রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে বলশেভিক নেতৃত্ব
Posted: 05 নভেম্বর, 2017
আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন :
১৮৬১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি*(গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা অনুসারে ৪ মার্চ) জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার আইন জারি করে ভূমিদাস প্রথার অবসান ঘোষণা করেন এবং নতুন ঘোষিত কর্মসূচির মাধ্যমে রাশিয়ায় পুঁজিবাদ বিকাশের সূচনা হয়।
১৮৬১ সালেই চেরনিশেভ্সকি, হেরজেন, ওগারেভ ও দবরোল্যুবভ প্রমুখ ‘জমি ও স্বাধীনতা’ নামে একটি গোপন বিপ্লবী সংস্থা গঠন করেন। এই সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল রুশ কৃষকদের নিয়ে একটি জাতীয় অভ্যুত্থান সংঘটিত করা। ১৮৭৪ সালে প্রায় এক হাজার রুশ তরুণ কৃষকের সাজে সজ্জিত হয়ে গ্রামে গ্রামে পদযাত্রা শুরু করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করা, কারণ তাদের কাছে কৃষকই ছিল রাশিয়াতে বিপ্লবী আন্দোলনের প্রধান নেতা ও মূল চালিকাশক্তি। এই তরুণ মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীরাই ‘নারদনিক’ নামে খ্যাত। ১৮৭৯ সালে ‘নারদনায়া ভলিয়া বা জনগণের ইচ্ছা’ নামে নতুন একটি বিপ্লবী সংগঠন গড়ে উঠে, যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সন্ত্রাসবাদের পথ অনুসরণ করে জারকে হত্যা করে সামন্তবাদের অবসান ঘটিয়ে রুশ জনগণের সামাজিক মুক্তির পথ সুগম করা। সোফিয়া পেরোভস্কায়া, আলেকজান্ডার মিখাইলভ, প্লেখানভ ‘জনগণের ইচ্ছা’ দলের নেতা ছিলেন। ১৮৮১ সালে জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারকে নারদনিকরা হত্যা করে। কিন্তু তার ফলে জারতন্ত্রের অবসান হয়নি। নারদনিকদের একাংশ বুঝতে পারে সন্ত্রাসবাদ ও গুপ্তহত্যার মাধ্যমে রুশ জনগণের মুক্তি সম্ভব নয়।
উনবিংশ শতাব্দীর পুরো সত্তর দশক জুড়ে সমগ্র রাশিয়ায় অসংখ্য শ্রমিক ধর্মঘট সংঘটিত হয়। ১৮৭৫ সালে ওদেসায় দক্ষিণ রুশ শ্রমিক ইউনিয়ন গঠিত হয়। ১৮৭৮ সালে সেন্ট পিটার্সবুর্গে উত্তর রুশ শ্রমিক ইউনিয়ন গঠিত হয়।
রাশিয়ায় মার্কসবাদের জনক প্লেখানভ ১৮৮০ সালে সুইজারল্যান্ডে নির্বাসনে চলে যান এবং ১৮৮২ সালে প্লেখানভ রুশ ভাষায় কমিউনিস্ট ইশতেহার অনুবাদ করেন এবং মাকর্স-এঙ্গেলসের ভূমিকাসহ তা প্রকাশিত হয়। ১৮৮৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্লেখানভ, পাভেল অ্যাক্সেলরড, ভেরা জাসিুলিচ, ভাসিলি ইগনাতভ প্রমুখ মিলে প্রবাসে জেনেভায় গঠন করেন রাশিয়ার প্রথম মার্কসবাদী সংগঠন ‘শ্রমিকমুক্তি সংঘ’। তাদের সাথে ক্রমান্বয়ে যুক্ত হন পিটার স্ত্রুভ, লেনিন, মার্তভ, আলেকজেন্ডার পেত্রোসভ, নাদেজদা স্ক্রুপস্কায়া প্রমুখ। এ সংঘ রাশিয়ায় মার্কসবাদের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরে।
১৮৯৫ সালে সেন্ট পিটার্সবুর্গের বিশটি শ্রমিকচক্রকে এক করে লেনিন ’শ্রমিকশ্রেণির মুক্তিসংগ্রাম সংঘ’ গঠন করেন। ১৮৯৮ সালের ১৩-১৫ মার্চ (২৬-২৮ মার্চ) মিন্স্ক শহরে নয় জন প্রতিনিধি নিয়ে রুশ সোশ্যাল-ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টি (আরএসডিএলপি)’র প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে থাকায় লেনিন এবং সুইজারল্যান্ডে প্রবাসে থাকায় প্লেখানভ কংগ্রেসে উপস্থিত থাকতে পারেন নি। আনুষ্ঠানিকভাবে পার্টি গঠন ও ইশতেহার ঘোষণা বিপ্লবী প্রচার কাজে বিরাট ভূমিকা রাখলেও পার্টির কোন কর্মসূচি, কোন নিয়মকানুন এবং কোন একটি নেতৃত্বশীল কেন্দ্র গড়ে উঠেনি। ১৯০০ সালে ডিসেম্বরে ‘ইসক্রা’ প্রত্রিকা প্রকাশিত হয়। লেনিন, প্লেখানভ, অ্যাক্সেলরড, মার্তভ, জাসুলিচ, পেত্রেসোভ এই ছয় জনকে নিয়ে সম্পাদকমণ্ডলী গঠিত হয়।
১৯০৩ সালের ১৭ জুলাই থেকে ১০ আগস্ট (৩০ জুলাই-২৩ আগস্ট) রুশ সোশ্যাল-ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেস প্রথমে ব্রাসেলস পরে লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয়। ২৬ টি সংগঠনের ৪৩ জন প্রতিনিধি কংগ্রেসে উপস্থিত ছিল। ৪৩ জন প্রতিনিধি ৫১ টি ভোটের অধিকারী ছিল। কংগ্রেসের মোট ৩৭ টি অধিবেশনের ১৩ টি ব্রাসেলসে এবং ২৪ টি লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় কংগ্রেসে গৃহিত কর্মসূচি ১৯১৮ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম কংগ্রেস পর্যন্ত বলবৎ ছিল। প্রায় ঐকমত্যের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি গৃহিত হলেও পার্টি সংগঠনের নিয়মকানুন নিয়ে ব্যাপক বিরোধ দেখা দেয়। লেনিন কংগ্রেসে উত্থাপন করেন-‘যে ব্যক্তি পার্টি কর্মসূচি মানবে, পার্টিকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করবে এবং পার্টির কোন না কোন সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকবে, তাকে পার্টির সদস্য করা যাবে।’ মার্তভসহ অন্যরা প্রথম দুটি শর্ত মানলেও তৃতীয় অর্থাৎ পার্টির কোন না কোন সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার শর্তটি মানতে অস্বীকার করে। পার্টির নিয়মাবলি প্রস্তাবের উপর ভোট গ্রহণ করা হলে লেনিনের প্রস্তাব বাইশ ভোট এবং মার্তভের প্রস্তাব আটাশ ভোট লাভ করে। একজন ভোটদানে বিরত ছিলেন। কিন্তু ‘বুন্দ’ কর্তৃক নিজেদের ইহুদি শ্রমিকদের একমাত্র সংগঠনের দাবি কংগ্রেস দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় বুন্দ-এর সাত জন প্রতিনিধি কংগ্রেস বর্জন করলে লেনিনের পক্ষের প্রতিনিধিরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কংগ্রেসে ট্রটস্কি মার্তভের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। পার্টির প্রধান প্রধান নেতৃস্থানীয় প্রতিষ্ঠান, পার্টির কেন্দ্রীয় মুখপত্র ইসক্রা’র সম্পাদকমণ্ডলী এবং কেন্দ্রীয় কমিটিতে লেনিনের মনোনীতরা জয়লাভ করেন। দ্বিতীয় কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় লেনিনপন্থিদের ‘বলশেভিক’ হিসেবে অখ্যায়িত করা হয়। অন্যরা ‘মেনশেভিক’ হিসেবে পরিচিতি পায়। কেন্দ্রীয় কমিটিতে তিনজন বলশেভিক ফ্রেডরিখ ভি লেনজনিক, ভøাদিমির এ নোসকভ, গ্লেব এম কিরজহিঝনোভস্কি নির্বাচিত হন। পরে কেন্দ্রীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হন লেনিন, ফিওদর গুসারভ, রোজালিয়া জেমলায়েসকা, লিওনিদ করাসিন, মারিয়া ইসেন, লেভ গালপোরিন, জোসেফ দুব্রভিনিস্কি, লেভ কারপভ, অ্যালেক্সেল লুবিমভ, ইয়েকেতারিনা অ্যালেক্সেন্দ্রভা, ভিক্টর করোচমাল, ভøাদিমির রোজালভ।
১৯০৫ সালের ১২-২৭ এপ্রিল (২৫ এপ্রিল-১০ মে) লন্ডনে আরএসডিএলপি (বলশেভিক)’র তৃতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। ২০ টি কমিটির ২৪ জন প্রতিনিধি কংগ্রেসে যোগ দেন। একই সময়ে জেনেভায় অনুষ্ঠিত মেনশেভিকদের সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের দলত্যাগী আখ্যায়িত করে লেনিন কর্তৃক ‘দুই কংগ্রেস-দুই পার্টি’ বলার মধ্য দিয়ে পার্টির মধ্যকার বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে যায়। চূড়ান্ত বিভক্তি না ঘটলেও বলশেভিক ও মেনশেভিকদের দুটি আলাদা নেতৃত্ব ও আলাদা কেন্দ্র গড়ে উঠে। মস্কো অভ্যুত্থানের ঠিক আগে ফিনল্যান্ডের টামারফর্সে বলশেভিকদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে জে ভি স্তালিন অংশগ্রহণ করেন এবং সেখানেই তিনি লেনিনের সাথে প্রথম মিলিত হন। লেভ ডেভিডোভিচ ট্রটস্কি ১৯০৫ সালের অভ্যুত্থানের সময় সেন্টপিটার্সবার্গ শ্রমিক সোভিয়েতে প্রথমে ভাইস চেয়ারম্যান পরে নভেম্বর মাসে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯০৬ সালের এপ্রিল মাসে সুইডেনের স্টকহমে আরএসডিএলপি’র ঐক্যবদ্ধ চতুর্থ কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। পার্টির ৫৭ টি সংগঠন হতে ১১১ জন প্রতিনিধি এবং ৯ জন পর্যবেক্ষক অংশগ্রহণ করেন। কংগ্রেসে মেনশেভিক প্রতিনিধিদের সংখ্যা সামান্য বেশি ছিল। এই কংগ্রেসে আনুষ্ঠানিক ঐক্য হলেও বলশেভিক ও মেনশেভিকরা নিজস্ব মত ও নিজস্ব সংগঠন বজায় রাখেন। বলশেভিকদের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের মধ্যে যারা কংগ্রেসে উপস্থিত হতে পেরেছিলেন তারা হচ্ছেন লেনিন, ফ্রনজে, কালিনিন, স্ক্রুপস্কায়া, লুনাচারস্কি, স্তালিন, ভরোভস্কি, ভরোসিলভ, ইয়ারোস্লাভস্কি প্রমুখ। নির্বাচিত কেন্দ্রীয় কমিটিতে বলশেভিক ছিলেন তিন জন এবং মেনশেভিক ছিলেন ছয় জন। কেন্দ্রীয় মুখপত্র ‘ইসক্রা’র সম্পাদকীয় বিভাগের সবাই ছিলেন মেনশেভিক।
১৯০৭ সালের ৩০ এপ্রিল-১৯ মে (১৩ মে-১ জুন) আরএসডিএলপি’র পঞ্চম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় লন্ডন শহরে। দেড় লাখ সদস্যের প্রতিনিধি হিসেবে ৩৩৬ জন প্রতিনিধি কংগ্রেসে যোগ দেন। এর মধ্যে ১০৫ জন বলশেভিক, ৯৭ জন মেনশেভিক। লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক নেতাদের মধ্যে ছিলেন, বুবনভ, দুব্রনিভস্কি, লিয়দভ, নোগিন, পব্রভোস্কি, স্তালিন, স্তাফানি, তিয়োভরোভিচ, তিসখাকায়া, ভরোসিলভ, ইয়ারোস্লাভস্কি প্রমুখ। বড় শিল্পাঞ্চল থেকে আগত প্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন বলশেভিক। কংগ্রেসে নির্বাচিত কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিলেন লেনিন, দুব্রনিভস্কি, ফিলিক্স দারজিনিস্কি, ক্রাসিন, ভি পি নোগিন। বলশেভিক সদস্যদের সংখ্যা ১৯০৫ সালে ছিল আট হাজার চার শত, ১৯০৬ সালে ছিল তের হাজার এবং ১৯০৭ সালে ছিল ছেচল্লিশ হাজার এক শত।
স্তলিপিন প্রতিক্রিয়ার যুগে ১৯০৭-১২ সালে পার্টির সদস্য সংখ্যা অনেক কমে যায়। পার্টির অনেক পেটি-বুর্জোয়া সহযোগীরা জার সরকারের অত্যাচারের ভয়ে পার্টির সংশ্রব পরিত্যাগ করে। মেনশেভিকদের একাংশ পার্টি বিলুপ্ত করে ঢিলেঢালা পার্টি গড়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে তাদেরকে ‘বিলোপবাদী’ আখ্যায়িত করা হয়। ১৯১২ সালেই ট্রটস্কি আরএসডিএলপি’র বিভিন্ন গ্রুপকে সাথে নিয়ে একটি মধ্যপন্থা জোট গঠন করেন। একে ‘আগস্ট জোট’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। ১৯১২ সালের ৫-১৭ জানুয়ারি (১৮-৩০ জানুয়ারি) প্রাগ শহরে আরএসডিএলপি’র ষষ্ঠ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিশটি পার্টি সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এ সম্মেলনে মেনশেভিকদের সংশ্রব পরিত্যাগ করে বলশেভিকরা স্বতন্ত্র মার্কসবাদী পার্টি আরএসডিএলপি (বলশেভিক) গড়ে তোলে। সম্মেলনে নির্বাচিত কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিলেন লেনিন, স্তালিন, সভের্দলভ, অর্জনিকিদজে, স্পান্দারিয়ান প্রমুখ। কেন্দ্রীয় কমিটির বিকল্প সদস্য ছিলেন কালিনিন। স্তালিন, সভেদলর্ভ, স্পান্দারিয়ান, অর্জনিকিদজে, কালিনিন এই পাঁচ জনকে সদস্য করে কেন্দ্রীয় কমিটির ‘রুশ ব্যুরো’ গঠিত হয়।
১৯১২ সালের ২২ এপ্রিল (৫ মে) পার্টির মুখপত্র হিসেবে ‘দৈনিক প্রাভদা’ প্রকাশিত হয়। সে সময় গড়ে প্রতিদিন চল্লিশ হাজার কপি বিক্রি হতো। আড়াই বছরে জার সরকার প্রাভদাকে আট বার বন্ধ করে দেয়। জে ভি স্তালিন লিখেন, “১৯১২ সালের প্রাভদা হলো ১৯১৭ সালে বলশেভিক বিজয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন”। ১৯১৪ সালের প্রথমার্ধ নাগাদ বলশেভিকরা রাজনীতি সচেতন শ্রমিকদের পাঁচ ভাগের চার ভাগকে নিজেদের পক্ষে সংগঠিত করতে সক্ষম হয়। তখন বলশেভিকদের বলা হতো প্রাভদাপন্থি। প্রাভদা হয়ে উঠে বিপ্লবীদের অন্যতম শিক্ষাকেন্দ্র। প্রাভদা বিপ্লবীদের শিক্ষিত করে তুলে।
১৯১২ সালে আরএসডিএলপি (বলশেভিক) চতুর্থ দুমা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। ছয় জন নির্বাচিত হয় এবং তাদের নিয়ে গঠিত ‘বলশেভিক গ্রুপ’ পার্টির আইনিভাবে কর্মরত কেন্দ্রীয় মুখপাত্রগুলোর অন্যতম ছিল। বলশেভিক গ্রুপ জমিদারী বাজেয়াপ্ত করে কৃষকদের মাঝে জমি বিতরণ করা এবং আট ঘণ্টা কর্মদিবস নির্ধারণের পক্ষে দুমার অভ্যন্তরে সোচ্চার ছিল।
