বিক্ষোভে উত্তাল ইরান

Posted: 07 জানুয়ারী, 2018

একতা বিদেশ ডেস্ক : বিক্ষোভ প্রতিবাদে উত্তাল ইরান। পুলিশের গুলিতে অন্তত ১০ জন আন্দোলনকারী নিহত হয়েছেন বলে ওই দেশের সরকারি টেলিভিশন জানিয়েছে। ইরানের সরকারকে বড়সড় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে আর্থিক সংস্কারের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন। দ্রবমূল্যবৃদ্ধি, দুর্নীতির প্রতিবাদে জীবনমানের উন্নতির দাবিতে অন্তত ৫০টি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে এই আন্দোলন। ইতোমধ্যে হাজার হাজার মানুষ নেমে এসেছেন রাস্তায়। সরকারবিরোধী স্লোগানে উত্তাল তেহরানসহ বড় বড় শহরের রাজপথ। সংস্কারের দাবিতে ২০০৯ সালে আন্দোলনে অশান্ত হয়ে উঠেছিল ইরান। তারপর এই প্রথম আর্থিক সংস্কারের বিরুদ্ধে এত বড় আন্দোলনে নেমেছে গোটা দেশের মানুষ। রক্তক্ষয়ী আন্দোলনকে শক্ত হাতে দমন করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সরকার। তবে, দেশজুড়ে লাগামছাড়া দুর্নীতি, নাগরিকদের দুর্দশা এবং বেকারির বিরুদ্ধে এই আন্দোলনে অনড় থাকবেন বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্টে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। দেশজুড়ে আন্দোলনের কথা জানিয়ে পহেলা জানুয়ারি ইরানের সরকারি টেলিভিশন বলেছে, রবিবার রাতে দেশের বিভিন্ন শহরে ১০ জন আন্দোলনকারী নিহত হয়েছেন। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা বলে জানিয়েছে সরকারি টেলিভিশন। দেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎত্তম শহর মাশহাদ শহরে শুক্রবার এই আন্দোলন প্রথম শুরু হয়। ক্রমশ তা অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়েও বিক্ষোভ দেখিয়েছেন ছাত্রছাত্রীদের একাংশ। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা খোমেইনেইর পদত্যাগের দাবিও জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। আন্দোলন, বিক্ষোভের খবর সরকারি টেলিভিশনে সম্প্রচারিত না হলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হচ্ছে মিছিল, সমাবেশের ভিডিও। পরিস্থতি নিয়ন্ত্রণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মোবাইল ও ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। শান্তি ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ইরানের রাষ্ট্রপতি হাসনা রৌহানি দেশবাসীর প্রতি আবেদন জানিয়েছেন। কিন্তু এর মধ্যে এদিন দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ অবস্থানের খবর মিলেছে। তবে, ওই দেশের সরকারিসূত্রে দাবি করা হয়েছে, এই বিক্ষোভের পেছনে বিদেশি শক্তির ইন্ধন রয়েছে। কারণ এই বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে দেশটির বর্তমান সরকারকেই উৎখাত করার দাবি তুলেছে কোনো কোনো দেশ। আপাতভাবে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে মনে হলেও এই আন্দোলন নিয়ে চলছে নানা রকম খেলা। প্রথমত, দেশের ভেতরে বিক্ষোভকারীরা যেমন পুরো সপ্তাহ জুড়ে উত্তাল ছিল, তেমনি পরবর্তীতে সরকার সমর্থকদেরও মিছিল দেখা গেছে। কাতার ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের বাকি প্রায় সব দেশই ইরানের সরকারবিরোধীদের সমর্থন করছে। এই বিভক্তি মূলত এ অঞ্চলে ক্ষমতার ভূ-রাজনৈতিক কৌশলকেই প্রকাশ করে। তাদের মূল এজেন্ডা মধ্যপ্রাচ্যের শিয়া অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোকে ইরানের প্রভাবমুক্ত করা। তাদের দুশ্চিন্তার কারণ, সিরিয়ার বাশার আল আসাদ সরকার, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইরাকের বর্তমান সরকারের প্রতি ইরানের মদত ও প্রভাব। তুরস্কের মতো কাতারও মনে করছে, এই অচলাবস্থার কারণ বৈদেশিক ইন্ধন। তবে আরব বসন্তের অভিজ্ঞতা থেকে ইরান মরিয়া হয়েই চাইছে, এই আন্দোলন আর কোনোভাবেই যেন ডালপালা না মেলে। তবে সতর্ক আছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন পর্যন্ত এই বিক্ষোভ নিয়ে খুব সতর্ক মন্তব্য করছে। এই ব্লকের বৈদেশিক বিষয়ক প্রধান ফেডেরিকা মোগেরিনি বলেন, ‘ইরানের বিক্ষোভ পর্যালোচনা করছে ইইউ। সহিংসতা কিংবা মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়।’ তিনি সরকার বা বিরোধীপক্ষ সবাইকেই সহিংসতা পরিহার করার আহ্বান জানিয়েছেন। ইরানিদের দেশব্যাপী প্রতিবাদ-বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নোবেল পুরস্কারজয়ী মানবাধিকার আইনজীবী শিরিন এবাদি। সৌদি মালিকানাধীন আরবীয় দৈনিক আশার্ক আল-আসোয়াত এবাদির উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, ‘ইরানিদের রাজপথে থাকা উচিত। সংবিধানে তাদের বিক্ষোভ করার অধিকার আছে।’ ইরানের মানবাধিকার আইনজীবী শিরিন এবাদি ২০০৩ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। ইরানের নেতাদের সমালোচকদের মধ্যে এবাদি অন্যতম। তিনি ইরানিদের পানি, গ্যাস বিদ্যুৎ বিল এবং কর দেয়া বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। সেইসঙ্গে বিক্ষোভকারীদের দাবি মেনে নেয়া এবং সহিংসতা বন্ধের জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে তিনি ইরানিদেরকে রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলো থেকে অর্থ তুলে নেয়ারও ডাক দিয়েছেন। এক সাক্ষাৎকারে এবাদির উদ্ধৃতি দিয়ে আল-আসোয়াত বলেছে, ‘সরকার ৩৮ বছর ধরে ইরানিদের কথা শোনেনি, এখন সরকারের কথায়ও তাদের কান না দেয়ার সময় হয়েছে।’ এদিকে ইরানে টানা কয়েকদিনের সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মধ্যেই এবার কয়েকটি নগরীতে হাজার হাজার মানুষ পাল্টা সরকারপন্থি বিক্ষোভ মিছিল করেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন কেরমানশাহ, ইলাম ও গোরগান নগরীর মিছিলের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করেছে। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের হাতে ইরানের জাতীয় পতাকা এবং সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছবি ছিল।