিছিলের অগ্র সেনানী। মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে সেই মিছিলে রাজু ও তার সহযোদ্ধারা স্লোগান তুলেছিল- “শিক্ষা-সন্ত্রাস একসাথে চলে না, সন্ত্রাস দখলদারিত্ব মুক্ত গণতান্ত্রিক শিক্ষা চাই”। তীব্র গুলিবর্ষণের মাঝেও সেই মিছিল প্রকম্পিত করে ক্যাম্পাস। ভয়ে শিউড়ে উঠে ছাত্র নামধারী গোলাগুলিরত সন্ত্রাসীদের হৃদপি-। সন্ত্রাসীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সেই মিছিল এগিয়ে চলে। এগিয়ে চলে রাজু ও তার মিছিলের সহযোদ্ধারা। মিছিলে প্রতিধ্বনিত সাহসী উচ্চারণ অবদমন করতে উদ্যত উন্মাদ সন্ত্রাসীরা। প্রিয় ক্যাম্পাস সন্ত্রাসের চারণভূমি হতে দেবে না দৃঢ়পণে অঙ্গীকারাবদ্ধ মিছিলকারীরা। গগনবিদারী প্রতিবাদী প্রত্যয়ে মিছিল এগিয়ে চলে নির্ভীকচিত্তে। রুগ্ন মতাদর্শিক কাপুরুষের আস্ফালন স্লোগানের বিপরীতে অস্ত্রের আশ্রয় নেয়। দিশেহারা সন্ত্রাসীরা অতর্কিত গুলি চালায় সেই মিছিলে। ধাবমান মিছিল আচমকা থমকে যায়। মুহূর্তে স্তব্দ হয়ে যায় রাজুর কণ্ঠস্বর। ঘাতক সন্ত্রাসীর বুলেট ভেদ করে রাজুর কপাল। সহযোদ্ধার কাঁধে লুটিয়ে পরে রাজু। প্রাণের ক্যাম্পাস রাজুর রক্তে রঞ্জিত হয়। বিদ্যুৎ গতিতে খবর পৌঁছে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতন্ত্রকামী শিক্ষার্থীদের নিকট। ক্যাম্পসের সীমান্ত অতিক্রম করে সেই আদর্শের স্ফুলিঙ্গ পৌঁছে যায় জনতার সমুদ্রে। যে জনসমুদ্র স্বৈরাচারকে বিতাড়িত করে সদ্য গনতন্ত্র কায়েম করেছে জাতীয় রাজনৈতিক বলয়ে। স্বৈরতন্ত্রের জাঁতাকলে অতিষ্ট গণতান্ত্রিক আন্দোলনের রেষ এখনো কাটেনি। ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে শহীদ ড.মিলন, নূর হোসেন, আমিনুল হুদা টিটোর রক্তের দাগ মুছেনি তখনো। মুক্তিকামী জনতা সন্ত্রাসবিরোধী সম্মুখ মিছিলে শহীদ রাজুর আত্মদান গণতান্ত্রিক নবজাগরণের প্রায়োগিক পরিসরে অশনিসংকেত হিসেবেই বিবেচনা করে। তীব্র প্রতিক্রিয়ায় ফেটে পড়ে বিবেকবান সচেতন মহল। কবি শামসুর রহমান রাজু’র গুলিবিদ্ধ আত্মদানের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন “পূরানের পাখি” কবিতায়। ছাত্র সমাজও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠে। রক্ত শপথে বলীয়ান রাজুর চেতনার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ দাবানলে পরিণত হয়। তীব্র নিন্দা প্রতিবাদের মুখে চিরতরে বন্ধ হয় অস্ত্রের ঝনঝনানি। সন্ত্রাস দখলদারিত্ব মুক্ত হয় রাজুর স্বপ্নের ক্যাম্পাস। ঘাতক বুলেট রাজুর কণ্ঠ স্তব্ধ করলেও নিজের জীবন দিয়ে চেতনার মশাল প্রজ্জ্বলন করেন এ ক্যাম্পাসের প্রমিথিউস শহীদ মুঈন হোসেন রাজু। এই ক্যাম্পাসকে সন্ত্রাস মুক্ত করতে রাজু জীবন দিয়ে বুঝিয়ে গেছেন এই মুক্তাঞ্চলের চরাচরে রাজুরা মৃত্যুঞ্জয়ী। মাটিতে প্রবাহমান রক্ত ¯্রােত জানান দেয় এই ক্যাম্পাস কোন সন্ত্রাসী দখলদারদের নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন রাজু। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা যে কেবল সার্টিফিকেট অর্জন করা নয় বরং সর্বজনের করের টাকায় পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়, উচ্চশিক্ষাখাতে গবেষণাধর্মী নতুন জ্ঞান উৎপাদনে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগের ন্যায্য প্রতিদান নিশ্চিত করা একজন ছাত্রের নৈতিক ও নাগরিক দায়িত্ব। নিজের আত্নমর্যাদা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দেশ ও জাতির কল্যাণে আত্মনিয়োগ করাটাই সচেতন উচ্চশিক্ষিত ছাত্রের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য। যে কর্তব্যের তাড়নায় রাজু বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের পতাকাতলে শামিল হয়েছিল। ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সমাজ কল্যাণবিষয়ক দপ্তরের সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়েছিল নিজের কাঁধে। ছাত্র সমাজেকে সংগঠিত করে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সাথে শোষণ বঞ্চনা থেকে দেশ মাতৃকাকে মুক্ত করতে নির্দিধায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। মৃত্যুভয়ে ব্যাকুল না হয়ে মৃত্যুকে জয় করার মহান মন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছিলেন। নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে প্রতিরোধের অগ্নিস্ফূলিঙ্গ মঈন হোসেন রাজু জেনে গিয়েছিল মরণেই থামে না জীবন। ঘাতকের বুলেট রাজুর প্রাণের স্পন্দন থামিয়ে দিলেও আদর্শের জীবন্ত প্রদীপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণচঞ্চল ক্যাম্পাসে শ্বাশত প্রেরণার অবিনশ্বর স্তম্ভ “সন্ত্রাস বিরোধী রাজু স্মারক ভাস্কর্য” তারই সাক্ষ্যদান করে চলেছে। এ যেন শুধু একটা ভাস্কর্য নয়, যেন সন্ত্রাসী দখলবাজের বুকে কাঁপন তোলা চিরন্তন অগ্নিশিখা। রাজু’র সুমহান আত্মত্যাগের মহিমার সাক্ষ্য দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার সংলগ্ন হাকিম চত্বর অভিমুখে ক্যাম্পাসের সর্ববৃহৎ নান্দনিক ক্যানভাস “রাজু’র দেয়ালে” অংকিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সুন্দরতম গ্রাফিতি। সকল রাজনৈতিক সমালোচনার গণ্ডি পেরিয়ে নীল পতাকার এই সূর্যসৈনিক আজ সমগ্র ছাত্র সমাজের অবিসংবাদিত সংশপ্তক। তাই যখন ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ তাদের দলীয় প্রচারণা উপলক্ষে রাজুর দেয়ালের এই গ্রাফিতি মুছে দিতে উদ্যত হয়, তখন ছাত্র সমাজ প্রতিবাদে উত্তাল হয় । দলমত নির্বিশেষে সমালোচনার ঝড় উঠে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ রাজু’র গ্রাফিতি মুছে দিতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। ভুলে যাইনি সন্ত্রাস দখলদারিত্বের ইজারাদার ছাত্রলীগ-ছাত্রদলের আধিপত্য বিস্তারের নগ্ন লড়াইয়ের ময়দানেই জীবন দিতে হয়েছে রাজুকে। ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের নেশায় সরকারের মদদপুষ্ট প্রশাসনের সহায়তায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে সমগ্র শিক্ষঙ্গনে। ক্ষমতার দাপটে জিম্মি করে রেখেছে ছাত্র স্বাধীনতার গণতান্ত্রিক বোধ। কলুষিত করে চলেছে ছাত্র আন্দোলনের সকল ঐতিহাসিক অর্জন। এরাইতো রাজু’র আদর্শিক শত্রু, রাজুর হন্তারক। আবার ভাবতে ভালই লাগে যখন দেখি, রাজুর গ্রাফিতি মুছতে গিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বিকল্প হিসেবে রাজু’র সমমর্যাদার নিজস্ব কোনো শহীদকে তুলনা করতে পারে না। সাহস করতে পারে না গায়ের জোরে ক্ষমতা খাটিয়ে রাজু’র গ্রাফিতি মুছে দেয়ার স্পর্ধা দেখাতে। সরকার দলীয় এতো বড় ছাত্র সংগঠন বঙ্গবন্ধুকেই রাজুর মুখোমুখি দাঁড় করাতে বাধ্য হয়। ওরা জানেনা, গুলি করে-ভয় দেখিয়ে আদর্শের স্পৃহা ক্ষয় হয় না বরং তা বহুগুণে সম্প্রসারিত হয়। অন্তরের অন্তঃস্থলে টের পাই রাজু এখনো ফুরিয়ে যায়নি। ফুরিয়ে যায়নি সন্ত্রাসী দখলদারদের নগ্ন আস্ফালন। তাই রাজুর আপসহীন চেতনার প্রতিবিম্ব এই দেয়ালে অংকিত গ্রাফিতি আজো দখলদার সন্ত্রাসীদের হিংস্র নখর খামচে ধরে। ক্ষতবিক্ষত হয় রাজুর রক্ত শপথে বলীয়ান আদর্শিক উত্তরাধিকার বহনকারী হাজারো সাহসী তরুণের হৃদয় অনুভূতি। অস্তিত্বের শেকড়ে টান পড়ে। যে অস্তিত্ব-ধমনীর শিরায় শিরায় শহীদ রাজুর রক্ত বহমান সেই রক্ত কখনোই চোরাবালিতে হারাবে না, আপস রফা করবে না। প্রয়োজনে এক রাজুর রক্ত থেকে এই জনপদে জন্ম নেবে অসংখ্য প্রমিথিউস। জীবন দিয়ে হলেও রাজুর রক্তের ঋণ শোধ করবে রাজুর উত্তরসূরিরা। লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ।