রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কেন প্রাসঙ্গিক
Posted: 05 নভেম্বর, 2017
হাসান তারিক চৌধুরী:
১৯১৭ সালের অক্টোবর মাসে রাশিয়ায় সংঘটিত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ছিল বিশ শতকের সবচেয়ে বড় ঘটনা। যখন বলশেভিক বিপ্লবীরা মহান নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিনের নেতৃত্বে রুশ সম্রাট দ্বিতীয় নিকোলাসকে উৎখাত করে, যখন তাঁরা জারের শীত প্রাসাদ দখল করে, তখন কি বলশেভিক বিপ্লবীরা তাঁদের এই বড় কাজটির দুনিয়াজোড়া ফলাফল কি হবে তার সবটাই বুঝতে পেরেছিল? সম্ভবত তাঁরা সেটা বুঝতে পারে নি। আজ অক্টোবর বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপনের প্রাক্কালে শুধু বলশেভিক বিপ্লবীদের অনুসারীরাই নয়, বরং এর বিরোধীরাও রুশ বিপ্লবের দুনিয়াজোড়া ফলাফল কি হয়েছে তার অনেকটাই বুঝতে পারে। এখানেই অক্টোবর বিপ্লবের সাফল্য এবং সার্থকতা। সমাজতন্ত্রী বিপ্লবীরা যেদিন রুশ সম্রাটের শীত প্রাসাদকে জনতার কব্জায় এনেছিলো সেদিন সারা দুনিয়ার শাসকশ্রেণির মনোজগতে শীতের কুয়াশা নেমে আসলেও বিশ্বজুড়ে শোষিত জনগণের ভাবনায় বয়ে চলছিল বসন্তের চঞ্চল মিষ্টি হাওয়া। সে বিপ্লবী হাওয়ার প্রভাবে এখনো মানুষ শোষণমুক্তির লড়াই করে। এখনো চট্টগ্রামের পাহাড়ে জুম্ম জনগণের প্রতিবাদ হয়। রানাপ্লাজা ধসে পড়লেও শ্রমিকের প্রতিবাদ ধ্বসে পড়ে না। এখনো নারী তাঁর আত্মমর্যাদার সংগ্রাম করে। এখনো গরিবেরা ওয়াল স্ট্রিট দখল করতে যায়। নিরানব্বই বনাম এক এর কথা বলে। তাই এখন আমরা নিঃশঙ্ক চিত্তে বলতে পারি, অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব শুধু বিশ শতকেরই সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল না। বরং এটি সে শতককেও অতিক্রম করে চলে গেছে। সামনের দিকে। আগামী শতকের মুক্ত মানবের এক মুক্ত সমাজের পানে। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাষ্ট্র জন্ম দেয়ার মধ্যেই অক্টোবর বিপ্লবের পরিধি সীমাবদ্ধ থাকে নি। এ বিপ্লব পৃথিবীকে দিয়েছে এক নতুন সভ্যতার দিশা। ফলে এ বিপ্লবের গর্ভে জন্ম নিয়েছে উন্নত মানবতাবাদের ধারণা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক অগ্রসর ভাবধারা। মুনাফার বদলে বিজ্ঞানের সাথে ঘটেছে মানবতার সংযোগ, আইন পেয়েছে তার গণমুখী গতি। রাজনৈতিক অর্থনীতির কেন্দ্রতে এসেছে মানুষের ইহজাগতিক মুক্তির প্রসঙ্গ।
অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সত্যিই মানব সভ্যতার এক অনন্য সাধারণ ঘটনা। বিপ্লবের পর রাশিয়ার সাধারণ মানুষ সেটি বাস্তবিক অর্থেই হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছে। এ বিপ্লব গোটা দুনিয়াকে দেখিয়েছে, মানুষ কতটা মর্যাদাবান। যে গরিব মজুর মেহনতী, চাষাভুষা, যাদের চালচুলো নেই, হাজার বছরের কুসংস্কারের অন্ধকার যাদের নিত্যসঙ্গী, গতর খাটানোই জীবন, সুস্থ সুন্দর জীবন যাদের কাছে অলীক কল্পনা- সেই নীচুতলার মানুষদের কাছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের অধিকারকে বাস্তব করে তুলেছিল সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন। শোষক শ্রেণির শিক্ষা দর্শনের বিপরীতে ‘মুক্ত মানবের শিক্ষা দর্শন’ সৃষ্টি করেছিল অক্টোবর বিপ্লব। সোভিয়েত সরকার প্রতিষ্ঠার আগে সেখানে সার্বজনীন শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা ছিল না, তাই লক্ষ লক্ষ শিশু কখনোই স্কুলে যায়নি। বেশিরভাগ কৃষক ছিল অজ্ঞ, মূর্খ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন। সংখ্যালঘু জাতিগুলোর অবস্থা ছিল আরও করুণ। রাশিয়ার ১৭৫ টি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ১২৪ টির কোনো লিখিত হরফ ছিল না। ইউক্রেনীয়, জর্জিয়ানরা সংবাদপত্র, বই, এমনকি আদালতে পর্যন্ত নিজেদের ভাষা ব্যবহার করতে পারত না। রাশিয়ান ভাষায় তাদের পড়ালেখা শিখতে হতো। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৭৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক জনগণ ছিল অশিক্ষিত। কিছু সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষিতের হার ৫ শতাংশেরও কম ছিল। (যেমন- কাজাকিস্তানে ২ শতাংশ, উজবেকিস্তানে ১ শতাংশ, তাজিকিস্তানে ০.৫ শতাংশ।)। অক্টোবর বিপ্লব এ পরিসংখ্যান পাল্টে দিয়েছিল। সোভিয়েত সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২১-এ বলা হয়েছিল, ‘ইউএসএসআর-এর নাগরিকদের শিক্ষার অধিকার হবে সুরক্ষিত। সার্বজনীন, বাধ্যতামূলক, বুনায়াদী শিক্ষার দ্বারা এই অধিকার নিশ্চিত করা হবে। অবৈতনিক উচ্চশিক্ষাসহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীর রাষ্ট্রীয় উপবৃত্তি প্রদান করা হবে। স্কুল শিক্ষা স্থানীয় মাতৃভাষার মাধ্যমে পরিচালিত হবে। রাষ্ট্রীয় খামার, ট্রাক্টর স্টেশন এবং যৌথ খামারে পরিশ্রমী বা মেহনতিদের বৃত্তিগত, প্রযুক্তিগত ও কৃষি সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা অবৈতনিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে।’ শিক্ষার আলোর এ ঝর্নাধারায় একের পর এক আলোকিত হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন লোকালয়। এ সমাজতান্ত্রিক শিক্ষা দর্শনই দুনিয়ায় প্রথম শিখিয়েছিল, তোতা পাখির মতো মুখস্ত বুলি শেখানোর নাম শিক্ষা নয়। শিক্ষা মানে হলো, প্রকৃত মানুষ গড়া। মানুষের ভেতরের মানুষটাকে জাগিয়ে তোলা। মানুষের ভেতর হৃদয়বোধ আর নৈতিকতাকে জন্ম দেয়া। বলা হয়েছিল, শিক্ষার অন্যতম প্রধান উদ্দ্যেশ্য হবে, মানুষের মধ্যে শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধা এবং শ্রমশীলতা তৈরি করা। বাংলা লোকগানে যখন আমরা শুনি ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ তখন তা যেন সমাজতান্ত্রিক শিক্ষা দর্শনেরই প্রতিধ্বনি করে। শিক্ষা বলতে সেখানে শিল্প, বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি, ভাষা, কাজ, খেলা, নৈতিক চরিত্র, আচার-আচরণ সবইকিছুই বোঝাত। অথচ, পুঁজিবাদী সমাজে শিক্ষার সাথে জীবনের সে সংযোগ কোথায়? উন্নত পুঁজিবাদী পশ্চিমা সমাজেও আজ শিক্ষা তার দার্শনিক দিশা খুঁজে পায় নি। শিক্ষা সেখানে কেবলই কর্পোরেট দাস তৈরির মেশিন। ক্যারিয়ার নামক যন্ত্রের চাকায় পিষ্ট মানুষ। ভোগের ফেনায় ডুবন্ত মানবতা আর মৃত সব সৃজনশীলতা। স্বার্থপরতা এখানে বুদ্ধিমত্তা আর পরার্থপরতা মানে বোকামি। কর্পোরেট দুনিয়ার প্রাণহীন সব জমকালো অনুষ্ঠানগুলো আজ এ নিষ্ঠুর সত্যকেই জানান দিচ্ছে।
এই কর্পোরেট দুনিয়ার অর্গল ভেঙে যখন উইকিলিক্স এর জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জরা কিংবা এডওয়ার্ড স্নোডেন এর মতো ফিনিক্স পাখিগুলো বেরিয়ে আসে তখন কি দোলাটাই না প্রাণে লাগে। অক্টোবর বিপ্লবের অর্জন এখানেও। যেদিন ইউরি গ্যাগারিন মহাকাশে উড়ে বেরিয়েছিলেন, যেদিন পৃথিবীর প্রথম নারী নভোচারী ভ্যালেন্তিনা তেরেশকোভা মহাকাশযান ভস্তক-৬’এ চড়ে মহাকাশে পাড়ি দেন সেদিন দুনিয়ার মানুষ দেখেছিল অক্টোবর বিপ্লবের আরেক অর্জনকে। ১৯৬৩-র ১৬ জুন মহাকাশের ৪৮টি কক্ষপথ ২ দিন ২২ ঘণ্টা ৪২ মিনিটে পরিক্রম করে পৃথিবীকে দেখিয়ে দেন বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা কেমন হতে পারে। ‘অর্ডার অব লেনিন’ পুরস্কারে সম্মানিত ভ্যালেন্তিনা সোভিয়েত পার্টির গুরুত্বপূর্ণ পদও সামলেছেন। কিন্তু বিপ্লবী চেতনাকে