‘উন্নয়নের’ শ্রেণিচরিত্র ও ‘গণতন্ত্রহীন উন্নয়নের’ স্বরূপ

Posted: 07 জানুয়ারী, 2018

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : ক্ষমতাসীনদের সবচেয়ে সরব আত্মপ্রচারণা হলো– বাংলাদেশকে তারা বিশ্বের বুকে ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো– যে ‘উন্নয়ন’ সাধনের জন্য তারা গর্ব করছে তা সমাজের কোন অংশের বা কোন শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করছে? অল্পসংখ্যক বিত্তবানদের নাকি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ট গরিব-মধ্যবিত্ত মানুষের? ‘উন্নয়ন’ কখনোই ‘শ্রেণি নিরপেক্ষ’ নয়। প্রাচীণ গ্রিসে, রোমে, ভারতে, মধ্যযুগের মোগল সাম্রাজ্যে, আধুনিক আমেরিকা-ইউরোপে ‘উন্নয়নের’ নির্দশনের কি কোনো কমতি ছিল। কোনো অভাব নেই। প্রাচীন ও মধ্যযুগের কারুকার্য খচিত ও রত্নভাণ্ডারে সুশোভিত মহামূল্যবান স্থাপনা কিংবা সে সময়ের ‘আমির শ্রেণির’ মানুষদের বিলাস বহুল জীবনের উচ্চমান এখনই বা কোথায় কতোটা দেখতে পাওয়া যায়। এসবও তো ‘উন্নয়নের’ নিদর্শন। কিন্তু শ্রেণি চরিত্রের দিক থেকে যে উন্নয়ন ছিল প্রধানত: মুষ্ঠিমেয় ওপরতলার মানুষের ‘উন্নয়ন’। তাই এখনো এ বিষয়ে অতি প্রাসঙ্গিক প্রশ্নটি হলো– ক্ষমতাসীনদের এই ঢোল পিটিয়ে প্রচার করা ‘উন্নয়নের’ ফলে যেভাবে সমাজে শ্রেণি-বৈষম্য ও ধন-বৈষম্য বেড়ে চলেছে, তাতে তাকে আদৌ জনগণের স্বার্থঅভিমুখীন প্রকৃত ‘উন্নয়ন’- বলে আখ্যায়িত করা যায় কি? প্রশ্ন হলো–তাদের ‘উন্নয়নের’ মডেল কতোটা আপামর জনগণের স্বার্থে, আর কতোটা মুষ্টিমেয় লুটেরা বিত্তবানদের স্বার্থে পরিচালিত? এ ধরণের প্রশ্নের জবাবে তারা সাধারণত যে বক্তব্যটি হাজির করে থাকে তা হলো, বৈষম্য বৃদ্ধি হলো ‘উন্নয়নেরই’ ‘প্রসব বেদনা’ মাত্র। কারণ, মুষ্টিমেয় কিছু লোকের হাতে বিপুল সম্পদ জমা হওয়াটা ‘উন্নয়ন’ প্রক্রিয়ারই একটি অত্যাবশ্যক ধাপ। কিছু লোকের হাতে টাকার পাহাড় জমা হওয়াটা দোষের কিছু নয়, বরং এটিই হলো সব মানুষের কাছে সম্পদ পৌঁছে দেয়ার একটি ‘উৎকৃষ্ট মাধ্যম’। বিত্তবানদের হাতে জমা হওয়া এই বিপুল সম্পদের কিছু অংশ ‘চুঁইয়ে পড়ে’ গরিব মানুষের কাছে কোনো এক সময় পৌঁছাবে। তাই, চিন্তা কি! অর্থাৎ, ক্ষমতাসীনদের ‘উন্নয়নের’ সার কথা হলো– কিছু মানুষের হাতে সম্পদ তুলে দেয়া, আর তারপর ব্যাপক জনগণের জন্য সেসবের ‘চুইয়ে পড়া’ উচ্ছিষ্টের ব্যবস্থা করা। ক্ষমতাসীনদের ‘উন্নয়ন ধারার’ শ্রেণি চরিত্র কী, শ্রেণি বিভক্ত এই সমাজের কোন অংশের মানুষের কাছে কী অনুপাতে এই ‘উন্নয়নের’ ফসল জমা হচ্ছে, বৈশ্বিক কিংবা আভ্যন্তরীণ নানা ধরণের নৈরাজ্যপূর্ণ তাল-মাতাল বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এরূপ ‘উন্নয়নের’ ধারা কতোটা টেকসই বলে বিবেচিত হতে পারে, এ ধরনের ‘উন্নয়ন’ ধারার অভিঘাতের ফলে সৃষ্ট ক্রমবর্দ্ধমান শ্রেণি-বৈষম্য ও ধন-বৈষম্য দেশকে কী ধরনের বিস্ফোরণমুখ সামাজিক সংঘাতের দিকে ধাবিত করছে, প্রকৃতি-পরিবেশ-জীব বৈচিত্র- প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে তা কী ধরনের মহাবিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে– এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ক্ষমতাসীন ‘উন্নয়নপন্থিরা’ প্রায় নিশ্চুপ। এসব প্রশ্ন ধামাচাপা দেয়ার জন্য তাদের সেই একটিই জবাব। এসব হলো ‘উন্নয়নের প্রসব বেদনা’ মাত্র। সেই ‘প্রসব বেদনা’ কেন যে শুধু গরিব-মধ্যবিত্ত মানুষকে বহন করতে হবে, এবং বিত্তবানরা সেক্ষেত্রে কেন বেদনামুক্ত থেকে কেবলই দেদার মজা লুটবে– এসব প্রশ্নে তাঁদের কোনো জবাব নেই। বস্তুত উন্নয়নের নামে ক্ষমতাসীনরা যা করছে সেটি আসলে প্রকৃত ‘উন্নয়ন’ নয়। মুষ্টিমেয় লুটেরা ধনিকদের হাত ধরে ও তাদের উপর নির্ভর করে তথাকথিত ‘উন্নয়নের’ অন্ধকার গলির পথ ধরে তারা অন্ধের মতো যেভাবে চলছে, তা মোটেও জনস্বার্থ-অভিমুখীন প্রকৃত কোনো উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারবে না। প্রকৃত সত্য হলো, তাদের এই ‘উন্নয়নের’ ফলশ্রুতিতে সমাজের বুকে ‘মহাবিপর্যয়ের’ টাইম বোমা স্থাপিত হচ্ছে। কয়েক বছর ধরে দেশে লুটেরা ধনিক শ্রেণি ক্ষমতাসীন। দেখা গেছে যে এ সময়ে যারাই ক্ষমতায় এসেছে তারাই রাতারাতি লুটেরা বনে যাচ্ছে। আবার, যারা লুটপাট করে বিত্তবান হচ্ছে তারাই ক্ষমতার মসনদে স্থান করে নিচ্ছে। রাষ্ট্রযন্ত্র তথা আমলাতন্ত্রও এই ক্ষমতাসীন লুটেরাদের স্বার্থ রক্ষা করছে। আবার, সেই আমলাতন্ত্রের ভেতর থেকেও লুটেরা ধনিক জন্ম নিচ্ছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা, লুটপাট, আমলাতন্ত্র– দেশে এখন এই তিন শক্তির একটি ঘোটচক্র গড়ে উঠেছে। বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানি ও তাদের স্বার্থের পাহারাদার সাম্রাজ্যবাদী বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা তাদেরকে মদদ দিচ্ছে। দেশি ও বিদেশি শোষকরা নিজেদের মধ্যে লুটপাটের ভাগ বাটোয়ারা করে নিচ্ছে। সেক্ষেত্রে পুঁজিবাদের ‘অসম বিকাশের সূত্র’ কার্যকর হওয়ায় ধনী দেশগুলো লাভবান হচ্ছে বেশি। দৃশ্য-অদৃশ্য পথে দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক পরিসরেও বৈষম্য বাড়ছে। এসবই হলো ক্ষমতাসীনদের ধনীক-অভিমুখীন ‘উন্নয়নের’ ফলাফল। ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে ‘উন্নয়ন’–এর নামে প্রোপাগান্ডার জজবা সৃষ্টির প্রয়াস নতুন কোনো ঘটনা নয়। ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসকরাও একসময় অনেকটা এভাবেই তাদের ঔপনিবেশিক-মডেলের ‘উন্নয়নের’ প্রশস্তি গেয়ে প্রোপাগান্ডা চালিয়েছে। ব্রিটিশদের প্রচারণা ছিল– রেলপথ, শিক্ষা ব্যবস্থা, আধুনিক প্রশাসন, শহর-বন্দর নির্মাণ– কতো কিছুই না তারা করেছে। সবচেয়ে বড় কথা তারা এদেশকে মধ্যযুগীয় ‘অসভ্যতা’ ও ‘বর্বরতা’ থেকে মুক্ত করে এদেশে ‘সভ্যতা’ নিয়ে এসেছে। তাদের ভাষায় এদেশ ছিল ‘সাদা মানুষের বোঝা’ (a white man’s burden)। কিন্তু কোনো জাতি যদি পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ থাকে তাহলে তার প্রকৃত উন্নয়ন কখনই সম্ভব হয় না। পরাধীনতা ও উন্নয়ন পরস্পরের বিরোধী। ফলে বিলেতি শাসকদের শাসন প্রকৃত ‘উন্নয়ন’ ছিল না। তারা এদেশে শাসক হিসেবে অভির্ভূত না হলে, তাদের দ্বারা এদেশের স্বাধীন ঐতিহাসিক বিকাশ রুদ্ধ না হলে, এদেশের পক্ষে যে আরো অনেক দ্রুত গতিতে ও সর্বাঙ্গীনভাবে বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, অধিকাংশ চিন্তাবিদ সে বিষয়ে একমত। সে কারণে বলা যায় যে ব্রিটিশ আমলে ‘উন্নয়ন’ ঘটলেও তা ছিল মূলত: ব্রিটেন ও বিত্তবান বিলেতি সাহেবদের স্বার্থ-অভিমুখীন ‘উন্নয়ন’। পাকিস্তানের আইউব- মোনায়েমি শাসনামলেও পাকিস্তানি- মডেলের ‘উন্নয়ন’ পরিচালিত হয়েছে। তাদের সেই তথাকথিত ‘উন্নয়ন’ নিয়েও প্রোপাগান্ডা কম হয়নি। আইউবী শাসনের দশ বছরে তারা ‘পূর্ব-পাকিস্তানে’ যে সব উন্নয়ন কাজ করেছিল তা নিয়ে প্রচারণার শেষ ছিল না। একথা ঠিক যে অনেক ‘উন্নয়ন’ সে সময় হয়েছিল বটে। ১৯৬৮ সালের শেষ দিকে চোখ ধাঁধানো সব অনুষ্ঠানাদির মধ্য দিয়ে আইউবের ‘উন্নয়নের এক দশক’ পালন করা হয়েছিল। কিন্তু এসব প্রোপাগান্ডায় সাধারণ মানুষকে সন্তুষ্ট করা যায়নি। কারণ আইউবী ‘উন্নয়ন’ জন্ম দিয়েছিল বৈষম্যের। ২২ পরিবারের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। তারই কিছু চুইয়ে পড়ে উচ্ছিষ্টরূপে পৌঁছেছিল সাধারণ মানুষের ঘরে। পাশাপাশি ছিল সাম্রাজ্যবাদ ও পাকিস্তানি শোষক শ্রেণির জাতিগত শোষণ। এর ফলে পূর্ব বাংলার সম্পদ পাচার হয়ে যাচ্ছিল আমেরিকায়, ইউরোপে, পাঞ্জাবে। এ ধরনের জাতিগত শোষণ না থাকলে আইউবী আমলের ‘উন্নয়নের’ চেয়ে অনেক বেশি উন্নয়ন অর্জন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হতো। তাই বলা যায় যে, পাকিস্তান আমলের ‘উন্নয়ন’ ছিল মূলত: ২২ পরিবার, একচেটিয়া পুঁজিপতি, সামন্ত প্রভু ও সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ-অভিমুখীন ‘উন্নয়ন’। আইউব খানের আমলে জাতিগত শোষণ-পীড়নের পাশাপাশি ছিল একনায়কত্ব, স্বৈরশাসন ও গণতন্ত্রহীনতা। মানুষ চিড়িয়াখানার খাঁচায় বন্দী জন্তুর মতো শুধু ‘ভাত খেয়ে’ বাঁচতে চায় না। সে স্বাধীন সত্ত্বা নিয়ে, অধিকার নিয়ে বাঁচতে চায়। রাজনীতির ক্ষেত্রেও সে গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করতে চায়। গণতন্ত্রহীন ‘উন্নয়ন’ মানুষের কাছে তেতো ওষুধের মতো। তাতে পেট ভরলেও মন ভরে না। আসলে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের মাঝে সম্পর্কটা এমনই যে, ‘গণতন্ত্রহীন’-উন্নয়নে যেমন মন ভরে না, তেমনি পেটও ভরে না। ফলে, মহা ধুমধামের সাথে চোখ ধাঁধানো ‘উন্নয়নের এক দশক’ পালন করার তিন মাসের মধ্যে দেশে আইউব খানের ‘উন্নয়নের’ রাজত্বের বিরুদ্ধে গণঅভ্যূত্থান ঘটে গেল। আরও তিন মাসের মধ্যে আইউব শাহীর পতন হলো। এদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে আজকাল যুক্তি দেয়া হচ্ছে যে গণতন্ত্রের চেয়ে ‘উন্নয়ন’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণে, ‘উন্নয়নের’ স্বার্থে গণতন্ত্রকে প্রয়োজনে কাট্্-ছাট্্ করলে বা তা বিসর্জন দিলেও কোনো ক্ষতির কিছু নেই। গণতন্ত্রের এজেন্ডাকে সাময়িকভাবে পেন্ডিং রেখে আগে ‘উন্নয়ন’ করে নেয়া উচিৎ। ‘উন্নয়নের’ কাজ এগিয়ে নেয়ার পর, পরবর্তীকালে কোনো উপযুক্ত সময়ে, গণতন্ত্রের এজেন্ডার প্রতি নজর দেয়া যাবে। এসব যুক্তিকে ভিত্তি করে ক্ষমতাসীনরা একটি তাত্ত্বিক অবস্থান নির্মাণ করেছে। সেই তত্ত্বকে এখন তারা বেশ জোরে-শোরে ফেরি করতে শুরু করেছে। গণতন্ত্রহীন ‘উন্নয়নের’ এই তত্ত্ব কেবল ভ্রান্ত ও অগ্রহণযোগ্যই নয়, তা নিষ্ফলও বটে। এই তত্ত্ব অনুসরণ করে চললে গণতন্ত্র তো পাওয়া যাবেই না, এমনকি দেশের কোনো প্রকৃত উন্নয়নও ঘটবে না। অর্থাৎ, এই তত্ত্ব অনুসরণ করে চললে ‘আমও যাবে, ছালাও যাবে’। কারণ প্রকৃত উন্নয়ন কেবল বৈষয়িক সম্পদের সমাহারের হিসেব দিয়েই নির্ধারণ করা যায় না। প্রকৃত উন্নয়নের মর্মকথা হলো মানুষের জীবনের গুণ-মান (quality of life)–এর ক্ষেত্রে অগ্রগতি ঘটা। শিক্ষা, সংস্কৃতি সামাজিক মূল্যবোধ, পরিবেশ-প্রকৃতির শুভ্রতা ও ভারসাম্য ইত্যাদি হলো জনস্বার্থ-অভিমুখীন ‘প্রকৃত উন্নয়নের’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একজন অধিকারহীন, শৃংঙ্খলিত ও পদানত মানুষকে বৈষয়িকভাবে যতো ‘সুখে’ থাকার ব্যবস্থাই করা হোক না কেন, তাতে সে নিজেকে উন্নত জীবনের অধিকারী হিসেবে কখনোই ভাববে না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থের ‘দুই পাখি’ কবিতাটি এ প্রসঙ্গে খুবই প্রণিধানযোগ্য। সোনার খাঁচায় বাস করা ‘খাঁচার পাখি’ ও স্বাধীনভাবে বনে বনে উড়ে বেড়ানো ‘বনের পাখির’ মধ্যে কাল্পনিক কথোপকথনকে ভিত্তি করে কবি তার এই কবিতাটি রচনা করেছেন। পাঠক যদি আরেকবার কবিতাটি কষ্ট করে পড়ে নেন তাহলে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের, তথা সুখ ও স্বাধীনতার পারস্পরিক যোগসূত্রের বিষয়টি তার কাছে বেশ স্পষ্ট হবে। এ বিষয়টি উপলব্ধি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের উপস্থিতি প্রকৃত উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য উপাদান। এটি কেবল হালকা কোনো কথার কথা নয়। তাছাড়া, ‘উন্নয়নকে’ যদি আলাদাভাবে কেবলমাত্র সব মানুষের জন্য বৈষয়িক ক্ষেত্রে ‘উন্নয়ন’ নিশ্চিত করার অর্থেও বিবেচনা করা হয় তাহলেও বলতে হয় যে, গণতন্ত্রকে ভিত্তি করে অগ্রসর হওয়া ব্যাতীত সেই লক্ষ্যের পথে স্থিতিশীল ও টেকসইভাবে এগিয়ে যাওয়াও সম্ভব হতে পারে না। ইতিহাস ও সমসাময়িক ঘটনাবলীর শিক্ষা হলো, অর্থনৈতিক ক্ষমতাই রাজনৈতিক ক্ষমতার নির্ধারক। আর্থিক ক্ষমতাবানরাই তাদের আর্থিক শক্তির জোরে রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী হতে সক্ষম হয়। কেবল গণতন্ত্রের চর্চাই এই সমীকরণকে বদলাতে পারে। কারণ, গণতন্ত্রের মর্মকথা হলো– আমির-ফকির নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা। নাগরিকদের মধ্যে সংখ্যায় ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ হলো কৃষক, শ্রমিক, ক্ষেতমজুর, মেহনতি মানুষ, নিম্ন মধ্যবিত্ত-মধ্যবিত্ত শ্রেণির জনগণ। এসব বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষদের অর্থনৈতিক দুর্বলতা তাদেরকে রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে দূরে থাকাটি অনেকটাই অনিবার্য্য করে তোলে। কিন্তু গণতন্ত্র বহাল থাকলে তাতে তাদের যে অধিকার থাকে তাতে করে এই অবস্থার বিপরীতমুখী ফলাফলের প্রক্রিয়া সূচনা করা সম্ভব হতে পারে। আপামর জনগণ যদি সচেতনভাবে গণতন্ত্র প্রদত্ত তাদের অধিকার প্রয়োগ করতে সক্ষম হয় তাহলে, অর্থনৈতিক শক্তিতে দুর্বল থাকা সত্ত্বেও, রাজনৈতিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে প্রভাব সৃষ্টি করতে তারা সক্ষম হতে পারে এবং তখনই কেবল সম্ভব হতে পারে ‘ধনীক-অভিমুখীন’ উন্নয়ন ধারাকে পাল্টিয়ে দিয়ে ‘গরিব মধ্যবিত্ত-অভিমুখীন’ উন্নয়ন ধারার পথ রচনা করা। রাজনৈতিক ক্ষমতাসীনদের শ্রেণি চরিত্রের আলোকেই নির্ধারিত হয় ‘উন্নয়নের’ শ্রেণি চরিত্র ও অভিমুখীনতা। গণতন্ত্রকে পেন্ডিং রেখে ‘আগে’ উন্নয়ন(!) করার পথ গ্রহণ করলে, রাজনীতিতে যতোই উত্থান-পতনই এর মাঝে ঘটুক না কেন, ক্ষমতায় বিত্তবানদের আধিপত্ব স্থায়ীভাবে অটুটই হয়ে থাকবে। ফলে ‘উন্নয়নের’ সেই ধারার অনুসরণই অবধারিত হয়ে উঠবে যে ধারা ধনীকে আরও ধনী করার ও মুষ্ঠিমেয় লুটেরাদের হাতে দেশের সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ার সুযোগ করে দেবে। সেই ‘উন্নয়নের’ সামান্য ছিটে-ফোঁটাই কেবল এসে পৌঁছাবে গরিব মানুষের ঘরে। লুটপাটের অর্থনীতির জন্য উপযোগী হলো ‘গণতন্ত্রহীনতা’। আর সেরূপ লুটপাটের ব্যবস্থার জন্য বিড়ম্বনা ও অন্তরায় হলো ‘গণতন্ত্র’। তাই, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা– উভয় ক্ষেত্রে মৌলিক ধরনের রূপান্তর সাধন, তথা একটি সর্বাঙ্গীন সমাজ বিপ্লব আজ আপামর দেশবাসীর সামনে অপরিহার্য কর্তব্য হিসেবে হাজির হয়েছে।