১৯১৪ সালের ১ আগস্ট জার্মানরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করলে রুশ দেশের বিপ্লবী পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। শ্রমিক ধর্মঘট, কৃষক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিপ্লবী জোয়ার শুরু হয়। ভ. ই লেনিন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ আখ্যায়িত করে আওয়াজ তুলেন- ১) সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে গৃহযুদ্ধে রুপান্তরিত কর, ২) স্বীয় দেশের সাম্রাজ্যবাদী সরকারের পরাজয় ঘটানোর চেষ্টা কর। ১৯১৬ সালে লেনিন লিখলেন তাঁর বিখ্যাত ও সময়োপযোগী গ্রন্থ ‘সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়’। এ গ্রন্থে লেনিন সাম্রাজ্যবাদের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদকে সঙ্গায়িত করার পর দুটো সিদ্ধান্ত দেন- ১) সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ অনিবার্য, ২) সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়। সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে ক্ষয়িষ্ণু ও মুমূর্ষু পুঁজিবাদ। এটি পুঁজিবাদের শেষ অবস্থা। এবং একই সাথে এটিই হচ্ছে শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবের যুগের শুরু।
এ সময় লেনিন রাশিয়ায় বিপ্লবের নতুন তত্ত্ব দিলেন- ‘পুঁজিবাদের অসম বিকাশের তত্ত্ব’। মার্কসের সময় যেটা ছিল প্রতিযোগিতামূলক পুঁজিবাদ, লেনিনের আমলে তা পরিণত হয়েছে একচেটিয়া পুঁজিবাদ। মার্কস ভাবতেন উন্নত পুঁজিবাদী দেশে প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হবে। তাদের চিন্তায় ব্রিটেন, জার্মানিতে প্রথম বিপ্লব হবে। লেনিন পুঁজিবাদের অসম বিকাশ তত্ত্বের মাধ্যমে দেখান সাম্রাজ্যবাদী কালে ‘সাম্রাজ্যবাদের দুর্বলতম গ্রন্থিকে ছিন্ন করা সম্ভব’। তিনি রাশিয়াকে দুর্বলতম গ্রন্থি চিহ্নিত করে রাশিয়ায় শ্রমিকশ্রেণির প্রথম বিপ্লব ঘটানোর সিদ্ধান্ত করেন।
১৯১৭ সালে বিপ্লবের সূচনা হয় ৯ জানুযারি (২২ জানুয়ারি) ১৯০৫ এর ‘রক্তাক্ত রবিবার’ এর ১২ বৎসর পূর্তি উদযাপনের মাধ্যমে। ১১৪ টি শ্রমিক সংগঠন ধর্মঘট আহ্বান করে। ২৩ ফেব্রুয়ারি (৮ মার্চ) আন্তর্জাতিক নারী দিবসে নারীরা রাস্তায় নামে খাদ্যের দাবিতে। ২৪-২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি (৯-১০-১১ মার্চ) শ্রমিক ধর্মঘট সশস্ত্র রূপ নেয়। শ্রমিকরা পুলিশ ও সৈনিকদের অস্ত্র কেড়ে নেয়। লেনিন ছিলেন সুইজারল্যান্ড। স্তালিন ছিলেন সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে। পেত্রগ্রাদে পার্টির হেডকোয়ার্টারের দায়িত্বে ছিলেন কমরেড মলটভ। পার্টির সদস্য সংখ্যা ছিল চল্লিশ হাজার। ২৬ ফেব্রুয়ারি (১১ মার্চ) হেডকোয়ার্টার থেকে নির্দেশ প্রচারিত হলো- অভ্যুত্থান চালিয়ে যাও। জারতন্ত্র উচ্ছেদ কর। সাময়িক বিপ্লবী সরকার গঠন কর। একই দিনে জার দ্বিতীয় নিকোলাস দুমা ভেঙে দিল। সৈনিকরা দলে দলে অভ্যুত্থানে যোগ দিল। ২৭ ফেব্রুয়ারি (১২ মার্চ) সকালে অভ্যুত্থানে যোগ দেয়া সৈনিকের সংখ্যা ছিল দশ হাজার। সন্ধ্যায় তা হয়ে যায় ষাট হাজার। সৈনিকরা জারের মন্ত্রীদের গ্রেপ্তার করে এবং রাজবন্দিদের মুক্ত করে দেয়। ১৯১৭ সালের ২ মার্চ (১৫ মার্চ) জার দ্বিতীয় নিকোলাস পদত্যাগ করে। জারতন্ত্রের অবসান ঘটে। রাশিয়ায় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হয়।
ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পর বলশেভিকরা নিজেদের ব্যাপৃত করলেন শ্রমিক-কৃষক-সৈনিক সোভিয়েতগুলোকে সংঘটিত করতে এবং ক্রমান্বয়ে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে। অপরদিকে অন্যান্যরা যোগ দিল সাময়িক সরকারে। ১৯১৭ সালের ৩ এপ্রিল (১৮ এপ্রিল) লেনিন পেত্রগ্রাদ এলেন। তাঁর বিখ্যাত এপ্রিল থিসিস দিলেন বলশেভিকদের কমিটি সভায়। এপ্রিল থিসিসে ‘সোভিয়েতের হাতে সকল ক্ষমতা’ তুলে দেবার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন বিপ্লব মাঝ পথে থামিয়ে দেয়া যাবে না এ বিপ্লবকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে পরিণত করতে হবে। ২৪ এপ্রিল (৭ মে) পার্টির সপ্তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল দুমাসে পার্টির সদস্য চল্লিশ হাজার বেড়ে আশি হাজার হয়। সম্মেলনে বিপ্লবের প্রস্তুতি এবং বিপ্লবোত্তর কর্মসূচি গৃহিত হয়।
জে ভি স্তালিন ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পর পরই পেত্রগ্রাদে ফিরে আসেন। লেভ কামেনেভকে সাথে নিয়ে দৈনিক প্রাভদার সম্পাদকীয় বিভাগের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি পেত্রগ্রাদ শ্রমিক সোভিয়েতের নির্বাহী কমিটিতে বলশেভিক প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। পেত্রগ্রাদে অবস্থান করে জুলাই অভ্যুত্থান পরিচালনা করেন।
৩ জুন (১৬ জুন) প্রথম নিখিল রুশ সোভিয়েত কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। পেত্রগ্রাদে বলশেভিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও কংগ্রেসে বলশেভিকদের সংখ্যা ছিল এক’শ আর অন্যদের ছিল আট’শ। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বন্ধের বলশেভিকদের দাবি প্রত্যাখান করে সাময়িক সরকার। মেনশেভিক ও রেভলিউশনারি সোশ্যালিস্টদের সমর্থক সংখ্যাগরিষ্ঠ সোভিয়েত নেতৃত্ব সাময়িক সরকারকে সমর্থন করে। ফলে সৈনিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।
১৯১৭ সালের ২৬ জুলাই-৩ আগস্ট (৮-১৬ আগস্ট) বলশেভিক পার্টির ষষ্ঠ কংগ্রেস পেত্রগ্রাদে অনুষ্ঠিত হয়। দুই লাখ চল্লিশ হাজার সদস্যের ১৫৭ জন প্রতিনিধি এবং ১১০ জন পর্যবেক্ষক কংগ্রেসে অংশ নেন। কংগ্রেসে সাংগঠনিক রিপোর্ট উত্থাপনকালে ওয়াই এম সেভের্দলভ উল্লেখ করেন এপ্রিল থেকে জুন তিন মাসে পার্টি সংগঠন ৭৮ থেকে বেড়ে ১৬২ টি হয়েছে। সদস্য সংখ্যা আশি হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে দুই লাখ চল্লিশ হাজার। কংগ্রেসে স্তালিন বলেন- ‘বিপ্লবের শান্তিপূর্ণ পর্যায় শেষ হয়েছে, শুরু হয়েছে শান্তিহীন পর্যায়, সংঘাত ও বিস্ফোরণের পর্যায়।’ কংগ্রেস ‘সকল ক্ষমতা সোভিয়েতের হাতে’ শ্লোগান প্রত্যাহার করে নেয় এবং শ্লোগান তুলে ‘প্রতিক্রিয়াশীল সরকারকে উচ্ছেদ কর’। কংগ্রেসস্থলে অবস্থান করে স্তালিন আত্মগোপনে থাকা লেনিনের নির্দেশনায় কংগ্রেস পরিচালনা করেন। লেভ ট্রটস্কি কংগ্রেসে উপস্থিত হয়ে নিজের দলের বিলুপ্তি ঘটিয়ে সদলবলে বলশেভিকদের সাথে যোগ দেন। কংগ্রেসে নির্বাচিত নতুন কমিটিতে ছিলেন, ভ ই লেনিন, জে ভি স্তালিন, ওয়াই এ বারজিন, এ এস বুবনভ, ফিলিক্স দারজেনেস্কি, এ এম কলোন্তাই, ভি পি মিলিউতিন, এম কে মোরানভ, ভি পি নোগিন, এফ এ সার্গেয়েভ, এস জি শাহহুমায়ান, ওয়াই এম সেভের্দলভ, এম এস ইউরিৎস্কি।