ভুলে যাননি। এমনিভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও অন্যান্য ফলিত বিজ্ঞানে অতি দ্রুত অসামান্য অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি ছিল অক্টোবর বিপ্লব। সমাজতন্ত্রের রাশিয়ায় বিজ্ঞানের এ অগ্রযাত্রার পেছনে কোন মুনাফালোভী প্রণোদনা ছিল না। ছিল শুধু মানব সভ্যতার কল্যাণে অজানাকে জানার অদম্য বাসনা। এ কারণেই সম্ভবতঃ বিশ্বকবি রবি ঠাকুর তাঁর রাশিয়ার চিঠি বইতে লিখেছেন, রাশিয়া ভ্রমণ না করলে তাঁর তীর্থ দর্শন অসম্পূর্ণ থাকতো।
রবি ঠাকুর ছাড়াও বার্নান্ড রাসেল, পাবলো নেরুদা, নাজিম হিকমতের মতো দুনিয়ার অনেক মেধাবী সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, আইনবিদ, দার্শনিক রুশ বিপ্লবের ঢেউয়ে আন্দোলিত হয়েছেন। অক্টোবর বিপ্লবের প্রভাব সারা দুনিয়ায় সাম্রাজ্যবাদ আর উপনিবেশবাদের মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে। ১৯১৬ সালে লেনিন তাঁর বিখ্যাত রচনা ‘সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়’ লেখেন। সে রচনায় তিনি সুস্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেন কিভাবে ধনী দেশগুলো গরিব দেশগুলোকে লুটপাটের মাধ্যমে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখে। লেনিন এটাও প্রমাণ করেন, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই না করে পুঁজিবাদ বিরোধী লড়াইকে এগিয়ে নেয়া যায় না। লেনিনের এ মতবাদ দেশে দেশে জাতীয় মুক্তি আন্দোলন তথা উপনিবেশবাদ বিরোধী সংগ্রামের মূলমন্ত্র হিসেবে বিপ্লবীরা গ্রহণ করে। পরাধীনতার শেকল ভেঙে বেরিয়ে আসে ভিয়েতনাম, চীন, কিউবা, ভারতের মতো এশিয়া-আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়া এসব ক্ষেত্রে শুধু বাণী দিয়েই বসে থাকেনি, নিজ দেশের জনগণকে কষ্ট দিয়ে হলেও দুনিয়াব্যাপী এসব জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে অস্ত্র ও আর্থিক সাহায্যও দিয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে রাশিয়ার বিপুল সাহায্য এর অন্যতম বড় উদাহরণ। এভাবেই অক্টোবর বিপ্লব এক সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদের জন্ম দিয়েছিল। যেটি না থাকলে আজ হয়তো পৃথিবীর অনেক জাতিকেই পরাধীনতার গ্লানি বয়ে বেড়াতে হতো।
বিপ্লবী কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য এর কবিতা তাই প্রকৃত সত্যেরই প্রতিধ্বনি করেছে। কবি সুকান্ত লিখেছিলেন-
‘সযত্ন মুখোশধারী ধনিকের বন্ধ আস্ফালন
কাঁপে হৃদযন্ত্র তার, চোখে মুখে চিহ্নিত মরণ
বিপ্লব হয়েছে শুরু, পদানত জনতার ব্যাগ্র গাত্রোত্থানে,
দেশে দেশে বিস্ফোরণ অতর্কিতে অগ্নুৎপাত হানে।’
সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের কালে প্রতিটি অলিম্পিক গেমসে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর বিজয়ের পদক যেভাবে পুঁজিবাদী শাসকদের উল্লাসকে থামিয়ে দিতো সেভাবে আজো জনতার অভ্যুত্থান পৃথিবীর অনেক দেশেই শোষকদের কালোহাত দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে। আমেরিকা ও বৃটেনে এখন নতুন করে সমাজতন্ত্রের আওয়াজ উঠেছে। অক্টোবর বিপ্লবের শত বছর পুর্তির এ কালপর্বে দুনিয়া আবারো এক পরিবর্তনের সংকেত দিচ্ছে। পদানত জনতার ব্যাগ্র গাত্রোত্থানে দেশে দেশে আবারো বিস্ফোরণ অতর্কিতে অগ্নুৎপাত হানছে। একথা ঠিক যে, লোভী নেতাদের দুর্নীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে ৭০ বছরের সোভিয়েত সমাজতন্ত্র বিধ্বস্ত হয়েছিলো। তাই জীর্ণ কুআচার, মগজ এবং হৃদয়ের দৈন্য ঘুচিয়ে যারা এ সংকেতকে কাজে লাগাতে পারবে। তারাই আনবে একুশ শতকের সমাজতন্ত্র।
লেখক : আইনজীবী