কংগ্রেসের পর পরই কার্নিলভের সামরিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা বলশেভিকদের সহযোগিতায় সাময়িক সরকার রুখে দেয়। সেপ্টেম্বর মাসে রেভলিউশনারি সোসালিস্টদের বিভক্তি, মেনশেভিকদের একাংশের বলশেভিকদের সাথে যোগদান সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে পেত্রগ্রাদ, মস্কোতে বলশেভিকদের অবস্থান দৃঢ় হয়। ২১ অক্টোবর (৩ নভেম্বর) লেনিন পেত্রগ্রাদে ফিরে আসেন। ২৩ অক্টোবর (৫ নভেম্বর) কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় লেনিন সশস্ত্র অভ্যুত্থানের প্রস্তাব দেন। কামেনেভ, জিনোভিয়েভের বিরোধিতা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় কমিটি প্রস্তাব অনুমোদন করে। অভ্যুত্থান পরিচালনার জন্য স্তালিন, সেভের্দলভ, দারজেনেস্কি ও ইউরিৎস্কিকে নিয়ে ‘পার্টি কেন্দ্র’ গঠন করা হয়।
১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবর (৭ নভেম্বর) বলশেভিকরা দ্বিতীয় নিখিল রুশ সোভিয়েত কংগ্রেস আহ্বান করে। পেত্রগ্রাদে স্মোলনি প্রাসাদে রাত ১০-৪৫ এ কংগ্রেসের উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়। তার আগে ২৪ অক্টোবর (৬ নভেম্বর) সকালে কেরেনেস্কির বাহিনী বলশেভিকদের আক্রমণ করলে বলশেভিক রেড গার্ডরা তা প্রতিহত করে। ২৪ অক্টোবর (৬ নভেম্বর) রাতে লেনিন উপস্থিত হলেন স্মোলনি প্রাসাদে। ২৫ অক্টোবর (৭ নভেম্বর) সকালে রেডগার্ড সাময়িক সরকারের হেডকোয়ার্টার শীতপ্রাসাদ দখল করে। কেরেনেস্কি পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও তার মন্ত্রীদের আটক করে রেডগার্ডরা।
২৫ অক্টোবর (৭ নভেম্বর) রাত ১০.৪৫ মিনিটে ঘোষণা করা হলো ‘বিপ্লব সফল হয়েছে। সাময়িক সরকারের পতন ঘটেছে। ক্ষমতা নিয়েছে সোভিয়েত।’ ২৬ অক্টোবর (৮ নভেম্বর) রাত আড়াইটায় লেভ কামেনেভ সরকার গঠনের ডিক্রি পড়ে শুনান। সংবিধান সভা না বসা পর্যন্ত শাসন পরিচালনার জন্য “জনকমিশার পরিষদ” নামে শ্রমিক-কৃষকের একটি সাময়িক সরকার গঠিত হয়। পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন, জাতিসত্ত্বা দপ্তরের সভাপতি- জে ভি স্তালিন, স্বরাষ্ট্র- এ আই রিকভ, কৃষি- ভি পি মিলিউতিন, শ্রম- এ জি শ্লিয়াপনিকভ, বাণিজ্য ও শিল্প- বি পি নোগিন, জনশিক্ষা- এ ভি লুনাচারস্কি, পররাষ্ট্র- লিয়ন ট্রটস্কি, বিচার- জি আই ওপ্পোকভ, অর্থ-আই আই স্কভর্ৎসভ, সরবরাহ- আই এ তেওদরোভিচ, ডাক-তার-এন পি আভিলভ।
* তারিখসমূহ রুশ পুরাতন বা জুলিয়ান পঞ্জিকা অনুসারে এবং বন্ধনীর ভিতরে গ্রেগরিয়ান বা নতুন পঞ্জিকা অনুসারে।
লেখক : প্রেসিডিয়াম সদস্য, সিপিবি